ঢাকা ০১:২৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম

ঈদ ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান উন্নতি এনেছে সরকারের ১০ উদ্যোগ : প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৯:১২:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ জুন ২০২৬
  • ২ বার

ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে সরকারের নেওয়া ১০টি জনমুখী উদ্যোগ ঈদ ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে এবং জবাবদিহিতামূলক ও জনকল্যাণমুখী প্রশাসনের প্রতিফলন ঘটিয়েছে বলে জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

আজ সোমবার (১ জুন) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের করবী হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এ কথা জানান।

মাহদী আমিন বলেন, এবারের ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে সরকারের কার্যক্রমে ১০টি গণমুখী বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় ঈদ উদযাপন নির্বিঘ্ন করতে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে জানান তিনি।

মাহদী আমিন আরও বলেন, নির্বিঘ্ন ঈদযাত্রা নিশ্চিতকরণ, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ, দেশীয় পশুর বাজার সুরক্ষা, দ্রুত বর্জ্য অপসারণ, গণপরিবহণে শৃঙ্খলা, চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট দমন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, চামড়া খাতের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা ছিল প্রধানমন্ত্রীর অন্যতম নির্দেশনা।

এসব উদ্যোগের সমন্বিত বাস্তবায়ন ঈদ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন এনে দিয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় সেবাকে আরও জনসম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টার প্রতিফলন ঘটিয়েছে বলে দাবি করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ মুখপাত্র।

মাহদী আমিন বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের মাত্র তিন মাস পূর্ণ হয়েছে। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই আমরা রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, সুশাসন, জনকল্যাণ এবং মানুষের প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসই একটি সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি।

মাহদী আমিন আরও বলেন, ফ্যাসিবাদী ১৬ বছরের প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় ও ধ্বংসস্তূপ মাত্র তিন মাসে সম্পূর্ণরূপে দূর করা সম্ভব নয়, এই কঠিন বাস্তবতা দেশবাসী অনুধাবন করে। তবু দীর্ঘদিনের দুঃশাসনে ক্লান্ত জনগণ এবারের ঈদে উপলব্ধি করেছে যে, রাষ্ট্র তাদের প্রতি সংবেদনশীল এবং প্রশাসন কেবল ক্ষমতার কেন্দ্র নয়, বরং জনসেবার কার্যকর ও দায়িত্বশীল মাধ্যম।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অনুষ্ঠিত প্রথম ঈদুল আজহা উদযাপনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সরকারের সব মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা, সংসদ সদস্যসহ সব মহলে আন্তরিকতা ও দায়বদ্ধতা ছিল সর্বোচ্চ। তবু কোথাও কোনো প্রশাসনিক ঘাটতি বা সমন্বয়হীনতা পরিলক্ষিত হলে তা চিহ্নিত করে দ্রুত ও কার্যকরভাবে নিরসনে সরকার কাজ চালিয়ে যাবে বলে জানান তিনি।

ঈদযাত্রা ও ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে সমন্বয় করে সরকারি ছুটি এক সপ্তাহ পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। ফলে সরকারি উদ্যোগেই পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে আমরা এবার ছুটিতে কিছুটা বেশি সময় থাকতে পেরেছি। ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে ও সার্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সার্বক্ষণিক মনিটরিং ও বিশেষ ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা হয়েছে। যে কারণে ঈদের আগের দিনগুলোতে মহাসড়কে একযোগে যানবাহনের চাপ অনেকটাই কমে এসেছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, প্রতিবছরের চেনা ছবি, কিলোমিটারের পর কিলোমিটার যানজট এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভোগান্তি, এবারের ঈদযাত্রায় তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে ছিল। তারপরও যতটুকু হয়েছে, সরকার সচেষ্ট থাকবে আগামীতে সেটারও সমাধানের জন্য।

মাহদী আমিন বলেন, এবার সামগ্রিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা যথেষ্ট উন্নতি এবং অতীতের তুলনায় সড়ক দুর্ঘটনা কম হলেও, এর আড়ালে কিছু পরিবারের ঈদ আনন্দ রূপ নিয়েছে আজীবনের কান্নায়। প্রশাসনের নজরদারি সত্ত্বেও মহাসড়কে বেপরোয়া গতি আর অসচেতনতার জেরে এবারও বেশ কিছু মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে, কেড়ে নিয়েছে তাজা প্রাণ। ঘটনাগুলো আমাদেরকে প্রচণ্ডভাবে ব্যথিত করেছে। ভবিষ্যতের যেকোনো উৎসবে যেকোনো মূল্যে জনসচেতনতা বাড়িয়ে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই হবে বলে এ সময় মন্তব্য করেন তিনি।

পোশাক খাতের শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধের বিষয়ে মাহদী আমিন বলেন, তৈরি পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন খাতের শ্রমিকদের ঈদের আগে বকেয়া বেতন ও বোনাস নিশ্চিত করতে সরকারের উদ্যোগে সব ব্যাংক এবং অংশীজনদের সঙ্গে কথা বলে কারখানার শ্রমিক, মালিক ও বিভিন্ন সংগঠনকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন কৌশল ও পরিকল্পনায় একটি সুষ্ঠু, সুন্দর ও আনন্দঘন পরিবেশে শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের ঈদ আনন্দ নিশ্চিত করা হয়েছে।

মাহদী আমিন আরও বলেন, এর ফলে ঈদের ঠিক আগে বকেয়া বেতনের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ বা শিল্পাঞ্চলে সেই রকম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়নি, যা ছিল বিগত সময়ের নিয়মিত ঘটনা। প্রায় সব কারখানায় সময়মতো শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ সম্ভব হয়েছে, নিশ্চিত করা হয়েছে উৎসবমুখর ঈদের পরিবেশ। এর ফলে দেশের শিল্পাঞ্চলজুড়ে বিরাজ করেছে শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও উৎসবমুখর পরিবেশ।

দেশীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে পশু প্রবেশ ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল উল্লেখ করে মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, ভারতীয় গরুর অবৈধ প্রবেশ বন্ধ এবং দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে থাকায় দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা স্বস্তির সঙ্গে ব্যাবসা পরিচালনার সুযোগ পেয়েছেন। পশুর হাটগুলোতেও ছিল সার্বক্ষণিক মনিটরিং ব্যবস্থা। বাজারে দেশি গরু, ছাগল, মহিষ ও ভেড়ার পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় দেশজুড়ে কোরবানির পশুর সংকট তৈরি হয়নি।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, দেশের অধিকাংশ প্রান্তিক খামারি ও গৃহস্থ পশুর ন্যায্যমূল্য পেয়েছেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে বাজারে চাহিদার তুলনায় পশুর সরবরাহ বেশি থাকায়, শেষের দিকে কিছু প্রান্তিক খামারি প্রত্যাশিত মূল্যে পশু বিক্রি করতে পারেননি। সরকারের দৃষ্টিও এ বিষয়টি এড়িয়ে যায়নি। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিদের স্বার্থ সংরক্ষণ, বাজার ব্যবস্থাপনার আরও উন্নয়ন এবং ভবিষ্যতে তাদের ন্যায্য অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, ঈদের পর ঢাকায় অধিকাংশ কোরবানির বর্জ্য ৮ থেকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে অপসারণ করা হয়েছে, যা অতীতের তুলনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি।

গণপরিবহন খাতের ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, এবারের ঈদযাত্রায় কোনো ধরনের অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ঘটনা ঘটেনি, বরং লঞ্চে সরকার নির্ধারিত ভাড়া রুট ভেদে ৫-৮ শতাংশ ডিসকাউন্টের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ন্যায্য ভাড়া ও হয়রানিমুক্ত যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের অভূতপূর্ব ভূমিকা ছিল জোরালো ও সাহসী।

মাহদী আমিন আরও বলেন, পশুবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজি রোধে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যকর ও শক্ত ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে পশুর হাটে ইজারা বহির্ভূত চাঁদা আদায় বন্ধেও কঠোর অবস্থানে ছিল। মহাসড়কে পশুবাহী গাড়ি থামিয়ে চাঁদাবাজির ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করায় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়নি, মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের প্ররোচনায় অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়েনি এবং সাধারণ ক্রেতারা তুলনামূলক স্থিতিশীল দামে পশু কিনতে পেরেছেন।

লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, উৎপাদনে বহু বছরের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও এই তীব্র গরমের মধ্যেও ঈদের দিন এবং পরবর্তী দিনগুলোতে দেশের সিংহভাগ এলাকায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে। একটি সমন্বিত ও কার্যকর বিদ্যুৎ পরিকল্পনা গ্রাহক পর্যায়ে বাস্তবতার আলোকে কিছুটা স্বস্তি এনেছে। পুরো বিদ্যুৎ খাতকে আরও সেবামুখী ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির সব উৎস ব্যবহারে সচেষ্ট রয়েছে বলে জানান তিনি।

সামাজিক সংবেদনশীলতা ও জননিরাপত্তা নিয়ে মাহদী আমিন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া কোরবানি-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্পর্শকাতর বিষয় বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর কঠোর নজরদারি জোরদার করা হয়েছিল। ঈদুল আজহার দিন বা এই ছুটিতে উল্লেখযোগ্য সামাজিক সংঘাত বা নৈরাজ্যজনক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

চামড়া শিল্প ব্যবস্থাপনার বিষয়ে মাহদী আমিন বলেন, কোরবানির মৌসুমে চামড়ার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। চামড়া কেনাবেচায় সিন্ডিকেট বা কারসাজি যাতে না ঘটে, সেজন্য মাঠপর্যায়ে তদারকি ও তথ্য অনুসন্ধান অব্যাহত রাখা হয়েছে। কোথাও কোথাও চামড়া অবিক্রিত থাকার তথ্য পাওয়া গেলেও তা সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় অনেক কম। সরকার ভবিষ্যতে কোরবানির পশুর চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের ব্যাপারে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারের পদক্ষেপের বিষয়ে মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপ থাকা সত্ত্বেও উৎসবের সুযোগ নিয়ে খুচরা বাজারে যেভাবে হঠাৎ দাম আকাশচুম্বী করা হতো, এবার সরকারি নজরদারির কারণে তা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা গেছে। উৎপাদনকারী, আমদানিকারক, সরকারি-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে প্রান্তিক মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মাঝে রাখার জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর স্পিচ রাইটার এস এ এম মাহফুজুর রহমান, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, উপ-প্রেস সচিব-১ জনাব জাহিদুল ইসলাম রনি ও মো. সুজন মাহমুদ এবং সহকারী প্রেস সচিব কে এম নাজমুল হক ও আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ শাহরিয়ার পামির প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

আকাশে দেখা যাবে বিশেষ পূর্ণিমা, যে কারণে এটাকে বলা হয় ব্লু মুন

ঈদ ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান উন্নতি এনেছে সরকারের ১০ উদ্যোগ : প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

আপডেট টাইম : ০৯:১২:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ জুন ২০২৬

ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে সরকারের নেওয়া ১০টি জনমুখী উদ্যোগ ঈদ ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে এবং জবাবদিহিতামূলক ও জনকল্যাণমুখী প্রশাসনের প্রতিফলন ঘটিয়েছে বলে জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

আজ সোমবার (১ জুন) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের করবী হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এ কথা জানান।

মাহদী আমিন বলেন, এবারের ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে সরকারের কার্যক্রমে ১০টি গণমুখী বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় ঈদ উদযাপন নির্বিঘ্ন করতে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে জানান তিনি।

মাহদী আমিন আরও বলেন, নির্বিঘ্ন ঈদযাত্রা নিশ্চিতকরণ, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ, দেশীয় পশুর বাজার সুরক্ষা, দ্রুত বর্জ্য অপসারণ, গণপরিবহণে শৃঙ্খলা, চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট দমন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, চামড়া খাতের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা ছিল প্রধানমন্ত্রীর অন্যতম নির্দেশনা।

এসব উদ্যোগের সমন্বিত বাস্তবায়ন ঈদ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন এনে দিয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় সেবাকে আরও জনসম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টার প্রতিফলন ঘটিয়েছে বলে দাবি করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ মুখপাত্র।

মাহদী আমিন বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের মাত্র তিন মাস পূর্ণ হয়েছে। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই আমরা রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, সুশাসন, জনকল্যাণ এবং মানুষের প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসই একটি সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি।

মাহদী আমিন আরও বলেন, ফ্যাসিবাদী ১৬ বছরের প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় ও ধ্বংসস্তূপ মাত্র তিন মাসে সম্পূর্ণরূপে দূর করা সম্ভব নয়, এই কঠিন বাস্তবতা দেশবাসী অনুধাবন করে। তবু দীর্ঘদিনের দুঃশাসনে ক্লান্ত জনগণ এবারের ঈদে উপলব্ধি করেছে যে, রাষ্ট্র তাদের প্রতি সংবেদনশীল এবং প্রশাসন কেবল ক্ষমতার কেন্দ্র নয়, বরং জনসেবার কার্যকর ও দায়িত্বশীল মাধ্যম।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অনুষ্ঠিত প্রথম ঈদুল আজহা উদযাপনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সরকারের সব মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা, সংসদ সদস্যসহ সব মহলে আন্তরিকতা ও দায়বদ্ধতা ছিল সর্বোচ্চ। তবু কোথাও কোনো প্রশাসনিক ঘাটতি বা সমন্বয়হীনতা পরিলক্ষিত হলে তা চিহ্নিত করে দ্রুত ও কার্যকরভাবে নিরসনে সরকার কাজ চালিয়ে যাবে বলে জানান তিনি।

ঈদযাত্রা ও ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে সমন্বয় করে সরকারি ছুটি এক সপ্তাহ পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। ফলে সরকারি উদ্যোগেই পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে আমরা এবার ছুটিতে কিছুটা বেশি সময় থাকতে পেরেছি। ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে ও সার্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সার্বক্ষণিক মনিটরিং ও বিশেষ ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা হয়েছে। যে কারণে ঈদের আগের দিনগুলোতে মহাসড়কে একযোগে যানবাহনের চাপ অনেকটাই কমে এসেছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, প্রতিবছরের চেনা ছবি, কিলোমিটারের পর কিলোমিটার যানজট এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভোগান্তি, এবারের ঈদযাত্রায় তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে ছিল। তারপরও যতটুকু হয়েছে, সরকার সচেষ্ট থাকবে আগামীতে সেটারও সমাধানের জন্য।

মাহদী আমিন বলেন, এবার সামগ্রিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা যথেষ্ট উন্নতি এবং অতীতের তুলনায় সড়ক দুর্ঘটনা কম হলেও, এর আড়ালে কিছু পরিবারের ঈদ আনন্দ রূপ নিয়েছে আজীবনের কান্নায়। প্রশাসনের নজরদারি সত্ত্বেও মহাসড়কে বেপরোয়া গতি আর অসচেতনতার জেরে এবারও বেশ কিছু মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে, কেড়ে নিয়েছে তাজা প্রাণ। ঘটনাগুলো আমাদেরকে প্রচণ্ডভাবে ব্যথিত করেছে। ভবিষ্যতের যেকোনো উৎসবে যেকোনো মূল্যে জনসচেতনতা বাড়িয়ে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই হবে বলে এ সময় মন্তব্য করেন তিনি।

পোশাক খাতের শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধের বিষয়ে মাহদী আমিন বলেন, তৈরি পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন খাতের শ্রমিকদের ঈদের আগে বকেয়া বেতন ও বোনাস নিশ্চিত করতে সরকারের উদ্যোগে সব ব্যাংক এবং অংশীজনদের সঙ্গে কথা বলে কারখানার শ্রমিক, মালিক ও বিভিন্ন সংগঠনকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন কৌশল ও পরিকল্পনায় একটি সুষ্ঠু, সুন্দর ও আনন্দঘন পরিবেশে শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের ঈদ আনন্দ নিশ্চিত করা হয়েছে।

মাহদী আমিন আরও বলেন, এর ফলে ঈদের ঠিক আগে বকেয়া বেতনের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ বা শিল্পাঞ্চলে সেই রকম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়নি, যা ছিল বিগত সময়ের নিয়মিত ঘটনা। প্রায় সব কারখানায় সময়মতো শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ সম্ভব হয়েছে, নিশ্চিত করা হয়েছে উৎসবমুখর ঈদের পরিবেশ। এর ফলে দেশের শিল্পাঞ্চলজুড়ে বিরাজ করেছে শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও উৎসবমুখর পরিবেশ।

দেশীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে পশু প্রবেশ ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল উল্লেখ করে মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, ভারতীয় গরুর অবৈধ প্রবেশ বন্ধ এবং দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে থাকায় দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা স্বস্তির সঙ্গে ব্যাবসা পরিচালনার সুযোগ পেয়েছেন। পশুর হাটগুলোতেও ছিল সার্বক্ষণিক মনিটরিং ব্যবস্থা। বাজারে দেশি গরু, ছাগল, মহিষ ও ভেড়ার পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় দেশজুড়ে কোরবানির পশুর সংকট তৈরি হয়নি।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, দেশের অধিকাংশ প্রান্তিক খামারি ও গৃহস্থ পশুর ন্যায্যমূল্য পেয়েছেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে বাজারে চাহিদার তুলনায় পশুর সরবরাহ বেশি থাকায়, শেষের দিকে কিছু প্রান্তিক খামারি প্রত্যাশিত মূল্যে পশু বিক্রি করতে পারেননি। সরকারের দৃষ্টিও এ বিষয়টি এড়িয়ে যায়নি। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিদের স্বার্থ সংরক্ষণ, বাজার ব্যবস্থাপনার আরও উন্নয়ন এবং ভবিষ্যতে তাদের ন্যায্য অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, ঈদের পর ঢাকায় অধিকাংশ কোরবানির বর্জ্য ৮ থেকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে অপসারণ করা হয়েছে, যা অতীতের তুলনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি।

গণপরিবহন খাতের ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, এবারের ঈদযাত্রায় কোনো ধরনের অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ঘটনা ঘটেনি, বরং লঞ্চে সরকার নির্ধারিত ভাড়া রুট ভেদে ৫-৮ শতাংশ ডিসকাউন্টের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ন্যায্য ভাড়া ও হয়রানিমুক্ত যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের অভূতপূর্ব ভূমিকা ছিল জোরালো ও সাহসী।

মাহদী আমিন আরও বলেন, পশুবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজি রোধে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যকর ও শক্ত ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে পশুর হাটে ইজারা বহির্ভূত চাঁদা আদায় বন্ধেও কঠোর অবস্থানে ছিল। মহাসড়কে পশুবাহী গাড়ি থামিয়ে চাঁদাবাজির ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করায় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়নি, মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের প্ররোচনায় অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়েনি এবং সাধারণ ক্রেতারা তুলনামূলক স্থিতিশীল দামে পশু কিনতে পেরেছেন।

লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, উৎপাদনে বহু বছরের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও এই তীব্র গরমের মধ্যেও ঈদের দিন এবং পরবর্তী দিনগুলোতে দেশের সিংহভাগ এলাকায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে। একটি সমন্বিত ও কার্যকর বিদ্যুৎ পরিকল্পনা গ্রাহক পর্যায়ে বাস্তবতার আলোকে কিছুটা স্বস্তি এনেছে। পুরো বিদ্যুৎ খাতকে আরও সেবামুখী ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির সব উৎস ব্যবহারে সচেষ্ট রয়েছে বলে জানান তিনি।

সামাজিক সংবেদনশীলতা ও জননিরাপত্তা নিয়ে মাহদী আমিন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া কোরবানি-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্পর্শকাতর বিষয় বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর কঠোর নজরদারি জোরদার করা হয়েছিল। ঈদুল আজহার দিন বা এই ছুটিতে উল্লেখযোগ্য সামাজিক সংঘাত বা নৈরাজ্যজনক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

চামড়া শিল্প ব্যবস্থাপনার বিষয়ে মাহদী আমিন বলেন, কোরবানির মৌসুমে চামড়ার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। চামড়া কেনাবেচায় সিন্ডিকেট বা কারসাজি যাতে না ঘটে, সেজন্য মাঠপর্যায়ে তদারকি ও তথ্য অনুসন্ধান অব্যাহত রাখা হয়েছে। কোথাও কোথাও চামড়া অবিক্রিত থাকার তথ্য পাওয়া গেলেও তা সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় অনেক কম। সরকার ভবিষ্যতে কোরবানির পশুর চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের ব্যাপারে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারের পদক্ষেপের বিষয়ে মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপ থাকা সত্ত্বেও উৎসবের সুযোগ নিয়ে খুচরা বাজারে যেভাবে হঠাৎ দাম আকাশচুম্বী করা হতো, এবার সরকারি নজরদারির কারণে তা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা গেছে। উৎপাদনকারী, আমদানিকারক, সরকারি-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে প্রান্তিক মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মাঝে রাখার জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর স্পিচ রাইটার এস এ এম মাহফুজুর রহমান, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, উপ-প্রেস সচিব-১ জনাব জাহিদুল ইসলাম রনি ও মো. সুজন মাহমুদ এবং সহকারী প্রেস সচিব কে এম নাজমুল হক ও আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ শাহরিয়ার পামির প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।