ঢাকা ০১:০২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

আমিও মুক্তিযোদ্ধা : এক কিশোরের আত্মকথা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:০২:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০১৫
  • ৫৮৪ বার

(দুই)

বাড়ীর ভস্মস্তূপ দেখে কান্না আসতে চাইল কিন্তু কাঁদতে পারলাম না, এর আগে এপ্রিলে সোহাগী বাজারে আব্বার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান .সৈয়দ এজেন্সি. নামের এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ঔষধের ফার্মেসিসহ দুটো ঘর পিছনে বাসাসহ পুড়ে ভস্ম করেছিল এত কষ্ট লাগেনি. এটা হজম করতেই পারছিনা, দাঁতে দাঁত চেপে হজম করলাম কান্নাটা।

মাথায় প্রতিশোধের আগুন জ্বলে উঠল, আমাকেও ট্রেনিং নিতে হবে, বইগুলো পোড়ার প্রতিশোধ নিতেই হবে। পেটে ক্ষুধার আগুন জ্বলছে, হাছুনি ভাইকে বললাম. ।।আমাকে ফকির বাড়ী দিয়ে আসো।। হাছুনি ভাই হোছেনের হাতে তিন ব্যাটারির টর্চটা দিয়ে দুই ব্যাটারিরটা ওর কাছ থেকে নিল,বলল।। তুই বারিন্দা ব আমি শফীক মেয়ারে দেয়া আইতাছি।। আমরা ফকির বাড়ীপানে হাঁটছি, এসময়ই তুফানি ভাই. শহরালি, বর্গদার আব্দুল ভাই.হেলিমসহ প্রায় দশজন এসে বৈঠক ঘরের বারান্দায় জমলো. সবার হাতেই দেশীয় অস্ত্র, কারো হাতে টর্চ, আব্দুল খাঁ’র হাতে নারিকেলের হুকা আর খড়ের পাকানো মশাল।

হেলিমের হাতে আমাদের লাল রেডিওটা, সবাই বৈঠক ঘরে এবং বারান্দায় সারারাত থাকবে। তাদের রেখে হাছুনি ভাই আমাকে নিয়ে চলল উত্তরদিকে ফকিরবাড়ী পানে। বহুদিন আম্মা ভাইবোনের সাথে মিলিত হলাম। ফকির বাড়ীতে আব্বার দাদা বিয়ে করেছিলেন, আম্মা জীবনে কারো বাড়ীতে যান নাই, মুক্তিযুদ্ধ এ বাড়ীতে এনেছে।বড় ঘরটিতে আম্মাসহ থাকার ব্যবস্থা করেছে।

পা দুটো ফুলে গেছে হাঁটতে পারছি না, কোনরকমে ফকিরবাড়ী এসে চারটে খেয়ে আম্মার কাছে শুয়ে পড়লাম, সাথে সাথেই ঘুম। পরদিন পাড়ায় বেরুলাম সামনের পাড়ার সাহেদ আর হাসেমের সাথে যুক্তি করলাম, কোনপথে ইন্ডিয়া যাওয়া যায়।

ওরা দুজনেও মুক্তিযুদ্ধে যেতে আগ্রহী.হাসেম বলল আমি ফকিরের বাজার,দশধার দিয়ে ইন্ডিয়া যাবার পথ চিনি, চল কালই আমরা যাত্রা করি, যে কথা সেই কাজ। পরদিন ভাইবোনসহ আম্মাও বাড়ী এসে পাকা ঘরটায় উঠলেন। এরপর দিন ১০ টাকা পকেটে নিয়ে হাসেম সাহেদসহ কেল্লা তাজপুর হয়ে আমরা তিনজন গাড়ো পাহাড় লক্ষ্য করে বাড়ী থেকে উত্তর দিকে এগুলাম।

সম্ভবতঃ শ্রাবণের শেষ, বর্ষাকাল, এরমাঝে চারদিকে মুক্তিযোদ্ধারাও এসে গেছে. হানাদারেরা ক্যাম্প থেকে বেরুচ্ছে না ,রাজাকারেরা ব্রিজে শ্টেশনে পাহাড়া দিচ্ছে, টুকটাক যুদ্ধও চলছে চারদিকে।

এখনকার মত যদি দিনলিপি লিখতাম তাহলে তারিখগুলো ভুল হতনা। যাক তিনজনের বাহিনী ছুটে চললাম এক কাপড়ে, আমার পরণে সেই লুঙিটা, যেটা প্রথমবারের মত কিনে পরেছি।

এখনকার মত যদি দিনলিপি লিখতাম তাহলে তারিখগুলো ভুল হতনা। যাক তিনজনের বাহিনী ছুটে চললাম এক কাপড়ে, আমার পরণে সেই লুঙিটা, যেটা প্রথমবারের মত কিনে পরেছি।

হাসেম কোনদিক দিয়ে নিয়ে চলেছে কিছুই চিনিনা। অনেক স্থানে সড়কে ব্রিজ না থাকায় ভাংগা রাস্তায় কখনো বুক পানি পেট পানি কখনো কোমড় পানিতে ভিজে রাস্তা পাড়ি দিচ্ছি, বলা বাহুল্য তিনজনেই লুঙি জামা খুলে জন্মদিনের পোশাকে ভাংগা রাস্তা পেরিয়েছি।

এভাবে রাত ৮টায় নেত্রকোনা মহকুমার ঠাকুরাকোনার কাছে বাউসি বাজারের পার্শবর্তী মোয়াটি গ্রামে এসে হাসেমের পরিচিত গ্রামের আত্মীয় বাড়ীতে উঠেছি। রাতে খেসারি ডাল আর ডিম দিয়ে খাওয়াল। আমি না খেয়ে শুধু ডিমটা খেলাম।

মহিলা আমাদের গ্রামের এখানে বিয়ে হয়েছে, সম্পর্কে আমার ফুফু, স্বামীর নাম হাজী মালু মিয়া. যথেষ্ট স্বচ্ছল, আব্বাকে চিনে দুজনেই, তাদের ছেলে নেই চারটে মেয়ে। আমার মাথা ছুঁয়ে আদর করতে চেয়ে ভদ্রলোক আঁতকে উঠলেন।

স্ত্রীর পানে তাকিয়ে বললেন,.।।কি গো সৈয়দ সাবের পুতের তো জ্বর. ছইয়া দেহ।। মহিলা গায়ে হাত দিয়ে বললেন।। আহারে সোনার পুতলাডা কতডা পথ হাইট্টা আইছে, মাথাত পানি দেওন লাগবো, ক ইরে খোকন।

উনার বড় মেয়ের নাম খোকন নাইনে পড়ে আমার বছর দুয়েকের বড়, তাকে ডেকে বালতিতে পানি ভরে ওদের খাটের পাশে নিতে বললেন, আর হাজী সাহেবকে বললেন. হাসেম আর সাহেদকে বাংলা ঘরে এমদাদের সাথে শোয়ার ব্যবস্থা করে দিতে, ওদের নিয়ে বৈঠক পানে চলে গেলেন ফুফুর স্বামী।

আমি শুধু বললাম, .আমার কিছুই হয়নি ফুফু. আসলে আমার পাদুটো ফুলে গেছে. সর্বাশরীর ব্যথায় টনটন করছে, ফুফু খোকনকে হুকুম দিলেন ওরে তোদের খাটে শুয়াইয়া মাথায় পানি দে, তেল মালিশ কর. ও তর ছোড ভাই।। তাই করা হল, প্রায় সারারাত আমাকে সেবা করলেন মা ও মেয়ে, সরিষার তেল মালিশ করে দিল খোকন আপা. পা দুটোতে মালিশ করাটা এ জীবনে ভুলতে পারব না। একসময় ৪ বোনের সাথেই ঘুমিয়ে গেলাম।

স্বপ্ন দেখলাম আমি আকাশে উড়ছি,আমার হাতে খালেক ভাইর সেই ছিদ্র ছিদ্র ষ্টেনগানটা, নীচে অগনিত খাকি উর্দিপরা পাকিসেনা, আমি উড়ছি আর গুলি করছি, সমানে হানাদারেরা গুলি খেয়ে পড়ছে আর মরছে, অগণিত সেনা ছুটে পালাচ্ছে, আমার গুলি শেষ হচ্ছেনা, চিৎকার দিচ্ছি ।।জয়বাংলা জয়বাংলা. বলে। ঘুম ভেঙে গেল , দেখলাম. ডান বাহুতে আমার মাথাটা রেখে বাম হাতে চুল টানছে খোকন আপা।

খোকন আপা বলল, ।।জয়বাংলা বলে চিৎকার দিলে যে।। স্বপ্ন দেখেছি এটা নাবলে আমি উঠতে চাইলাম, কিন্তু পারলাম না, শরীরটা যেন অবশ হয়ে গেছে, খোকন আপাও মাথাটা চেপে ধরে বলল, ।।সকাল হয়নি আরেকটু ঘুমাও।। বললাম,।।আমিত মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিতে এসেছি আপা ঘুমাতে আসিনি।। বলল, আগেত সুস্থ হও, পরে যুদ্ধ।। মাথায় হাত বুলাতে থাকল। আবার ঘুমিয়ে গেলাম।

পরদিন অনেকবেলায় ঘুম ভাংলো, সাহেদ হাসেম খেয়ে তৈরী, বড় মোরগ জবাই করে পোলাও রান্না করেছে ফুফু। আমার জ্বর ব্যথা অনেকটা কমেছে, ফুফার ভাজতে এমদাদের লুঙি নিয়ে গোসল করলাম. এমদাদ বলল খেয়ে নাও তারপর নভালজিন টেবলেট আনছি ঐটা খাইলে জ্বর বেদনা কিছুই থাকতনা।

ক্লাস এইটে পড়ে এমদাদ সে বলল. খোকন আপা তোমারে খুব আদর করছে না। বললাম ।।হ্যাঁ।। এমদাদ বলল. আমিও তোমরার লগে ইন্ডিয়া যাইবাম. রাইতে সাহেদ হাশেমের লগে কতা অইছে। বললাম। চল।

আনুমানিক ১০টা হবে খেয়ে বড়িটা খেলাম. ১৫ মিনিটের মধ্যে ঘেমে শরীর ভিজে গেল, জ্বর তো দূরে একটু ব্যথাও নেই। ফুফূ এবং খোকন আপার পীড়াপীড়ি উপেক্ষা করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। বাড়ীতে আমাদের রাস্তা দেখানোর কথা বলে এমদাদ ও আমাদের সাথী হল।

আমরা বাউসি বাজার পেরিয়ে দশধার কিংবা ফকিরের বাজার হয়ে ইন্ডিয়া ট্রেনিং ক্যাম্পে যাবার পথে হাঁটতে লাগলাম ২ মাইল হবেনা,এর আগেই একদল মুক্তিসেনার মুখোমুখি পড়লাম, একজন বলল,.কৈ যাও তোমরা?, আমি বললাম, ট্রেনিং নিতে ইন্ডিয়া যাব. ধমকে উঠল, মুক্তিসেনা, ।।নাকে টিপি দিলে দুধ বাঈর অইব তাইন টেরনিং দিবাইন , এইদিগে বর্ডারের পথ বন্ধ, দেহনা দলকে দল মুক্তিসেনা আইতাছে।। পিছনে তাকালাম রাস্তা জুড়ে এগিয়ে আসছে মুক্তিসেনার দল। আরেকজন বলল. আজ ঠাকুরাকোনা আক্রমন করা হবে। ঐদিকে তো যাওয়া যাবেইনা যেদিক পার যাও, চল. ওদের সাথে ফিরিয়ে নিয়ে চলল।

এমদাদ বাড়ী চলে গেল, আমরা ফিরতি পথে বিফল মনোরথে হাঁটতে লাগলাম কোনদিকে জানিনা তবে গ্রামপথে ছোট সড়ক ধরে, কোথাও হাঁটুপানি কোথাও কোমর পানি. হাসেমের নির্দেশিত পথে দক্ষিণ পশ্চিমকোনে দ্রুত হেঁটে চলেছি।

পরে জেনেছি হাসেমের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল..নেত্রকোনার এ অঞ্চল দিয়ে ইন্ডিয়া যাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল।

হাঁটতে হাঁটতে মগড়া নদি পার হয়ে মদনপুর মাজারে এলাম প্রায় সন্ধ্যায়, এখান থেকে প্রায় দৌড়ে যখন বীরাঙ্গনা সখিনার মাজার হয়ে ভুটিয়ারকোনার সুরিয়া নদী পেরিয়ে কেল্লা তাজপুর দেওয়ান মিজাজ খাঁর বাড়ী এলাম তখন রাত ৯টা তো হবেই। মিজাজ মিয়া এ অঞ্চলের বড় আ.লীগ নেতা, উনি আব্বার মামাত বোনের স্বামী, আমার ফুফা. উনিও বাড়ী ছাড়া, ফুফুও বাবার বাড়ীতে, অন্যান্যরা রান্না করে যত্ন করে খাওয়াল। রাতটা এখানে কাটিয়ে পরদিন বাড়ী এলাম।

বেশ কিছুদিন বাড়ীতে কাটালাম, আশেপাশের গ্রামগুলোতে মুক্তিবাহিনীরা বিচরণ করছে খবর পেলাম. পাছার জাঙালিয়া কামারজানি ভালুকাপুর ছিলিমপুর এসব গ্রামে তারা টহল দিচ্ছে। একদিন কামারজানী গেলাম আমার গ্রাম দরিবৃ থেকে পূর্বদিকে ঢালিয়া বিলের ওপারে।

মানুষকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম কামারজানী তালুকদার বাড়ীতে মুক্তিযোদ্ধারা আছে.গেলাম, উদ্দেশ্য, জেনে নেব ভাইজান কোথায়. আব্বা কোথায়? আর কিভাবে যাব ইন্ডিয়াতে।

এখানেই দেখা পেলাম, কমান্ডার কাজী হাসানুজ্জামান হিরুর, আমাকে চিনেনি আমিও চিনিনা, যদিও তার বাড়ী মাত্র ২ মাইল দূরে তুলন্দর, আব্বার পরিচয় দিয়ে বললাম, আমি সৈয়দ শামস্ উজ জামান সাহেবের ২য় ছেলে নাম শফীক।

হিরু ভাই বললেন, তোমার আব্বাতো আমার মামা, উনি ধর্মপাশা এলাকায় আছেন, আর তোমার বড় ভাই রফিক আমার পরের ব্যাচে রিক্রট হয়ে সম্ভবতঃ রঃ রা থেকে এখন ঢালুতে গেছে। আমরা ট্রেনিং শেষ করে চলে এসেছি ওরা ট্রেনিং নিচ্ছে।

আমার আত্মাটা অচেনা ঢালুতে চলে গেল। জানতে চাইলাম, আমি যেতে চাই, কিভাবে যাব ? হিরুভাই হেসে বললেন,তুমি গিয়ে কি করবে ? রাইফেল দিয়ে ট্রেনিং দিতে পারবে না, ওটা তোমার চেয়ে বড়। পাশে রাখা শ্টেনগানটা দেখিয়ে বললাম. এটাতো ছোট এটার ট্রেনিং নেব। বলল, রাইফেল নিয়ে ক্রোলিং করতে হয়। বললাম, সব পারব।

হিরুভাই বললেন. বৈখেরহাটী বাজারের পূর্বদিকে, তেতুলিয়া,কৃষ্টামপুর ঘাট থেকে প্রতিদিন নৌকা ছাড়ে মাথাপিছু ৩ টাকা ভাড়া, ওরা মহেশখলা নিয়ে যায়। তুমিও যেতে পার।

ফিরে এলাম বাড়ীতে, আলাপ হল মোশলেম খলিফার সাথে প্রতিদিন ঈশ্বরগঞ্জ যায়, সে বলেছিল, কাকনহাটী ধামদির কিছু ছেলে ইন্ডিয়া যেতে চায়, তাকে বললাম. ওদেরকে আমার সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিতে. পরদিন বিকেলে, ধামদি র রাশিদ আর আঃ হাই এসে হাজির। দুজনেই আমার চে একটু বড়, হাসেম সাহেদের মত। আমি ১৩ টাকা জমিয়েছি গত কিছুদিনে,ভারতে যাব বলে।

আম্মাকে না বলেই, ওদের নিয়ে বৈখেরহাটী পানে ছুটলাম। সন্ধ্যায় এসে মিলিত হলাম বাজারের একটি ঘরে, আরো ১৯ জনকে পেলাম। মাঝিরা জানাল, ভাড়া ৪ টাকা, দিলাম। আমাদের কে নিয়ে যাওয়া হল কৃষ্টামপুর ঘাটে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

আমিও মুক্তিযোদ্ধা : এক কিশোরের আত্মকথা

আপডেট টাইম : ১০:০২:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০১৫

(দুই)

বাড়ীর ভস্মস্তূপ দেখে কান্না আসতে চাইল কিন্তু কাঁদতে পারলাম না, এর আগে এপ্রিলে সোহাগী বাজারে আব্বার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান .সৈয়দ এজেন্সি. নামের এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ঔষধের ফার্মেসিসহ দুটো ঘর পিছনে বাসাসহ পুড়ে ভস্ম করেছিল এত কষ্ট লাগেনি. এটা হজম করতেই পারছিনা, দাঁতে দাঁত চেপে হজম করলাম কান্নাটা।

মাথায় প্রতিশোধের আগুন জ্বলে উঠল, আমাকেও ট্রেনিং নিতে হবে, বইগুলো পোড়ার প্রতিশোধ নিতেই হবে। পেটে ক্ষুধার আগুন জ্বলছে, হাছুনি ভাইকে বললাম. ।।আমাকে ফকির বাড়ী দিয়ে আসো।। হাছুনি ভাই হোছেনের হাতে তিন ব্যাটারির টর্চটা দিয়ে দুই ব্যাটারিরটা ওর কাছ থেকে নিল,বলল।। তুই বারিন্দা ব আমি শফীক মেয়ারে দেয়া আইতাছি।। আমরা ফকির বাড়ীপানে হাঁটছি, এসময়ই তুফানি ভাই. শহরালি, বর্গদার আব্দুল ভাই.হেলিমসহ প্রায় দশজন এসে বৈঠক ঘরের বারান্দায় জমলো. সবার হাতেই দেশীয় অস্ত্র, কারো হাতে টর্চ, আব্দুল খাঁ’র হাতে নারিকেলের হুকা আর খড়ের পাকানো মশাল।

হেলিমের হাতে আমাদের লাল রেডিওটা, সবাই বৈঠক ঘরে এবং বারান্দায় সারারাত থাকবে। তাদের রেখে হাছুনি ভাই আমাকে নিয়ে চলল উত্তরদিকে ফকিরবাড়ী পানে। বহুদিন আম্মা ভাইবোনের সাথে মিলিত হলাম। ফকির বাড়ীতে আব্বার দাদা বিয়ে করেছিলেন, আম্মা জীবনে কারো বাড়ীতে যান নাই, মুক্তিযুদ্ধ এ বাড়ীতে এনেছে।বড় ঘরটিতে আম্মাসহ থাকার ব্যবস্থা করেছে।

পা দুটো ফুলে গেছে হাঁটতে পারছি না, কোনরকমে ফকিরবাড়ী এসে চারটে খেয়ে আম্মার কাছে শুয়ে পড়লাম, সাথে সাথেই ঘুম। পরদিন পাড়ায় বেরুলাম সামনের পাড়ার সাহেদ আর হাসেমের সাথে যুক্তি করলাম, কোনপথে ইন্ডিয়া যাওয়া যায়।

ওরা দুজনেও মুক্তিযুদ্ধে যেতে আগ্রহী.হাসেম বলল আমি ফকিরের বাজার,দশধার দিয়ে ইন্ডিয়া যাবার পথ চিনি, চল কালই আমরা যাত্রা করি, যে কথা সেই কাজ। পরদিন ভাইবোনসহ আম্মাও বাড়ী এসে পাকা ঘরটায় উঠলেন। এরপর দিন ১০ টাকা পকেটে নিয়ে হাসেম সাহেদসহ কেল্লা তাজপুর হয়ে আমরা তিনজন গাড়ো পাহাড় লক্ষ্য করে বাড়ী থেকে উত্তর দিকে এগুলাম।

সম্ভবতঃ শ্রাবণের শেষ, বর্ষাকাল, এরমাঝে চারদিকে মুক্তিযোদ্ধারাও এসে গেছে. হানাদারেরা ক্যাম্প থেকে বেরুচ্ছে না ,রাজাকারেরা ব্রিজে শ্টেশনে পাহাড়া দিচ্ছে, টুকটাক যুদ্ধও চলছে চারদিকে।

এখনকার মত যদি দিনলিপি লিখতাম তাহলে তারিখগুলো ভুল হতনা। যাক তিনজনের বাহিনী ছুটে চললাম এক কাপড়ে, আমার পরণে সেই লুঙিটা, যেটা প্রথমবারের মত কিনে পরেছি।

এখনকার মত যদি দিনলিপি লিখতাম তাহলে তারিখগুলো ভুল হতনা। যাক তিনজনের বাহিনী ছুটে চললাম এক কাপড়ে, আমার পরণে সেই লুঙিটা, যেটা প্রথমবারের মত কিনে পরেছি।

হাসেম কোনদিক দিয়ে নিয়ে চলেছে কিছুই চিনিনা। অনেক স্থানে সড়কে ব্রিজ না থাকায় ভাংগা রাস্তায় কখনো বুক পানি পেট পানি কখনো কোমড় পানিতে ভিজে রাস্তা পাড়ি দিচ্ছি, বলা বাহুল্য তিনজনেই লুঙি জামা খুলে জন্মদিনের পোশাকে ভাংগা রাস্তা পেরিয়েছি।

এভাবে রাত ৮টায় নেত্রকোনা মহকুমার ঠাকুরাকোনার কাছে বাউসি বাজারের পার্শবর্তী মোয়াটি গ্রামে এসে হাসেমের পরিচিত গ্রামের আত্মীয় বাড়ীতে উঠেছি। রাতে খেসারি ডাল আর ডিম দিয়ে খাওয়াল। আমি না খেয়ে শুধু ডিমটা খেলাম।

মহিলা আমাদের গ্রামের এখানে বিয়ে হয়েছে, সম্পর্কে আমার ফুফু, স্বামীর নাম হাজী মালু মিয়া. যথেষ্ট স্বচ্ছল, আব্বাকে চিনে দুজনেই, তাদের ছেলে নেই চারটে মেয়ে। আমার মাথা ছুঁয়ে আদর করতে চেয়ে ভদ্রলোক আঁতকে উঠলেন।

স্ত্রীর পানে তাকিয়ে বললেন,.।।কি গো সৈয়দ সাবের পুতের তো জ্বর. ছইয়া দেহ।। মহিলা গায়ে হাত দিয়ে বললেন।। আহারে সোনার পুতলাডা কতডা পথ হাইট্টা আইছে, মাথাত পানি দেওন লাগবো, ক ইরে খোকন।

উনার বড় মেয়ের নাম খোকন নাইনে পড়ে আমার বছর দুয়েকের বড়, তাকে ডেকে বালতিতে পানি ভরে ওদের খাটের পাশে নিতে বললেন, আর হাজী সাহেবকে বললেন. হাসেম আর সাহেদকে বাংলা ঘরে এমদাদের সাথে শোয়ার ব্যবস্থা করে দিতে, ওদের নিয়ে বৈঠক পানে চলে গেলেন ফুফুর স্বামী।

আমি শুধু বললাম, .আমার কিছুই হয়নি ফুফু. আসলে আমার পাদুটো ফুলে গেছে. সর্বাশরীর ব্যথায় টনটন করছে, ফুফু খোকনকে হুকুম দিলেন ওরে তোদের খাটে শুয়াইয়া মাথায় পানি দে, তেল মালিশ কর. ও তর ছোড ভাই।। তাই করা হল, প্রায় সারারাত আমাকে সেবা করলেন মা ও মেয়ে, সরিষার তেল মালিশ করে দিল খোকন আপা. পা দুটোতে মালিশ করাটা এ জীবনে ভুলতে পারব না। একসময় ৪ বোনের সাথেই ঘুমিয়ে গেলাম।

স্বপ্ন দেখলাম আমি আকাশে উড়ছি,আমার হাতে খালেক ভাইর সেই ছিদ্র ছিদ্র ষ্টেনগানটা, নীচে অগনিত খাকি উর্দিপরা পাকিসেনা, আমি উড়ছি আর গুলি করছি, সমানে হানাদারেরা গুলি খেয়ে পড়ছে আর মরছে, অগণিত সেনা ছুটে পালাচ্ছে, আমার গুলি শেষ হচ্ছেনা, চিৎকার দিচ্ছি ।।জয়বাংলা জয়বাংলা. বলে। ঘুম ভেঙে গেল , দেখলাম. ডান বাহুতে আমার মাথাটা রেখে বাম হাতে চুল টানছে খোকন আপা।

খোকন আপা বলল, ।।জয়বাংলা বলে চিৎকার দিলে যে।। স্বপ্ন দেখেছি এটা নাবলে আমি উঠতে চাইলাম, কিন্তু পারলাম না, শরীরটা যেন অবশ হয়ে গেছে, খোকন আপাও মাথাটা চেপে ধরে বলল, ।।সকাল হয়নি আরেকটু ঘুমাও।। বললাম,।।আমিত মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিতে এসেছি আপা ঘুমাতে আসিনি।। বলল, আগেত সুস্থ হও, পরে যুদ্ধ।। মাথায় হাত বুলাতে থাকল। আবার ঘুমিয়ে গেলাম।

পরদিন অনেকবেলায় ঘুম ভাংলো, সাহেদ হাসেম খেয়ে তৈরী, বড় মোরগ জবাই করে পোলাও রান্না করেছে ফুফু। আমার জ্বর ব্যথা অনেকটা কমেছে, ফুফার ভাজতে এমদাদের লুঙি নিয়ে গোসল করলাম. এমদাদ বলল খেয়ে নাও তারপর নভালজিন টেবলেট আনছি ঐটা খাইলে জ্বর বেদনা কিছুই থাকতনা।

ক্লাস এইটে পড়ে এমদাদ সে বলল. খোকন আপা তোমারে খুব আদর করছে না। বললাম ।।হ্যাঁ।। এমদাদ বলল. আমিও তোমরার লগে ইন্ডিয়া যাইবাম. রাইতে সাহেদ হাশেমের লগে কতা অইছে। বললাম। চল।

আনুমানিক ১০টা হবে খেয়ে বড়িটা খেলাম. ১৫ মিনিটের মধ্যে ঘেমে শরীর ভিজে গেল, জ্বর তো দূরে একটু ব্যথাও নেই। ফুফূ এবং খোকন আপার পীড়াপীড়ি উপেক্ষা করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। বাড়ীতে আমাদের রাস্তা দেখানোর কথা বলে এমদাদ ও আমাদের সাথী হল।

আমরা বাউসি বাজার পেরিয়ে দশধার কিংবা ফকিরের বাজার হয়ে ইন্ডিয়া ট্রেনিং ক্যাম্পে যাবার পথে হাঁটতে লাগলাম ২ মাইল হবেনা,এর আগেই একদল মুক্তিসেনার মুখোমুখি পড়লাম, একজন বলল,.কৈ যাও তোমরা?, আমি বললাম, ট্রেনিং নিতে ইন্ডিয়া যাব. ধমকে উঠল, মুক্তিসেনা, ।।নাকে টিপি দিলে দুধ বাঈর অইব তাইন টেরনিং দিবাইন , এইদিগে বর্ডারের পথ বন্ধ, দেহনা দলকে দল মুক্তিসেনা আইতাছে।। পিছনে তাকালাম রাস্তা জুড়ে এগিয়ে আসছে মুক্তিসেনার দল। আরেকজন বলল. আজ ঠাকুরাকোনা আক্রমন করা হবে। ঐদিকে তো যাওয়া যাবেইনা যেদিক পার যাও, চল. ওদের সাথে ফিরিয়ে নিয়ে চলল।

এমদাদ বাড়ী চলে গেল, আমরা ফিরতি পথে বিফল মনোরথে হাঁটতে লাগলাম কোনদিকে জানিনা তবে গ্রামপথে ছোট সড়ক ধরে, কোথাও হাঁটুপানি কোথাও কোমর পানি. হাসেমের নির্দেশিত পথে দক্ষিণ পশ্চিমকোনে দ্রুত হেঁটে চলেছি।

পরে জেনেছি হাসেমের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল..নেত্রকোনার এ অঞ্চল দিয়ে ইন্ডিয়া যাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল।

হাঁটতে হাঁটতে মগড়া নদি পার হয়ে মদনপুর মাজারে এলাম প্রায় সন্ধ্যায়, এখান থেকে প্রায় দৌড়ে যখন বীরাঙ্গনা সখিনার মাজার হয়ে ভুটিয়ারকোনার সুরিয়া নদী পেরিয়ে কেল্লা তাজপুর দেওয়ান মিজাজ খাঁর বাড়ী এলাম তখন রাত ৯টা তো হবেই। মিজাজ মিয়া এ অঞ্চলের বড় আ.লীগ নেতা, উনি আব্বার মামাত বোনের স্বামী, আমার ফুফা. উনিও বাড়ী ছাড়া, ফুফুও বাবার বাড়ীতে, অন্যান্যরা রান্না করে যত্ন করে খাওয়াল। রাতটা এখানে কাটিয়ে পরদিন বাড়ী এলাম।

বেশ কিছুদিন বাড়ীতে কাটালাম, আশেপাশের গ্রামগুলোতে মুক্তিবাহিনীরা বিচরণ করছে খবর পেলাম. পাছার জাঙালিয়া কামারজানি ভালুকাপুর ছিলিমপুর এসব গ্রামে তারা টহল দিচ্ছে। একদিন কামারজানী গেলাম আমার গ্রাম দরিবৃ থেকে পূর্বদিকে ঢালিয়া বিলের ওপারে।

মানুষকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম কামারজানী তালুকদার বাড়ীতে মুক্তিযোদ্ধারা আছে.গেলাম, উদ্দেশ্য, জেনে নেব ভাইজান কোথায়. আব্বা কোথায়? আর কিভাবে যাব ইন্ডিয়াতে।

এখানেই দেখা পেলাম, কমান্ডার কাজী হাসানুজ্জামান হিরুর, আমাকে চিনেনি আমিও চিনিনা, যদিও তার বাড়ী মাত্র ২ মাইল দূরে তুলন্দর, আব্বার পরিচয় দিয়ে বললাম, আমি সৈয়দ শামস্ উজ জামান সাহেবের ২য় ছেলে নাম শফীক।

হিরু ভাই বললেন, তোমার আব্বাতো আমার মামা, উনি ধর্মপাশা এলাকায় আছেন, আর তোমার বড় ভাই রফিক আমার পরের ব্যাচে রিক্রট হয়ে সম্ভবতঃ রঃ রা থেকে এখন ঢালুতে গেছে। আমরা ট্রেনিং শেষ করে চলে এসেছি ওরা ট্রেনিং নিচ্ছে।

আমার আত্মাটা অচেনা ঢালুতে চলে গেল। জানতে চাইলাম, আমি যেতে চাই, কিভাবে যাব ? হিরুভাই হেসে বললেন,তুমি গিয়ে কি করবে ? রাইফেল দিয়ে ট্রেনিং দিতে পারবে না, ওটা তোমার চেয়ে বড়। পাশে রাখা শ্টেনগানটা দেখিয়ে বললাম. এটাতো ছোট এটার ট্রেনিং নেব। বলল, রাইফেল নিয়ে ক্রোলিং করতে হয়। বললাম, সব পারব।

হিরুভাই বললেন. বৈখেরহাটী বাজারের পূর্বদিকে, তেতুলিয়া,কৃষ্টামপুর ঘাট থেকে প্রতিদিন নৌকা ছাড়ে মাথাপিছু ৩ টাকা ভাড়া, ওরা মহেশখলা নিয়ে যায়। তুমিও যেতে পার।

ফিরে এলাম বাড়ীতে, আলাপ হল মোশলেম খলিফার সাথে প্রতিদিন ঈশ্বরগঞ্জ যায়, সে বলেছিল, কাকনহাটী ধামদির কিছু ছেলে ইন্ডিয়া যেতে চায়, তাকে বললাম. ওদেরকে আমার সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিতে. পরদিন বিকেলে, ধামদি র রাশিদ আর আঃ হাই এসে হাজির। দুজনেই আমার চে একটু বড়, হাসেম সাহেদের মত। আমি ১৩ টাকা জমিয়েছি গত কিছুদিনে,ভারতে যাব বলে।

আম্মাকে না বলেই, ওদের নিয়ে বৈখেরহাটী পানে ছুটলাম। সন্ধ্যায় এসে মিলিত হলাম বাজারের একটি ঘরে, আরো ১৯ জনকে পেলাম। মাঝিরা জানাল, ভাড়া ৪ টাকা, দিলাম। আমাদের কে নিয়ে যাওয়া হল কৃষ্টামপুর ঘাটে।