বৈশাখের তীব্র তাপপ্রবাহে নাজেহাল হয়ে পড়েছে জনজীবন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের প্রখরতাও বাড়তে থাকে। প্রচণ্ড গরম ও তীব্র রোদে বাইরে থাকা দায় হয়ে উঠেছে। প্রয়োজন ছাড়া অনেকেই বাইরে বের হচ্ছেন না। তবে সকালের দিকে রাস্তাঘাটে কিছুটা মানুষ দেখা গেলেও দুপুরের পর থেকে মানুষের উপস্থিতি কম দেখা গেছে। তাপে সবচেয়ে কষ্টে আছেন রিকশাচালক, দিনমজুর, নির্মাণশ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। আর যারা তীব্র গরমে কাজে বের হচ্ছেন তাদের কাছে ভরসা বিভিন্ন ভ্রাম্যমাণ শরবতের দোকান। রাজধানীর প্রতিটি শরবতের দোকানে ভিড় দেখা গেছে।
আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার ঢাকাসহ দেশের ২০ জেলায় তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এমনকি বুধবারের চেয়ে বৃহস্পতিবার তাপমাত্রাও বেড়েছে। তবে আগের দিনের চেয়ে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা চেয়ে কমেছে এদিন।
অধিদফতর বলছে, শুক্রবার কালবৈশাখীর মৌসুমে ঝড়-বৃষ্টি হলেও তাপপ্রবাহ কমে আসার সম্ভাবনা কম। বরং কোনও কোনও এলাকায় তাপমাত্রা আরও কিছুটা বেড়ে উঠতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়, রাজশাহী-ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার উপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে।
এতে আরও বলা হয়েছে, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের দু’এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সাথে কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে শিলাবৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া দেশের অন্যত্র অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে।
একইসঙ্গে, সারাদেশে দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে ও রাতের তাপমাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পেতে পারে। আবহাওয়ার সিনপটিক অবস্থা সম্পর্কে বলা হয়েছে, লঘুচাপের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ হতে উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। ঢাকার তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গতকাল তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, খুলনা বিভাগসহ ২০ জেলায় তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। আর খুলনার বাইরে বাকি যেসব জেলায় তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে সেগুলো হলো ঢাকায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা আগের দিন ছিল ছিল ৩৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এছাড়া ফরিদপুরে ৩৬, মাদারীপুর ৩৬, রাজশাহীতে ৩৭, পাবনায় ৩৬ দশমিক ২, সিরাজগঞ্জে ৩৬ দশমিক ১, বান্দরবানে ৩৬, রাঙামাটিতে ৩৬ দশমিক ৬, মুন্সিগঞ্জ ও পটুয়াখালীতে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। খুলনা বিভাগে জেলার সংখ্যা ১০। এর বাইরে ১০ জেলা ধরে মোট ২০ জেলায় তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে।
আর দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে যশোরে, ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বুধবার তুলনায় গতকাল বৃহস্পতিবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কমেছে। বুধবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল রাজশাহীতে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটি ছিল চলতি বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা।
চলতি মাসের শুরু থেকে দেশে তাপপ্রবাহ শুরু হয়। পরে অবশ্য তা কমে আসে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে তাপমাত্রা বাড়ছে। আবহাওয়া অধিদফতর চলতি মাসের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলেছে, এ মাসে একাধিক তীব্র তাপপ্রবাহ হতে পারে।
আবহাওয়া অধিদফতরের সংজ্ঞা অনুযায়ী, সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৬-৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে মৃদু তাপপ্রবাহ, ৩৮ থেকে ৩৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে মাঝারি তাপপ্রবাহ, ৪০ থেকে ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তীব্র তাপপ্রবাহ এবং ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা এর বেশি হলে একে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ বলা হয়। সেই হিসাবে রাজশাহীতে আজ মৃদু তাপপ্রবাহ চলছে।
রাজশাহী প্রতিনিধি জানায়, রাজশাহীতে এক দিনের ব্যবধানে তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমেছে। বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টার দিকে জেলার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগের দিন বুধবার ছিল ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটি ছিল চলতি মৌসুমে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড।
রাজশাহীতে তাপমাত্রা গত কয়েক দিন ধরেই বাড়ছিল। সবশেষ তিন দিন ধরে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রাজশাহীতেই রেকর্ড হচ্ছিল। এ তাপপ্রবাহ এবং অব্যাহত লোডশেডিংয়ে মানুষের জনজীবনে নাকাল অবস্থা। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষ বেশি বিপাকে পড়েছেন।
রাজশাহী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহীতে মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ধীরে ধীরে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করেছে। মাঝে দুই দফা কালবৈশাখীর প্রভাবে বৃষ্টি হওয়ায় তাপমাত্রা কমে এসেছিল। এপ্রিলে এসে তাপমাত্রা আবার বাড়তে থাকে।
রাজশাহী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ইনচার্জ রহিদুল ইসলাম বলেন, তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমেছে। তবে তাপমাত্রার বর্তমান এ ধারা অপরিবর্তিত থাকতে পারে এবং জনজীবনে গরমের এ দাপট আরও কয়েক দিন বজায় থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে, সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে- তীব্র গরমে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন রিকশাচালক, দিনমজুর ও নির্মাণ শ্রমিকরা। প্রখর রোদের মধ্যেই তাদের কাজ করতে হচ্ছে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে। আবার আয়ও কমেছে। এরই মধ্যে ভ্যাপসা গরম এবং তপ্ত হাওয়ায় রীতিমতো হাঁসফাঁস অবস্থা।
অটোরিকশাচালক নওশাদ ভরদুপুরে মাথায় গামছা বেঁধে বের হয়েছেন। যাত্রী পাওয়ার আশায় নগরীর রেলগেট এলাকায় অপেক্ষা করছিলেন। তিনি জানান, রোদ আর গরমের কারণে মানুষজনের আনাগোনা কম। তাই যাত্রী পাচ্ছি না। আয়-উপার্জন কমে যাওয়ায়ও টান পড়ছে সংসারে।
রাজশাহী নগরীর অটোরিকশাচালক কবির হোসেন বলেন, সড়কে মানুষের উপস্থিতি কম। পাকা সড়কে রোদের মধ্যে রিকশা চালানো যাচ্ছে না।
রাজশাহীর লিচু চাষি আব্দুল মালেক বলেন, কয়েকদিন আগেও প্রচণ্ড গরম ছিল। এখন আবার আর্দ্রতা বেড়েছে। এই কারণে গাছের লিচু ফেটে যাচ্ছে, আমরা খুব চিন্তায় আছি।
Reporter Name 




















