ঢাকা ০৪:৪৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মহিষারকান্দি’ গ্রামটি জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও চির বঞ্চিত

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৪:৪৪:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
  • ০ বার

রফিকুল ইসলামঃ গ্রামই শেকড়। গ্রাম নিয়ে গর্ব করা হলেও মূলধারার অনেক গণমাধ্যমে গ্রামের সমস্যাগুলো তুলে ধরতে একধরনের হীনমন্যতায় ভুগে। সাধারণত গ্রামীণ জীবনের চেয়ে শহুরে খবর, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও বিনোদনকে বেশি প্রাধান্য বা গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর কারণ হলো পত্রিকার পাঠক ও বিজ্ঞাপনদাতাদের বড় অংশ শহুরে।

গণমাধ্যম মূলত শহরের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দুকে ঘিরে পরিচালিত হয়, যার ফলে প্রান্তিক গ্রামীণ জীবনের দৈনন্দিন সংবাদ ও সমস্যাগুলো উপেক্ষিত থেকে যায়।

অথচ একটি দেশের সামগ্রিক অস্তিত্ব ও উন্নয়নের জন্য গ্রাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি জাতীয় খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করে এবং দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে। এছাড়াও গ্রাম আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মূল কেন্দ্র এবং এটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রধান ভূমিকা পালন করে।

বাংলাদেশের প্রায় ৯৮ হাজার গ্রামের মধ্যে ‘মহিষারকান্দি’ একটি বর্ধিষ্ণু ও জনবহুল গ্রাম। আদর্শ গ্রাম হিসেবে বিবেচিত হলেও চির অবহেলিত, বঞ্চিত ও পশ্চাৎপদ।ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, ভঙ্গুর অবকাঠামো বিশেষ করে পাকা রাস্তা ও সেতুর অভাব এবং প্রতিকূল পরিবেশের কারণে বাসিন্দারা বহুমুখী ও নিত্যদিনের সংকটের মুখে পড়ে রয়েছে।

গ্রামের প্রায় ৪ হাজার জনগোষ্ঠীকে যুগ যুগ ধরে অধিকার ও প্রাপ্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে, অমানবিক বৈষম্য তৈরি করা হয়েছে, শিক্ষা ও চিকিৎসায় চরম অবহেলা করা হয়েছে, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। এটি একটি পদ্ধতিগত ও সামাজিক সামষ্টিক অবিচারের ফল।

গ্রামটি কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা সদর থেকে অতি কাছে অবস্থিত; তথাপি যেন উপজেলার বহু দূরের কোনো বিচ্ছিন্ন ব-দ্বীপ। এর মূল কারণ উন্নত পাকা সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার সুবিধা না থাকা।

মহিষারকান্দি গ্রামটি হলো বাংলাদেশের জনবসতির ক্ষুদ্রতম একটি একক। এই গ্রামের কৃষকদের মহিষারকান্দি, বোরনপুর, মিঠামইন, উড়িয়ন্দ, গড়বন্দ, হোসেনপুর, খুনখুনি মৌজায় বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক কাঠামো টিকিয়ে রাখতে গ্রামটির ভূমিকা অপরিসীম।

দেশের প্রধান খাদ্যশস্য যেমন ধান, ভুট্টা, গম, আলু, বাতাম, ডাল, সরিষা এবং শাকসবজি উৎপাদনে এই গ্রামের কৃষকেরা অন্যতম ভূমিকা পালন করছে। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি জাতীয় জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এবং অন্যান্য খাতের জন্য কাঁচামাল সরবরাহ করছে। গ্রামের বিশাল জনগোষ্ঠী কৃষি, মৎস্য চাষ, গবাদিপশু পালন ও কুটির শিল্পের মতো পেশার সাথে জড়িত হলেও সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার অভাবে সবদিক দিয়ে মার খাচ্ছে।

মহিষারকান্দি একটি আলোকিত গ্রাম বলা চলে। গ্রামে ‘আজিজুর রহমান গণ-পাঠাগার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পাঠ্যাভ্যাস গড়ে তোলা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা-সহ ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির ধারক হিসেবে কাজ করছে। প্রচলিত ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনধারার বিপরীতে গ্রাম্য জীবন অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। গ্রামবাসীরা পরিশ্রমী হলেও সড়ক যোগাযোগে পশ্চাৎপদতায় কাজের ক্ষেত্র অতি সীমিত।

তবে গ্রামীণ ঐতিহ্য, লোকশিল্প, গ্রামীণ উৎসব এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এই গ্রাম থেকে পরিচালিত হয়।সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব, মুরব্বিদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং বিপদে-আপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মতো গুণাবলি গ্রামের সমাজব্যবস্থাকে অনন্য করে তুলেছে। পাশাপাশি গ্রামের সবুজ প্রকৃতি, গাছপালা, উন্মুক্ত মাঠ সামগ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করছে। পিছিয়ে কেবল গ্রামীণ পাকা সড়ক যোগাযোগব্যবস্থায়।

মহিষারকান্দি গ্রামটিতে অনেক জ্ঞানী-গুণীজনের আবাসস্থল। গ্রামটিকে ‘চাঁদের হাট’ও বলা হয়। এটি শুধু প্রবাদ নয়, বরং এমন একটি স্থান সংস্কৃতি, শিক্ষা ও ঐতিহ্যের দিক থেকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ।

এছাড়া রাজনৈতিক নেতৃত্বে, শিক্ষা-দীক্ষায়, চাকরি-বাকরিতে, ব্যবসা-বাণিজ্যে ও কৃষিতে একটি অগ্রসর গ্রাম হওয়া সত্ত্বেও যোগাযোগব্যবস্থার অভাবে সেই অঞ্চলের উন্নয়ন থমকে আছে। উন্নত পাকা সড়ক না থাকায় উপজেলা সদর এবং শহর-বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা ও ব্যবসা-বাণিজ্য করা অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

একটি গ্রামের মধ্যকার রাস্তা ও ইউনিয়ন সদর দপ্তর, স্থানীয় বাজার, খামার এবং ঘাট বা একে অন্যের সঙ্গে গ্রামগুলোকে সংযোগকারী রাস্তাই হচ্ছে গ্রামীণ রাস্তা। সেইমতে মহিষারকান্দি গ্রামটি এক কিলোমিটারের কাছাকাছি অবস্থিত হলেও উপজেলা সদরের প্রধান সড়ক থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় গ্রামের ভেতর রিকশা, ভ্যান বা অটোরিকশা-সহ সাধারণ কোনো যানবাহনও চলাচল করতে পারে না।

সেই ক্ষেত্রে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন মহিষারকান্দি গ্রামটি যেন বিচ্ছিন্ন কোনো ভূখন্ড এবং অনুন্নত ভাঙাচোরা ও গর্তেভরা কাঁচা সড়ক যেন পিছিয়ে পড়া গ্রামের বুক চিরে বয়ে যাওয়া দীর্ঘশ্বাস; যা শুষ্ক মৌসুমে ধুলোবালিতে ধূসর এবং বর্ষায় কাদায় একাকার হয়ে যায়। সামান্য বৃষ্টিতেই কাঁচা সড়কটি পিচ্ছিল হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।বাইসাইকেল, মোটরবাইক, ইজিবাইক চলাচল তো দূরের কথা, বয়স্ক, মহিলা বা শিশুদের জন্য পায়ে হাঁটাও হয়ে ওঠে একপ্রকার যুদ্ধ। এতে পুরো জনপদের জীবনযাত্রাকেই দিয়েছে অচল করে।

পাকা সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে না উঠায় পাকা ধান, রবিশস্য ও শাকসবজি নিয়ে কৃষকেরা সময়মতো হাট-বাজরে পৌঁছাতে পারেন না। গাড়ির অভাবে নষ্ট হয় উৎপাদিত ফসল। ফলে উৎপাদিত পণ্য মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে বাধ্য হয়ে বিক্রি করতে হয় পানির দরে।

অথচ পরিবহন যে-কোনো অঞ্চলের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাহক। পরিবহন মানুষ ও পণ্যকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তর করে। এটি একটি গ্রাম শুধু নয়, দেশের খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাগত সুযোগ ও কর্মসংস্থানের প্রবেশাধিকার ঘটায়। পরিবহন বিনোদন এবং দৈনন্দিন জীবনের অন্যান্য ক্রিয়াকলাপে প্রবেশাধিকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

মহিষারকান্দি গ্রামটিতে যোগাযোগের অভাবে স্বাস্থ্যসেবায়ও দেখা দিয়েছে করুণ দশা। হঠাৎ কোনো নারী অসুস্থ হয়ে পড়লে বা গর্ভবতী মায়েদের প্রসব বেদনা উঠলে হাসপাতালে নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রসূতি মা কিংবা গুরুতর অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য চাঙ্গাড়ি, ভ্যান বা খাটিয়াই একমাত্র ভরসা। অনেক সময় কাদাপথ পাড়ি দিতে দিতেই নিভে যায় জীবনপ্রদীপ। তাই দুর্গম গ্রাম বলে কোনো চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মী যেতে চান না সেখানে। এতে বিনা চিকিৎসায় সাধারণ রোগেও অনেক সময় রোগীর মৃত্যু ঘটে।

আর শিক্ষাব্যবস্থায় চরম দুর্দশার কথা বলে শেষ করার নয়। গ্রামটিতে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও গ্রামের এমাথা-ওমাথা থেকে যাতায়াতের অসুবিধার কারণে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না। শিশুশিক্ষার্থীরা আসতে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে।

একইসাথে গ্রামটিতে ধর্মীয় শিক্ষা প্রসারে রয়েছে মহিষারকান্দি নিজামীয়া মাতলুবুল উলূম ফাজিল মাদরাসা এবং মহিষারকান্দি জামে মসজিদ। মাদ্রাসাটিতে উপজেলার সকল মাদ্রাসার পাবলিক পরীক্ষাকেন্দ্র অবস্থিত। কিন্তু পাকা সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা না থাকার দরুন উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে আগত শতশত শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থী-সহ সংশ্লিষ্ট সবাই বিড়ম্বনার শিকার হয়ে আসছে।

বেহাল যোগাযোগব্যবস্থার দুর্ভোগে ঝরেও পড়ছে অনেক শিশুশিক্ষার্থী। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোলেই উপজেলা সদরে অবস্থিত হাইস্কুল বা কলেজে যেতে হয়। যাতায়াত দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বিশেষ করে মেয়েশিশুদের পড়াশোনায় চরম বিঘ্ন ঘটছে এবং অনেক ক্ষেত্রে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। আর বৃষ্টি-বাদলার দিনে শিক্ষকদের অনুপস্থিতিতে বলার কিছু থাকে না। বাইরের শিক্ষকরাও সময়মতো গ্রামে পৌঁছাতে পারেন না। ফলে পড়ালেখার মানোন্নয়নে বেশ বেগ পোহাতে হচ্ছে।

প্রায় ৪ হাজার জনগোষ্ঠীর মহিষারকান্দি গ্রামটিতে রয়েছে একটি ভোটকেন্দ্র। একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য ভোটকেন্দ্রের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ, নিরাপদ ও সুগম হওয়া অপরিহার্য। অথচ প্রায় ২ হাজার ভোটারদের অনেক কষ্টে ভোটকেন্দ্রে আসা-যাওয়া করতে হয়। সেইসাথে ভোটকেন্দ্রে যে-কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলা ও উদ্ধার কাজের জন্য ভোটকেন্দ্রের বাইরে অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস বা জরুরি গাড়ি চলাচলের নেই পাকা সড়ক যোগাযোগের কোনো বালাই।

মহিষারকান্দি গ্রামটিতে হজরত মাওলানা মতলেব উদ্দিন আনোয়ারী (রহ.) নামের একজন আধ্যাত্মিক সুফি সাধক বা ওলি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। ঐতিহ্যগতভাবে ওলি-আউলিয়া ও পীর-মাশায়েখদের স্মৃতিবিজড়িত এই গ্রামের পরিচিতি ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডলে অত্যন্ত সমাদৃত। সেখানে রয়েছে তাঁর মাজার ও খানকাহ শরিফ। এতে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হওয়া ওরস মোবারক ও ওয়াজ মাহফিলে সমবেত হয় লাখো ভক্ত ও মুরিদেরা। কিন্তু পাকা সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার অভাবে চরম ভোগান্তির ইয়ত্তা নেই।

এদিকে খালের ওপর কোনো পাকা সেতু না থাকায় নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোই পারাপারের একমাত্র ভরসা, যা পার হতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। এতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ঝুঁকিতে পারাপার করছে এবং নারী-শিশুসহ জনজীবন স্থবিরতার মধ্য দিয়ে কোনোমতে চলছে।

অন্যদিকে মহিষারকান্দি গ্রামটি সম্ভাবনাময় গ্রাম হওয়া সত্ত্বেও ভগ্ন কাচা রাস্তার পরিণামে সেখানে কোনো ধরনের খামার, ক্ষুদ্র শিল্প-কারখানা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঠিকঠাকভাবে গড়ে উঠতে পারছে না। এতে দিন দিন বেকারত্ব ও দারিদ্র্যতা বাড়ছে। পাশাপাশি দুর্যোগ বা বন্যা-পরবর্তী সময়ে দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে সরকারি বা বেসরকারি ত্রাণ সহায়তা সহজে পৌঁছাতে পারে না।

সামগ্রিকভাবে, একটি উন্নত ও প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন মহিষারকান্দি গ্রামটি মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে যুগের পর যুগ পিছিয়েই পড়ে থাকছে। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা না থাকায় সেখানে পৌঁছায় না কোনো শহর-বন্দরে বিনিয়োগ বা আধুনিকতার ছোঁয়া। ফলে যুগের পর যুগ গ্রামটি রয়ে গেছে অর্থনৈতিকভাবেও দৈন্য পীড়িত।

পাকা সড়ক ও সেতুর অভাবে শুধু যাতায়াতের পথ নয়, এটি মহিষারকান্দি গ্রামের অগণিত মানুষের পিছিয়ে পড়া জীবন ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার এক জীবন্ত দলিল যেন।

অথচ দেশের জনসংখ্যার সিংহভাগ মানুষের আবাসস্থল গ্রামে। গ্রামের কৃষকেরাই দেশের মূল চালিকাশক্তি, যারা খাদ্য উৎপাদন করে কোটি মানুষের মুখে খাবার তুলে দেন।

ঢাকাতে বসবাসরত মহিষারকান্দি গ্রামের প্রকৌশলী মো. এনায়েতুর রহমানের ফেসবুকের এক পোস্ট থেকে জানা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মোট ২১ বছরের শাসনামলে এই গ্রামের দুজন কৃতি সন্তান প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান শাহজাহান এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মো. জিল্লুর রহমান ৫ বছর করে উপজেলা চেয়ারম্যান এবং জিল্লুর রহমান ১৫ বছর জেলা পরিষদের মনোনীত প্রশাসক/ নির্বাচিত চেয়ারাম্যান থাকার পরও শুধু উপজেলা সদরের বাজার সংলগ্ন নতুনহাটি/বেড়িবাঁধের খালপাড় থেকে মাত্র আধা-কিলোমিটার কাঁচা সড়কটি পাকা হলো না কেবল স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের দলীয় কোন্দলের কারণে।

একই পোস্টে জানা যায়, এই আধা-কিলোমিটার এলজিইডি’র তালিকাভুক্ত কাঁচা সড়কটি প্রশস্ত ও পাকা করার জন্য বিভিন্ন অর্থবছরে প্রায় এক কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও কাজ না হওয়ায় অর্থ ফেরত যায়।

প্রকৌশলী এনায়েতুর রহমান লেখেন, গত অর্থ বছরে ইউনিয়ন পরিষদের কোনো এক বাজেট থেকে স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বারের মাধ্যমে কিছু মাটি ভরাট করা হয়। কিন্তু এর সাথে আরসিসি ওয়াল দিয়ে রাস্তাটি পাকা না হওয়ায় গত বর্ষায় রাস্তার মাটি পাশের ফসলের জমিতে ছড়িয়ে পড়েছে এবং বৃষ্টিতে রাস্তাটি আরও কর্দমাক্ত হয়ে পায়ে হাটা, সাইকেল, মটরবাইক ও ইজিবাইকে চলাচলও দুষ্কর হয়ে পড়েছে।

কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান তার এক ফেসবুক পোস্টে মন্তব্য করে লিখেছেন, সমস‍্যার গভীরে গেলে এক অবাক অথচ চিরাচরিত নিয়ম দেখতে পাওয়া যায়। প্রতিহিংসার শিকার মহিষারকান্দি গ্রামটি।

তিনি লেখেন, ভোটের রাজনীতি গ্রামটিকে উন্নত হতে দেয়নি। অবশ্য এতে গ্রামবাসীদেরও কিছুটা দায় রয়েছে। তাদের দূরদর্শিতার অভাব এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।

তিনি আরও লেখেন, স্রোতের বিপরীতে গিয়ে বেশি-কিছু আশা করাও ঠিক নয়। এছাড়া এত বেশি দলাদলি গ্রামটিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে দেয়নি। ফলশ্রুতিতে এর অপঘাত সবাইকেই ভোগতে হয়েছে এবং হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পল্লব হাসান লেখেন, এই গ্রামের মানুষ পালাক্রমে ক্ষমতাকে বৃদ্ধাংগুলি দেখিয়ে উলটা পথে হেঁটেছে; ভোটের সময় স্রোতের উজানে চলেছে। এখন কর্মফল ভোগ করছে সবাই।

চাকরিজীবী মাহফুজুর রহমান বলেন, মহিষারকান্দি গ্রামটি গ্রামীণ ও জাতীয় অর্থনীতিতে বেশ অবদান রাখলেও যোগাযোগব্যবস্থা-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চির অবহেলিত ও বঞ্চিত। রাজনৈতিক মতাদর্শ উন্নয়নে বাধা হওয়া বা বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত রাখা কোনোমতেই সমীচীন নয়।

একটি শক্তিশালী ও টেকসই সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণশক্তি। তদ্রূপ মহিষারকান্দি গ্রামের বেলায় আরও বেশি প্রযোজ্য। সেখানে আধুনিক ও উন্নত সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা স্থাপিত হলে গ্রামীণ ও জাতীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, কৃষির প্রসার ঘটবে। এছাড়াও –

১. কৃষিপণ্য ও শ্রমের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্রামীণ উদ্যোক্তা তৈরি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামগ্রিক দারিদ্র্য বিমোচনে সরাসরি ভূমিকা রাখবে।

২. কৃষক তাঁদের উৎপাদিত ধান, রবিশস্য, সবজি, মাছ ও ফলমূল দ্রুত এবং কম খরচে স্থানীয় হাট-বাজার বা শহর-বন্দরে পাইকারি বাজারে পৌঁছাতে পারবেন। এতে পণ্যের অপচয় রোধ হবে এবং কৃষকেরা মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে সরাসরি ন্যায্যমূল্য পাবেন।

৩. গ্রামীণ যোগাযোগ সহজ হলে প্রত্যন্ত গ্রামটিতে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি, সার ও উন্নত বীজ সরবরাহ করা সহজ হবে। পাশাপাশি পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খামারের মতো অকৃষি উদ্যোগগুলোও দ্রুত চালু ও বিকশিত হতে পারবে।

৪. সড়ক নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিবহন খাতে প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এছাড়াও যাতায়াতব্যবস্থা সহজ হওয়ায় গ্রামের মানুষ সহজেই নিকটবর্তী উপজেলা সদরে, শহর বা বাণিজ্যিক কেন্দ্রে কাজ করার সুযোগ পাবেন।

৫. ভালো যোগাযোগের ব্যবস্থা হলে মহিষারকান্দি গ্রামের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ঠিকমত গড়ে উঠবে। উৎপাদিত পণ্য দেশের শহর-বন্দরে সরবরাহের সুযোগ তৈরি হয়ে গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের আর্থিক সক্ষমতাও বেড়ে যাবে।

৬. উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা করা হলে দূরবর্তী শিক্ষার্থীরা সহজেই স্কুল-কলেজ-মাদ্রসায় যাতায়াত করতে পারবে, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার কমবে এবং শিক্ষার হার বেড়ে তা প্রসার ঘটবে।

৭. উন্নত রাস্তা হলে গ্রামে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসক ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা-সহ প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ সহায়তা সহজে পৌঁছানো সম্ভব হবে। যার ফলে গ্রামীণ মানবসম্পদ উন্নয়নের পথ সুগম হবে।

৮. যাতায়াত ব্যবস্থা নিরাপদ ও উন্নত হলে গ্রামটির নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণ বা অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি সেবা গ্রহণের হার বহুলাংশে বেড়ে যাবে।

৯. উন্নত পাকা সড়ক হলে সড়কের দুপাশে নতুন হাট-বাজার ও দোকানপাট গড়ে উঠবে, যা স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মহিষারকান্দি গ্রামের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে।

১০. উন্নত গ্রামীণ সড়ক নেটওয়ার্ক শহর ও গ্রামের মধ্যকার অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস করে টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে বর্ধিষ্ণু মহিষারকান্দি গ্রামটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারবে।

অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একটি বড় সত্য হলো, আমাদের দেশ এখনো গ্রামের ওপর ভর করে আছে। দেশের প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ বসবাস করে গ্রামে; আর তাঁদের জীবনধারা, কর্মসংস্থান ও আয় নির্ভর করে কৃষি, মৎস্য, পশুপালন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও শ্রমবাজারের ওপর। অথচ দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা শহরমুখীই থেকে গেছে, গ্রামীণ অর্থনীতি রয়ে গেছে নীতিনির্ধারকদের নখদর্পণে নয়, বরং প্রান্তে। আমরা শয়ে শয়ে পাকা সড়ক ও অলওয়েদার সড়ক গড়ে তুলছি, শহরকেন্দ্রিক উপজেলা গড়ে তুলছি, পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে শহরে। কিন্তু এগিয়ে যাওয়ার রসদ যে গ্রাম থেকে গড়ে উঠছে তা নিয়ে কয়জন ভেবেছেন?

ভাবতে না চাইলেও ভাবতে হয়, নিয়তি আমাদের শিকড়ের কাছেই টেনে নিয়ে যায়। তবুও স্থানীয় পর্যায়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর – এলজিইডি’র মতো সংস্থাগুলো এই অবকাঠামো উন্নয়নে নিরলস কাজ করে গেলেও মহিষারকান্দি গ্রামটির প্রতি বরাবরই উদাসীন থেকেছে।

উন্নত সড়ক ও নৌ-যোগাযোগ হাওরের গ্রামীণ অর্থনীতি এগিয়ে যাওয়ার পথের সারথি হতে পারে। এখানেই হাওরাঞ্চলের সত্যিকারের অর্থনৈতিক মুক্তির বীজ লুকিয়ে আছে। শহর নয়, দেশের পুনর্জাগরণ শুরু হবে গ্রাম থেকে – যেখানে একজন কৃষক, একজন জেলে কিংবা একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।

গ্রাম হলো বাংলাদেশের জনবসতির ক্ষুদ্রতম একটি একক। এজন্য দরকার জাতীয় অগ্রাধিকারে গ্রামীণ উন্নয়নকে স্থান দেওয়া, অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং সব ধরনের ভেদাভেদ ছাড়িয়ে একটি বাস্তববাদী ও মানবিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।

তাই সরকার তথা জনপ্রতিনিধির এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ উদ্যোগে মহিষারকান্দি গ্রামীণ জনপদের টেকসই অবকাঠামো গঠনে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য কাঁচা রাস্তা পাকাকরণ, পর্যাপ্ত ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি টেকসই উন্নয়নে কৃষি আধুনিকায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা-স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মানোন্নয়ন জরুরি।

লেখক: সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা

 

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

মহিষারকান্দি’ গ্রামটি জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও চির বঞ্চিত

আপডেট টাইম : ০৪:৪৪:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

রফিকুল ইসলামঃ গ্রামই শেকড়। গ্রাম নিয়ে গর্ব করা হলেও মূলধারার অনেক গণমাধ্যমে গ্রামের সমস্যাগুলো তুলে ধরতে একধরনের হীনমন্যতায় ভুগে। সাধারণত গ্রামীণ জীবনের চেয়ে শহুরে খবর, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও বিনোদনকে বেশি প্রাধান্য বা গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর কারণ হলো পত্রিকার পাঠক ও বিজ্ঞাপনদাতাদের বড় অংশ শহুরে।

গণমাধ্যম মূলত শহরের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দুকে ঘিরে পরিচালিত হয়, যার ফলে প্রান্তিক গ্রামীণ জীবনের দৈনন্দিন সংবাদ ও সমস্যাগুলো উপেক্ষিত থেকে যায়।

অথচ একটি দেশের সামগ্রিক অস্তিত্ব ও উন্নয়নের জন্য গ্রাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি জাতীয় খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করে এবং দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে। এছাড়াও গ্রাম আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মূল কেন্দ্র এবং এটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রধান ভূমিকা পালন করে।

বাংলাদেশের প্রায় ৯৮ হাজার গ্রামের মধ্যে ‘মহিষারকান্দি’ একটি বর্ধিষ্ণু ও জনবহুল গ্রাম। আদর্শ গ্রাম হিসেবে বিবেচিত হলেও চির অবহেলিত, বঞ্চিত ও পশ্চাৎপদ।ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, ভঙ্গুর অবকাঠামো বিশেষ করে পাকা রাস্তা ও সেতুর অভাব এবং প্রতিকূল পরিবেশের কারণে বাসিন্দারা বহুমুখী ও নিত্যদিনের সংকটের মুখে পড়ে রয়েছে।

গ্রামের প্রায় ৪ হাজার জনগোষ্ঠীকে যুগ যুগ ধরে অধিকার ও প্রাপ্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে, অমানবিক বৈষম্য তৈরি করা হয়েছে, শিক্ষা ও চিকিৎসায় চরম অবহেলা করা হয়েছে, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। এটি একটি পদ্ধতিগত ও সামাজিক সামষ্টিক অবিচারের ফল।

গ্রামটি কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা সদর থেকে অতি কাছে অবস্থিত; তথাপি যেন উপজেলার বহু দূরের কোনো বিচ্ছিন্ন ব-দ্বীপ। এর মূল কারণ উন্নত পাকা সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার সুবিধা না থাকা।

মহিষারকান্দি গ্রামটি হলো বাংলাদেশের জনবসতির ক্ষুদ্রতম একটি একক। এই গ্রামের কৃষকদের মহিষারকান্দি, বোরনপুর, মিঠামইন, উড়িয়ন্দ, গড়বন্দ, হোসেনপুর, খুনখুনি মৌজায় বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক কাঠামো টিকিয়ে রাখতে গ্রামটির ভূমিকা অপরিসীম।

দেশের প্রধান খাদ্যশস্য যেমন ধান, ভুট্টা, গম, আলু, বাতাম, ডাল, সরিষা এবং শাকসবজি উৎপাদনে এই গ্রামের কৃষকেরা অন্যতম ভূমিকা পালন করছে। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি জাতীয় জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এবং অন্যান্য খাতের জন্য কাঁচামাল সরবরাহ করছে। গ্রামের বিশাল জনগোষ্ঠী কৃষি, মৎস্য চাষ, গবাদিপশু পালন ও কুটির শিল্পের মতো পেশার সাথে জড়িত হলেও সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার অভাবে সবদিক দিয়ে মার খাচ্ছে।

মহিষারকান্দি একটি আলোকিত গ্রাম বলা চলে। গ্রামে ‘আজিজুর রহমান গণ-পাঠাগার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পাঠ্যাভ্যাস গড়ে তোলা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা-সহ ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির ধারক হিসেবে কাজ করছে। প্রচলিত ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনধারার বিপরীতে গ্রাম্য জীবন অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। গ্রামবাসীরা পরিশ্রমী হলেও সড়ক যোগাযোগে পশ্চাৎপদতায় কাজের ক্ষেত্র অতি সীমিত।

তবে গ্রামীণ ঐতিহ্য, লোকশিল্প, গ্রামীণ উৎসব এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এই গ্রাম থেকে পরিচালিত হয়।সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব, মুরব্বিদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং বিপদে-আপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মতো গুণাবলি গ্রামের সমাজব্যবস্থাকে অনন্য করে তুলেছে। পাশাপাশি গ্রামের সবুজ প্রকৃতি, গাছপালা, উন্মুক্ত মাঠ সামগ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করছে। পিছিয়ে কেবল গ্রামীণ পাকা সড়ক যোগাযোগব্যবস্থায়।

মহিষারকান্দি গ্রামটিতে অনেক জ্ঞানী-গুণীজনের আবাসস্থল। গ্রামটিকে ‘চাঁদের হাট’ও বলা হয়। এটি শুধু প্রবাদ নয়, বরং এমন একটি স্থান সংস্কৃতি, শিক্ষা ও ঐতিহ্যের দিক থেকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ।

এছাড়া রাজনৈতিক নেতৃত্বে, শিক্ষা-দীক্ষায়, চাকরি-বাকরিতে, ব্যবসা-বাণিজ্যে ও কৃষিতে একটি অগ্রসর গ্রাম হওয়া সত্ত্বেও যোগাযোগব্যবস্থার অভাবে সেই অঞ্চলের উন্নয়ন থমকে আছে। উন্নত পাকা সড়ক না থাকায় উপজেলা সদর এবং শহর-বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা ও ব্যবসা-বাণিজ্য করা অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

একটি গ্রামের মধ্যকার রাস্তা ও ইউনিয়ন সদর দপ্তর, স্থানীয় বাজার, খামার এবং ঘাট বা একে অন্যের সঙ্গে গ্রামগুলোকে সংযোগকারী রাস্তাই হচ্ছে গ্রামীণ রাস্তা। সেইমতে মহিষারকান্দি গ্রামটি এক কিলোমিটারের কাছাকাছি অবস্থিত হলেও উপজেলা সদরের প্রধান সড়ক থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় গ্রামের ভেতর রিকশা, ভ্যান বা অটোরিকশা-সহ সাধারণ কোনো যানবাহনও চলাচল করতে পারে না।

সেই ক্ষেত্রে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন মহিষারকান্দি গ্রামটি যেন বিচ্ছিন্ন কোনো ভূখন্ড এবং অনুন্নত ভাঙাচোরা ও গর্তেভরা কাঁচা সড়ক যেন পিছিয়ে পড়া গ্রামের বুক চিরে বয়ে যাওয়া দীর্ঘশ্বাস; যা শুষ্ক মৌসুমে ধুলোবালিতে ধূসর এবং বর্ষায় কাদায় একাকার হয়ে যায়। সামান্য বৃষ্টিতেই কাঁচা সড়কটি পিচ্ছিল হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।বাইসাইকেল, মোটরবাইক, ইজিবাইক চলাচল তো দূরের কথা, বয়স্ক, মহিলা বা শিশুদের জন্য পায়ে হাঁটাও হয়ে ওঠে একপ্রকার যুদ্ধ। এতে পুরো জনপদের জীবনযাত্রাকেই দিয়েছে অচল করে।

পাকা সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে না উঠায় পাকা ধান, রবিশস্য ও শাকসবজি নিয়ে কৃষকেরা সময়মতো হাট-বাজরে পৌঁছাতে পারেন না। গাড়ির অভাবে নষ্ট হয় উৎপাদিত ফসল। ফলে উৎপাদিত পণ্য মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে বাধ্য হয়ে বিক্রি করতে হয় পানির দরে।

অথচ পরিবহন যে-কোনো অঞ্চলের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাহক। পরিবহন মানুষ ও পণ্যকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তর করে। এটি একটি গ্রাম শুধু নয়, দেশের খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাগত সুযোগ ও কর্মসংস্থানের প্রবেশাধিকার ঘটায়। পরিবহন বিনোদন এবং দৈনন্দিন জীবনের অন্যান্য ক্রিয়াকলাপে প্রবেশাধিকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

মহিষারকান্দি গ্রামটিতে যোগাযোগের অভাবে স্বাস্থ্যসেবায়ও দেখা দিয়েছে করুণ দশা। হঠাৎ কোনো নারী অসুস্থ হয়ে পড়লে বা গর্ভবতী মায়েদের প্রসব বেদনা উঠলে হাসপাতালে নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রসূতি মা কিংবা গুরুতর অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য চাঙ্গাড়ি, ভ্যান বা খাটিয়াই একমাত্র ভরসা। অনেক সময় কাদাপথ পাড়ি দিতে দিতেই নিভে যায় জীবনপ্রদীপ। তাই দুর্গম গ্রাম বলে কোনো চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মী যেতে চান না সেখানে। এতে বিনা চিকিৎসায় সাধারণ রোগেও অনেক সময় রোগীর মৃত্যু ঘটে।

আর শিক্ষাব্যবস্থায় চরম দুর্দশার কথা বলে শেষ করার নয়। গ্রামটিতে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও গ্রামের এমাথা-ওমাথা থেকে যাতায়াতের অসুবিধার কারণে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না। শিশুশিক্ষার্থীরা আসতে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে।

একইসাথে গ্রামটিতে ধর্মীয় শিক্ষা প্রসারে রয়েছে মহিষারকান্দি নিজামীয়া মাতলুবুল উলূম ফাজিল মাদরাসা এবং মহিষারকান্দি জামে মসজিদ। মাদ্রাসাটিতে উপজেলার সকল মাদ্রাসার পাবলিক পরীক্ষাকেন্দ্র অবস্থিত। কিন্তু পাকা সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা না থাকার দরুন উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে আগত শতশত শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থী-সহ সংশ্লিষ্ট সবাই বিড়ম্বনার শিকার হয়ে আসছে।

বেহাল যোগাযোগব্যবস্থার দুর্ভোগে ঝরেও পড়ছে অনেক শিশুশিক্ষার্থী। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোলেই উপজেলা সদরে অবস্থিত হাইস্কুল বা কলেজে যেতে হয়। যাতায়াত দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বিশেষ করে মেয়েশিশুদের পড়াশোনায় চরম বিঘ্ন ঘটছে এবং অনেক ক্ষেত্রে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। আর বৃষ্টি-বাদলার দিনে শিক্ষকদের অনুপস্থিতিতে বলার কিছু থাকে না। বাইরের শিক্ষকরাও সময়মতো গ্রামে পৌঁছাতে পারেন না। ফলে পড়ালেখার মানোন্নয়নে বেশ বেগ পোহাতে হচ্ছে।

প্রায় ৪ হাজার জনগোষ্ঠীর মহিষারকান্দি গ্রামটিতে রয়েছে একটি ভোটকেন্দ্র। একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য ভোটকেন্দ্রের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ, নিরাপদ ও সুগম হওয়া অপরিহার্য। অথচ প্রায় ২ হাজার ভোটারদের অনেক কষ্টে ভোটকেন্দ্রে আসা-যাওয়া করতে হয়। সেইসাথে ভোটকেন্দ্রে যে-কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলা ও উদ্ধার কাজের জন্য ভোটকেন্দ্রের বাইরে অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস বা জরুরি গাড়ি চলাচলের নেই পাকা সড়ক যোগাযোগের কোনো বালাই।

মহিষারকান্দি গ্রামটিতে হজরত মাওলানা মতলেব উদ্দিন আনোয়ারী (রহ.) নামের একজন আধ্যাত্মিক সুফি সাধক বা ওলি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। ঐতিহ্যগতভাবে ওলি-আউলিয়া ও পীর-মাশায়েখদের স্মৃতিবিজড়িত এই গ্রামের পরিচিতি ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডলে অত্যন্ত সমাদৃত। সেখানে রয়েছে তাঁর মাজার ও খানকাহ শরিফ। এতে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হওয়া ওরস মোবারক ও ওয়াজ মাহফিলে সমবেত হয় লাখো ভক্ত ও মুরিদেরা। কিন্তু পাকা সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার অভাবে চরম ভোগান্তির ইয়ত্তা নেই।

এদিকে খালের ওপর কোনো পাকা সেতু না থাকায় নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোই পারাপারের একমাত্র ভরসা, যা পার হতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। এতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ঝুঁকিতে পারাপার করছে এবং নারী-শিশুসহ জনজীবন স্থবিরতার মধ্য দিয়ে কোনোমতে চলছে।

অন্যদিকে মহিষারকান্দি গ্রামটি সম্ভাবনাময় গ্রাম হওয়া সত্ত্বেও ভগ্ন কাচা রাস্তার পরিণামে সেখানে কোনো ধরনের খামার, ক্ষুদ্র শিল্প-কারখানা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঠিকঠাকভাবে গড়ে উঠতে পারছে না। এতে দিন দিন বেকারত্ব ও দারিদ্র্যতা বাড়ছে। পাশাপাশি দুর্যোগ বা বন্যা-পরবর্তী সময়ে দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে সরকারি বা বেসরকারি ত্রাণ সহায়তা সহজে পৌঁছাতে পারে না।

সামগ্রিকভাবে, একটি উন্নত ও প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন মহিষারকান্দি গ্রামটি মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে যুগের পর যুগ পিছিয়েই পড়ে থাকছে। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা না থাকায় সেখানে পৌঁছায় না কোনো শহর-বন্দরে বিনিয়োগ বা আধুনিকতার ছোঁয়া। ফলে যুগের পর যুগ গ্রামটি রয়ে গেছে অর্থনৈতিকভাবেও দৈন্য পীড়িত।

পাকা সড়ক ও সেতুর অভাবে শুধু যাতায়াতের পথ নয়, এটি মহিষারকান্দি গ্রামের অগণিত মানুষের পিছিয়ে পড়া জীবন ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার এক জীবন্ত দলিল যেন।

অথচ দেশের জনসংখ্যার সিংহভাগ মানুষের আবাসস্থল গ্রামে। গ্রামের কৃষকেরাই দেশের মূল চালিকাশক্তি, যারা খাদ্য উৎপাদন করে কোটি মানুষের মুখে খাবার তুলে দেন।

ঢাকাতে বসবাসরত মহিষারকান্দি গ্রামের প্রকৌশলী মো. এনায়েতুর রহমানের ফেসবুকের এক পোস্ট থেকে জানা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মোট ২১ বছরের শাসনামলে এই গ্রামের দুজন কৃতি সন্তান প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান শাহজাহান এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মো. জিল্লুর রহমান ৫ বছর করে উপজেলা চেয়ারম্যান এবং জিল্লুর রহমান ১৫ বছর জেলা পরিষদের মনোনীত প্রশাসক/ নির্বাচিত চেয়ারাম্যান থাকার পরও শুধু উপজেলা সদরের বাজার সংলগ্ন নতুনহাটি/বেড়িবাঁধের খালপাড় থেকে মাত্র আধা-কিলোমিটার কাঁচা সড়কটি পাকা হলো না কেবল স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের দলীয় কোন্দলের কারণে।

একই পোস্টে জানা যায়, এই আধা-কিলোমিটার এলজিইডি’র তালিকাভুক্ত কাঁচা সড়কটি প্রশস্ত ও পাকা করার জন্য বিভিন্ন অর্থবছরে প্রায় এক কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও কাজ না হওয়ায় অর্থ ফেরত যায়।

প্রকৌশলী এনায়েতুর রহমান লেখেন, গত অর্থ বছরে ইউনিয়ন পরিষদের কোনো এক বাজেট থেকে স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বারের মাধ্যমে কিছু মাটি ভরাট করা হয়। কিন্তু এর সাথে আরসিসি ওয়াল দিয়ে রাস্তাটি পাকা না হওয়ায় গত বর্ষায় রাস্তার মাটি পাশের ফসলের জমিতে ছড়িয়ে পড়েছে এবং বৃষ্টিতে রাস্তাটি আরও কর্দমাক্ত হয়ে পায়ে হাটা, সাইকেল, মটরবাইক ও ইজিবাইকে চলাচলও দুষ্কর হয়ে পড়েছে।

কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান তার এক ফেসবুক পোস্টে মন্তব্য করে লিখেছেন, সমস‍্যার গভীরে গেলে এক অবাক অথচ চিরাচরিত নিয়ম দেখতে পাওয়া যায়। প্রতিহিংসার শিকার মহিষারকান্দি গ্রামটি।

তিনি লেখেন, ভোটের রাজনীতি গ্রামটিকে উন্নত হতে দেয়নি। অবশ্য এতে গ্রামবাসীদেরও কিছুটা দায় রয়েছে। তাদের দূরদর্শিতার অভাব এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।

তিনি আরও লেখেন, স্রোতের বিপরীতে গিয়ে বেশি-কিছু আশা করাও ঠিক নয়। এছাড়া এত বেশি দলাদলি গ্রামটিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে দেয়নি। ফলশ্রুতিতে এর অপঘাত সবাইকেই ভোগতে হয়েছে এবং হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পল্লব হাসান লেখেন, এই গ্রামের মানুষ পালাক্রমে ক্ষমতাকে বৃদ্ধাংগুলি দেখিয়ে উলটা পথে হেঁটেছে; ভোটের সময় স্রোতের উজানে চলেছে। এখন কর্মফল ভোগ করছে সবাই।

চাকরিজীবী মাহফুজুর রহমান বলেন, মহিষারকান্দি গ্রামটি গ্রামীণ ও জাতীয় অর্থনীতিতে বেশ অবদান রাখলেও যোগাযোগব্যবস্থা-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চির অবহেলিত ও বঞ্চিত। রাজনৈতিক মতাদর্শ উন্নয়নে বাধা হওয়া বা বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত রাখা কোনোমতেই সমীচীন নয়।

একটি শক্তিশালী ও টেকসই সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণশক্তি। তদ্রূপ মহিষারকান্দি গ্রামের বেলায় আরও বেশি প্রযোজ্য। সেখানে আধুনিক ও উন্নত সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা স্থাপিত হলে গ্রামীণ ও জাতীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, কৃষির প্রসার ঘটবে। এছাড়াও –

১. কৃষিপণ্য ও শ্রমের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্রামীণ উদ্যোক্তা তৈরি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামগ্রিক দারিদ্র্য বিমোচনে সরাসরি ভূমিকা রাখবে।

২. কৃষক তাঁদের উৎপাদিত ধান, রবিশস্য, সবজি, মাছ ও ফলমূল দ্রুত এবং কম খরচে স্থানীয় হাট-বাজার বা শহর-বন্দরে পাইকারি বাজারে পৌঁছাতে পারবেন। এতে পণ্যের অপচয় রোধ হবে এবং কৃষকেরা মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে সরাসরি ন্যায্যমূল্য পাবেন।

৩. গ্রামীণ যোগাযোগ সহজ হলে প্রত্যন্ত গ্রামটিতে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি, সার ও উন্নত বীজ সরবরাহ করা সহজ হবে। পাশাপাশি পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খামারের মতো অকৃষি উদ্যোগগুলোও দ্রুত চালু ও বিকশিত হতে পারবে।

৪. সড়ক নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিবহন খাতে প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এছাড়াও যাতায়াতব্যবস্থা সহজ হওয়ায় গ্রামের মানুষ সহজেই নিকটবর্তী উপজেলা সদরে, শহর বা বাণিজ্যিক কেন্দ্রে কাজ করার সুযোগ পাবেন।

৫. ভালো যোগাযোগের ব্যবস্থা হলে মহিষারকান্দি গ্রামের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ঠিকমত গড়ে উঠবে। উৎপাদিত পণ্য দেশের শহর-বন্দরে সরবরাহের সুযোগ তৈরি হয়ে গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের আর্থিক সক্ষমতাও বেড়ে যাবে।

৬. উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা করা হলে দূরবর্তী শিক্ষার্থীরা সহজেই স্কুল-কলেজ-মাদ্রসায় যাতায়াত করতে পারবে, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার কমবে এবং শিক্ষার হার বেড়ে তা প্রসার ঘটবে।

৭. উন্নত রাস্তা হলে গ্রামে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসক ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা-সহ প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ সহায়তা সহজে পৌঁছানো সম্ভব হবে। যার ফলে গ্রামীণ মানবসম্পদ উন্নয়নের পথ সুগম হবে।

৮. যাতায়াত ব্যবস্থা নিরাপদ ও উন্নত হলে গ্রামটির নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণ বা অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি সেবা গ্রহণের হার বহুলাংশে বেড়ে যাবে।

৯. উন্নত পাকা সড়ক হলে সড়কের দুপাশে নতুন হাট-বাজার ও দোকানপাট গড়ে উঠবে, যা স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মহিষারকান্দি গ্রামের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে।

১০. উন্নত গ্রামীণ সড়ক নেটওয়ার্ক শহর ও গ্রামের মধ্যকার অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস করে টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে বর্ধিষ্ণু মহিষারকান্দি গ্রামটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারবে।

অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একটি বড় সত্য হলো, আমাদের দেশ এখনো গ্রামের ওপর ভর করে আছে। দেশের প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ বসবাস করে গ্রামে; আর তাঁদের জীবনধারা, কর্মসংস্থান ও আয় নির্ভর করে কৃষি, মৎস্য, পশুপালন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও শ্রমবাজারের ওপর। অথচ দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা শহরমুখীই থেকে গেছে, গ্রামীণ অর্থনীতি রয়ে গেছে নীতিনির্ধারকদের নখদর্পণে নয়, বরং প্রান্তে। আমরা শয়ে শয়ে পাকা সড়ক ও অলওয়েদার সড়ক গড়ে তুলছি, শহরকেন্দ্রিক উপজেলা গড়ে তুলছি, পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে শহরে। কিন্তু এগিয়ে যাওয়ার রসদ যে গ্রাম থেকে গড়ে উঠছে তা নিয়ে কয়জন ভেবেছেন?

ভাবতে না চাইলেও ভাবতে হয়, নিয়তি আমাদের শিকড়ের কাছেই টেনে নিয়ে যায়। তবুও স্থানীয় পর্যায়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর – এলজিইডি’র মতো সংস্থাগুলো এই অবকাঠামো উন্নয়নে নিরলস কাজ করে গেলেও মহিষারকান্দি গ্রামটির প্রতি বরাবরই উদাসীন থেকেছে।

উন্নত সড়ক ও নৌ-যোগাযোগ হাওরের গ্রামীণ অর্থনীতি এগিয়ে যাওয়ার পথের সারথি হতে পারে। এখানেই হাওরাঞ্চলের সত্যিকারের অর্থনৈতিক মুক্তির বীজ লুকিয়ে আছে। শহর নয়, দেশের পুনর্জাগরণ শুরু হবে গ্রাম থেকে – যেখানে একজন কৃষক, একজন জেলে কিংবা একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।

গ্রাম হলো বাংলাদেশের জনবসতির ক্ষুদ্রতম একটি একক। এজন্য দরকার জাতীয় অগ্রাধিকারে গ্রামীণ উন্নয়নকে স্থান দেওয়া, অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং সব ধরনের ভেদাভেদ ছাড়িয়ে একটি বাস্তববাদী ও মানবিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।

তাই সরকার তথা জনপ্রতিনিধির এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ উদ্যোগে মহিষারকান্দি গ্রামীণ জনপদের টেকসই অবকাঠামো গঠনে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য কাঁচা রাস্তা পাকাকরণ, পর্যাপ্ত ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি টেকসই উন্নয়নে কৃষি আধুনিকায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা-স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মানোন্নয়ন জরুরি।

লেখক: সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা