ঢাকা ০৪:১২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তিতে নিজেদের বিজয় দেখছেন ইরানিরা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:১২:১৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
  • ৯ বার

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং আঞ্চলিক কূটনীতিকরা যখন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ-সমাপ্তির একটি চুক্তির সম্ভাবনার কথা জোরেশোরে ঘোষণা করছেন, তখন এর জবাবে নিজেদের ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে একটি ব্যাখ্যা দিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। খবর নিউইয়র্ক টাইমসের।

মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ইরানের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে খোদাই করা একটি বিখ্যাত ভাস্কর্যের ছবি পোস্ট করেন, যেখানে প্রাচীন ইরানি সাম্রাজ্য সাসানীয় রাজার কাছে একজন রোমান সম্রাটকে বশ্যতা স্বীকার করে মাথানত করতে দেখা যায়।

ওয়াশিংটনের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির প্রতি ইঙ্গিত করে ইসমাইল বাঘাই লেখেন, রোমানদের মনে রোম ছিল বিশ্বের অনস্বীকার্য কেন্দ্র। ইরানিরা সেই ভ্রান্ত ধারণা ভেঙে দিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে ইরানকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হতে হলেও, দেশটির নেতারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য প্রাথমিক চুক্তির ঘোষিত শর্তগুলোকে বিজয় হিসেবেই দেখছেন।

শনিবার (২৩ মে) মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা ঘোষণা করেছেন, দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তির প্রাথমিক কাঠামো নিয়ে মূলত আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে, যদিও তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। প্রস্তাবে কী আছে তার বিস্তারিত বিবরণ অস্পষ্ট, যদিও ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে লেখেন, এই চুক্তির অংশ হিসেবে তেল ও গ্যাস পরিবহণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে।

আলোচনার মাধ্যমে ইরান কতটুকু সুবিধা অর্জন করতে পেরেছে, তা কেবল শর্তগুলো জানা গেলেই নিশ্চিত হওয়া যাবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশটির হাতে এই ফলাফলকে বিজয় হিসেবে তুলে ধরার ভালো সুযোগ থাকবে। দুই মাস আগে, ট্রাম্প অঙ্গীকার করেছিলেন—‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ ছাড়া ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হবে না। এর বিপরীতে বর্তমানে ওয়াশিংটনকে দেখে মনে হচ্ছে, তারা ইরানের বারবার দাবি করা আসা ‘অচলাবস্থা অবসানের একমাত্র উপায় আলোচনা, যুদ্ধ নয়’, তা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে।

ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশনসের ‘ইরান নিউক্লিয়ার মনিটর’ এর বিশ্লেষক ও লেখক এলি গেরানমায়েহ বলেন, অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ইরান প্রমাণ করেছে, তারা দুটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশকে মোকাবিলা করতে সক্ষম।

হরমুজ প্রণালিতে আধিপত্যের কারণে ইরান এখন আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সামনে এসেছে। তারা এটাও দেখিয়ে দিয়েছে, ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের পারমাণবিক সংকট সামরিক শক্তির মাধ্যমে সমাধান হবে না।

তুলনামূলকভাবে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় উচ্চাকাঙ্ক্ষাগুলোর বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি বলেই মনে হচ্ছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এবং শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের হত্যার পরেও দেশটির ধর্মীয় শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করতে পারেনি।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক চুক্তি সম্পর্কে যা জানা গেছে, তা হলো ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অথবা তাদের সহযোগী সশস্ত্র বাহিনীগুলোর আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক দমনের কোনো শর্ত এতে উল্লেখ নেই। এ ছাড়া ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত করতে বা পারমাণবিক অস্ত্রে রূপান্তরিত হতে পারে এমন উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত অপসারণ করতে কী ধরনের প্রতিশ্রুতি দেবে এবং কী সময়সীমা দেবে, তা-ও অস্পষ্ট। এই ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা দ্বিতীয় পর্যায়ে গড়াতে পারে।

ইরান সম্পর্কিত বিশ্লেষক ও আঞ্চলিক সংবাদ পোর্টাল আমওয়াজ.মিডিয়ার সম্পাদক মোহাম্মদ আলী শাবানি বলেছেন, কিছু দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্য বিজয় দাবি করা সহজ, কারণ বিজয়ের সংজ্ঞাগুলো খুবই একপেশে। তবে তিনি বলেন, কৌশলগত প্রতিরোধ প্রদর্শনের ক্ষেত্রে ইরানের নতুন করে আত্মবিশ্বাসী হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

শাবানি বলেন, বছরের পর বছর ধরে ইরানের পূর্ববর্তী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলায় সতর্ক হয়ে উঠেছিলেন। যদিও তিনি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলার প্রথম দিনে গোলাবর্ষণে নিহত হন।

এবারের যুদ্ধে ইরানের নতুন নেতারা আগ্রাসী পন্থা অবলম্বনের আগ্রহ দেখিয়েছেন। যদিও এ পন্থা নিতে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি অনিচ্ছুক ছিলেন বলে ধারণা করা যায়। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রেখেছে, তবে এর ফলে দেশটির জাহাজগুলোও অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া ইরান প্রতিবেশী, অর্থাৎ উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান আঞ্চলিক মিত্র, সেসব দেশের ওপর বোমাবর্ষণ করেছে। তবে এসব দেশের সঙ্গে তেহরান আগে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চেয়েছিল।

শাবানি আরও বলেন, প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার ছেলে ও উত্তরাধিকারী মোজতবা খামেনিসহ ইরানের নতুন নেতারা সেই ভবিষ্যতের অনুমান-নির্ভর স্বভাব দূর করেছেন। এর পরিবর্তে তারা দেখিয়েছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে নামতে পারে এবং দেশটি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে না। প্রকৃতপক্ষে, ইরান প্রতিরোধ করতে পারে। প্রতিরোধ করে বিশ্ব অর্থনীতিতে এতটাই ক্ষতিসাধন করতে পারে, এতটাই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে, যার মাধ্যমে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে একটি চুক্তিতে আসতে বাধ্য করতে পারে।

ইরান এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কবলে পড়েছে। ইস্পাত কারখানা থেকে শুরু করে পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্ট পর্যন্ত, সামরিক ও বেসামরিক উভয় কাজে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলো মারাত্মকভাবে বোমাবর্ষণের শিকার হয়েছে।

সুইজারল্যান্ডের জেনেভা গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউটের ইরান ও অস্ত্র ব্যবস্থা বিষয়ক বিশ্লেষক ফারজান সাবেত বলেন, যদি আলোচনায় ইরানকে তাদের তেল বিক্রির ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার অথবা বিদেশে থাকা তাদের কিছু অর্থনৈতিক সম্পদ অবমুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়, তবে ইরানি নেতারা এটিকে দেশের অভ্যন্তরে আরেকটি বড় বিজয় হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন।

তবে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জাহাজ চলাচলের ওপর নতুন করে ড্রোন বা রকেট হামলার হুমকির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার নতুন অর্জিত ক্ষমতা দৃশ্যত ধরে রাখতে চাইবে তেহরান, যোগ করেন শাবানি।

বিশ্লেষক ফারজান সাবেত বলেন, স্বল্প থেকে মধ্য মেয়াদে ইরান এই ধরনের প্রতিরোধ ব্যবস্থা বজায় রাখতে সক্ষম হবে। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো দেশগুলো সম্ভবত হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভর না করে তাদের তেল ও গ্যাস পরিবহণের জন্য পাইপলাইন নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করবে, যা ইরানের নতুন ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলী ভায়েজ বলেন, একটি চুক্তির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করে এটি শুধু যুদ্ধবিরতির বোঝাপড়ার বাইরে যেতে পারে কি না তার ওপর। তবে উভয় পক্ষ যুদ্ধ থামানোর একটি অস্থায়ী পরিকল্পনাকে বাস্তব চুক্তিতে রূপান্তরিত করতে দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনায় যেতে পারবে কি না, তা নিয়ে তিনি সন্দিহান ছিলেন।

আলী ভায়েজ বলেন, ‘অনেকে যেভাবে এটাকে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় বা ইরানের জয় হিসেবে তুলে ধরেন, তা আমার পছন্দ নয়। এটি আসলে উভয় পক্ষের জন্যই একটি উভয় সংকটের পরিস্থিতি তৈরি করেছে। আমি বিশ্বাস করি না, এই চুক্তির ফলে কোনো পক্ষই প্রকৃতপক্ষে লাভবান হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তিতে নিজেদের বিজয় দেখছেন ইরানিরা

আপডেট টাইম : ১২:১২:১৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং আঞ্চলিক কূটনীতিকরা যখন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ-সমাপ্তির একটি চুক্তির সম্ভাবনার কথা জোরেশোরে ঘোষণা করছেন, তখন এর জবাবে নিজেদের ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে একটি ব্যাখ্যা দিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। খবর নিউইয়র্ক টাইমসের।

মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ইরানের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে খোদাই করা একটি বিখ্যাত ভাস্কর্যের ছবি পোস্ট করেন, যেখানে প্রাচীন ইরানি সাম্রাজ্য সাসানীয় রাজার কাছে একজন রোমান সম্রাটকে বশ্যতা স্বীকার করে মাথানত করতে দেখা যায়।

ওয়াশিংটনের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির প্রতি ইঙ্গিত করে ইসমাইল বাঘাই লেখেন, রোমানদের মনে রোম ছিল বিশ্বের অনস্বীকার্য কেন্দ্র। ইরানিরা সেই ভ্রান্ত ধারণা ভেঙে দিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে ইরানকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হতে হলেও, দেশটির নেতারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য প্রাথমিক চুক্তির ঘোষিত শর্তগুলোকে বিজয় হিসেবেই দেখছেন।

শনিবার (২৩ মে) মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা ঘোষণা করেছেন, দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তির প্রাথমিক কাঠামো নিয়ে মূলত আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে, যদিও তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। প্রস্তাবে কী আছে তার বিস্তারিত বিবরণ অস্পষ্ট, যদিও ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে লেখেন, এই চুক্তির অংশ হিসেবে তেল ও গ্যাস পরিবহণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে।

আলোচনার মাধ্যমে ইরান কতটুকু সুবিধা অর্জন করতে পেরেছে, তা কেবল শর্তগুলো জানা গেলেই নিশ্চিত হওয়া যাবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশটির হাতে এই ফলাফলকে বিজয় হিসেবে তুলে ধরার ভালো সুযোগ থাকবে। দুই মাস আগে, ট্রাম্প অঙ্গীকার করেছিলেন—‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ ছাড়া ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হবে না। এর বিপরীতে বর্তমানে ওয়াশিংটনকে দেখে মনে হচ্ছে, তারা ইরানের বারবার দাবি করা আসা ‘অচলাবস্থা অবসানের একমাত্র উপায় আলোচনা, যুদ্ধ নয়’, তা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে।

ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশনসের ‘ইরান নিউক্লিয়ার মনিটর’ এর বিশ্লেষক ও লেখক এলি গেরানমায়েহ বলেন, অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ইরান প্রমাণ করেছে, তারা দুটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশকে মোকাবিলা করতে সক্ষম।

হরমুজ প্রণালিতে আধিপত্যের কারণে ইরান এখন আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সামনে এসেছে। তারা এটাও দেখিয়ে দিয়েছে, ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের পারমাণবিক সংকট সামরিক শক্তির মাধ্যমে সমাধান হবে না।

তুলনামূলকভাবে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় উচ্চাকাঙ্ক্ষাগুলোর বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি বলেই মনে হচ্ছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এবং শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের হত্যার পরেও দেশটির ধর্মীয় শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করতে পারেনি।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক চুক্তি সম্পর্কে যা জানা গেছে, তা হলো ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অথবা তাদের সহযোগী সশস্ত্র বাহিনীগুলোর আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক দমনের কোনো শর্ত এতে উল্লেখ নেই। এ ছাড়া ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত করতে বা পারমাণবিক অস্ত্রে রূপান্তরিত হতে পারে এমন উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত অপসারণ করতে কী ধরনের প্রতিশ্রুতি দেবে এবং কী সময়সীমা দেবে, তা-ও অস্পষ্ট। এই ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা দ্বিতীয় পর্যায়ে গড়াতে পারে।

ইরান সম্পর্কিত বিশ্লেষক ও আঞ্চলিক সংবাদ পোর্টাল আমওয়াজ.মিডিয়ার সম্পাদক মোহাম্মদ আলী শাবানি বলেছেন, কিছু দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্য বিজয় দাবি করা সহজ, কারণ বিজয়ের সংজ্ঞাগুলো খুবই একপেশে। তবে তিনি বলেন, কৌশলগত প্রতিরোধ প্রদর্শনের ক্ষেত্রে ইরানের নতুন করে আত্মবিশ্বাসী হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

শাবানি বলেন, বছরের পর বছর ধরে ইরানের পূর্ববর্তী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলায় সতর্ক হয়ে উঠেছিলেন। যদিও তিনি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলার প্রথম দিনে গোলাবর্ষণে নিহত হন।

এবারের যুদ্ধে ইরানের নতুন নেতারা আগ্রাসী পন্থা অবলম্বনের আগ্রহ দেখিয়েছেন। যদিও এ পন্থা নিতে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি অনিচ্ছুক ছিলেন বলে ধারণা করা যায়। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রেখেছে, তবে এর ফলে দেশটির জাহাজগুলোও অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া ইরান প্রতিবেশী, অর্থাৎ উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান আঞ্চলিক মিত্র, সেসব দেশের ওপর বোমাবর্ষণ করেছে। তবে এসব দেশের সঙ্গে তেহরান আগে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চেয়েছিল।

শাবানি আরও বলেন, প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার ছেলে ও উত্তরাধিকারী মোজতবা খামেনিসহ ইরানের নতুন নেতারা সেই ভবিষ্যতের অনুমান-নির্ভর স্বভাব দূর করেছেন। এর পরিবর্তে তারা দেখিয়েছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে নামতে পারে এবং দেশটি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে না। প্রকৃতপক্ষে, ইরান প্রতিরোধ করতে পারে। প্রতিরোধ করে বিশ্ব অর্থনীতিতে এতটাই ক্ষতিসাধন করতে পারে, এতটাই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে, যার মাধ্যমে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে একটি চুক্তিতে আসতে বাধ্য করতে পারে।

ইরান এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কবলে পড়েছে। ইস্পাত কারখানা থেকে শুরু করে পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্ট পর্যন্ত, সামরিক ও বেসামরিক উভয় কাজে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলো মারাত্মকভাবে বোমাবর্ষণের শিকার হয়েছে।

সুইজারল্যান্ডের জেনেভা গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউটের ইরান ও অস্ত্র ব্যবস্থা বিষয়ক বিশ্লেষক ফারজান সাবেত বলেন, যদি আলোচনায় ইরানকে তাদের তেল বিক্রির ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার অথবা বিদেশে থাকা তাদের কিছু অর্থনৈতিক সম্পদ অবমুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়, তবে ইরানি নেতারা এটিকে দেশের অভ্যন্তরে আরেকটি বড় বিজয় হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন।

তবে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জাহাজ চলাচলের ওপর নতুন করে ড্রোন বা রকেট হামলার হুমকির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার নতুন অর্জিত ক্ষমতা দৃশ্যত ধরে রাখতে চাইবে তেহরান, যোগ করেন শাবানি।

বিশ্লেষক ফারজান সাবেত বলেন, স্বল্প থেকে মধ্য মেয়াদে ইরান এই ধরনের প্রতিরোধ ব্যবস্থা বজায় রাখতে সক্ষম হবে। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো দেশগুলো সম্ভবত হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভর না করে তাদের তেল ও গ্যাস পরিবহণের জন্য পাইপলাইন নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করবে, যা ইরানের নতুন ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলী ভায়েজ বলেন, একটি চুক্তির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করে এটি শুধু যুদ্ধবিরতির বোঝাপড়ার বাইরে যেতে পারে কি না তার ওপর। তবে উভয় পক্ষ যুদ্ধ থামানোর একটি অস্থায়ী পরিকল্পনাকে বাস্তব চুক্তিতে রূপান্তরিত করতে দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনায় যেতে পারবে কি না, তা নিয়ে তিনি সন্দিহান ছিলেন।

আলী ভায়েজ বলেন, ‘অনেকে যেভাবে এটাকে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় বা ইরানের জয় হিসেবে তুলে ধরেন, তা আমার পছন্দ নয়। এটি আসলে উভয় পক্ষের জন্যই একটি উভয় সংকটের পরিস্থিতি তৈরি করেছে। আমি বিশ্বাস করি না, এই চুক্তির ফলে কোনো পক্ষই প্রকৃতপক্ষে লাভবান হবে।