রফিকুল ইসলামঃ সত্য চলে ধীরে, কিন্তু মিথ্যা দৌড়ে চলে। মার্কিন লেখক মার্ক টোয়েনের নামে একটি বিখ্যাত উক্তি প্রচলিত আছে—’সত্য জুতা পরার আগেই মিথ্যা পৃথিবীর অর্ধেক ঘুরে আসে।’ ডিজিটাল যুগে এই কথাটি যেন আরও বেশি বাস্তব হয়ে উঠেছে।
কারণ এটি শুধু জনমতকে বিভ্রান্ত করে না; সামাজিক বিভাজন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি তৈরি করে।
আসল কথাতে আসা যাক। কৃষকরা হলেন যেকোনো জাতির প্রাণ এবং অর্থনীতির মেরুদণ্ড। রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে তাঁরা খাদ্য উৎপাদন করেন, যার ওপর পুরো জাতির বেঁচে থাকা নির্ভর করে।
অথচ এই কৃষকদেরই পোড়া কপাল সবদিক দিয়েই। আবার দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাঁরা বরাবরই বলির পাঁঠা, কখনও তুরুপের তাস হন।
মূলত কৃষকদের চরম আর্থিক ক্ষতি, ফসলহানি এবং এর ফলে তাঁদের ভাগ্য বিপর্যয় কেবল কৃষকদের একার নয়, বরং পুরো জাতির জন্যই গভীর পরিতাপ ও উদ্বেগের বিষয়। কেননা, তাঁদের উৎপাদিত পণ্য চূড়ান্ত বিচারে খাদ্যের চাহিদা মেটায়।
কৃষকদের কঠোর পরিশ্রম ও বিনিয়োগের পরও যখন কাঙ্ক্ষিত ফলন না পেয়ে বা ফসল নষ্ট হয়ে কৃষক সর্বস্বান্ত হন, তখন সরকারের মানবিক আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে সংঘবদ্ধ দুষ্টচক্রের কারসাজিতে তা সঠিক হাতে পৌঁছাচ্ছে না। এই অশুভ চক্রটির অপতৎপরতা, অনৈতিক ও অযাচিত হস্তক্ষেপে অধিকার হারাচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা। তখন প্রচলিত অর্থেই ‘কৃষকের পোড়া কপাল’ না বলে উপায় কি! এটি মূলত একটি নেতিবাচক ফিডব্যাক লুপ।
হাওরাঞ্চলে চলতি বোরো মৌসুমে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারি যে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে, তাতে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, দলীয় প্রভাব এবং সঠিক যাচাই-বাছাইয়ের অভাবের কারণে অসন্তোষ ও অভিযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তদুপরি সরকারি বরাদ্দে অপ্রতুলতা, স্থানীয় জনপ্রতিধিদের নয়ছয় এবং সরকার দলীয় স্থানীয় ভুঁইফোঁড় নেতাদের মধ্যকার পারস্পরিক স্বার্থসিদ্ধিতে কর্তৃত্ব ফলানো ও কাড়াকাড়িই বেশি দায়ী।
তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে গাঁটছড়া বেধে একে অপরকে সহায়তা করছে। বিশেষ করে তৃণমূলের বর্ণচোরা তথাকথিত ওই নেতারা ‘যারাই শাহিদারি করতে গেছেন তারাই মিডুরি লুকিয়েছেন’ এবং ‘মুখ চিনে মুগের ডাল দিয়েছেন’। ফলে ফাঁকে থেকে সরকার ও প্রশাসনকে করে তুলেছে বিতর্কিত।
প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরিতে বিশেষ করে হাওর অধ্যুষিত সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার প্রায় ৩৫টি উপজেলা থেকেই গণমাধ্যমের বদৌলতে কমবেশি একই অভিযোগ প্রকাশ পাচ্ছে।
এ নিয়ে গণমাধ্যমের সংবাদ শিরোনাম হয়েছে – হাওরে ফসলডুবি: সরকারি সহায়তার তালিকায় ‘অনিয়ম’, বাদ পড়েছেন প্রকৃতরা; সুনামগঞ্জে হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ; হাওরে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরিতে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ।
যাঁদের শতভাগ ফসল তলিয়ে গেছে বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, এমন অনেক প্রকৃত ও প্রান্তিক কৃষক তালিকা থেকেই বাদ পড়েছেন। প্রকৃত কৃষকদের পরিবর্তে প্রভাবশালী বা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ব্যক্তি, যাঁদের ফসলহানি হয়নি এমন ব্যক্তি, এমনকি প্রবাসী ও মৃত ব্যক্তিদের নামও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার খবর গণমাধ্যমে ওঠে আসছে। সেইসাথে তালিকায় নাম উঠানোর বিনিময়ে স্থানীয় পর্যায়ে ঘুষ নেওয়ারও অভিযোগ করেছেন বঞ্চিত কৃষকরা।
প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে সচেতন যাঁরা, তাঁরা গণমাধ্যমকে বলেছেন, সরকারিভাবে যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি দেখানো হয়েছে, বাস্তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্তের তুলনায় সহায়তার সংখ্যাও নেহায়েত কম। যার কারণে স্বাভাবিকভাবেই বহু কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও স্বভাবতই তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেছেন। ফলে অভিযোগের মাত্রাও অধিক, যার অযাচিত ও বিরূপ চাপ পড়েছে স্থানীয় প্রশাসনের ওপর। এতে পুরো প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মনোবলকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
বিশেষ করে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার সংবাদ নিয়ে। সংবাদ শিরোনাম হয়েছে – মিঠামইনে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরিতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে মানববন্ধন স্মারকলিপি পেশ; মিঠামইনে কৃষক তালিকা নিয়ে বিতর্ক, তদন্ত চান অভিযুক্ত কর্মকর্তাও।
স্থানীয় প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও ব্যক্তিদের কাছে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এর আগে গত ৯ই জুন একটি স্বার্থান্বেষী মহল মিলে ওই কর্মকর্তাকে হেনস্তা করতে ভিডিয়ো বানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। ক্যামেরার সামনে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এর রেশ ধরেই পরবর্তী সময়ে কয়েকটি গণমাধ্যমে তা প্রকাশিত হয় খবরের পেছনে খবর না জেনে বা ঘটনার গভীরে না গিয়ে।
এতে মিঠামইন উপজেলার গোপদিঘী ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা স্বচ্ছতার দাবির চেয়ে বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ কেবল উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. তাজুল ইসলামকে ঘিরে। তাদের দাবি, তিনি এককভাবে অর্থের বিনিময়ে কৃষকের ক্ষতিগ্রস্তের পুরো তালিকা প্রস্তুত করেছেন।
মিঠামইন উপজেলার সংবাদ কয়টির গভীরে তলিয়ে দেখলে পুরো হাওরাঞ্চলের প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বঞ্চিত হবার নেপথ্য কারণ এবং সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার পেছনে আদতে কারা নাটেরগুরু, তা জানা যাবে।
বিষয়টি গভীরে তলিয়ে দেখতে গিয়ে দেখা যায়, ভিডিয়ো ভাইরালকারী ওই নেতা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নের শেষ পর্যায়ে অর্থাৎ দ্বিতীয় ধাপে ১৩ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের নাম দেন সংশ্লিষ্ট কমিটির সভাপতির কাছে, যার দ্বিতীয় ধাপের ক্রমিক নং ১৪৭ – ১৫৯। বিলম্বিত এবং বরাদ্দে অপ্রতুলতায় তা যাচাই-বাছাইয়েই যায়নি। কেননা, আগে আসা বা প্রথম ধাপের ৪১৯ জনের আবেদন থেকে ৫৭ জন ইতোমধ্যেই বাদের তালিকায় পড়ে আছেন।
এছাড়া দেখা গেছে, দ্বিতীয় ধাপে ওই নেতার দাখিল করা ১৩ জনের মধ্যেও রয়েছে চরম স্বজনপ্রীতি ও অনিয়ম; আর প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বঞ্চিত রাখার হীনমন্যতা, যা সত্য উদঘাটনে খতিয়ে দেখার দাবি রাখে।
মানুষ এমনটি কেন করে? এর মনস্তাত্ত্বিক দিকই-বা কী? এক্ষেত্রে আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (APA)-এর একটি মত প্রণিধানযোগ্য। তাতে বলা হয়েছে – ‘It’s a human defense strategy. Instead of taking the responsibility of their own faults and failures on their own shoulders and putting them on others.’ অর্থাৎ, ‘এটি মানুষের একটি আত্মরক্ষামূলক কৌশল। নিজেদের দোষ ও ব্যর্থতার দায় নিজের কাঁধে না নিয়ে তা অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া।’
অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বৃহত্তর হাওরাঞ্চলে কৃষকদের হাজার কোটি টাকার বোরো ধানের ক্ষয়ক্ষতির পর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মানবিক আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দেয় সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের চিহ্নিত করে নির্ভুল ও স্বচ্ছ তালিকা প্রস্তুত করতে হবে। এই তালিকার ভিত্তিতেই আগামী তিন মাস কৃষকদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
এর আগে গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছিলেন, হাওরাঞ্চলে ভারী বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের চিহ্নিত করে সরকারের পক্ষ থেকে তিন মাস মানবিক সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত প্রতিটি পরিবারকে কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে ২০ কেজি করে চাল দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি ক্ষতির মাত্রা বিবেচনা করে তিন ক্যাটাগরিতে নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হবে। এতে সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পাবেন ৭ হাজার ৫০০ টাকা, মধ্যম ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পাবেন ৫ হাজার টাকা ও স্বল্প ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পাবেন ২ হাজার ৫০০ টাকা।
কিন্তু চলতি বোরো মৌসুমে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের যে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে, সেটি গ্রহণযোগ্য হয়নি বলে খোদ সরকার দলীয় নেত্রকোনা-৪ (মদন-মোহনগঞ্জ-খালিয়াজুরী) আসনের এমপি ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর নিজেই অভিযোগ তুলেছেন।
লুৎফুজ্জামান বাবর বলেছেন, বিএনপি ও প্রশাসনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রাথমিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের একটি তালিকা করা হয়েছিল। তবে সেই তালিকায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় অনেক নামও এসে গেছে। তাই সেটি গ্রহণযোগ্য নয়, নতুন করে যাচাই-বাছাই করে তালিকা প্রণয়ন করা হবে। যাঁরা বাস্তবিক অর্থে ক্ষতির শিকার হয়েছেন এবং সহায়তা পাওয়ার যৌক্তিকতা রাখেন, তাঁদেরই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
আসলে সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনকে (জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা) সঙ্গে নিয়ে যৌথভাবে এই তালিকা প্রণয়ন করে থাকে।
হাওরে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্দিষ্ট সরকারি কমিটির মাধ্যমে নীতিমালা অনুযায়ী সুফলভোগী নির্বাচন করা হয়।ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনতে গঠিত এসব কমিটির মূল নিয়ম হলো:
উপজেলা কৃষি পুনর্বাসন বাস্তবায়ন কমিটি বা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা। উপজেলা পর্যায়ে এই কমিটির প্রধান বা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সদস্য সচিব থাকেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা। এছাড়াও এতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তারা যুক্ত থাকেন।
আর ইউনিয়ন কৃষি কমিটি ও সুফলভোগী নির্বাচন কমিটিতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা ইউনিয়ন পরিষদ প্রশাসক, ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (ইউপি সচিব), মেম্বার, উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা এবং উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা-সহ আরও অনেকের সমন্বয়ে এই কমিটি গঠিত হয়। এতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নে স্থানীয় সংসদ সদস্যগণ উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত থাকেন।
মাঠপর্যায় থেকে ইউনিয়ন কমিটিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে থাকে। এরপর এই কমিটি সেই তালিকা কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। উপজেলা কমিটি তা নজরদারিতে রাখে।
স্থানীয় প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও ব্যক্তিদের কাছে খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, গোপদিঘী ইউনিয়ন পরিষদ প্রশাসককে সভাপতি ও ইউপি প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে (ইউপি সচিব) সদস্যসচিব করে ২৪ সদস্যবিশিষ্ট গোপদিঘী ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২ জনই ওয়ার্ড মেম্বার। এছাড়া রয়েছে উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা, ইউনিয়ন সমাজকর্মী, সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, শিক্ষক প্রতিনিধি, গণ্যমান্য, মসজিদের ইমাম, পুরোহিত, আনসার ভিডিপি দলনেতা, ইউডিসি উদ্যোক্তা এবং সভাপতি হিসেবে রয়েছে ইউপি প্রশাসক অর্থাৎ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে ৩ জন সংরক্ষিত মহিলা মেম্বার মিলিয়ে মোট ১২ জন মেম্বার-সহ ১৩ জনের কাজের দায়িত্ব ওয়ার্ডভিত্তিক বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে আগে অর্থাৎ প্রথম ধাপে ৪১৯ জনের আবেদন বা জাতীয় পরিচয়পত্র জমা হয়। সুফলভোগী নির্বাচনে সংখ্যার সীমাবদ্ধতার দরুন, অর্থাৎ বরাদ্দে অপ্রতুলতার জন্য তালিকা থেকে ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্তে ৫৭ জনকে ছাটাই করা হয়। অন্যদিকে ৩ জন সংরক্ষিত মহিলা মেম্বার-সহ ১২ জন মেম্বার দালিলিকভাবে সুফলভোগীদের
শনাক্ত করার মধ্য দিয়ে ৩৬২ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের একটি তালিকা চূড়ান্ত করা হয়।
এমনিতেই তো প্রথম ধাপ থেকে ৫৭ জন বাদ পড়ে আছেন, তার ওপর দেরিতে আসা দ্বিতীয় ধাপে ২৭০ জন কৃষকের আবেদন বা জাতীয় পরিচয়পত্র জমা পড়ে। যার ফলে বরাদ্দে সংখ্যার সীমাবদ্ধতার কারণে প্রথম ধাপের ৫৭ জন নিয়ে মোট ৩২৭ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের আবেদন স্বভাবতই বাদ রয়ে যায়।
এক্ষেত্রে গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ৩২৭ জন কৃষকের নাম যারা যারা দিয়েছেন সরকার দলীয় নেতা সেজে এবং জনপ্রতিনিধি-সহ বিভিন্ন যোগসাজশে, তারাই বাদপড়া কৃষকদের ভুল বুঝিয়ে বিশৃঙ্খলার দিকে উস্কে দিয়েছেন। এছাড়া কৃষকদেরকে তুরুপের তাস বানিয়ে গণমাধ্যম গরম ও পরিস্থিতি ঘোলাটে করেছেন।
অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, এমন পরিস্থিতি বৃহত্তর হাওরাঞ্চলের সবখানেই; যা প্রশাসন শুধু নয়, খোদ সরকারকেই কৃষকবিরোধী করে তুলছে সরকার দলীয় নেতাগিরি নাম বেচে ওই সংঘবদ্ধ কুচক্রী মহলটি। সরকার ও দলের দায়িত্বশীল নেতারা এখনই তাদের লাগাম টেনে না ধরলে সরকারের জন্য তা বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়াতে পারে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে শুধুমাত্র প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করার নির্দেশনা থাকলেও কেবল একজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে দায়ী করে তার শাস্তি, বদলি ও পদত্যাগ দাবি করার মূল কারণ জানা গেছে। তা হলো, ওই কর্মকর্তার কাছে সুফলভোগীদের আবেদনে বা জাতীয় পরিচয়পত্রে শনাক্তকারী হিসেবে স্থানীয় মেম্বারদের স্বাক্ষর-সহ প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস সংরক্ষিত করে রাখা।
মাঠপর্যায়ের এই কর্মকর্তারা সাধারণত তালিকা প্রণয়ন কমিটির একজন সদস্যমাত্র। তারা এককভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়ন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন না; সম্ভবও নয়।
এছাড়া যাচাই-বাছাইয়ের কাজটি প্রশাসনের কোনো একক কর্মকর্তার পক্ষে একা করারও কোনো সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা প্রশাসক, ওয়ার্ড মেম্বার, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং উপজেলা প্রশাসনের গঠিত কমিটির সম্মিলিত অনুমোদন লাগে।
একজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পক্ষে একটি নির্দিষ্ট ব্লকের বাইরে পুরো ইউনিয়নের তিনটি ব্লকের সকল কৃষকদের চেনার কথা নয়, প্রতিটি ওয়ার্ড মেম্বার ছাড়া। তাই ওয়ার্ড মেম্বারদের দিয়েই সুফলভোগীদের তালিকা প্রণয়নে শনাক্ত ও যাচাই-বাছাইয়ের কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছে।
এখানে অবশ্য স্বল্প সময় ও জনবল সংকটে হাওরে জরুরি ভিত্তিতে বা খুব অল্প সময়ে তালিকা প্রস্তুত করতে হয়েছে, যার কারণে অনেক সময় মাঠ পর্যায়ে সরেজমিন যাচাই করার পর্যাপ্ত সুযোগ ছিল না। আর কোনো ত্রুটিপূর্ণ তালিকা সংশোধনের দায়িত্ব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও উপজেলা প্রশাসনের ওপর বর্তায়।
কৃষকরা সব রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহার ও প্রচারণায় প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলেও শেষে তাঁরাই চরম অবহেলা ও ক্ষতির শিকার হন। প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরিতে তাঁদের ভাগ্য বদলায় না, বরং নানা সংকটে তাঁরা বরাবরই স্কেপগোট বা বলির পাঁঠা হন। এই বলির পাঁঠা হওয়ার বৃত্ত থেকে বের হতে হলে শুধু কথার রাজনীতি নয়, বরং কৃষকদের স্বার্থ দেখা উচিত সবার আগে।
কেননা, হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা পর্যাপ্ত সরকারি আর্থিক সহায়তা না পেলে তা দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে গভীর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। আর্থিক সংকটের কারণে কৃষকরা পরবর্তী মৌসুমে বীজ, সার ও কীটনাশক কিনতে ব্যর্থ হবেন। যার ফলে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় চালের দাম বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।
এককথায়, কৃষি খাতের সুরক্ষায় পর্যাপ্ত সরকারি প্রণোদনা, সহজ শর্তে কৃষি ঋণ এবং পুনর্বাসন সহায়তা অত্যন্ত জরুরি।
তবে এবারের বাজেট হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরাসরি আর্থিক প্রণোদনা, ঋণ মওকুফ এবং খাদ্য সহায়তার মতো বেশকিছু সুরক্ষামূলক ও আশাব্যঞ্জক বার্তা বহন করে।
কৃষক কার্ড প্রোগ্রামে সরকার ৪ কোটি ২৫ লাখ কৃষক কার্ড বিতরণের জন্য বাজেটে ১,০৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা
প্রাথমিক বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকরা সহজে সরাসরি সরকারি সহায়তা, ভর্তুকি এবং কৃষি উপকরণ পাবেন।
হাওর অঞ্চলের অর্থনীতি ও কৃষকদের সুরক্ষার জন্য প্রণোদনা বাড়লেও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়ন নিয়ে দলীয় লোকদের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির মতো গুরুতর অভিযোগ উঠছে। স্বচ্ছতার সাথে প্রকৃত কৃষকরা যেন এই সহায়তাগুলো পান, সেটি এখন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।
বৃহত্তর হাওরাঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা নিয়ে যা শুরু হয়েছে তাতে সরকারের অবশ্যই করণীয় রয়েছে। উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নে কার কী ভূমিকা ছিল তা বের করা। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকায় দলীয় নেতাকর্মীদের অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি রোধে তালিকাগুলো সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে অসঙ্গতিগুলো সংশোধন করা।
আর তালিকা তৈরিতে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির প্রমাণ পেলে সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা বা সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের অপতৎপরতা ও পরিকল্পিত নৈরাজ্য সৃষ্টির অপচেষ্টা রোধে জাতীয় পরিচয়পত্র ও কৃষি কার্ডের সাহায্যে প্রকৃত কৃষকদের একটি ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করা জরুরি।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় গণমাধ্যম সঠিক তথ্য উদঘাটন করে তা প্রকাশের মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তিন মাস নয়, বছরব্যাপী সহায়তা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে, ন্যায্য বাজারমূল্য ও অধিকার রক্ষায় এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণে গণমাধ্যমের ভূমিকাও অনস্বীকার্য।
এছাড়াও কৃষির সামগ্রিক উন্নয়নে ও দরিদ্র কৃষকের স্বার্থ সুরক্ষায় কৃষিনির্ভর গণমাধ্যম বা কৃষি সাংবাদিকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
লেখক: সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা
Reporter Name 
























