বিদেশের মাটিতে জাতীয় সংগীত শোনার যে আনন্দ তার তুলনা কোথাও নেই। আজো সুখের কোনো স্মৃতি ভাবলে সেই দিনটার কথা মনে পড়ে। সবার ওপরে পতপত করে উড়ছিল লাল-সবুজ পতাকা। মৃদুমন্দ হাওয়া বইছিল। ঘাসের ওপর বসে অবাক চোখে ক্রিকেট ম্যাচ দেখছিল চীনারা! চীনের পুষ্পনগরী গুয়াংজুতে সেবার বসেছিল এশিয়াডের আসর।
কোন এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের একটি মাঠকে পীচ বানিয়ে ক্রিকেট খেলার উপযোগী করে তোলা হয়। এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) পক্ষে সেই কাজটা করেছিলেন বাংলাদেশের সাবেক ক্রিকেটার আমিনুল ইসলাম বুলবুল! এসিসি’র প্রধান তখন সৈয়দ আশরাফুল হক।
আফগানিস্তানকে হারিয়ে ওই ম্যাচে জিতে এশিয়াডে প্রথম স্বর্ণ পায় বাংলাদেশ। বড় কোন আন্তর্জাতিক আসরে ওটাই লাল-সবুজদের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত শেষ স্বর্ণ। আদৌ কোনদিন এ আসরে স্বর্ণালি সাফল্য মিলবে কিনা জানা নেই কারো। আন্তর্জাতিক কোন গেমসে এটাই বাংলাদেশের সেরা অর্জন। অলিম্পিক গেমসের পরেই এশিয়ান গেমসকে দ্বিতীয় সেরা ধরা হয়।
পুষ্পনগরী গুয়াংজুতে সেই অপরাহ্নে পুষ্পবৃষ্টি হয়েছিল কিনা জানা নেই। তবে সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদের বৃষ্টি ছিল আমাদের ওপরে। তাইতো চোখে জল, মুখে হাসি নিয়ে আমরা প্রবল আবেগে গেয়ে উঠলাম- আমার সোনার বাংলা/ আমি তোমায় ভালোবাসি………। শরীরের প্রত্যেকটি স্নায়ুগন্থি জেগে উঠেছিল সেইদিন অনন্য এক ভালোবাসায়, ভালোলাগায়……..।
এরই নাম দেশপ্রেম, দেশের প্রতি ভালোবাসা, পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাসক্ত মানুষকেও যে ভালোবাসা নিরপেক্ষ থাকতে দেয় না। মনে পড়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচের সময় প্রেসবক্সে যেন ঘনঘন বোমা ফাটতো। দেশি ব্যাটসম্যান-বোলারদের প্রত্যেকটি সাফল্য উদযাপিত হত প্রবল চিৎকারে, করতালিতে, কখনও টেবিল থাপড়ে।
আর গ্যালারি? যেখানে কেউ কখনো বসে না। দুই হাত তুলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে সমর্থকেরা। কখনও মেক্সিকান ঢেউ তোলে। কেউ মুখে আঁকে পতাকার রঙ। কেউ আঁকে বুকে। বাংলাদেশ জয় পেলে যেন কোন ঐশ্বরিক শক্তি ভর করতো শরীরে। উৎসবের-আনন্দের রঙে রঙিন হত সবাই।
ক্রীড়া সাংবাদিক হওয়ার জন্য দেশপ্রেম, প্রিয় দেশের দলের জন্য মানুষের উন্মাদনা হৃদয় দিয়ে, শরীরের প্রতিটি শিরা উপশিরা দিয়ে, প্রতিটি রোমকূপ দিয়ে অনুভব করেছি বারবার। কি যে উত্তুঙ্গস্পর্শী ভালোবাসা জাগায় একটা নাম, যার নাম- বাংলাদেশ। একটি দেশের ভাষার নামেই সে দেশের নাম!
বিদেশ বিভুঁইয়ে এলে সেই ভালোবাসা প্রতিদিনই যেন পৌনপুনিক হারে বাড়তে থাকে। হয়তো দূর থেকে দেখা বলে, ভালো করে দেখা যায়, সৌন্দর্যটাই বেশি ধরা পড়ে। ভিনদেশে কখনও লাল-সবুজ পতাকা দেখলে থমকে যাই। অনির্বচনীয় ভালোলাগায় দেহমন আচ্ছাদিত হয়। বারবার মনে হয়, আমারও এক দেশ আছে। সেখানে বারো মাসে তেরো পার্বণ হয়। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা নদী আছে।
‘পদ্মা-মেঘনা-যমুনা, তোমার-আমার ঠিকানা’- পৃথিবীর রাজধানী খ্যাত নিউইয়র্কের রাজপথে যেতে যেতে আমরা স্লোগান তুলি। প্রকাশনা সংস্থা মুক্তধারা প্রতি বছর নিউইয়র্কে তিনদিন ব্যাপী বইমেলার আয়োজন করে। স্বাধীনতা দিবস-একুশে ফেব্রুয়ারিতেও নানা আয়োজন থাকে। বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা জ্যাকসন হাইটস থেকে যখন লাল-সবুজ পোষাক পরে আমরা র্যালি নিয়ে বের হই, সবাই ভিড় করে এসে দেখে। অনেকে ছবি তোলে। ভিডিও তোলে।
এই ভালোলাগার ঘোর ধাক্কা খায়, যখন ফিরতি পথে আসতে চোখে পড়ে একজন বয়স্ক বাঙালি লোক পথের ধারে সবজি বিক্রি করছে। কেউ ফ্লায়ার দিচ্ছেন। তুষারপাতে, বৃষ্টিতে, হিমাংকের নিচে তাপমাত্রায় জমে গিয়েও কাজ করছেন। কেন? কেন স্বচ্ছল, অসচ্ছল সবাই পাড়ি জমাচ্ছে বিদেশে? কাগজপত্র নেই। অবৈধ। সারাক্ষণ পুলিশি হয়রানির মধ্যে থেকেও কেন তারা ফিরছে না জন্মভূমিতে?
দীর্ঘদিন নিউইয়র্কে বসবাসের পরে গত বছর নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন কবি শহীদ কাদরী। প্রবাসজীবন ওনার একদমই ভালো লাগতো না। এত বছর বিদেশে থেকেও উনি সবুজ পাশপোর্টধারীই ছিলেন! তবু কেন এই স্বেচ্ছা নির্বাসন? কবির ভাষায়….
‘দু টুকরো রুটি কিংবা লাল শানকি ভরা ভাত
এবং নক্ষত্রকুচির মতন কিছু লবণের কণা
দিগন্তের শান্ত দাওয়ায় আমাকে চাও নি তুমি দিতে-
তাই এই দীর্ঘ পরবাস!’
নতুন প্রেসিডেন্ট আমেরিকাকে গ্রেট ন্যাশন বানানোর লক্ষ্যে দেশতাড়া করেছেন অসংখ্য-অজস্র মেক্সিকানকে। অথচ এই মেক্সিকানরা উত্তর আমেরিকার ভূমিপুত্র। একটা সময় ছিল যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোথাও যেতে তাদের অনুমতি লাগতো না। কিন্তু স্বাধীনতা, জাতীয়তাবোধ, পাশপোর্ট, ভিসা- সভ্য জগতের সব নিয়মকানুন তাদেরকে এই দেশে সন্ত্রাসী বানিয়েছে। লাখ লাখ মেক্সিকানকে করেছে অবৈধ।
যে কারনে আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্তে পড়ে থাকে রক্তাক্ত গুয়াদালুপে। ওর পুরো নাম গুয়াদালুপে অলিভাস ভ্যালেন্সিয়া। তৃতীয়বারের মতো মেক্সিকোয় পাঠিয়ে দেয়ায় সীমান্তে সেতুর ওপর দিয়ে লাফিয়ে পড়ে আত্নহত্যা করে সে।
বাংলাদেশে তো সীমান্তে কখনও কখনও সরাসরি গুলির ঘটনাও ঘটে। কাঁটাতারের ওপর ঝুলিয়ে রাখা হয় কিশোরী ফেলানির লাশ। পাখী হলে কি কেউ এভাবে গুলি করে ফেলে রাখতে পারতো? তাই মনে হয় পাখী হলেই বোধ করি ভালো হত! তবেই হয়ত সত্যিকারের স্বাধীন হতে পারতাম।
২৬ মার্চ, রোববার, ২০১৭
(অন্ধকারে একটা জোনাকী)
সংবাদ শিরোনাম
অন্ধকারে জোনাকী আমি যদি পাখি হতাম…মনিজা রহমান
-
Reporter Name - আপডেট টাইম : ১২:২৫:৫১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ মার্চ ২০১৭
- ৩৯০ বার
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ


























