ঢাকা ০১:৩০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
‘পাহাড়ি কৃষিপণ্য রপ্তানিতে মানসম্মত উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ জরুরি’ শাহজালালে বিমানের জরুরি অবতরণের পর ছুটে গেলেন মন্ত্রী এআই দিয়ে জামায়াত-শিবির সরকারবিরোধী যে অপপ্রচার ছড়াচ্ছে, তা আ. লীগও করেনি দেশের ৫০৩টি উপজেলার উন্নয়নে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে : এলজিআরডি মন্ত্রী আঙুলের কালির দাগ শুকানোর আগেই সরকার ফ্যামিলি কার্ড চালু করেছে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ৪ সাবেক মুখ্যমন্ত্রীসহ ৭ হাজারের বেশি আটক: মোদি সরকারকে তীব্র নিন্দা জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টিসহ বিরোধীদের আগামী বছরের রমজান শুরু হতে পারে ৮ ফেব্রুয়ারি ক্যামেরার ফ্রেমে পরিযায়ী পাখির চোখজুড়ানো দৃশ্য পতনের দ্বারপ্রান্তে মোদির সরকার বিদ্যুৎ বিভাগের ৪১টি উন্নয়ন প্রকল্পে ১০ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকার সহায়তা

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শিশুদের পড়াতে চান ‘এক টাকার মাস্টার’

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:০৭:১৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
  • ১২ বার

মাত্র এক টাকা। এই এক টাকার বিনিময়ে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন গাইবান্ধার লুৎফর রহমান। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীরেও থামেনি তার পাঠদান। প্রতিদিন বই-খাতা নিয়ে তার সামনে বসে একদল শিশু। পড়ানোর পাশাপাশি তাদের নৈতিক শিক্ষাও দেন তিনি। বিনিময়ে নেন মাত্র এক টাকা। দীর্ঘ ৫২ বছরের এই শিক্ষাসেবা তাকে পরিচিত করেছে ‘এক টাকার মাস্টার’ নামে। এবার তার নিরলস প্রচেষ্টার স্বীকৃতি মিলেছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে।

গত ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষ্যে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশের ১০০ জন গুণী শিক্ষকের সঙ্গে লুৎফর রহমানকেও সম্মাননা দেওয়া হয়। পুরস্কার হিসেবে পান দুই লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তাকে সরকারি অবসরভাতা দেওয়ার ঘোষণাও দেন শিক্ষামন্ত্রী। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সামনে নিজের অনুভূতিও প্রকাশ করেন তিনি। তবে এই স্বীকৃতির পরও তার ইচ্ছা, যত দিন বেঁচে থাকবেন ও সুস্থ থাকবেন, তত দিন শিশুদের পড়িয়ে যাবেন।

নদীভাঙনে সব হারিয়ে ঠিকানা বাগুড়িয়ায়

গাইবান্ধা শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার গিদারি ইউনিয়নের বাগুড়িয়া গ্রাম। ব্রহ্মপুত্র নদের নতুন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পাশের এই জনপদে নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়া অনেক পরিবারের বসবাস। এমনই এক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন লুৎফর রহমান।

তবে বাগুড়িয়া তার আদি নিবাস নয়। তার জন্ম ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া গ্রামে। চরের সম্পদশালী পরিবারে জন্ম নেওয়া লুৎফর রহমানের পরিবারের একসময় চার বিঘার বেশি জমিতে বসতভিটা ছিল। চরের আবাদি জমির পরিমাণও ছিল ১০০ বিঘার বেশি। কিন্তু নদীভাঙনে একে একে হারিয়ে যায় জমিজমা ও বসতভিটা। পরে পরিবারটি ডাকাতিয়ার চরে আশ্রয় নেয়। সেখানকার ভিটেমাটিও নদীগর্ভে বিলীন হলে লুৎফর রহমান সদর উপজেলার বাগুড়িয়া গ্রামে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিন শতাংশ জমির ওপর তার বসতি।

জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী, লুৎফর রহমানের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৩ নভেম্বর। সে হিসাবে বর্তমানে তার বয়স প্রায় ৭৮ বছর। বাবা মৃত ফইম উদ্দিন ও মা মৃত নছিয়ম নেছার পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি একমাত্র ছেলে এবং সবার ছোট। স্ত্রী লতিফুন বেগমের সঙ্গে তার সংসারে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে হয়েছে। দুই ছেলের একজন লাভলু ইজিবাইক চালান, অন্যজন মশিউর একটি মাদরাসায় কর্মরত। নিজস্ব সম্পত্তি বলতে তেমন কিছুই নেই তার।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেলে বাগুড়িয়া গ্রামের মদনের পাড়া এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একটি বাড়ির পাকা বারান্দায় পাটি বিছিয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সাত শিশুকে পড়াচ্ছেন লুৎফর রহমান। বৈরী আবহাওয়ার কারণে সেদিন বারান্দায় পাঠদান করছিলেন তিনি। বিভিন্ন বিষয়ে পড়ানোর পাশাপাশি শিশুদের পড়া ধরছিলেন, শেখাচ্ছিলেন লেখা। শিশুদেরও আনন্দের সঙ্গে পড়াশোনায় অংশ নিতে দেখা যায়।

স্থানীয়রা জানান, ঝড়-বৃষ্টি কিংবা বয়সের ভার তাকে দমাতে পারেনি। প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করেই নিয়মিত পাঠদানে বের হন তিনি। কখনো সাইকেলে, কখনো হেঁটে শিক্ষার্থীদের পড়াতে যান লুৎফর রহমান।

যেভাবে হলেন ‘এক টাকার মাস্টার’

লুৎফর রহমানের পাঠদানের শুরু ১৯৭৪ সালের দিকে। তখন গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত ও ঝরে পড়া শিশুদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়াতেন তিনি। বিনিময়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতিদিন এক বা দুই মুষ্টি চাল নিতেন। পরে চালের পরিবর্তে শিক্ষার্থীপ্রতি এক টাকা নেওয়া শুরু করেন। সেই থেকেই তার পরিচয় ‘এক টাকার মাস্টার’ হিসেবে।

লুৎফর রহমান বলেন, ১৯৭৪ সালের অভাব-অনটনের সময় গ্রামের ঝরে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ধরে ধরে এনে পড়াতাম। এর কিছুদিন পর শিক্ষার্থীপ্রতি এক টাকা করে নেওয়া শুরু করি। তখন থেকেই মানুষ আমাকে এক টাকার মাস্টার বলে ডাকতে শুরু করে।

ফি মাত্র এক টাকা কেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বিনামূল্যে পড়ালে অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ থাকে না। অন্যদিকে, দরিদ্র পরিবারের অভিভাবকদের পক্ষে বেশি টাকা দিয়ে সন্তানকে পড়ানো কঠিন। তাই এক টাকা নির্ধারণ করি।

সময় বদলেছে, বদলেছে টাকার মূল্যও। তবে তার পাঠদানের পদ্ধতি বদলায়নি। এখনো সকাল ও সন্ধ্যায় বিভিন্ন দফায় শিশুদের পড়ান তিনি।

লুৎফর রহমান বলেন, এই টাকা আমার কাছে এখন কোনো পারিশ্রমিক নয়, এটা শিক্ষার্থীকে পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত রাখার একটি উপায় বা কৌশল মাত্র।

নদীভাঙনে হারিয়েছেন সব, সংকল্প সেখান থেকেই

নিজের জীবনের অভাব-অনটনের অভিজ্ঞতাই লুৎফর রহমানকে অন্য শিশুদের শিক্ষার প্রতি দায়িত্বশীল করে তোলে। আর্থিক সংকটের কারণে বেশি দূর পড়াশোনা করতে পারেননি তিনি। সেই আক্ষেপ থেকেই তার প্রতিজ্ঞা, অভাবের কারণে কোনো শিশুর পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়।

লুৎফর রহমান বলেন, প্রচণ্ড অভাব-অনটনের কারণে বেশিদূর পড়তে পারিনি আমি। সেটাই আমার বড় দুঃখ। যখন দেখলাম অভাবের কারণে এলাকার শিশুরা পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অভিভাবকেরাও নিরুপায়, তখনই যুদ্ধে নামি। প্রতিজ্ঞা করি, অভাবের কারণে যেন কোনো শিশু পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত না হয়। এজন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের ধরে এনে পড়ানো শুরু করি।

তার কাছে পড়তে আসা শিশুদের অনেকের পরিবার নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত। এসব পরিবারের সন্তানদের জন্য এক টাকার বিনিময়ে পড়ার সুযোগ বাড়তি সহায়তা হিসেবে কাজ করছে।

এক প্রজন্মের শিক্ষক, পরের প্রজন্মেরও

পাঁচ দশকের বেশি সময়ে অসংখ্য শিশুকে পড়িয়েছেন লুৎফর রহমান। তার কাছে পড়েছেন এমন শিক্ষার্থীদের সন্তানেরাও এখন তার সামনে বসে পড়াশোনা করছে। ফলে তার পাঠদান শুধু একটি প্রজন্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

লুৎফর রহমান জানান, ৫২ বছরের শিক্ষাসেবায় তার অনেক শিক্ষার্থী বর্তমানে শিক্ষক, চিকিৎসক, পুলিশ, বিজিবি, সাব-রেজিস্ট্রারসহ বিভিন্ন দপ্তরে চাকরি করছেন।

বৃহস্পতিবার মদনের পাড়ায় পড়তে আসা সাত শিক্ষার্থীর একজন সাদমান। তার বয়স পাঁচ বছর। সে মাদরাসার প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে পড়ে। তার মা সাথী বেগমও একসময় লুৎফর রহমানের ছাত্রী ছিলেন।

সাথী বেগম বলেন, স্যার অনেক জোরে শব্দ করে ও যত্ন করে আমাদের পড়াতেন। আমরা দলবেঁধে তার কাছে পড়তাম। আমি গৃহিণী। আমার সঙ্গে পড়া অনেকেই প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় সরকারি-বেসরকারি চাকরি করেন। যে স্যার আমাকে পড়িয়েছেন, তিনিই আজ আমার সন্তানকেও পড়াচ্ছেন।

কিশামত ফলিয়া ব্র্যাক শিশু নিকেতনের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মার্জিয়া আক্তার বারাকতা বলে, স্যারের কাছে পড়তে আমার অনেক ভালো লাগে। স্যার আমাকে বাংলা, ইংরেজি, গণিতসহ সব বিষয়ে পড়ান।

কিশামত ফলিয়া হাফিজিয়া ও নুরানী মাদরাসার নার্সারির শিক্ষার্থী নুসরাত বলে, স্যার সুন্দর করে পড়ান। স্যার রাগ করেন না, মারেন না। অনেক সুন্দর করে পড়ান।

অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ও লুৎফর রহমানের প্রাক্তন ছাত্র রবিউল ইসলাম নিরব বলে, ছোটবেলায় আমরা পড়তে বসতাম না, ফাঁকি দিতাম। খেলতে যেতাম। স্যার ধরে এনে পড়াতেন। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানায় টেকনিক্যাল স্কুলের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী আরমানও।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক নন, তবুও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি

লুৎফর রহমান সরকারি বা বেসরকারি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নন। ব্যক্তিগত উদ্যোগেই দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের পড়িয়ে আসছেন তিনি। ১৯৭০ সালে ফুলছড়ি উপজেলার গুণভড়ি উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। চাকরি না পেলেও শিক্ষার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। বরং শিশুদের পড়ানোই হয়ে ওঠে তার জীবনের অন্যতম প্রধান কাজ।

দীর্ঘদিনের এই শিক্ষাসেবার স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে তার গল্প। এবার বিশ্ব শিক্ষক দিবসে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পাওয়ায় সেই স্বীকৃতি নতুন মাত্রা পেয়েছে।

সম্মাননা পাওয়ার পর সাঘাটার আর রাহমা ফাউন্ডেশন ও স্পোর্টস একাডেমির পক্ষ থেকে তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও সংবর্ধনা জানাতে আসেন সংগঠনটির একদল তরুণ স্বেচ্ছাসেবী।

এ সময় সংগঠনটির সহদপ্তর সম্পাদক আরিফ আহমেদ বলেন, এমন একজন গুণী মানুষ আমাদের জেলায় আছেন, আমরা আগে জানতাম না। সত্যিই আমরা গর্বিত। আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা দিতে তার এলাকায় এসেছি। স্মারকের সঙ্গে একটি বই ও পোশাক উপহার দেওয়া হয়েছে।

গাইবান্ধার গর্ব ‘এক টাকার মাস্টার’

লুৎফর রহমানের রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় আনন্দিত স্থানীয় বাসিন্দাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাদের মতে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গণ্ডির বাইরে থেকেও তিনি যেভাবে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়াশোনার সুযোগ করে দিয়েছেন, তা অনুকরণীয়।

লুৎফর রহমানের প্রাক্তন ছাত্র ও চন্দিয়া মহিলা কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক জাহিদুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, সেই ছোট্টবেলায় আমি তার কাছে পড়েছি। সে সময় প্রাইভেট শিক্ষক পাওয়া যেত না। পেলেও অভাবে সবাই পড়াতে পারতেন না। সেই সময় তিনি আমাকে পড়িয়েছেন।

তিনি বলেন, আজ আমিও একজন কলেজশিক্ষক। স্যারের শিক্ষাসেবার ৫২ বছর পর এসে গুণী শিক্ষক সম্মাননা আমাকে আনন্দিত করেছে। নিঃসন্দেহে স্যার আমাদের গর্ব, গাইবান্ধার গর্ব।

প্রতিবেশী মন্টু মিয়া বলেন, তার কাছে একসময় আমরা পড়েছি, এখন আমাদের সন্তানেরা পড়ে। এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের অবহেলিত শিশুদের পড়িয়ে তিনি রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পেয়েছেন। তিনি আমাদের এলাকার গর্ব।

রায়দাসপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাবীবা সুলতানা বলেন, আমরা যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকতা করি, তারা আসলে একটা গণ্ডির মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করি। কিন্তু তিনি খুঁজে খুঁজে সুবিধাবঞ্চিত ও ঝরে পড়া শিশুদের শিক্ষা দিয়েছেন। এটি তার প্রাপ্য সম্মান।

জয়েনপুর আদর্শ কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক আবুল আজাদ বলেন, লুৎফর রহমান একজন ব্যতিক্রমী শিক্ষক। এক টাকা হয়তো হিসাব করা যায়, কিন্তু তার বিনিময়ে যে শিক্ষা তিনি দিয়ে আসছেন, সেটি মাপা সম্ভব নয়। এ ধরনের নিবেদিতপ্রাণ মানুষকে মূল্যায়ন করায় তিনি সরকারকে ধন্যবাদ জানান।

কলেজশিক্ষক ও গাইবান্ধা প্রেসক্লাবের সভাপতি অমিতাভ দাস হিমুন বলেন, তাকে নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। নির্লোভ এবং সত্যিই শিশুদের শিক্ষায় একজন নিবেদিতপ্রাণ লুৎফর রহমান মাস্টার। আমরা হয়তো অনেকেই ডিগ্রি অর্জন করেছি, কিন্তু তার মতো করে শিশুদের জন্য করতে পারিনি, এমনকি ভাবতেও পারিনি।

লুৎফর রহমানের ছোট ছেলে মশিউর রহমান বলেন, শেষ বয়সে এসে হলেও তাকে সরকার সম্মানিত করেছে। এজন্য আমরা কৃতজ্ঞ। যদিও আমরা বিষয়টি কখনো আশা করিনি।

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পড়াতে চান

রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পাওয়ার অনুভূতি জানতে চাইলে লুৎফর রহমান বলেন, আমি খুব খুশি ও আনন্দিত। তবে সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে প্রধানমন্ত্রীকে কাছ থেকে দেখতে পেরে। সম্মাননা কিংবা অর্থপ্রাপ্তি আমার মূল প্রত্যাশা ছিল না। আমার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ঝরে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের লেখাপড়ার সুযোগ নিশ্চিত করা। কারণ, আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড।

তিনি বলেন, সম্মাননার সঙ্গে পাওয়া অর্থ আমার উপকারে আসবে। আর সরকারি ভাতার ব্যবস্থা হলে বাকি জীবনটা কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারব।

লুৎফর রহমান বলেন, যত দিন সুস্থ থাকব, তত দিনই শিশুদের পড়িয়ে যাব। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পড়ানোই আমার ইচ্ছা। আমার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষার্থীদের প্রতিও অনুরোধ থাকবে, অর্থের অভাবে কোনো শিশুর লেখাপড়া যেন বন্ধ না হয়। তারা যেন এমন শিশুদের পাশে দাঁড়ায়। আমি না থাকলেও তারা যেন এই কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। আমার প্রাক্তন ছাত্রদের যেখানেই পাই, সেখানেই এই অনুরোধ করে থাকি।

তৈরি হচ্ছে ‘এক টাকার স্কুল’

লুৎফর রহমানের দীর্ঘদিনের শিক্ষাসেবাকে আরও সুসংগঠিত ও বিস্তৃত করতে তার বাড়িতে জেলা প্রশাসনের অর্থায়নে নির্মাণ করা হচ্ছে এক কক্ষবিশিষ্ট একটি পাঠশালা। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘এক টাকার স্কুল’। এখানে এলাকার দরিদ্র পরিবারের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিশুদের বিনা মূল্যে পড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। নির্মাণকাজ শেষ হলে পাঠশালাটি চালু করা হবে।

লুৎফর রহমান বলেন, স্কুলঘরটির নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি। এটি চালু হলে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিশুদের বিনা মূল্যে পড়ানো হবে। আমি না থাকলেও আমার ছেলে ও ছেলের বউ এই কাজের দায়িত্ব পালন করবে। আমি চাই, আমার অবর্তমানেও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার এই উদ্যোগ চালু থাকুক।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাব্বির আহমেদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, সেখানে একটি পাঠশালা ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। লুৎফর রহমান সেখানে স্কুলের শিক্ষার্থীদের পড়াবেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

‘পাহাড়ি কৃষিপণ্য রপ্তানিতে মানসম্মত উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ জরুরি’

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শিশুদের পড়াতে চান ‘এক টাকার মাস্টার’

আপডেট টাইম : ১১:০৭:১৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

মাত্র এক টাকা। এই এক টাকার বিনিময়ে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন গাইবান্ধার লুৎফর রহমান। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীরেও থামেনি তার পাঠদান। প্রতিদিন বই-খাতা নিয়ে তার সামনে বসে একদল শিশু। পড়ানোর পাশাপাশি তাদের নৈতিক শিক্ষাও দেন তিনি। বিনিময়ে নেন মাত্র এক টাকা। দীর্ঘ ৫২ বছরের এই শিক্ষাসেবা তাকে পরিচিত করেছে ‘এক টাকার মাস্টার’ নামে। এবার তার নিরলস প্রচেষ্টার স্বীকৃতি মিলেছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে।

গত ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষ্যে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশের ১০০ জন গুণী শিক্ষকের সঙ্গে লুৎফর রহমানকেও সম্মাননা দেওয়া হয়। পুরস্কার হিসেবে পান দুই লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তাকে সরকারি অবসরভাতা দেওয়ার ঘোষণাও দেন শিক্ষামন্ত্রী। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সামনে নিজের অনুভূতিও প্রকাশ করেন তিনি। তবে এই স্বীকৃতির পরও তার ইচ্ছা, যত দিন বেঁচে থাকবেন ও সুস্থ থাকবেন, তত দিন শিশুদের পড়িয়ে যাবেন।

নদীভাঙনে সব হারিয়ে ঠিকানা বাগুড়িয়ায়

গাইবান্ধা শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার গিদারি ইউনিয়নের বাগুড়িয়া গ্রাম। ব্রহ্মপুত্র নদের নতুন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পাশের এই জনপদে নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়া অনেক পরিবারের বসবাস। এমনই এক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন লুৎফর রহমান।

তবে বাগুড়িয়া তার আদি নিবাস নয়। তার জন্ম ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া গ্রামে। চরের সম্পদশালী পরিবারে জন্ম নেওয়া লুৎফর রহমানের পরিবারের একসময় চার বিঘার বেশি জমিতে বসতভিটা ছিল। চরের আবাদি জমির পরিমাণও ছিল ১০০ বিঘার বেশি। কিন্তু নদীভাঙনে একে একে হারিয়ে যায় জমিজমা ও বসতভিটা। পরে পরিবারটি ডাকাতিয়ার চরে আশ্রয় নেয়। সেখানকার ভিটেমাটিও নদীগর্ভে বিলীন হলে লুৎফর রহমান সদর উপজেলার বাগুড়িয়া গ্রামে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিন শতাংশ জমির ওপর তার বসতি।

জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী, লুৎফর রহমানের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৩ নভেম্বর। সে হিসাবে বর্তমানে তার বয়স প্রায় ৭৮ বছর। বাবা মৃত ফইম উদ্দিন ও মা মৃত নছিয়ম নেছার পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি একমাত্র ছেলে এবং সবার ছোট। স্ত্রী লতিফুন বেগমের সঙ্গে তার সংসারে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে হয়েছে। দুই ছেলের একজন লাভলু ইজিবাইক চালান, অন্যজন মশিউর একটি মাদরাসায় কর্মরত। নিজস্ব সম্পত্তি বলতে তেমন কিছুই নেই তার।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেলে বাগুড়িয়া গ্রামের মদনের পাড়া এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একটি বাড়ির পাকা বারান্দায় পাটি বিছিয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সাত শিশুকে পড়াচ্ছেন লুৎফর রহমান। বৈরী আবহাওয়ার কারণে সেদিন বারান্দায় পাঠদান করছিলেন তিনি। বিভিন্ন বিষয়ে পড়ানোর পাশাপাশি শিশুদের পড়া ধরছিলেন, শেখাচ্ছিলেন লেখা। শিশুদেরও আনন্দের সঙ্গে পড়াশোনায় অংশ নিতে দেখা যায়।

স্থানীয়রা জানান, ঝড়-বৃষ্টি কিংবা বয়সের ভার তাকে দমাতে পারেনি। প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করেই নিয়মিত পাঠদানে বের হন তিনি। কখনো সাইকেলে, কখনো হেঁটে শিক্ষার্থীদের পড়াতে যান লুৎফর রহমান।

যেভাবে হলেন ‘এক টাকার মাস্টার’

লুৎফর রহমানের পাঠদানের শুরু ১৯৭৪ সালের দিকে। তখন গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত ও ঝরে পড়া শিশুদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়াতেন তিনি। বিনিময়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতিদিন এক বা দুই মুষ্টি চাল নিতেন। পরে চালের পরিবর্তে শিক্ষার্থীপ্রতি এক টাকা নেওয়া শুরু করেন। সেই থেকেই তার পরিচয় ‘এক টাকার মাস্টার’ হিসেবে।

লুৎফর রহমান বলেন, ১৯৭৪ সালের অভাব-অনটনের সময় গ্রামের ঝরে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ধরে ধরে এনে পড়াতাম। এর কিছুদিন পর শিক্ষার্থীপ্রতি এক টাকা করে নেওয়া শুরু করি। তখন থেকেই মানুষ আমাকে এক টাকার মাস্টার বলে ডাকতে শুরু করে।

ফি মাত্র এক টাকা কেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বিনামূল্যে পড়ালে অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ থাকে না। অন্যদিকে, দরিদ্র পরিবারের অভিভাবকদের পক্ষে বেশি টাকা দিয়ে সন্তানকে পড়ানো কঠিন। তাই এক টাকা নির্ধারণ করি।

সময় বদলেছে, বদলেছে টাকার মূল্যও। তবে তার পাঠদানের পদ্ধতি বদলায়নি। এখনো সকাল ও সন্ধ্যায় বিভিন্ন দফায় শিশুদের পড়ান তিনি।

লুৎফর রহমান বলেন, এই টাকা আমার কাছে এখন কোনো পারিশ্রমিক নয়, এটা শিক্ষার্থীকে পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত রাখার একটি উপায় বা কৌশল মাত্র।

নদীভাঙনে হারিয়েছেন সব, সংকল্প সেখান থেকেই

নিজের জীবনের অভাব-অনটনের অভিজ্ঞতাই লুৎফর রহমানকে অন্য শিশুদের শিক্ষার প্রতি দায়িত্বশীল করে তোলে। আর্থিক সংকটের কারণে বেশি দূর পড়াশোনা করতে পারেননি তিনি। সেই আক্ষেপ থেকেই তার প্রতিজ্ঞা, অভাবের কারণে কোনো শিশুর পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়।

লুৎফর রহমান বলেন, প্রচণ্ড অভাব-অনটনের কারণে বেশিদূর পড়তে পারিনি আমি। সেটাই আমার বড় দুঃখ। যখন দেখলাম অভাবের কারণে এলাকার শিশুরা পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অভিভাবকেরাও নিরুপায়, তখনই যুদ্ধে নামি। প্রতিজ্ঞা করি, অভাবের কারণে যেন কোনো শিশু পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত না হয়। এজন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের ধরে এনে পড়ানো শুরু করি।

তার কাছে পড়তে আসা শিশুদের অনেকের পরিবার নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত। এসব পরিবারের সন্তানদের জন্য এক টাকার বিনিময়ে পড়ার সুযোগ বাড়তি সহায়তা হিসেবে কাজ করছে।

এক প্রজন্মের শিক্ষক, পরের প্রজন্মেরও

পাঁচ দশকের বেশি সময়ে অসংখ্য শিশুকে পড়িয়েছেন লুৎফর রহমান। তার কাছে পড়েছেন এমন শিক্ষার্থীদের সন্তানেরাও এখন তার সামনে বসে পড়াশোনা করছে। ফলে তার পাঠদান শুধু একটি প্রজন্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

লুৎফর রহমান জানান, ৫২ বছরের শিক্ষাসেবায় তার অনেক শিক্ষার্থী বর্তমানে শিক্ষক, চিকিৎসক, পুলিশ, বিজিবি, সাব-রেজিস্ট্রারসহ বিভিন্ন দপ্তরে চাকরি করছেন।

বৃহস্পতিবার মদনের পাড়ায় পড়তে আসা সাত শিক্ষার্থীর একজন সাদমান। তার বয়স পাঁচ বছর। সে মাদরাসার প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে পড়ে। তার মা সাথী বেগমও একসময় লুৎফর রহমানের ছাত্রী ছিলেন।

সাথী বেগম বলেন, স্যার অনেক জোরে শব্দ করে ও যত্ন করে আমাদের পড়াতেন। আমরা দলবেঁধে তার কাছে পড়তাম। আমি গৃহিণী। আমার সঙ্গে পড়া অনেকেই প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় সরকারি-বেসরকারি চাকরি করেন। যে স্যার আমাকে পড়িয়েছেন, তিনিই আজ আমার সন্তানকেও পড়াচ্ছেন।

কিশামত ফলিয়া ব্র্যাক শিশু নিকেতনের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মার্জিয়া আক্তার বারাকতা বলে, স্যারের কাছে পড়তে আমার অনেক ভালো লাগে। স্যার আমাকে বাংলা, ইংরেজি, গণিতসহ সব বিষয়ে পড়ান।

কিশামত ফলিয়া হাফিজিয়া ও নুরানী মাদরাসার নার্সারির শিক্ষার্থী নুসরাত বলে, স্যার সুন্দর করে পড়ান। স্যার রাগ করেন না, মারেন না। অনেক সুন্দর করে পড়ান।

অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ও লুৎফর রহমানের প্রাক্তন ছাত্র রবিউল ইসলাম নিরব বলে, ছোটবেলায় আমরা পড়তে বসতাম না, ফাঁকি দিতাম। খেলতে যেতাম। স্যার ধরে এনে পড়াতেন। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানায় টেকনিক্যাল স্কুলের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী আরমানও।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক নন, তবুও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি

লুৎফর রহমান সরকারি বা বেসরকারি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নন। ব্যক্তিগত উদ্যোগেই দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের পড়িয়ে আসছেন তিনি। ১৯৭০ সালে ফুলছড়ি উপজেলার গুণভড়ি উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। চাকরি না পেলেও শিক্ষার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। বরং শিশুদের পড়ানোই হয়ে ওঠে তার জীবনের অন্যতম প্রধান কাজ।

দীর্ঘদিনের এই শিক্ষাসেবার স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে তার গল্প। এবার বিশ্ব শিক্ষক দিবসে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পাওয়ায় সেই স্বীকৃতি নতুন মাত্রা পেয়েছে।

সম্মাননা পাওয়ার পর সাঘাটার আর রাহমা ফাউন্ডেশন ও স্পোর্টস একাডেমির পক্ষ থেকে তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও সংবর্ধনা জানাতে আসেন সংগঠনটির একদল তরুণ স্বেচ্ছাসেবী।

এ সময় সংগঠনটির সহদপ্তর সম্পাদক আরিফ আহমেদ বলেন, এমন একজন গুণী মানুষ আমাদের জেলায় আছেন, আমরা আগে জানতাম না। সত্যিই আমরা গর্বিত। আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা দিতে তার এলাকায় এসেছি। স্মারকের সঙ্গে একটি বই ও পোশাক উপহার দেওয়া হয়েছে।

গাইবান্ধার গর্ব ‘এক টাকার মাস্টার’

লুৎফর রহমানের রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় আনন্দিত স্থানীয় বাসিন্দাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাদের মতে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গণ্ডির বাইরে থেকেও তিনি যেভাবে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়াশোনার সুযোগ করে দিয়েছেন, তা অনুকরণীয়।

লুৎফর রহমানের প্রাক্তন ছাত্র ও চন্দিয়া মহিলা কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক জাহিদুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, সেই ছোট্টবেলায় আমি তার কাছে পড়েছি। সে সময় প্রাইভেট শিক্ষক পাওয়া যেত না। পেলেও অভাবে সবাই পড়াতে পারতেন না। সেই সময় তিনি আমাকে পড়িয়েছেন।

তিনি বলেন, আজ আমিও একজন কলেজশিক্ষক। স্যারের শিক্ষাসেবার ৫২ বছর পর এসে গুণী শিক্ষক সম্মাননা আমাকে আনন্দিত করেছে। নিঃসন্দেহে স্যার আমাদের গর্ব, গাইবান্ধার গর্ব।

প্রতিবেশী মন্টু মিয়া বলেন, তার কাছে একসময় আমরা পড়েছি, এখন আমাদের সন্তানেরা পড়ে। এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের অবহেলিত শিশুদের পড়িয়ে তিনি রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পেয়েছেন। তিনি আমাদের এলাকার গর্ব।

রায়দাসপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাবীবা সুলতানা বলেন, আমরা যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকতা করি, তারা আসলে একটা গণ্ডির মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করি। কিন্তু তিনি খুঁজে খুঁজে সুবিধাবঞ্চিত ও ঝরে পড়া শিশুদের শিক্ষা দিয়েছেন। এটি তার প্রাপ্য সম্মান।

জয়েনপুর আদর্শ কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক আবুল আজাদ বলেন, লুৎফর রহমান একজন ব্যতিক্রমী শিক্ষক। এক টাকা হয়তো হিসাব করা যায়, কিন্তু তার বিনিময়ে যে শিক্ষা তিনি দিয়ে আসছেন, সেটি মাপা সম্ভব নয়। এ ধরনের নিবেদিতপ্রাণ মানুষকে মূল্যায়ন করায় তিনি সরকারকে ধন্যবাদ জানান।

কলেজশিক্ষক ও গাইবান্ধা প্রেসক্লাবের সভাপতি অমিতাভ দাস হিমুন বলেন, তাকে নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। নির্লোভ এবং সত্যিই শিশুদের শিক্ষায় একজন নিবেদিতপ্রাণ লুৎফর রহমান মাস্টার। আমরা হয়তো অনেকেই ডিগ্রি অর্জন করেছি, কিন্তু তার মতো করে শিশুদের জন্য করতে পারিনি, এমনকি ভাবতেও পারিনি।

লুৎফর রহমানের ছোট ছেলে মশিউর রহমান বলেন, শেষ বয়সে এসে হলেও তাকে সরকার সম্মানিত করেছে। এজন্য আমরা কৃতজ্ঞ। যদিও আমরা বিষয়টি কখনো আশা করিনি।

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পড়াতে চান

রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পাওয়ার অনুভূতি জানতে চাইলে লুৎফর রহমান বলেন, আমি খুব খুশি ও আনন্দিত। তবে সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে প্রধানমন্ত্রীকে কাছ থেকে দেখতে পেরে। সম্মাননা কিংবা অর্থপ্রাপ্তি আমার মূল প্রত্যাশা ছিল না। আমার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ঝরে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের লেখাপড়ার সুযোগ নিশ্চিত করা। কারণ, আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড।

তিনি বলেন, সম্মাননার সঙ্গে পাওয়া অর্থ আমার উপকারে আসবে। আর সরকারি ভাতার ব্যবস্থা হলে বাকি জীবনটা কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারব।

লুৎফর রহমান বলেন, যত দিন সুস্থ থাকব, তত দিনই শিশুদের পড়িয়ে যাব। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পড়ানোই আমার ইচ্ছা। আমার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষার্থীদের প্রতিও অনুরোধ থাকবে, অর্থের অভাবে কোনো শিশুর লেখাপড়া যেন বন্ধ না হয়। তারা যেন এমন শিশুদের পাশে দাঁড়ায়। আমি না থাকলেও তারা যেন এই কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। আমার প্রাক্তন ছাত্রদের যেখানেই পাই, সেখানেই এই অনুরোধ করে থাকি।

তৈরি হচ্ছে ‘এক টাকার স্কুল’

লুৎফর রহমানের দীর্ঘদিনের শিক্ষাসেবাকে আরও সুসংগঠিত ও বিস্তৃত করতে তার বাড়িতে জেলা প্রশাসনের অর্থায়নে নির্মাণ করা হচ্ছে এক কক্ষবিশিষ্ট একটি পাঠশালা। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘এক টাকার স্কুল’। এখানে এলাকার দরিদ্র পরিবারের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিশুদের বিনা মূল্যে পড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। নির্মাণকাজ শেষ হলে পাঠশালাটি চালু করা হবে।

লুৎফর রহমান বলেন, স্কুলঘরটির নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি। এটি চালু হলে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিশুদের বিনা মূল্যে পড়ানো হবে। আমি না থাকলেও আমার ছেলে ও ছেলের বউ এই কাজের দায়িত্ব পালন করবে। আমি চাই, আমার অবর্তমানেও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার এই উদ্যোগ চালু থাকুক।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাব্বির আহমেদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, সেখানে একটি পাঠশালা ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। লুৎফর রহমান সেখানে স্কুলের শিক্ষার্থীদের পড়াবেন।