ঢাকা ০২:৫১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
১৫ দিনে প্রবাসী আয় এলো ১৯ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা মহররমের চাঁদ দেখা গেছে ২৬ জুন সারাদেশে উদযাপিত হবে পবিত্র আশুরা সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে পর্যায়ক্রমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: স্থানীয় সরকারমন্ত্রী প্রতিটি জেলায় খামার স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে: কৃষিমন্ত্রী আত্রাই নদীতে অবৈধ সৌতিজালের বিরুদ্ধে অভিযান নেটওয়ার্ক খুঁজতে আম গাছে প্রধান শিক্ষক, কী ঘটেছিল সাবেক আইজিপি বেনজীরকে দেশে ফেরাতে আরব আমিরাতকে দুদকের চিঠি মাদরাসা শিক্ষকদের মে মাসের বেতন বিলম্ব: দ্রুত সমাধান ও স্থায়ী ব্যবস্থার দাবি বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের যুব সমাজকে মাদকমুক্ত করতে খেলাধুলা-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জোর দিতে হবে রাত পোহালেই আর্জেন্টিনার ম্যাচ, মাঠে নামলেই ইতিহাস গড়বেন মেসি

হাওরবাসীর দুঃখেরও সমাধান আছে : শফী আহমেদ

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:০০:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ এপ্রিল ২০১৭
  • ৪১০ বার

আমি হাওরের মানুষ। এই হাওর ঘিরে আছে সাতটি জেলা। এখানে এবার যে বন্যা হয়েছে সেটা অকল্পনীয়। বিগত ৪০ বছরে এমন বন্যা চোখে পড়েনি। হাওরাঞ্চলের সম্পদ হচ্ছে দুটি। একটি ধান চাষ, অন্যটি মাছ চাষ। একফসলি জমিতে অক্টোবর থেকে চাষাবাদ শুরু হয়, এপ্রিলের শেষদিকে এসে আমাদের কৃষকরা ধান ঘরে তুলে থাকে। আর বাকি চার মাস বিভিন্ন জলাশয়ের মধ্যে আটকে থাকা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতে হয় হাওরবাসীকে। জলাশয় আবার বরাদ্দ দেয় সরকার। তবে কিছু উন্মুক্ত জলাশয়ে অনুমোদন ছাড়াই গরিব-দুঃখীরা মাছ চাষ করে থাকে।

এই হাওরাঞ্চল অনেক জাতীয় নেতা উপহার দিয়েছে। এর মধ্যে বলতে হয় আবদুস সামাদ আজাদ, দেওয়ান ফরিদ গাজী, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, আবদুল মোমিনের কথা। এখনো অনেকে হাওরের মতো প্রত্যন্ত এলাকা থেকে জাতীয় পর্যায়ে অবদান রাখছেন। বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদও আমাদের এলাকার মানুষ। তিনি হাওরবাসীর দুঃখ-দুর্দশায় সব সময় সমব্যথী। তবু গত ৪০ বছরে হাওরে বন্যা সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। সমন্বিত কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। আমিও একজন রাজনৈতিক নেতা। কিন্তু আমার পরিকল্পনা আর একজন এ বিষয়ের বিশেষজ্ঞের পরিকল্পনা এক হবে না। আমার দর্শন হচ্ছে হোয়াংহো নদী এক সময় ছিল চীনের দুঃখ। সেটাকে নিয়ন্ত্রণে এনে আশীর্বাদে পরিণত করা হয়েছে। সেই সূত্র ধরে বলতে হয়, হাওরের পানি, মৎস্যসম্পদ এবং ফসল যে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তারও সমাধান আছে। আমাদের হাওর সারা দেশের এক-তৃতীয়াংশ ধান, মিঠাপানির মাছের প্রায় অর্ধেক অংশ জোগান দেয়। তাই হাওরবাসীর দুঃখের সমাধান করতে হবে, জাতীয় প্রয়োজনেই। এর সমাধানও আসলে আছে।
দুই.
পাহাড়ি ঢল নেমে হাওর তলিয়ে যায়। কিন্তু পাহাড়ে তো বৃষ্টি হবেই। প্রকৃতির আচরণ আমরা বদলাতে পারব না, কিন্তু তার থেকে ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে পানি ময়মনসিংহে পতিত না হয়ে যদি সুনামগঞ্জের ধনো নদীর মোহনায় পড়ে, তাহলে বান-বন্যার ক্ষতি অনেকটাই কমে যাবে। কিন্তু ধনো নদীর পুরোটাতেই পলি পড়ে জমে আছে অর্থাৎ নাব্যতার সংকট। সেখানে একটি খালের মতো আছে যা দিয়ে কার্গো চলাচল করে। ধনো নদীর মোহনা মিলেছে মেঘনায়। সেখানে শনির হাওরটা এখনো টিকে আছে। সেটা মিলিত হয়েছে সুনামগঞ্জের সুরমা নদীতে। কারণ ধনো নদীতে না যাওয়ার কারণে সেটা হাওরে প্রবেশ করে। আমার মতে, ধনো নদী থেকে পানি মূল নদীগুলোতে যাওয়ার রাস্তা সহজ করে দিতে হবে।

আমার ৩৫ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এই হাওর নিয়ে নানা রকম পরিবেশবাদী আন্দোলন হয়েছে। সবই আসলে লোক-দেখানো। বঙ্গবন্ধুর সময় হাওর উন্নয়ন বোর্ড গঠিত হয়েছিল। সেটা এখনো আছে কিন্তু তা প্রায় অকার্যকর। সেটাকে কার্যকর করা যাচ্ছে না। কারণ বাইপাস করে পানি ভিন্নদিকে নিয়ে যাওয়ার কার্যক্রম পানি উন্নয়ন বোর্ডের হাতে নেই, ড্রেজিং করে থাকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। সুতরাং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।

হাওরে পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা উন্নয়ন করা হলেও বাড়তি পানি থাকবে। এক্ষেত্রে তিস্তা নদীর জন্য যে গ্লোব ডায়না সিস্টেম করে পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার কথা বলা হচ্ছে, এ রকম কোনো পদ্ধতি হাওরেও অনুসরণ করতে হবে। সম্প্রতি হাওরে তিন দিনের অকাল বন্যা হয়েছে। সে বন্যাতেই ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তখন গ্রামের লোকজন স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে বাঁধ ঠিক করেছে। ফসল রক্ষায় কাজ করেছে। অথচ জনপ্রতিনিধিদের উচিত ছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং অন্যান্য সংস্থার মাধ্যমে দ্রুত এসব কাজ করা। কিন্তু তারা যখন প্রয়োজন, তার অনেক পরে সংস্কার কাজ শুরু করেছে। যেখানে কাজ শেষ করার কথা ছিল পৌষ মাসে, সেখানে ৪৮ কোটি টাকা নেত্রকোনার জন্য এবং সুনামগঞ্জের জন্য ৫৭ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। একটা কমিটি তৈরি হয় জনপ্রতিনিধি, লোকাল চেয়ারম্যান ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বয়ে, কিন্তু তারা কাজের বদলে ভাগ-বাটোয়ারায় বেশি ব্যস্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলোতে প্রয়োজন আসলে স্থায়ীভাবে সিল করা অথবা সøুইসগেটের মতো কিছু করা। কিন্তু সে কাজগুলো করা হয় না।

তিন.

আমার জীবনে বহুবার অনেক রাজনৈতিক নেতাকে হাওর নিয়ে রাজকীয়ভাবে প্রকল্প গঠন করতে দেখেছি। কিন্তু আজও সেসব বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এবারের বন্যা শুরু হওয়ার আগেই জনগণ এবং প্রতিনিধিদের আহাজারি ছিল। আমাকে ডেকেছিল। আমি সেখানে গিয়েছি এবং কিছু কাজও করেছি। মূলত অনুপ্রেরণা দিতে গিয়েছিলাম। আসলে শুধু টাকা দিলেই হবে না সেখানে প্রয়োজন পরিকল্পনা। বছরের অর্ধেকটা সময় শুকনো আর বাকিটা সময় পানিতে ভেসে কাটে এখানকার মানুষগুলোর। বৈশাখের আগেই বন্যার কারণে ফসলের ক্ষতি হওয়ায় ঋণদায়গ্রস্ত হয়ে পড়ে এলাকাবাসী। এর প্রভাবে অনেকেই আত্মহননের পথও বেছে নেন। কারণ বৈশাখের ফসল কিংবা মাছের আয়ের ওপর তারা জীবিকা নির্ভর করে। আর সেটা না পেলে আত্মহনন ছাড়া আর পথ থাকে না। বন্যার কারণে শুধু ফসলের ক্ষতিই হচ্ছে এমন নয়, মাছ চাষও বাধাগ্রস্ত হয়। বন্যার পরে পানিতে চুনা দিয়ে রাখলে মাছগুলো বাঁচানো যায়। কিন্তু মৎস্য উন্নয়ন অধিদপ্তর কিংবা কৃষি উন্নয়ন অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনার অভাবে মাছগুলো মারা যায়। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক এক সপ্তাহ মাছধরা ও খাওয়া নিষিদ্ধ করেছেন। আমি যখন সেই এলাকায় গিয়েছিলাম মাছগুলো তখনো মারা যায়নি। আমাদের ফিশারিগুলো এক বছরের জন্য লিজ দেওয়া হয়। আমি বলেছিলাম এক বছরের জন্য লিজগুলো সাসপেন্ড রেখে মানুষকে উন্মুক্ত করে দিক। পরের এক বছর লিজ হোল্ডারদের বাড়িয়ে দেওয়া হোক। যাতে জনগণ মাছ খেতে পারে। হাওরাঞ্চলে অনেক বড় বড় হাঁসের খামার রয়েছে। বন্যার কারণে খামারের হাঁসও মারা যাচ্ছে। আবার কৃষক ৫০ হাজার টাকার গরু ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিচ্ছেন। তাছাড়া মাছ, গবাদিপশু, হাওরাঞ্চলের হাঁস মরে পচা গন্ধ বের হয়ে পরিবেশ বিষাক্ত করে দিয়েছে। সমস্যা দিন দিন বাড়ছেই।

হাওর এলাকায় পরিকল্পিত কোনো কবরস্থান, শ্মশানঘাট নেই। বর্ষার সময় মানুষ মারা গেলে পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। এখানকার ৪০ ভাগ মানুষ বিদ্যুতের সঙ্গে পরিচিত নয়। সরকারের কাছে আমাদের একটি দাবি ছিল, এলাকাটিকে দুর্গত হিসেবে তালিকাভুক্ত করা। কিন্তু সরকারের ত্রাণ সচিব আইনের একটি ধারা দেখিয়ে বলেছেন যে, একটি জনপদের অর্ধেক মানুষ না মারা গেলে সেটাকে দুর্গত এলাকা বলে না। কিন্তু পুরো পৃথিবীর মানুষ জানে হাওর এলাকার মানুষ কেমন মানবেতর জীবনযাপন করছে। সরকারের পক্ষ থেকে একটি কার্যক্রম চালু হয়েছে যে, গ্রামে দরিদ্রদের মাঝে ১০ কেজি করে চাল দিতে হবে। দুঃখের বিষয় হচ্ছে সেখানেও দুর্নীতি হচ্ছে।

চার.

আমি বিশেষজ্ঞ নই। তবে হাওরের সমস্যার নিশ্চয় সমাধান পাওয়া যাবে। পাহাড়ি ঢলে পানি ধুনো নদীতে পড়লে সেটার মোড় ঘুড়িয়ে মেঘনায় ফিরিয়ে দিলে মনে হয় হাওর এলাকা আর ডুববে না। আড়াই-তিন কোটি মানুষের জন্য খুব দ্রুত এই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে কেয়ার ও কনসার্ন নামে দুটি প্রতিষ্ঠান গ্রামগুলোর জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তারা ইট দিয়ে বড় বড় চারকোণা সø্যাব দিয়ে গ্রামটিকে বাঁধাই করেছে। তারপর গাছপালা লাগিয়ে দিয়েছে। ফলে সবুজ বেষ্টনীর সেই সøাবের কারণে পানির স্রোত থেকে গ্রামবাসী রক্ষা পাচ্ছে। তবে এটি তো স্থায়ী সমাধান নয়। সরকারের কাছে দাবি হচ্ছে, আইন থাকুক বা না থাকুক এলাকাটিকে দুর্গত হিসেবে ঘোষণা করা, কৃষিঋণসহ সবকিছু দেওয়া। আর যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় সেগুলো পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জনপ্রতিনিধিদের সুনজরে রেখে পরিকল্পিত বাস্তবায়ন করা উচিত। কারণ এর পরের বন্যায়ও এমন ক্ষতি হলে হাওরবাসীর পক্ষে মানসিক ভারসাম্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।

দুঃখের মধ্যেও বঙ্গবন্ধু-কন্যাই একমাত্র আমাদের এ অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পারেন। তিনি যদি দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে রেখে একটি কো-অর্ডিনেশন কমিটি গঠন করে দেন, তবে হাওরের সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

১৫ দিনে প্রবাসী আয় এলো ১৯ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা

হাওরবাসীর দুঃখেরও সমাধান আছে : শফী আহমেদ

আপডেট টাইম : ১১:০০:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ এপ্রিল ২০১৭

আমি হাওরের মানুষ। এই হাওর ঘিরে আছে সাতটি জেলা। এখানে এবার যে বন্যা হয়েছে সেটা অকল্পনীয়। বিগত ৪০ বছরে এমন বন্যা চোখে পড়েনি। হাওরাঞ্চলের সম্পদ হচ্ছে দুটি। একটি ধান চাষ, অন্যটি মাছ চাষ। একফসলি জমিতে অক্টোবর থেকে চাষাবাদ শুরু হয়, এপ্রিলের শেষদিকে এসে আমাদের কৃষকরা ধান ঘরে তুলে থাকে। আর বাকি চার মাস বিভিন্ন জলাশয়ের মধ্যে আটকে থাকা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতে হয় হাওরবাসীকে। জলাশয় আবার বরাদ্দ দেয় সরকার। তবে কিছু উন্মুক্ত জলাশয়ে অনুমোদন ছাড়াই গরিব-দুঃখীরা মাছ চাষ করে থাকে।

এই হাওরাঞ্চল অনেক জাতীয় নেতা উপহার দিয়েছে। এর মধ্যে বলতে হয় আবদুস সামাদ আজাদ, দেওয়ান ফরিদ গাজী, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, আবদুল মোমিনের কথা। এখনো অনেকে হাওরের মতো প্রত্যন্ত এলাকা থেকে জাতীয় পর্যায়ে অবদান রাখছেন। বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদও আমাদের এলাকার মানুষ। তিনি হাওরবাসীর দুঃখ-দুর্দশায় সব সময় সমব্যথী। তবু গত ৪০ বছরে হাওরে বন্যা সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। সমন্বিত কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। আমিও একজন রাজনৈতিক নেতা। কিন্তু আমার পরিকল্পনা আর একজন এ বিষয়ের বিশেষজ্ঞের পরিকল্পনা এক হবে না। আমার দর্শন হচ্ছে হোয়াংহো নদী এক সময় ছিল চীনের দুঃখ। সেটাকে নিয়ন্ত্রণে এনে আশীর্বাদে পরিণত করা হয়েছে। সেই সূত্র ধরে বলতে হয়, হাওরের পানি, মৎস্যসম্পদ এবং ফসল যে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তারও সমাধান আছে। আমাদের হাওর সারা দেশের এক-তৃতীয়াংশ ধান, মিঠাপানির মাছের প্রায় অর্ধেক অংশ জোগান দেয়। তাই হাওরবাসীর দুঃখের সমাধান করতে হবে, জাতীয় প্রয়োজনেই। এর সমাধানও আসলে আছে।
দুই.
পাহাড়ি ঢল নেমে হাওর তলিয়ে যায়। কিন্তু পাহাড়ে তো বৃষ্টি হবেই। প্রকৃতির আচরণ আমরা বদলাতে পারব না, কিন্তু তার থেকে ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে পানি ময়মনসিংহে পতিত না হয়ে যদি সুনামগঞ্জের ধনো নদীর মোহনায় পড়ে, তাহলে বান-বন্যার ক্ষতি অনেকটাই কমে যাবে। কিন্তু ধনো নদীর পুরোটাতেই পলি পড়ে জমে আছে অর্থাৎ নাব্যতার সংকট। সেখানে একটি খালের মতো আছে যা দিয়ে কার্গো চলাচল করে। ধনো নদীর মোহনা মিলেছে মেঘনায়। সেখানে শনির হাওরটা এখনো টিকে আছে। সেটা মিলিত হয়েছে সুনামগঞ্জের সুরমা নদীতে। কারণ ধনো নদীতে না যাওয়ার কারণে সেটা হাওরে প্রবেশ করে। আমার মতে, ধনো নদী থেকে পানি মূল নদীগুলোতে যাওয়ার রাস্তা সহজ করে দিতে হবে।

আমার ৩৫ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এই হাওর নিয়ে নানা রকম পরিবেশবাদী আন্দোলন হয়েছে। সবই আসলে লোক-দেখানো। বঙ্গবন্ধুর সময় হাওর উন্নয়ন বোর্ড গঠিত হয়েছিল। সেটা এখনো আছে কিন্তু তা প্রায় অকার্যকর। সেটাকে কার্যকর করা যাচ্ছে না। কারণ বাইপাস করে পানি ভিন্নদিকে নিয়ে যাওয়ার কার্যক্রম পানি উন্নয়ন বোর্ডের হাতে নেই, ড্রেজিং করে থাকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। সুতরাং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।

হাওরে পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা উন্নয়ন করা হলেও বাড়তি পানি থাকবে। এক্ষেত্রে তিস্তা নদীর জন্য যে গ্লোব ডায়না সিস্টেম করে পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার কথা বলা হচ্ছে, এ রকম কোনো পদ্ধতি হাওরেও অনুসরণ করতে হবে। সম্প্রতি হাওরে তিন দিনের অকাল বন্যা হয়েছে। সে বন্যাতেই ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তখন গ্রামের লোকজন স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে বাঁধ ঠিক করেছে। ফসল রক্ষায় কাজ করেছে। অথচ জনপ্রতিনিধিদের উচিত ছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং অন্যান্য সংস্থার মাধ্যমে দ্রুত এসব কাজ করা। কিন্তু তারা যখন প্রয়োজন, তার অনেক পরে সংস্কার কাজ শুরু করেছে। যেখানে কাজ শেষ করার কথা ছিল পৌষ মাসে, সেখানে ৪৮ কোটি টাকা নেত্রকোনার জন্য এবং সুনামগঞ্জের জন্য ৫৭ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। একটা কমিটি তৈরি হয় জনপ্রতিনিধি, লোকাল চেয়ারম্যান ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বয়ে, কিন্তু তারা কাজের বদলে ভাগ-বাটোয়ারায় বেশি ব্যস্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলোতে প্রয়োজন আসলে স্থায়ীভাবে সিল করা অথবা সøুইসগেটের মতো কিছু করা। কিন্তু সে কাজগুলো করা হয় না।

তিন.

আমার জীবনে বহুবার অনেক রাজনৈতিক নেতাকে হাওর নিয়ে রাজকীয়ভাবে প্রকল্প গঠন করতে দেখেছি। কিন্তু আজও সেসব বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এবারের বন্যা শুরু হওয়ার আগেই জনগণ এবং প্রতিনিধিদের আহাজারি ছিল। আমাকে ডেকেছিল। আমি সেখানে গিয়েছি এবং কিছু কাজও করেছি। মূলত অনুপ্রেরণা দিতে গিয়েছিলাম। আসলে শুধু টাকা দিলেই হবে না সেখানে প্রয়োজন পরিকল্পনা। বছরের অর্ধেকটা সময় শুকনো আর বাকিটা সময় পানিতে ভেসে কাটে এখানকার মানুষগুলোর। বৈশাখের আগেই বন্যার কারণে ফসলের ক্ষতি হওয়ায় ঋণদায়গ্রস্ত হয়ে পড়ে এলাকাবাসী। এর প্রভাবে অনেকেই আত্মহননের পথও বেছে নেন। কারণ বৈশাখের ফসল কিংবা মাছের আয়ের ওপর তারা জীবিকা নির্ভর করে। আর সেটা না পেলে আত্মহনন ছাড়া আর পথ থাকে না। বন্যার কারণে শুধু ফসলের ক্ষতিই হচ্ছে এমন নয়, মাছ চাষও বাধাগ্রস্ত হয়। বন্যার পরে পানিতে চুনা দিয়ে রাখলে মাছগুলো বাঁচানো যায়। কিন্তু মৎস্য উন্নয়ন অধিদপ্তর কিংবা কৃষি উন্নয়ন অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনার অভাবে মাছগুলো মারা যায়। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক এক সপ্তাহ মাছধরা ও খাওয়া নিষিদ্ধ করেছেন। আমি যখন সেই এলাকায় গিয়েছিলাম মাছগুলো তখনো মারা যায়নি। আমাদের ফিশারিগুলো এক বছরের জন্য লিজ দেওয়া হয়। আমি বলেছিলাম এক বছরের জন্য লিজগুলো সাসপেন্ড রেখে মানুষকে উন্মুক্ত করে দিক। পরের এক বছর লিজ হোল্ডারদের বাড়িয়ে দেওয়া হোক। যাতে জনগণ মাছ খেতে পারে। হাওরাঞ্চলে অনেক বড় বড় হাঁসের খামার রয়েছে। বন্যার কারণে খামারের হাঁসও মারা যাচ্ছে। আবার কৃষক ৫০ হাজার টাকার গরু ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিচ্ছেন। তাছাড়া মাছ, গবাদিপশু, হাওরাঞ্চলের হাঁস মরে পচা গন্ধ বের হয়ে পরিবেশ বিষাক্ত করে দিয়েছে। সমস্যা দিন দিন বাড়ছেই।

হাওর এলাকায় পরিকল্পিত কোনো কবরস্থান, শ্মশানঘাট নেই। বর্ষার সময় মানুষ মারা গেলে পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। এখানকার ৪০ ভাগ মানুষ বিদ্যুতের সঙ্গে পরিচিত নয়। সরকারের কাছে আমাদের একটি দাবি ছিল, এলাকাটিকে দুর্গত হিসেবে তালিকাভুক্ত করা। কিন্তু সরকারের ত্রাণ সচিব আইনের একটি ধারা দেখিয়ে বলেছেন যে, একটি জনপদের অর্ধেক মানুষ না মারা গেলে সেটাকে দুর্গত এলাকা বলে না। কিন্তু পুরো পৃথিবীর মানুষ জানে হাওর এলাকার মানুষ কেমন মানবেতর জীবনযাপন করছে। সরকারের পক্ষ থেকে একটি কার্যক্রম চালু হয়েছে যে, গ্রামে দরিদ্রদের মাঝে ১০ কেজি করে চাল দিতে হবে। দুঃখের বিষয় হচ্ছে সেখানেও দুর্নীতি হচ্ছে।

চার.

আমি বিশেষজ্ঞ নই। তবে হাওরের সমস্যার নিশ্চয় সমাধান পাওয়া যাবে। পাহাড়ি ঢলে পানি ধুনো নদীতে পড়লে সেটার মোড় ঘুড়িয়ে মেঘনায় ফিরিয়ে দিলে মনে হয় হাওর এলাকা আর ডুববে না। আড়াই-তিন কোটি মানুষের জন্য খুব দ্রুত এই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে কেয়ার ও কনসার্ন নামে দুটি প্রতিষ্ঠান গ্রামগুলোর জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তারা ইট দিয়ে বড় বড় চারকোণা সø্যাব দিয়ে গ্রামটিকে বাঁধাই করেছে। তারপর গাছপালা লাগিয়ে দিয়েছে। ফলে সবুজ বেষ্টনীর সেই সøাবের কারণে পানির স্রোত থেকে গ্রামবাসী রক্ষা পাচ্ছে। তবে এটি তো স্থায়ী সমাধান নয়। সরকারের কাছে দাবি হচ্ছে, আইন থাকুক বা না থাকুক এলাকাটিকে দুর্গত হিসেবে ঘোষণা করা, কৃষিঋণসহ সবকিছু দেওয়া। আর যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় সেগুলো পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জনপ্রতিনিধিদের সুনজরে রেখে পরিকল্পিত বাস্তবায়ন করা উচিত। কারণ এর পরের বন্যায়ও এমন ক্ষতি হলে হাওরবাসীর পক্ষে মানসিক ভারসাম্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।

দুঃখের মধ্যেও বঙ্গবন্ধু-কন্যাই একমাত্র আমাদের এ অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পারেন। তিনি যদি দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে রেখে একটি কো-অর্ডিনেশন কমিটি গঠন করে দেন, তবে হাওরের সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব।