ঢাকা ০৬:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
ইটনায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্র্যাক সদস্যদের মাঝে হাঁসের বাচ্চা ও সবজি বীজ বিতরণ তালবাহানায় আটকে গভর্নিং বডি নির্বাচন, প্রশ্নের মুখে আইডিয়াল কর্তৃপক্ষ অবহেলায় অনেক স্কুলের অবকাঠামোর বেহাল দশা: জুবাইদা রহমান গ্লোবাল পিস ইনডেক্স ২০২৬ দক্ষিণ এশিয়ায় চতুর্থ শান্তিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ ক্রমান্বয়ে স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসা এমপিওভুক্ত করা হবে পুরস্কারের গাড়ি মাকে উপহার দেবেন তাওহীদ হৃদয় ইসলামী ব্যাংকে নতুন প্রশাসক নিয়োগ জিয়াউর রহমানের জীবন ও দর্শন নিয়ে গবেষণার আহ্বান ফখরুলের পাখির চোখে সীমান্ত পাহারার ছক, কঠোর নজরদারি বাড়াচ্ছে সরকার বেনজীরের গ্রেপ্তারের খবরে আনন্দিত পরীমণি

হরমুজের গভীরে নতুন শক্তিতে নজর ইরানের, নিয়ন্ত্রণে থাকবে পুরো দুনিয়া

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:৫৫:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬
  • ১৪ বার

হরমুজ প্রণালিতে সফল সামরিক অবরোধের পর এবার বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান এবং গোপন একটি লাইফলাইনের দিকে নজর দিয়েছে ইরান। পারস্য উপসাগরের তলদেশ দিয়ে যাওয়া সাবমেরিন বা সমুদ্রগর্ভস্থ ক্যাবল নেটওয়ার্কের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে তেহরান।

এই সাবমেরিন ক্যাবলগুলো মূলত ইউরোপ, এশিয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে বিশাল ইন্টারনেট ট্রাফিক ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য আদান-প্রদান করে। ইরান এখন এই নৌপথের নিচে থাকা ইন্টারনেট ক্যাবল ব্যবহারের জন্য বিশ্বের বৃহত্তম প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ফি বা মাশুল আদায় করার পরিকল্পনা করছে।

তেহরানের আইনপ্রণেতারা ইতোমধ্যেই এমন একটি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন, যা আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগকারী সাবমেরিন ক্যাবলগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো পরোক্ষভাবে হুমকি দিয়ে জানিয়েছে, কোম্পানিগুলো এই ফি না দিলে ইন্টারনেট ট্রাফিক ব্যাহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ইরানের সামরিক মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ ঘোষণা করেছেন যে তারা ইন্টারনেট ক্যাবলের ওপর ফি আরোপ করতে যাচ্ছেন। দেশটির রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) সঙ্গে যুক্ত গণমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গুগল, মাইক্রোসফট, মেটা এবং আমাজনের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টদের ইরানের আইন মেনে চলতে হবে।

সাবমেরিন ক্যাবল পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলোকে ক্যাবল অতিক্রমের জন্য লাইসেন্সিং ফি দিতে হবে এবং এই ক্যাবলগুলোর মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের একচ্ছত্র অধিকার কেবল ইরানি কোম্পানিগুলোকেই দিতে হবে। তবে এই কোম্পানিগুলোর ওপর ইরানের নিষেধাজ্ঞা চাপানোর সক্ষমতা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে, কারণ মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে এই প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর পক্ষে ইরানকে কোনো অর্থ প্রদান করা আইনিভাবে অসম্ভব। ফলে অনেক বিশেষজ্ঞ একে বড় কোনো পদক্ষেপের চেয়ে ইরানের রাজনৈতিক শক্তির মহড়া হিসেবেই দেখছেন।

তা সত্ত্বেও এই হুমকির অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ঝুঁকি অনেক গভীর। সাবমেরিন ক্যাবল হলো বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগের মেরুদণ্ড। এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে কেবল ইন্টারনেটের গতিই কমবে না, বরং ব্যাংকিং ব্যবস্থা, সামরিক যোগাযোগ, ক্লাউড অবকাঠামো থেকে শুরু করে ফ্রিল্যান্সিং ও অনলাইন স্ট্রিমিং সেবাও স্থবির হয়ে পড়তে পারে।

ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক প্রধান দিনা এসফান্দিয়ারি মনে করেন, এটি মূলত যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে নিজেদের টিকিয়ে রাখার এবং প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার জন্য ইরানের একটি কৌশল। ইরান বিশ্ব অর্থনীতিতে এমন একটি চড়া মূল্য চাপিয়ে দিতে চায়, যাতে ভবিষ্যতে কেউ দেশটিতে আক্রমণ করার সাহস না পায়।

নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে আন্তর্জাতিক অপারেটররা সাধারণত ওমানের জলসীমা দিয়ে ক্যাবল স্থাপন করলেও, ‘ফ্যালকন’ এবং ‘গালফ ব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল’ (জিবিআই) নামের দুটি প্রধান ক্যাবল ইরানের জলসীমার ওপর দিয়েই গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ভিত্তিক হাবতূর রিসার্চ সেন্টারের গবেষক মোস্তফা আহমেদ সতর্ক করেছেন যে কম্ব্যাট ডাইভার, ছোট সাবমেরিন এবং আন্ডারওয়াটার ড্রোনে সজ্জিত ইরানি বাহিনী যদি এই ক্যাবলগুলোতে কোনো হামলা চালায়, তবে তা কয়েক মহাদেশ জুড়ে একটি ‘ডিজিটাল বিপর্যয়’ ডেকে আনবে।

এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস রপ্তানি ব্যাহত হতে পারে এবং ভারতের মতো বিশাল আউটসোর্সিং শিল্পের শত কোটি ডলারের ক্ষতি হতে পারে। এছাড়া সিঙ্গাপুরের মতো এশিয়ান ডেটা হাব এবং ইউরোপের মধ্যে আর্থিক লেনদেন মারাত্মকভাবে ধীর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইরান অবশ্য এই ফি আদায়ের পরিকল্পনাকে ১৯৮২ সালের জাতিসংঘের সমুদ্র আইন বিষয়ক কনভেনশনের আলোকে বৈধ বলে দাবি করছে। তারা মিশরের উদাহরণ টেনে বলছে, মিশরও সুয়েজ খালের ওপর ভৌগোলিক আধিপত্য বজায় রেখে প্রতি বছর কোটি কোটি ডলার ট্রানজিট ও লাইসেন্সিং ফি আয় করে। তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুয়েজ খাল মিশরের খনন করা একটি কৃত্রিম জলপথ হলেও হরমুজ প্রণালি একটি প্রাকৃতিক আন্তর্জাতিক নৌপথ, যার আইনি নিয়ম সম্পূর্ণ ভিন্ন।

লন্ডনের সোয়াস ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক ইরিনি পাপানিকোলৌপোলু জানিয়েছেন, বিদ্যমান ক্যাবলগুলোর ক্ষেত্রে ইরানকে আগের চুক্তি মেনে চলতে হবে, তবে নতুন ক্যাবল স্থাপনের ক্ষেত্রে যেকোনো দেশই তার নিজস্ব জলসীমায় শর্ত আরোপ করার অধিকার রাখে। সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের এই নতুন চাল বিশ্বজুড়ে কেবল জ্বালানি সংকট নয়, একটি বড় ধরনের বৈশ্বিক ডিজিটাল ও আর্থিক সংকটের ঝুঁকি তৈরি করছে।

সূত্র: সিএনএন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

ইটনায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্র্যাক সদস্যদের মাঝে হাঁসের বাচ্চা ও সবজি বীজ বিতরণ

হরমুজের গভীরে নতুন শক্তিতে নজর ইরানের, নিয়ন্ত্রণে থাকবে পুরো দুনিয়া

আপডেট টাইম : ১০:৫৫:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬

হরমুজ প্রণালিতে সফল সামরিক অবরোধের পর এবার বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান এবং গোপন একটি লাইফলাইনের দিকে নজর দিয়েছে ইরান। পারস্য উপসাগরের তলদেশ দিয়ে যাওয়া সাবমেরিন বা সমুদ্রগর্ভস্থ ক্যাবল নেটওয়ার্কের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে তেহরান।

এই সাবমেরিন ক্যাবলগুলো মূলত ইউরোপ, এশিয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে বিশাল ইন্টারনেট ট্রাফিক ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য আদান-প্রদান করে। ইরান এখন এই নৌপথের নিচে থাকা ইন্টারনেট ক্যাবল ব্যবহারের জন্য বিশ্বের বৃহত্তম প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ফি বা মাশুল আদায় করার পরিকল্পনা করছে।

তেহরানের আইনপ্রণেতারা ইতোমধ্যেই এমন একটি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন, যা আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগকারী সাবমেরিন ক্যাবলগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো পরোক্ষভাবে হুমকি দিয়ে জানিয়েছে, কোম্পানিগুলো এই ফি না দিলে ইন্টারনেট ট্রাফিক ব্যাহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ইরানের সামরিক মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ ঘোষণা করেছেন যে তারা ইন্টারনেট ক্যাবলের ওপর ফি আরোপ করতে যাচ্ছেন। দেশটির রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) সঙ্গে যুক্ত গণমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গুগল, মাইক্রোসফট, মেটা এবং আমাজনের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টদের ইরানের আইন মেনে চলতে হবে।

সাবমেরিন ক্যাবল পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলোকে ক্যাবল অতিক্রমের জন্য লাইসেন্সিং ফি দিতে হবে এবং এই ক্যাবলগুলোর মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের একচ্ছত্র অধিকার কেবল ইরানি কোম্পানিগুলোকেই দিতে হবে। তবে এই কোম্পানিগুলোর ওপর ইরানের নিষেধাজ্ঞা চাপানোর সক্ষমতা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে, কারণ মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে এই প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর পক্ষে ইরানকে কোনো অর্থ প্রদান করা আইনিভাবে অসম্ভব। ফলে অনেক বিশেষজ্ঞ একে বড় কোনো পদক্ষেপের চেয়ে ইরানের রাজনৈতিক শক্তির মহড়া হিসেবেই দেখছেন।

তা সত্ত্বেও এই হুমকির অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ঝুঁকি অনেক গভীর। সাবমেরিন ক্যাবল হলো বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগের মেরুদণ্ড। এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে কেবল ইন্টারনেটের গতিই কমবে না, বরং ব্যাংকিং ব্যবস্থা, সামরিক যোগাযোগ, ক্লাউড অবকাঠামো থেকে শুরু করে ফ্রিল্যান্সিং ও অনলাইন স্ট্রিমিং সেবাও স্থবির হয়ে পড়তে পারে।

ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক প্রধান দিনা এসফান্দিয়ারি মনে করেন, এটি মূলত যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে নিজেদের টিকিয়ে রাখার এবং প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার জন্য ইরানের একটি কৌশল। ইরান বিশ্ব অর্থনীতিতে এমন একটি চড়া মূল্য চাপিয়ে দিতে চায়, যাতে ভবিষ্যতে কেউ দেশটিতে আক্রমণ করার সাহস না পায়।

নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে আন্তর্জাতিক অপারেটররা সাধারণত ওমানের জলসীমা দিয়ে ক্যাবল স্থাপন করলেও, ‘ফ্যালকন’ এবং ‘গালফ ব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল’ (জিবিআই) নামের দুটি প্রধান ক্যাবল ইরানের জলসীমার ওপর দিয়েই গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ভিত্তিক হাবতূর রিসার্চ সেন্টারের গবেষক মোস্তফা আহমেদ সতর্ক করেছেন যে কম্ব্যাট ডাইভার, ছোট সাবমেরিন এবং আন্ডারওয়াটার ড্রোনে সজ্জিত ইরানি বাহিনী যদি এই ক্যাবলগুলোতে কোনো হামলা চালায়, তবে তা কয়েক মহাদেশ জুড়ে একটি ‘ডিজিটাল বিপর্যয়’ ডেকে আনবে।

এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস রপ্তানি ব্যাহত হতে পারে এবং ভারতের মতো বিশাল আউটসোর্সিং শিল্পের শত কোটি ডলারের ক্ষতি হতে পারে। এছাড়া সিঙ্গাপুরের মতো এশিয়ান ডেটা হাব এবং ইউরোপের মধ্যে আর্থিক লেনদেন মারাত্মকভাবে ধীর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইরান অবশ্য এই ফি আদায়ের পরিকল্পনাকে ১৯৮২ সালের জাতিসংঘের সমুদ্র আইন বিষয়ক কনভেনশনের আলোকে বৈধ বলে দাবি করছে। তারা মিশরের উদাহরণ টেনে বলছে, মিশরও সুয়েজ খালের ওপর ভৌগোলিক আধিপত্য বজায় রেখে প্রতি বছর কোটি কোটি ডলার ট্রানজিট ও লাইসেন্সিং ফি আয় করে। তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুয়েজ খাল মিশরের খনন করা একটি কৃত্রিম জলপথ হলেও হরমুজ প্রণালি একটি প্রাকৃতিক আন্তর্জাতিক নৌপথ, যার আইনি নিয়ম সম্পূর্ণ ভিন্ন।

লন্ডনের সোয়াস ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক ইরিনি পাপানিকোলৌপোলু জানিয়েছেন, বিদ্যমান ক্যাবলগুলোর ক্ষেত্রে ইরানকে আগের চুক্তি মেনে চলতে হবে, তবে নতুন ক্যাবল স্থাপনের ক্ষেত্রে যেকোনো দেশই তার নিজস্ব জলসীমায় শর্ত আরোপ করার অধিকার রাখে। সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের এই নতুন চাল বিশ্বজুড়ে কেবল জ্বালানি সংকট নয়, একটি বড় ধরনের বৈশ্বিক ডিজিটাল ও আর্থিক সংকটের ঝুঁকি তৈরি করছে।

সূত্র: সিএনএন।