ঢাকা ০২:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
শিক্ষার্থীদের স্বার্থই সরকারের অগ্রাধিকার: মাহদী আমিন ফের লঘুচাপ সৃষ্টির আভাস, আবহাওয়া নিয়ে নতুন বার্তা অধিদপ্তরের চলতি অর্থবছরেই ৪১ লাখ নতুন ফ্যামিলি কার্ড দেবে সরকার দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা সরকারের প্রধান নীতিগত অগ্রাধিকার : প্রধানমন্ত্রী সংসদে ‘ব্যক্তিগত মন্তব্য’ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করলেন শিক্ষামন্ত্রী আদমদীঘিতে কাঁচা মরিচের দামে ‘সেঞ্চুরি’, স্বস্তিতে কৃষক ব্রয়লার মুরগি খাওয়া কতটা নিরাপদ ‘ব্রয়লার মুরগি’ মন্তব্য নিয়ে যে ব্যাখ্যা দিলেন ছাত্রদলের নাছির দেশের যেসব অঞ্চলে রাত ১টার মধ্যে ঝড়ের আভাস দিল্লিতে বসে হুঙ্কার দিয়ে লাভ নেই, সীমানায় ঢুকলেই গ্রেপ্তার: আইনমন্ত্রী

শতবর্ষ পুরানো ‘কুড়িয়ানা নৌকার হাট

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০১:৪২:৩৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০১৫
  • ৪২৪ বার

ধান, নদী, খাল– এই তিনে বরিশাল৷ জালের মতো ছড়ানো ছিটানো নদী আর খালের প্রাধান্য থাকায় এ অঞ্চলে আজও চলাচলের প্রধান যান নৌকা৷ আর বর্ষার সময় নদী-খালের পানি বেড়ে যাওয়ায় নৌকার ব্যবহারও যায় বেড়ে৷ বসে নৌকার হাটও৷

ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক

পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠি উপজেলার কুড়িয়ানা হাটে নৌকা নিয়ে যাচ্ছেন কারিগররা৷ স্বরূপকাঠির সন্ধ্যা নদীর শাখা খাল ‘কুড়িয়ানা’-তে সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার বসে এ নৌকার হাট৷ প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকাজুড়ে জলে ও ডাঙ্গায় বসা এ হাট এই অঞ্চলের ঐতিহ্যেরও ধারক৷

নৌকা তৈরি করা যাঁদের পেশা

স্বরূপকাঠি উপজেলার এগারোটি গ্রামের প্রায় দেড় হাজারেরও বেশি পরিবারের প্রধান পেশা নৌকা তৈরি করা৷ উপজেলার আটঘর, কুড়িয়ানা, আদমকাঠি, জিন্দাকাঠি, ইন্দুরকানি, দলাহার, আতাপাড়া, শেখেরহাট, চামির, গাগর, গগন প্রভৃতি গ্রামের নৌকার কারিগররা সারা সপ্তাহজুড়ে ব্যস্ত থাকেন নৌকা তৈরিতে৷ আর তারপর শুক্রবার সেই সব নৌকা নিয়ে বিক্রি করেন কুড়িয়ানা নৌকার হাটে৷

বর্ষায় রবিবারেও বসে হাট

শুক্রবার খুব সকাল থেকেই কারিগররা কুড়িয়ানার হাটে আসতে শুরু করেন৷ ক্রেতা সমাগম বিকেলে হলেও, ক্রেতা আকৃষ্ট করতে ভালো জায়গা দখলের প্রতিযোগিতা থাকে এখানে৷ কুড়িয়ানার হাট সাধারণত সপ্তাহে মাত্র একদিন, অর্থাৎ শুক্রবার বসলেও বর্ষা মৌসুমে চাহিদা বেশি থাকায় রবিবারেও সীমিত আকারে হাট বসান বিক্রেতারা৷

দুর্লভ হয়ে উঠেছে সুন্দরীশতবর্ষ পুরানো ‘কুড়িয়ানা নৌকার হাট’

আটঘর বাজারে সাধারণত বিক্রি হয় কোষা ও ডিঙ্গি নৌকা৷ এ বাজারের নৌকার কারিগর আশুতোষ জানালেন যে, তাঁর বাপ-দাদারা নৌকা তৈরি করতেন সুন্দরী কাঠ দিয়ে৷ সে সময়ে সুন্দরী কাঠের সবচেয়ে বড় মোকাম ছিল স্বরূপকাঠি৷ তবে দিনে দিনে সুন্দরী কাঠ দুর্লভ হয়ে ওঠায়, তাঁরা এখন নৌকা তৈরি করছেন মেহগনি, চাম্বল, রেইনট্রি, গাব, গুলাব, আমড়া, বাদাম প্রভৃতি কাঠ দিয়ে৷

দু’জন মিলে করি কাজ…

ইন্দুরকানি গ্রাম থেকে আসা নৌকা বিক্রেতা আমজাদ মোল্লা জানান যে, দু’জন মিস্ত্রী দিনে একটি ছোট নৌকা তৈরি করতে পারেন৷ আকার আর কাঠের রকম ভেদে একেকটি নৌকা বিক্রি হয় দেড় হাজার থেকে চার হাজার টাকায়৷ তবে নৌকায় গাব, আলকাতরা কিংবা অন্য কোনো কারুকাজ থাকলে দামের তারতম্য তো হয়-ই৷

নামাজের পর জমে ওঠে বাজার

দিনের প্রথমভাগে নৌকা বিক্রেতারা হাটে এসে অলস সময় কাটান৷ এই ফাঁকে কেউ কেউ আবার একটিখানি জিরিয়ে বা ঘুমিয়েও নেন৷ তবে শুক্রবারের জুম্মার নামাজের পর বাজার জমে উঠলে বিক্রেতাদের ব্যস্ত সময় কাটাতে হয়৷

মুঠোফোনেও হয় লেনদেন

কুড়িয়ানা নৌকার হাটে ক্রেতার অপেক্ষা করছেন বিক্রেতারা৷ তবে সব সময় এ সব বিক্রেতাকে ক্রেতার অপেক্ষায় থাকতে হয় না৷ মোবাইল নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ ও মুঠোফোন সহজলভ্য হওয়ায় অনেক ক্রেতাই আজকাল কারিগরদের কাছে আগাম চাহিদার কথা জানান৷ পরে হাটের দিনে এসে যাচাই বাচাই করে সে নৌকা বুঝে নেন৷

এক নৌকায় দুই মৌসুম

কুড়িয়ানা হাটে ক্রেতারা নৌকা কেনার আগে ভালো করে যাচাই বাচাই করে নেন৷ স্বল্প আয়ের এ সব মানুষদের প্রতিটি নৌকা দিয়ে কমপক্ষে দুটি মৌসুম পার করতে হয়৷ প্রত্যেক ক্রেতাই তাই তাঁদের টাকার সর্বোচ্চ মূল্য পেতে সচেষ্ট থাকেন৷ তারপর নৈকা কিনে আনন্দে ঘরে ফেরেন তাঁরা৷

বৈঠাও বিক্রি হয় বাজারে

নৌকা চালানোর জন্য দরকার বৈঠা৷ কুড়িয়ানা বাজারে কোনো কোনো বিক্রেতা তাই শুধু নৌকার বৈঠা বিক্রি করেন৷ আর ক্রেতারা নৌকা কেনার পর আকার অনুযায়ী বৈঠা কিনে নেন বাজার থেকে৷ কুড়িয়ানা নৌকার হাটে সাধারণত একেকটি বৈঠার দাম ৮০-২০০ টাকা৷ বলা বাহুল্য, কাঠের ধরণ ও আকার অনুযায়ী বৈঠার দামের তারতম্য হয়৷

নানা কাজে ব্যবহৃত হয় নৌকা

কুড়িয়ানা বাজারে বিক্রি হওয়া নৌকাগুলো এ অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন কাজে বহুল ব্যবহৃত হয়৷ সাধরণত মাছ ধরা, কোথাও বেড়াতে যাওয়া, বাজারে পণ্য সরবাহ, পেয়ারা ধরা, হাট-বাজারে যাওয়াসহ নানান কাজে এ সব নৌকার ব্যবহার হয়৷

ভাসমান হাট বেশি দূরে নয়শতবর্ষ পুরানো ‘কুড়িয়ানা নৌকার হাট’

স্বরূপকাঠির পার্শ্ববতী ঝালকাঠি জেলার ভিমরুলি গ্রামের কৃত্তিপাশা খালে বসে এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ভাসমান হাট৷ বর্ষা ও শরতে এ হাটে শত শত নৌকা বোঝাই পেয়ারা আর আমড়া বিক্রি হয়৷ আর এ সব নৌকার বেশিরভাগেরই যোগান আসে কুড়িয়ানার নৌকার হাট থেকে৷

পাশেই রয়েছে আরেক হাট

কুড়িয়ানার পাশেই আরেকটি হাট ‘আটঘর’৷ ভাসমান এ হাটেও ছোট ছোট নৌকায় কৃষিপণ্য নিয়ে জড়ো হন বিক্রেতারা৷ এ বাজারেও কুড়িয়ানা হাটের নৌকারই প্রাধান্য৷ ।ডচভেলে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

শিক্ষার্থীদের স্বার্থই সরকারের অগ্রাধিকার: মাহদী আমিন

শতবর্ষ পুরানো ‘কুড়িয়ানা নৌকার হাট

আপডেট টাইম : ০১:৪২:৩৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০১৫

ধান, নদী, খাল– এই তিনে বরিশাল৷ জালের মতো ছড়ানো ছিটানো নদী আর খালের প্রাধান্য থাকায় এ অঞ্চলে আজও চলাচলের প্রধান যান নৌকা৷ আর বর্ষার সময় নদী-খালের পানি বেড়ে যাওয়ায় নৌকার ব্যবহারও যায় বেড়ে৷ বসে নৌকার হাটও৷

ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক

পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠি উপজেলার কুড়িয়ানা হাটে নৌকা নিয়ে যাচ্ছেন কারিগররা৷ স্বরূপকাঠির সন্ধ্যা নদীর শাখা খাল ‘কুড়িয়ানা’-তে সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার বসে এ নৌকার হাট৷ প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকাজুড়ে জলে ও ডাঙ্গায় বসা এ হাট এই অঞ্চলের ঐতিহ্যেরও ধারক৷

নৌকা তৈরি করা যাঁদের পেশা

স্বরূপকাঠি উপজেলার এগারোটি গ্রামের প্রায় দেড় হাজারেরও বেশি পরিবারের প্রধান পেশা নৌকা তৈরি করা৷ উপজেলার আটঘর, কুড়িয়ানা, আদমকাঠি, জিন্দাকাঠি, ইন্দুরকানি, দলাহার, আতাপাড়া, শেখেরহাট, চামির, গাগর, গগন প্রভৃতি গ্রামের নৌকার কারিগররা সারা সপ্তাহজুড়ে ব্যস্ত থাকেন নৌকা তৈরিতে৷ আর তারপর শুক্রবার সেই সব নৌকা নিয়ে বিক্রি করেন কুড়িয়ানা নৌকার হাটে৷

বর্ষায় রবিবারেও বসে হাট

শুক্রবার খুব সকাল থেকেই কারিগররা কুড়িয়ানার হাটে আসতে শুরু করেন৷ ক্রেতা সমাগম বিকেলে হলেও, ক্রেতা আকৃষ্ট করতে ভালো জায়গা দখলের প্রতিযোগিতা থাকে এখানে৷ কুড়িয়ানার হাট সাধারণত সপ্তাহে মাত্র একদিন, অর্থাৎ শুক্রবার বসলেও বর্ষা মৌসুমে চাহিদা বেশি থাকায় রবিবারেও সীমিত আকারে হাট বসান বিক্রেতারা৷

দুর্লভ হয়ে উঠেছে সুন্দরীশতবর্ষ পুরানো ‘কুড়িয়ানা নৌকার হাট’

আটঘর বাজারে সাধারণত বিক্রি হয় কোষা ও ডিঙ্গি নৌকা৷ এ বাজারের নৌকার কারিগর আশুতোষ জানালেন যে, তাঁর বাপ-দাদারা নৌকা তৈরি করতেন সুন্দরী কাঠ দিয়ে৷ সে সময়ে সুন্দরী কাঠের সবচেয়ে বড় মোকাম ছিল স্বরূপকাঠি৷ তবে দিনে দিনে সুন্দরী কাঠ দুর্লভ হয়ে ওঠায়, তাঁরা এখন নৌকা তৈরি করছেন মেহগনি, চাম্বল, রেইনট্রি, গাব, গুলাব, আমড়া, বাদাম প্রভৃতি কাঠ দিয়ে৷

দু’জন মিলে করি কাজ…

ইন্দুরকানি গ্রাম থেকে আসা নৌকা বিক্রেতা আমজাদ মোল্লা জানান যে, দু’জন মিস্ত্রী দিনে একটি ছোট নৌকা তৈরি করতে পারেন৷ আকার আর কাঠের রকম ভেদে একেকটি নৌকা বিক্রি হয় দেড় হাজার থেকে চার হাজার টাকায়৷ তবে নৌকায় গাব, আলকাতরা কিংবা অন্য কোনো কারুকাজ থাকলে দামের তারতম্য তো হয়-ই৷

নামাজের পর জমে ওঠে বাজার

দিনের প্রথমভাগে নৌকা বিক্রেতারা হাটে এসে অলস সময় কাটান৷ এই ফাঁকে কেউ কেউ আবার একটিখানি জিরিয়ে বা ঘুমিয়েও নেন৷ তবে শুক্রবারের জুম্মার নামাজের পর বাজার জমে উঠলে বিক্রেতাদের ব্যস্ত সময় কাটাতে হয়৷

মুঠোফোনেও হয় লেনদেন

কুড়িয়ানা নৌকার হাটে ক্রেতার অপেক্ষা করছেন বিক্রেতারা৷ তবে সব সময় এ সব বিক্রেতাকে ক্রেতার অপেক্ষায় থাকতে হয় না৷ মোবাইল নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ ও মুঠোফোন সহজলভ্য হওয়ায় অনেক ক্রেতাই আজকাল কারিগরদের কাছে আগাম চাহিদার কথা জানান৷ পরে হাটের দিনে এসে যাচাই বাচাই করে সে নৌকা বুঝে নেন৷

এক নৌকায় দুই মৌসুম

কুড়িয়ানা হাটে ক্রেতারা নৌকা কেনার আগে ভালো করে যাচাই বাচাই করে নেন৷ স্বল্প আয়ের এ সব মানুষদের প্রতিটি নৌকা দিয়ে কমপক্ষে দুটি মৌসুম পার করতে হয়৷ প্রত্যেক ক্রেতাই তাই তাঁদের টাকার সর্বোচ্চ মূল্য পেতে সচেষ্ট থাকেন৷ তারপর নৈকা কিনে আনন্দে ঘরে ফেরেন তাঁরা৷

বৈঠাও বিক্রি হয় বাজারে

নৌকা চালানোর জন্য দরকার বৈঠা৷ কুড়িয়ানা বাজারে কোনো কোনো বিক্রেতা তাই শুধু নৌকার বৈঠা বিক্রি করেন৷ আর ক্রেতারা নৌকা কেনার পর আকার অনুযায়ী বৈঠা কিনে নেন বাজার থেকে৷ কুড়িয়ানা নৌকার হাটে সাধারণত একেকটি বৈঠার দাম ৮০-২০০ টাকা৷ বলা বাহুল্য, কাঠের ধরণ ও আকার অনুযায়ী বৈঠার দামের তারতম্য হয়৷

নানা কাজে ব্যবহৃত হয় নৌকা

কুড়িয়ানা বাজারে বিক্রি হওয়া নৌকাগুলো এ অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন কাজে বহুল ব্যবহৃত হয়৷ সাধরণত মাছ ধরা, কোথাও বেড়াতে যাওয়া, বাজারে পণ্য সরবাহ, পেয়ারা ধরা, হাট-বাজারে যাওয়াসহ নানান কাজে এ সব নৌকার ব্যবহার হয়৷

ভাসমান হাট বেশি দূরে নয়শতবর্ষ পুরানো ‘কুড়িয়ানা নৌকার হাট’

স্বরূপকাঠির পার্শ্ববতী ঝালকাঠি জেলার ভিমরুলি গ্রামের কৃত্তিপাশা খালে বসে এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ভাসমান হাট৷ বর্ষা ও শরতে এ হাটে শত শত নৌকা বোঝাই পেয়ারা আর আমড়া বিক্রি হয়৷ আর এ সব নৌকার বেশিরভাগেরই যোগান আসে কুড়িয়ানার নৌকার হাট থেকে৷

পাশেই রয়েছে আরেক হাট

কুড়িয়ানার পাশেই আরেকটি হাট ‘আটঘর’৷ ভাসমান এ হাটেও ছোট ছোট নৌকায় কৃষিপণ্য নিয়ে জড়ো হন বিক্রেতারা৷ এ বাজারেও কুড়িয়ানা হাটের নৌকারই প্রাধান্য৷ ।ডচভেলে।