‘যত গর্জে তত বর্ষে না’-এই প্রবাদটি হতে পারে সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের হাঁকডাকের জুতসই উদাহরণ। ফ্যাসিস্ট এবং মানবতাবিরোধী কা-ে জড়িত সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ছিল গতকাল মঙ্গলবার। দিবসটি উপলক্ষে সোশ্যাল মিডিয়ায় বাগাড়ম্বর করা হয়। দিল্লিতে পালিয়ে থাকা শেখ হাসিনার নির্দেশে সারাদেশে হাজার হাজার নেতাকর্মী রাস্তায় নেমে আসবেÑ কয়েকটি গণমাধ্যমে এমন বার্তা দেয়া হয়। ফেসবুক, ব্লগ, টিকটক, ইউটিউব ও টিভির বিভিন্ন টকশোতে এমন প্রচারণা চালানো হয় যে, মৃত্যুদ-প্রাপ্ত শেখ হাসিনা দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনে যেন দিল্লি থেকে ঢাকায় এসে নামবেন। দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করে। এমনকি জনগণের ভোটে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রিরা বুঝে হোক না বুঝে হোক, কয়েকটি স্পটে সেনাবাহিনীকে নামানোর আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেয়। চতুর্দিকে আওয়ামী লীগ ঠেকানোর সাজ সাজ রব পড়ে যায়। অবশেষে দেখা গেল, কলকাতার ভূমি ব্যান্ডের ভোকাল সুরজিতের ‘তোমার দেখা নাইরে তোমার দেখা নাই’ গানের মতোই পরিণতি। সারাদেশে দিনভর অপেক্ষা, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা রাস্তায় নামলেই ঠেঙ্গানো হবে। কিন্তু কোথাও তাদের দেখা নেই। রাজধানী ঢাকাসহ জেলাপর্যায়ে টুকটাক কয়েকটি স্পটে আওয়ামী লীগের কয়েকজন কর্মী-সমর্থক মিছিল নিয়ে রাস্তায় নেমেছে। ৫ থেকে ১০ মিনিটের ঝটিকা মিছিলের পর উধাও হয়ে গেছে। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ঘেষতেই পারেনি ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের ডাক দেয়া আওয়ামী লীগ।
গত কয়েক দিন ধরে ‘বাঘ আসছে বাঘ আসছে’ আওয়াজের মতো ‘আওয়ামী লীগ রাজপথ কাঁপিয়ে তুলবে’ প্রচারণা চালালেও গতকাল ধানমন্ডিতে ঘটেছে ভিন্ন ঘটনা। রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রতিবাদে আয়োজিত একটি বিক্ষোভ কর্মসূচির পর সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ধানমন্ডি জোনের উদ্যোগে আয়োজিত আওয়ামী লীগবিরোধী বিক্ষোভ মিছিল শেষে ব্রিফিং চলাকালে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের কর্মী-সমর্থকদের কথা-কাটাকাটি হলে পরিস্থিতি সংঘর্ষে রূপ নেয়। তবে তারও আগে রাজধানীর ধানমন্ডি মডেল থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের ১০ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, গ্রেফতারদের কাছ থেকে যুবলীগের মনোগ্রামযুক্ত ১৫টি ক্যাপ, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ছবি-সংবলিত আটটি গেঞ্জি এবং ‘শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশ হাসবে’ লেখা একটি ব্যানার উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া গ্রেফতারদের বহনকারী দুটি বাস ও একটি প্রাইভেটকার জব্দ করা হয়েছে।
দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ কার্যত গণধিকৃত ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত। দ্ইু বছর আগে ঢাকার রাজপথে প্রকাশ্যে শত শত ছাত্র-জনতাকে পাখির মতো গুলে করে মারার পৈশাচিক দৃশ্য মানুষ ভুলতে পারেনি। এছাড়াও বিগত ১৫ বছর আট মাসের শাসনামলে দলটি দেশের জনগণ ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরতা দেখেছে। ২০২৪ সালে শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে দমন-পীড়ন এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন বাহিনীকে ব্যবহার করে ¯œাইপার, হেলিকপ্টারে গুলি করে ১৪ শ’ মানুষকে হত্যার করে পালানোয় দলটির নেতাদের ওপর মানুষ চরম বিক্ষুব্ধ। জাতিসংঘের তদন্তের কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দলটি এখন মানবতাবিরোধী দল হিসেবে চিহ্নিত। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রথমে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ পরবর্তীতে নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ নামে জন্ম নেয়া দলটির যেমন ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংগ্রাম, গৌরব ও সাফল্য আছে, তেমনি ব্যর্থতা, গ্লানিও কম নয়। অপরাধকা-, খুন, গুম, ধর্ষণ এবং মানবতাবিরোধী কর্মকা- করায় দেশের মানুষের কাছে এখন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করা জামায়াতের চেয়েও বেশি ঘৃণিত আওয়ামী লীগ নামের দলটি। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া দলটির ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী যখন গৌরবের সঙ্গে পালন করার কথা; তখন দলটির অপকা-ের কারণে ঢাকা শহরে একটি মিছিলও করতে পারছে না। সভা-সেমিনার করার মতো কেউ নেই। তবে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার করা দলটির নেতারা এখন পাচারকৃত অর্থ ব্যয়ে দেশের কিছু সাংবাদিক, ব্লগার, কনটেইন ক্রিয়েটর, টিকটকারকে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণায় নামিয়েছে; তারা ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সারাদেশে ভয়ঙ্কর কা- ঘটানো হবেÑ এমন প্রচারণায় নেমেছে। ঢাকা থেকে প্রকাশিত চিহ্নিত কিছু গণমাধ্যমে এমনভাবে প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও খবর প্রচার করছে যে, আওয়ামী লীগ সত্যিই যেন সারাদেশে ৭৭তম জন্মবার্ষিকী পালন করছে।
মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে সময়ের প্রয়োজনে ১৯৪৯ সালে টিকাটুলির রোজ গার্ডেনে জন্ম নেয়া আওয়ামী লীগ কার্যত এখন আইসিইউতে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ শুধু ক্ষমতাই হারায়নি; দেড় দশকের অপশাসন, দেশকে দিল্লির ‘করদরাজ্যে’ পরিণত করা, ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ সালের তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করায় আমজনতার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে। ফলে আওয়ামী লীগের সামনে এখন নানামুখী চ্যালেঞ্জÑ একদিকে রাজনীতিতে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা, অন্যদিকে পুরোনো জনসমর্থন ফিরে পাওয়া। দলটির যখন গৌরবময় ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের কথা; তখন দেশের সরকারি দল, বিরোধী দল থেকে শুরু করে বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল ও মানুষ দলটির ওপর ঘৃণা বর্ষণ করছে। পুরোনো ও একসময়ের প্রভাবশালী এই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ কীভাবে এ সংকট অতিক্রম করবে? সেটিই যখন রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম বড় প্রশ্ন; তখন দলটির নেতারা জনতার কাছে যেতে না পারায় কার্যত সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে অস্তিত্ব রক্ষার চেষ্টা করছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতা হারানোর পর ২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। দীর্ঘ ১৫ বছর ‘নাজি বাহিনী’র মতো বীভৎসতা ও পৈশাচিকতা করা দলটির ছাত্র সংগঠন-ছাত্রলীগ এখন নিষিদ্ধ। ফলে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম পুরোপুরিই ভার্চুয়াল মাধ্যমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন প্রচারণা চালানো হচ্ছে যে, দেশের মানুষ আওয়ামী লীগের জন্য কান্নাকাটি করছেন; শেখ হাসিনা যেকোনো সময় বিমানের করে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামবেন। লাখ লাখ লোক তাকে বরণ করার জন্য বিমানবন্দরে যাবেন।
শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারানোর পর দীর্ঘ দুই বছর ভারতকে ব্যবহার করে বাংলাদেশে নানাভাবে বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করছে, এমনকি সংখ্যালঘু নির্যাতনের কাল্পনিক অভিযোগ তুলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানোর চেষ্টা করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার ও জনগণের প্রতিরোধের মুখে কোনোটিতেই সফল হতে পারেনি। এখন মাঝেমধ্যে ঝটিকা মিছিল, হরতালের ডাকও দেয়। তবে সেটিতে রাজনীতি ও জনজীবনে কোনো প্রভাব পড়েনি। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, তবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধই রয়েছে। এবার ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে ঝটিকা মিছিল করেছে। ভার্চুয়ালি প্রচারণা চলছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার তা সারা দেশেই বিক্ষোভ করার ঘোষণা দিয়েছিল দলটির আত্মগোপনে থাকা নেতারা; কিন্তু ওই পর্যন্তই।
সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণায় কারণে আগাম প্রস্তুতি হিসেবে রাজধানী ঢাকায় ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছিল ঢাকা মহানগর পুলিশ-ডিএমপি। ঢাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ১৮ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন রাখা হয়। এর বাইরে সেনা মোতায়েনের তথ্য প্রচার করা হয়। কোথায় আওয়ামী লীগ!
৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল রাজধানীতে আওয়ামী লীগের মিছিল-সমাবেশ ও গণজমায়েত চোখে পড়েনি। ঢাকার বাইরে কয়েকটি জায়গায় ঝটিকা মিছিল হলেও সেটি ছিল কার্যত ক্যামেরায় ভিডিও করার জন্য; বরং গতকাল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপি, ছাত্রদল, জামায়াত, এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল, যুব সংগঠন ও সামাজিক সংগঠনের বিক্ষোভ মিছিল দেখা গেছে। তারপরও দেখা গেছে কিছু গণমাধ্যম আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে খবর, প্রবন্ধ, নিবন্ধ প্রকাশের মাধ্যমে দেশবাসীকে জানান দিচ্ছেÑ আওয়ামী লীগ আছে এবং শেখ হাসিনা শিগগিরই আসছেন। অনেকটা ‘যার বিয়ে তার খবর নেই, পাড়া পড়শির ঘুম নাই’ প্রবাদের মতো অবস্থা। এদিকে বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা, জামায়াত ও এনসিপির নেতারা শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে এনে মৃত্যুদ- কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন। গতকাল জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে ‘আয়নাঘর’-এর বিশেষ চেয়ারে বসিয়ে ইলেকট্রিক শক দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নেই তারপরও আওয়ামী লীগ আসছে Ñএমন প্রচারণায় রহস্যজনক বৈকি।
Reporter Name 
























