নিজস্ব প্রতিবেদক, হাওর বার্তাঃ বর্ষা মৌসুম এলেই কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল দেশজুড়ে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠত। নিকলী, মিঠামইন, ইটনা, অষ্টগ্রাম ও করিমগঞ্জের হাওরে প্রতিদিন শত শত পর্যটকের পদচারণায় মুখর থাকত নদী-নালা ও জলরাশি। কিন্তু চলতি মৌসুমে সেই চিত্র একেবারেই ভিন্ন। একের পর এক নৌ-ডাকাতির ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় পর্যটকদের উপস্থিতি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে হাওরকেন্দ্রিক পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতে।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) হাওরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সম্প্রতি করিমগঞ্জ হাওরে শিশুর লাশবাহী নৌকায় ডাকাতির ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এর আগে নিকলী ও মিঠামইনের বিভিন্ন জলপথে পর্যটকবাহী ট্রলার ও স্পিডবোটে সংঘবদ্ধ ডাকাতির একাধিক ঘটনা ঘটে। অস্ত্রধারী ডাকাতরা যাত্রীদের জিম্মি করে মোবাইল ফোন, নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কারসহ মূল্যবান সামগ্রী লুটে নেয়। বাধা দিলে মারধর এমনকি পানিতে ফেলে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
গত সপ্তাহে ঢাকার উত্তরা থেকে আসা একটি পর্যটক দল নিকলী হাওরে ডাকাতির শিকার হয়। দলের এক সদস্য বলেন,
“পরিবার নিয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসেছিলাম। কিন্তু সন্ধ্যার আগে নির্জন এলাকায় আমাদের ট্রলার ঘিরে ধরে অস্ত্রের মুখে সবকিছু লুটে নেয় ডাকাতরা। এমন অভিজ্ঞতার পর আর কেউ সহজে এখানে আসতে চাইবে না।”
এসব ঘটনার খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় অনেক পর্যটক আগাম বুকিং বাতিল করছেন। ফলে ভরা বর্ষা মৌসুমেও পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল।
পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ট্রলার ও স্পিডবোট চালকরা। স্থানীয়দের দাবি, হাওর এলাকায় প্রায় সহস্রাধিক ট্রলার ও স্পিডবোট বর্তমানে অলস পড়ে রয়েছে। আগে প্রতিদিন ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় করলেও এখন অনেক চালকেরই তেলের খরচ তোলাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
একই পরিস্থিতি আবাসন ও হোটেল খাতেও। মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের অলওয়েদার সড়কসংলগ্ন আবাসিক হোটেল, গেস্ট হাউস ও ওয়াটার রিসোর্টগুলোর অধিকাংশ কক্ষ খালি পড়ে আছে। ধারাবাহিক বুকিং বাতিলের কারণে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন উদ্যোক্তারা।
এছাড়া হাওরের বিখ্যাত পনির বিক্রেতা, শুঁটকি ব্যবসায়ী, মাছের রেস্তোরাঁ, ঘাটকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন সেবাখাতের মানুষও চরম দুর্দশায় পড়েছেন। পর্যটক না থাকায় অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিক্রি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতির নেতা মো. রুবেল মিয়া বলেন, “হাওরের পর্যটনই আমাদের প্রধান জীবিকার উৎস। কিন্তু নিরাপত্তার ঘাটতির কারণে অপরাধীরা বারবার সুযোগ পাচ্ছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে হাজারো পরিবার ভয়াবহ আর্থিক সংকটে পড়বে।”
এ বিষয়ে জেলা পুলিশ ও নৌ-পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হাওরের নিরাপত্তা জোরদারে টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত নজরদারি, অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শহীদউল্লাহ বলেন, “পর্যটকরা যাতে নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে হাওর ভ্রমণ করতে পারেন, সে লক্ষ্যে প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি যেকোনো ধরনের অনিয়ম, অপরাধ ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের মতে, হাওরের পর্যটন শুধু বিনোদনের বিষয় নয়; এটি হাজারো মানুষের জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। তাই আশ্বাসের পাশাপাশি দ্রুত দৃশ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ, নিয়মিত নৌ-টহল এবং ডাকাত চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে পর্যটকদের আস্থা ফিরিয়ে আনার এখনই সময়।
Reporter Name 




















