ঢাকা ১২:৪০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৪-৫টি কোম্পানির হাতে জিম্মি সয়াবিন তেলের বাজারে সিন্ডিকেটের নৈরাজ্য

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:২৮:১৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬
  • ১ বার

সরকারকে চাপে ফেলে সয়াবিন তেলের দাম বাড়াতে পরিকল্পিতভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। পর্যাপ্ত আমদানি ও মজুত থাকার পরও মিলপর্যায়ে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় খুচরা বাজার থেকে বোতলজাত সয়াবিন তেল একপ্রকার গায়েব হয়ে গেছে।

এই সুযোগে বাজারে খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ২১০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। বাণিজ্যমন্ত্রীর কড়া হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও চক্রটি নিজেদের খেয়ালখুশিমতো দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে এবং বাজার অস্থিতিশীল করে তুলেছে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটি কিনতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ ক্রেতার।

এ বিষয়ে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, দেশের ৪ থেকে ৫টি বড় কোম্পানি সয়াবিন তেলের বাজারের ৮৫-৯০ শতাংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। বাকি ১০-১৫ শতাংশ অন্য ছোট কোম্পানিগুলো সরবরাহ করে।

ওইসব বড় কোম্পানি দেশের চাহিদামতো তেল আমদানির পর রিফাইন করে বাজারে ছাড়ে। বাড়তি মুনাফা করতে তারা বছরের একেক সময় তাদের ডিলারদের মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেয়। সরকারকে চাপে ফেলে সাধারণ ভোক্তাকে জিম্মি করে মূল্য বাড়িয়ে নেয়। এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

এদিকে এপ্রিলের প্রথম দিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে মিল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। সেখানে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ২০৭ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা সরকার নির্ধারিত মূল্য ১৯৫ টাকা।

এছাড়া ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১ হাজার ২০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বর্তমানে ৯৫৫ টাকা। খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৭৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮৫ টাকা, পাম তেল ১৬৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রতিলিটার ১৭৭ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এ মূল্য সরকারের অনুমতি পাওয়ার আগেই তারা কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে ১২ এপ্রিল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বৈঠকে তিনি বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং কোনোভাবেই দাম না বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি কঠোর পদক্ষেপের কথা জানান। তবে বৈঠকের ১১ দিনেও বাজারে সয়াবিন তেল সরবরাহ বাড়েনি।

মন্ত্রী কড়া অবস্থানে থাকলেও ওই সিন্ডিকেট বাজারে তেল সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। মুদি দোকান থেকে দিনে ২০ কার্টনের চাহিদা দিলেও সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র দুই থেকে চার কার্টন। এমন পরিস্থিতিতে চাহিদা বাড়ায় সুযোগ বুঝে খোলা সয়াবিনের দামও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে লিটারে ৩৪ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে বিপাকে পড়ছেন সব শ্রেণির ক্রেতা।

মঙ্গলবার নয়াবাজারের মুদি ব্যবসায়ী তুহিরন বলেন, রোজার শুরু থেকেই কোম্পানিগুলো তেল সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। ২০ কার্টন চাহিদা দিলে ২-৩ কার্টন দিয়ে যাচ্ছে। কোম্পানিগুলো ডিলারদের মাধ্যমে এমন কারসাজি করছে। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। টার্গেট ছিল ঈদের আগেই দাম আরেক দফা বাড়ানোর। কিন্তু নতুন সরকারের কঠোর তদারকিতে তা পারেনি। তাই ঈদের পর আবার দাম বাড়াতে পাঁয়তারা শুরু করেছে ৫ থেকে ৬টি কোম্পানির প্রভাবশালী সিন্ডিকেট।

এ দিন বাড্ডা এলাকার গুদারাঘাট বাজারের পাঁচটি দোকানের চারটিতে বোতল সয়াবিন তেলের সংকট দেখা গেছে। এক ও দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল নেই। ৫ লিটারের কয়েকটি বোতল বিক্রি করতে দেখা যায় তাদের। ক্রেতারা যে দোকানে খোলা তেল পাচ্ছেন কিনে নিচ্ছেন। একই দিন নয়াবাজারের চারটি মুদি দোকান ঘুরে তেলের সংকট দেখা গেছে। ৭ এপ্রিল বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির কাওরান বাজার ও শান্তিনগর বাজারে সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়েও এমন চিত্র দেখতে পেয়েছেন।

গুদারাঘাট বাজারের ভাই ভাই জেনারেল স্টোরের বিক্রেতা আল আমিন বলেন, ৫ লিটারের এক বোতল সয়াবিন তেলের গায়ের দাম (এমআরপি) ৯৫৫ টাকা। ডিলারের কাছ থেকে আগে এই তেল ৯৩০ টাকায় কিনতাম, বিক্রি করতাম ৯৪০ টাকায়। ১০ টাকা লাভ থাকত। কিন্তু রোজার মধ্যে ৫ লিটারের বোতল কিনতে হয়েছে ৯৫০ টাকায়, বিক্রি করতে হয়েছে ৯৫৫ টাকায়। ডিলার পর্যায় থেকে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে খুচরা পর্যায়ে ৫ টাকা লাভ কমেছে।

কাওরান বাজারের তীর ব্র্যান্ডের ডিলার এটিএন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. সেলিম বলেন, রোজায় তীরের তেলের বেশ সংকট ছিল। স্বাভাবিক সময়ে দুই থেকে আড়াইশ কার্টন তেল পেতাম। সেখানে তখন কোম্পানি মাত্র ৫০ কার্টন তেল দিত। তাই তখন খুচরায় তেল সরবরাহ কমিয়ে দিতে হয়েছিল। তবে ঈদের আগে সরবরাহ কিছুটা বেড়েছিল। এখন আবার সরবরাহ কিছুটা কম। তাই খুচরা বাজারে বোতল সয়াবিন কম সরবরাহ করতে পারছি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টিকে গ্রুপের এক কর্মকর্তা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম টনপ্রতি ১৩৭০ ডলার, যা আগে ১১০০ ডলার ছিল। যখন ১১০০ ডলার ছিল, তখন দেশে দাম সমন্বয় হয়েছে। এখন বিশ্ববাজারে দাম বাড়ায় তা ফের সমন্বয় করতে হবে। কারণ বাজারে কয়েক মাস ধরে লোকসান গুনতে হচ্ছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি হয়েছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। কোম্পানিগুলো কতদিন এভাবে লোকসানে পণ্য বিক্রি করবে?

এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাজারে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকায় দাম বাড়ার কোনো আশঙ্কা নেই। বর্তমানে বাজারে ১ লাখ ৭০ হাজার টন তেল মজুত আছে। আরও ৩ লাখ ৬০ হাজার টন পাইপলাইনে রয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ কারণে সরকার বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। সরকার ভোক্তা স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হচ্ছে এই সময়ে যেন কোনো পণ্যের দাম না বাড়ে। সেটিকে লক্ষ্য হিসাবে নিয়ে আমরা যথাযথ পদক্ষেপ নেব।

প্রসঙ্গত, এর আগে গত ১০ নভেম্বর লিটারে ৯ টাকা বাড়ানোর অনুমতি চেয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিল বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। ২৪ নভেম্বর তারা আবারও মূল্য সমন্বয়ের সুপারিশ করে। অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে দুবার অনুমতি চাওয়া হলেও মন্ত্রণালয় তখন সাড়া দেয়নি। একপর্যায়ে ব্যবসায়ী সংগঠন সরকারকে পাত্তা না দিয়ে অনুমতি ছাড়াই প্রতি লিটারে ৯ টাকা বাড়িয়ে খুচরা পর্যায়ে বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৯৮ টাকায় বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। মোড়কে নতুন দাম উল্লেখ করে বাজারে ছাড়া হয় তেল। তখন ক্রেতাকে বাধ্য হয়ে বাড়তি দামেই তেল কিনতে হয়েছে। সরকারকে না জানিয়ে কোম্পানিগুলো ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোয় উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দীন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

৪-৫টি কোম্পানির হাতে জিম্মি সয়াবিন তেলের বাজারে সিন্ডিকেটের নৈরাজ্য

আপডেট টাইম : ১২:২৮:১৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬

সরকারকে চাপে ফেলে সয়াবিন তেলের দাম বাড়াতে পরিকল্পিতভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। পর্যাপ্ত আমদানি ও মজুত থাকার পরও মিলপর্যায়ে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় খুচরা বাজার থেকে বোতলজাত সয়াবিন তেল একপ্রকার গায়েব হয়ে গেছে।

এই সুযোগে বাজারে খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ২১০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। বাণিজ্যমন্ত্রীর কড়া হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও চক্রটি নিজেদের খেয়ালখুশিমতো দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে এবং বাজার অস্থিতিশীল করে তুলেছে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটি কিনতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ ক্রেতার।

এ বিষয়ে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, দেশের ৪ থেকে ৫টি বড় কোম্পানি সয়াবিন তেলের বাজারের ৮৫-৯০ শতাংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। বাকি ১০-১৫ শতাংশ অন্য ছোট কোম্পানিগুলো সরবরাহ করে।

ওইসব বড় কোম্পানি দেশের চাহিদামতো তেল আমদানির পর রিফাইন করে বাজারে ছাড়ে। বাড়তি মুনাফা করতে তারা বছরের একেক সময় তাদের ডিলারদের মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেয়। সরকারকে চাপে ফেলে সাধারণ ভোক্তাকে জিম্মি করে মূল্য বাড়িয়ে নেয়। এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

এদিকে এপ্রিলের প্রথম দিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে মিল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। সেখানে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ২০৭ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা সরকার নির্ধারিত মূল্য ১৯৫ টাকা।

এছাড়া ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১ হাজার ২০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বর্তমানে ৯৫৫ টাকা। খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৭৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮৫ টাকা, পাম তেল ১৬৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রতিলিটার ১৭৭ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এ মূল্য সরকারের অনুমতি পাওয়ার আগেই তারা কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে ১২ এপ্রিল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বৈঠকে তিনি বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং কোনোভাবেই দাম না বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি কঠোর পদক্ষেপের কথা জানান। তবে বৈঠকের ১১ দিনেও বাজারে সয়াবিন তেল সরবরাহ বাড়েনি।

মন্ত্রী কড়া অবস্থানে থাকলেও ওই সিন্ডিকেট বাজারে তেল সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। মুদি দোকান থেকে দিনে ২০ কার্টনের চাহিদা দিলেও সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র দুই থেকে চার কার্টন। এমন পরিস্থিতিতে চাহিদা বাড়ায় সুযোগ বুঝে খোলা সয়াবিনের দামও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে লিটারে ৩৪ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে বিপাকে পড়ছেন সব শ্রেণির ক্রেতা।

মঙ্গলবার নয়াবাজারের মুদি ব্যবসায়ী তুহিরন বলেন, রোজার শুরু থেকেই কোম্পানিগুলো তেল সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। ২০ কার্টন চাহিদা দিলে ২-৩ কার্টন দিয়ে যাচ্ছে। কোম্পানিগুলো ডিলারদের মাধ্যমে এমন কারসাজি করছে। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। টার্গেট ছিল ঈদের আগেই দাম আরেক দফা বাড়ানোর। কিন্তু নতুন সরকারের কঠোর তদারকিতে তা পারেনি। তাই ঈদের পর আবার দাম বাড়াতে পাঁয়তারা শুরু করেছে ৫ থেকে ৬টি কোম্পানির প্রভাবশালী সিন্ডিকেট।

এ দিন বাড্ডা এলাকার গুদারাঘাট বাজারের পাঁচটি দোকানের চারটিতে বোতল সয়াবিন তেলের সংকট দেখা গেছে। এক ও দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল নেই। ৫ লিটারের কয়েকটি বোতল বিক্রি করতে দেখা যায় তাদের। ক্রেতারা যে দোকানে খোলা তেল পাচ্ছেন কিনে নিচ্ছেন। একই দিন নয়াবাজারের চারটি মুদি দোকান ঘুরে তেলের সংকট দেখা গেছে। ৭ এপ্রিল বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির কাওরান বাজার ও শান্তিনগর বাজারে সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়েও এমন চিত্র দেখতে পেয়েছেন।

গুদারাঘাট বাজারের ভাই ভাই জেনারেল স্টোরের বিক্রেতা আল আমিন বলেন, ৫ লিটারের এক বোতল সয়াবিন তেলের গায়ের দাম (এমআরপি) ৯৫৫ টাকা। ডিলারের কাছ থেকে আগে এই তেল ৯৩০ টাকায় কিনতাম, বিক্রি করতাম ৯৪০ টাকায়। ১০ টাকা লাভ থাকত। কিন্তু রোজার মধ্যে ৫ লিটারের বোতল কিনতে হয়েছে ৯৫০ টাকায়, বিক্রি করতে হয়েছে ৯৫৫ টাকায়। ডিলার পর্যায় থেকে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে খুচরা পর্যায়ে ৫ টাকা লাভ কমেছে।

কাওরান বাজারের তীর ব্র্যান্ডের ডিলার এটিএন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. সেলিম বলেন, রোজায় তীরের তেলের বেশ সংকট ছিল। স্বাভাবিক সময়ে দুই থেকে আড়াইশ কার্টন তেল পেতাম। সেখানে তখন কোম্পানি মাত্র ৫০ কার্টন তেল দিত। তাই তখন খুচরায় তেল সরবরাহ কমিয়ে দিতে হয়েছিল। তবে ঈদের আগে সরবরাহ কিছুটা বেড়েছিল। এখন আবার সরবরাহ কিছুটা কম। তাই খুচরা বাজারে বোতল সয়াবিন কম সরবরাহ করতে পারছি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টিকে গ্রুপের এক কর্মকর্তা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম টনপ্রতি ১৩৭০ ডলার, যা আগে ১১০০ ডলার ছিল। যখন ১১০০ ডলার ছিল, তখন দেশে দাম সমন্বয় হয়েছে। এখন বিশ্ববাজারে দাম বাড়ায় তা ফের সমন্বয় করতে হবে। কারণ বাজারে কয়েক মাস ধরে লোকসান গুনতে হচ্ছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি হয়েছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। কোম্পানিগুলো কতদিন এভাবে লোকসানে পণ্য বিক্রি করবে?

এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাজারে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকায় দাম বাড়ার কোনো আশঙ্কা নেই। বর্তমানে বাজারে ১ লাখ ৭০ হাজার টন তেল মজুত আছে। আরও ৩ লাখ ৬০ হাজার টন পাইপলাইনে রয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ কারণে সরকার বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। সরকার ভোক্তা স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হচ্ছে এই সময়ে যেন কোনো পণ্যের দাম না বাড়ে। সেটিকে লক্ষ্য হিসাবে নিয়ে আমরা যথাযথ পদক্ষেপ নেব।

প্রসঙ্গত, এর আগে গত ১০ নভেম্বর লিটারে ৯ টাকা বাড়ানোর অনুমতি চেয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিল বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। ২৪ নভেম্বর তারা আবারও মূল্য সমন্বয়ের সুপারিশ করে। অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে দুবার অনুমতি চাওয়া হলেও মন্ত্রণালয় তখন সাড়া দেয়নি। একপর্যায়ে ব্যবসায়ী সংগঠন সরকারকে পাত্তা না দিয়ে অনুমতি ছাড়াই প্রতি লিটারে ৯ টাকা বাড়িয়ে খুচরা পর্যায়ে বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৯৮ টাকায় বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। মোড়কে নতুন দাম উল্লেখ করে বাজারে ছাড়া হয় তেল। তখন ক্রেতাকে বাধ্য হয়ে বাড়তি দামেই তেল কিনতে হয়েছে। সরকারকে না জানিয়ে কোম্পানিগুলো ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোয় উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দীন।