বগুড়া-৫ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ (জি এম) সিরাজ বলেছেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ডিভোর্স হতে পারে; কিন্তু প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ডিভোর্স হতে পারে না। গত ২২ জুন সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের ১২তম দিনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের কথা তুলে ধরে জি এম সিরাজ বলেন, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, তাদের মধ্যে ডিভোর্সও হতে পারে; কিন্তু ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রতিবেশী সম্পর্কের ডিভোর্স হতে পারে না। প্রতিবেশীকে কখনোই অস্বীকার করা সম্ভব নয়, ভারতও পারবে না, বাংলাদেশও পারবে না। তিনি আরো বলেন, আমরা সবাই চাই ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্বপূর্ণ এবং সম্মানজনকভাবে আমাদের বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখি। কারণ আমি বিশ্বাস করি, ভারত আমাদের প্রতিবেশী। আমরাও দুই বন্ধুতে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ক্ষণস্থায়ী যেন না হয়।
জনাব গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ বগুড়া থেকে বিএনপির টিকিটে এর আগেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ব্যবসা-বাণিজ্য করে তিনি উত্তরবঙ্গের একজন ধনকুবের হয়েছেন। কিন্তু একাধিকবার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হলেও তিনি রাজনীতির জন্য যেটি পূর্বশর্ত সেই ইতিহাস ভালোভাবে পাঠ করেছেন বলে মনে হয় না। যদি পাঠ করতেন তাহলে তিনি দেখতেন, শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই বিচ্ছেদ হয় না, প্রতিবেশীদের মধ্যেও বিচ্ছেদ হয়। আওয়ামী ঘরানার লোকেরাও বলেন, ভারত ভৌগোলিকভাবে আমাদের প্রতিবেশী।
প্রতিবেশীকে তো বদলানো যায় না। প্রতিবেশীকে বদলানো আর সেই প্রতিবেশীর সাথে স্বামী-স্ত্রীর মতো ঘনিষ্ঠতম সম্পর্ক বজায় রাখা—এক বিষয় নয়। ভূগোলও সময়ের আবর্তনে পরিবর্তিত হয়। আমরা আজকের আলোচনায় দেখাব, কিভাবে এবং কত জায়গায় ভূগোল অর্থাৎ দেশ বা রাষ্ট্রের মানচিত্রও পরিবর্তিত হয়েছে। এই পরিবর্তন ঘটেছে ইউরোপে, পরিবর্তন ঘটেছে মধ্যপ্রাচ্যে, এমনকি অনেক বড় পরিবর্তন ঘটেছে এই পাক-ভারত-বাংলা উপমহাদেশেও।
আজ যেটি ভারত, গতকাল সেটি কি ভারত ছিল? ভারতের আয়তন কি এই ছিল? পাকিস্তান কি বর্তমান মানচিত্রের মতো ছিল? একাত্তরের আগে বাংলাদেশ নামে কি কোনো স্বাধীন দেশ ছিল?
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট যখন ভারত স্বাধীন হয় তখনকার ভারতের আয়তন আজকের ভারতের সমান ছিল না। আয়তন আজকের ভারতের চেয়ে কম ছিল। আজ যেটি ভারতের হায়দারাবাদ সেটি কিন্তু ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের আগে ভারতের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এটি ছিল দক্ষিণ ভারতের সবচেয়ে বড় দেশীয় রাজ্য। রাজ্যের শাসকের নাম ছিল মীর ওসমান আলী খান। শাসককে বলা হতো নিজাম। হায়দারাবাদের নিজাম ভারতে যোগ না দিয়ে স্বাধীন থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পণ্ডিত নেহরু ভারতের স্বাধীনতার আগে থেকেই ভারতকে আঞ্চলিক পরাশক্তি তো বটেই, অন্যতম বিশ্বশক্তি করার স্বপ্ন দেখছিলেন। তাই ভারতের অভ্যন্তরে হায়দারাবাদ স্বাধীন থাকবে, এটি তিনি মেনে নিতে পারেননি। তাই ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারত হায়দারাবাদকে ভারতের সাথে যুক্ত করার জন্য সেনা অভিযান পরিচালনা করে। এই অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন পোলো’। নিজামের বাহিনী ভারতীয় বাহিনীকে মোকাবিলা করে। তবে এত বড় শক্তির সাথে তারা পেরে উঠবে কিভাবে? তাই মাত্র পাঁচ দিনের অভিযানের পর নিজাম আত্মসমর্পণ করেন এবং এভাবে গায়ের জোরে পণ্ডিত নেহরু হায়দারাবাদকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করেন। অনুরূপভাবে জুনাগড় ও মানভাদার ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানে যোগদানের চেষ্টা করে। কিন্তু সেখানেও ভারত সেনা অভিযান করে এবং রাজ্য দুটিকে জোরপূর্বক ভারতের অন্তর্ভুক্ত করে। এর পর সেনা নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় নিয়ন্ত্রিত গণভোট করে ভারতভুক্তির পক্ষে জনগণের রায় আদায় করে।
আজ যে গোয়া নিয়ে তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য ভারত গর্ব করে সেই গোয়া কিন্তু ১৯৬০ সাল পর্যন্ত ভারতের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এটি ছিল পর্তুগালের একটি উপনিবেশ। ১৯৬১ সালে ভারত সামরিক অভিযান করে এবং গোয়া দখল করে।
সিকিমের ভারতভুক্তির ইতিহাস ষড়যন্ত্রের ইতিহাস। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর সিকিম একটি স্বাধীন রাজ্য হিসেবে থাকার ইচ্ছা পোষণ করে। সিকিমের শাসক বা রাজা ছিলেন চোগিয়াল। ১৯৫০ সালে ভারত সামরিক হুমকি দিয়ে সিকিমের সাথে একটি চুক্তি করে, যার ফলে সিকিম পরিণত হয় একটি রক্ষিত রাষ্ট্রে বা প্রোটেক্টরেট স্টেট; কিন্তু সিকিমকে রক্ষিত রাষ্ট্র বানিয়েই ভারত সন্তুষ্ট ছিল না। তারা চাচ্ছিল সিকিমকে একটি পূর্ণাঙ্গ অঙ্গরাজ্য বানাতে। তাই সিকিমের রাজনৈতিক নেতা ভারতীয় দালাল লেন্দুপ দর্জির মাধ্যমে ভারত চোগিয়ালের বিরুদ্ধে অসন্তোষ ও বিক্ষোভ ছড়াতে থাকে। বিস্তর টাকাপয়সা ছিটিয়ে গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর অপারেটররা সিকিমে প্রচণ্ড অস্থিরতা সৃষ্টি করে। এই সময় লেন্দুপ দর্জি জনগণকে বোঝান, একমাত্র ভারতভুক্তিই সিকিমের অশান্তি দূর করতে পারে। ১৯৭৫ সালের এপ্রিল মাসে ভারতের ২২তম অঙ্গরাজ্য হিসেবে সিকিম ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।
ওপরের এই আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের ভারতের মানচিত্র এবং আজকের মানচিত্র এক নয়। হায়দারাবাদ, জুনাগড়, মানভাদার, গোয়া ও সিকিমকে গ্রাস করে ভারতের ভূগোল বড় হয়েছে।
ভূগোল বড় করার পিপাসা ভারতের এখনো মেটেনি। বৃহত্তম দেশীয় রাজ্য কাশ্মীরকে বলা হয় ভূস্বর্গ, অর্থাৎ—এই পৃথিবীতেই স্বর্গের অস্তিত্ব। সেই কাশ্মীরের ৯৫ শতাংশ মানুষ মুসলমান। তারা পাকিস্তানে যোগ দিতে চেয়েছিলেন। কাশ্মীরের ইতিহাস দীর্ঘ ইতিহাস। গত ৭৯ বছরেও কাশ্মীর বিরোধে জনগণের গ্রহণযোগ্য নিষ্পত্তি হয়নি। সমগ্র জনগোষ্ঠী যখন পাকিস্তানে যোগ দিতে চেয়েছিল, তখন কাশ্মীরের হিন্দু মহারাজা হরি সিং একটি দলিলে ভারতে যোগদান করেন। ওই দলিল বলে ভারত কাশ্মীরে সামরিক অভিযান চালায়। মুক্তিকামী কাশ্মীরিরা ভারতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। স্বাধীনতার ঊষালগ্নে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী বলতে তেমন কিছু ছিল না। তাই উপজাতীয়রা কাশ্মীরিদের সাথে যোগ দেয়। এ অবস্থায় জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে যুদ্ধবিরতি হয়। জাতিসংঘ সিদ্ধান্ত দেয়, কাশ্মীরে গণভোট হবে। জনগণ ভারতে যেতে চাইলে কাশ্মীর ভারতের হবে, পাকিস্তানে যেতে চাইলে পাকিস্তানের হবে, আর যদি স্বাধীন থাকতে চায় তাহলে স্বাধীন হবে। কিন্তু পরবর্তীতে ভারত আর গণভোট মানেনি। আজও পাঁচ লাখ সৈন্য মোতায়েন রেখে ভারত জোর করে কাশ্মীরের দুই-তৃতীয়াংশ দখলে রেখেছে।
সুতরাং জি এম সিরাজ এমপি সাহেব দেখতে পাচ্ছেন, ভূগোলও বদল হয়। আজ যেটি বাংলাদেশ সেটি তো বৃহত্তর বাংলা বা যুক্তবাংলা নামে স্বাধীন থাকার কথা ছিল। কিন্তু মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, পণ্ডিত নেহরু, সরদার প্যাটেল এবং ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির প্রচণ্ড বিরোধিতায় যুক্তবাংলা হতে পারেনি এবং বাংলা বিভক্ত হয়। আজ থেকে ৫০ কি ১০০ বছর পর ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মানচিত্রে কোনো পরিবর্তন আসে কিনা সেটি আজ কে বলতে পারে?
এখন আমরা বিশ্বের ইতিহাসের দিকে তাকাই। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের জঠর থেকে বেরিয়ে ১৫টি রাষ্ট্র স্বাধীন হয়েছে। রাশিয়া প্রথমে ক্রিমিয়া দখল করে। তার পর ইউক্রেনের একটি অংশ দখল করে আছে। সাবেক যুগোস্লাভ ফেডারেশন ভেঙে মোট ছয়টি স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরি হয়। এগুলো হলো—স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, উত্তর মেসিডোনিয়া, সার্বিয়া, মন্টেনেগ্রো। পরে কসোভো ২০০৮ সালে সার্বিয়া থেকে বেরিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। তবে অনেক রাষ্ট্র এখনো কসোভোকে স্বীকৃতি দেয়নি।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র পুরোপুরি বদলে যায় এবং বড় চারটি সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। পতন ঘটে অটোমান বা ওসমানীয়, রুশ, জার্মান এবং অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের।
ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে পোল্যান্ড, চেকোস্লোভাকিয়া, যুগোস্লাভিয়া, ফিনল্যান্ড এবং বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোর (এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া) সৃষ্টি হয়।ওসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের পর ব্রিটেন ও ফ্রান্স মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা নির্ধারণ করে। যার ফলে ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ফিলিস্তিনের মতো নতুন অঞ্চলের জন্ম হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী শান্তি চুক্তির ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা হয় এবং নতুন পরাশক্তি আত্মপ্রকাশ করে। জার্মানিকে দুই ভাগে (পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি) বিভক্ত করা হয়। অবশ্য পরবর্তীতে দুই জার্মানিই এক হয়ে এক জার্মানিতে পরিণত হয়েছে। এই যুদ্ধের পর জাপান তার দখলকৃত সব অঞ্চল অর্থাৎ—কোরিয়া, তাইওয়ান ও মাঞ্চুরিয়া হারিয়ে ফেলে এবং কোরিয়া উত্তর ও দক্ষিণ অংশে বিভক্ত হয়। আজও দুই কোরিয়া এক হয়নি; বরং উত্তর কোরিয়া কমিউনিস্ট প্রভাবিত এবং দক্ষিণ কোরিয়া আমেরিকা প্রভাবিত।
জি এম সিরাজ এবং বিএনপির অবগতির জন্য জানাচ্ছি, ১৯৯০ সালের আগ পর্যন্ত ইয়েমেন দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। ১৯৯০ সালে দুই ইয়েমেন একত্র হয়ে বর্তমান ইয়েমেন প্রজাতন্ত্র গঠন করেছে।
সবশেষে বলব ইসরাইলের কথা। প্রথমেই বলেছি, দেশের মানচিত্র সবসময় অপরিবর্তিত থাকে না। প্রথমে ভারতের উদাহরণ দিয়েছি। এবার ইসরাইলের উদাহরণ দেবো। ইসরাইলের জন্মের পেছনে রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস। আজ আমরা সেদিকে যাব না। কিন্তু জন্মের সময় ইসরাইলের যে আয়তন ছিল সেটি ১৯৪৮-১৯৪৯ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে ৪৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
১৯৪৮ সালে ডেভিড বেনগুরিয়ন যে স্বাধীন ইসরাইলের ঘোষণা দেন তার আয়তন ছিল ১৪ হাজার ১০০ বর্গকিলোমিটার। কিন্তু ’৪৮-৪৯ সালের যুদ্ধের পর ইসরাইলের আয়তন বৃদ্ধি পেয়ে হয় ২০ হাজার ৭৭০ বর্গকিলোমিটার। ইসরাইলের এই আয়তনকে জাতিসংঘ অন্যায়ভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
ওপরের এই আলোচনা থেকে বিএনপির বন্ধুরা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন, ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী হলেও তাদের সম্পর্ক ছেদ হতে পারে। ড. ইউনূসের সময় হয়েছিল। এখনো সেই সম্পর্ক রিপেয়ার করা হয়নি। জি এম সিরাজ সজ্জন মানুষ। তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, তিনি যেভাবে দুটি রাষ্ট্রকে নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন সেটি আওয়ামী ন্যারেটিভের সাথে অনেকটা মিলে যায়। শহীদ জিয়া এবং দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সময় সম্পর্ক জোড়া লাগেনি। নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী যে কাব্যের ভাষায় দুই দেশের একই আকাশ এবং একই বাতাসের সবক দিয়েছেন সেটি ‘গাঁয়ে মানে না, আপনি মোড়ল’-এর মতো শোনায়। আমাদের আর ওদের আকাশ ও বাতাস যে ভিন্ন সেটি ১৯৪৭ সালেই চূড়ান্ত ফয়সালা হয়ে গেছে।Email : journalist15@gmail.com
Reporter Name 























