ঢাকা ১০:০৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ৩০ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুৎতের পথে সরকার

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৯:৪১:৫৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬
  • ২ বার

লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি নেই, বিদ্যুতের বিল সাশ্রয় হয় এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচ খুবই কম। বাসার লাইট, ফ্যান, টিভি থেকে শুরু করে বড় শিল্পকারখানায় এ বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ সোলার প্যানেল চীন উৎপাদন করে, যা বাংলাদেশে সোলার প্রযুক্তির খরচ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় দেশে দিন দিন সোলার পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। শ্রীলঙ্কায় ৭৫ শতাংশ বিদ্যুৎ আসে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। ভারতে আসে ৪০ শতাংশ। বাংলাদেশ এগোতে পারছে না। এ ছাড়া চীনের তুলনায় বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ চার গুণ বেশি। সারা দেশে সরকারি সব স্থাপনার ছাদ ব‍্যবহার করে ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে সরকার। প্রথম ধাপে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে তিনটি মন্ত্রণালয়ের ছয়টি বিভাগ যুক্ত হয়েছে। এর আওতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের ছাদ ব্যবহার করা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে সোলার প্যানেল উৎপাদন কারখানা স্থানান্তরের আহ্বান জানানোর পর চীনের একাধিক কোম্পানি বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ পর্যালোচনা করেছে সরকার। একই সাথে দেশের বিদ্যুৎ সঙ্কট মোকাবেলায় সোলার প্যানেল উৎপাদন বাড়াতে আগামী ১৫ বছরের নতুন পরিকল্পনা করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

দেশে বিদ্যুৎ সঙ্কট নিরসনে বড় উদ্যোগ নিয়েছে নতুন সরকার। এর অংশ হিসেবে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকায় নির্মাণ করা হবে ৫৫টি সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট বা সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র। ইতোমধ্যে এর দরপত্রও আহ্বান করা হয়েছে। অর্থায়নের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় থাকায় মিলছেন না বিনিয়োগ। কিন্তু কি কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে তার কারণ জানতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল রোববার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সোলার প্যানেল বিষয়ক অনুষ্ঠিত সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেবক রহমান এ নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

আগামী ২০২৭ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক আবহাওয়া বিপর্যয়কে আরও গভীর করে তুলবে। পর্যায়ে, যা সাধারণত প্রতি ১০ থেকে ১৫ বছরে ঘটে থাকে, সমুদ্রের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হয়, যা খরা, বন্যা, দাবদাহ, ঘূর্ণিঝড় এবং সমুদ্রের বরফ হ্রাসের মতো প্রভাবকে তীব্র করে। বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে নতুন রেকর্ডে পৌঁছে দিতে পারে। সাম্প্রতিক বছর গুলোতে নির্ধারিত সর্বোচ্চ তাপমাত্রাকেও ছাড়িয়ে যাবে মত প্রকাশ করেছেন বায়ুম-লে বিজ্ঞানী পল রাউন্ডি।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে অন্যতম যন্ত্র হলো সোলার প্যানেল। সূর্য থেকে আলো ও তাপ শোষণ করে বৈদ্যুতিক প্রবাহ উৎপন্ন করে এই প্যানেল। এটি আমদানি করা হয়। দেশেও এখন সীমিত পরিসরে সোলার প্যানেল তৈরি করা হচ্ছে। এটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাকৃতিক উৎস। তাই পরিবেশবান্ধব সবুজ জ্বালানি হিসেবে দুনিয়াজুড়ে এর ব্যবহার বাড়ছে। এ ছাড়া এটি নির্মাণের পর নতুন করে জ্বালানি কেনার খরচ নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ঠেকাতে সৌরবিদ্যুৎ মূল ভরসা হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশে সোলার প্যানেল উৎপাদন কারখানা স্থানান্তরের আহ্বান জানানোর পর চীনের একাধিক কোম্পানি বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ পর্যালোচনা করেছে। বিশ্বের বৃহত্তম সৌর প্যানেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘লংগি’ বাংলাদেশে অফিস স্থাপন এবং সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত। গত মার্চে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ) বলছে,গত ২০১২ থেকে ২০২০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে ৫৬ মেগাওয়াট। বর্তমানে এটি বেড়ে ১৬০ মেগাওয়াট হয়েছে। ছাদ ব্যবহার করে বড় ধরনের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ আছে দেশে। সএটি করা গেলে তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করতে পারে সরকার। ৬০ হাজার কোটি টাকার ৫৫ সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রে অনিশ্চয়তা। ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের নামে দেশীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ও বিদেশি বিনিয়োগ এনে আত্মসাৎ করায় তা আর আলোর মুখ দেখেনি। এ কারণে মুখ থুবড়ে পড়ে পুরো প্রকল্প। জুলাই বিপ্লবের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার আগের পরিকল্পনাটি স্থগিত করে বর্তমান নতুন সরকার এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনা নিয়েছে। বিশ্ববাজারে সৌরবিদ্যুৎ যন্ত্রপাতির দাম কমছে। এতে অনেকেই বিনিয়োগে উৎসাহী হবে। সারা দেশে সরকারি সব স্থাপনার ছাদ ব‍্যবহার করে ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে সরকার। প্রথম ধাপে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে তিনটি মন্ত্রণালয়ের ছয়টি বিভাগ যুক্ত হয়েছে। এর আওতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের ছাদ ব্যবহার করা হবে। গত বছর ২১ অক্টোবর তিন মন্ত্রণালয়ের ছয়টি বিভাগের সঙ্গে আলাদা করে সমঝোতা স্মারকে সই করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগ। ছয়টি বিভাগ হলো মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ। ছাদ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা। ৪৬ হাজার ৮৫৪টি প্রতিষ্ঠানে ১ হাজার ৪৫৪ দশমিক ৬১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। যদিও এতে তেমন অগ্রগতি নেই। দরপত্রের প্রক্রিয়া শেষ করে ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে চুক্তি করার সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে ১৩টি এলাকায় গবেষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজারে দুটি বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। ফেনীতে গত ২০০৫ সালে নির্মাণ করা হয় প্রথম বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র। এটির উৎপাদন সক্ষমতা ১ মেগাওয়াটের চেয়ে কম। যা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে কয়েক বছর আগে। গত ২০০৮ সালে কক্সবাজারে ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। একই এলাকায় ৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরও একটি বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র গত বছর উৎপাদনে এসেছে। এ ছাড়া সিরাজগঞ্জে ২ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র করা হয়েছে। দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে পানি ও বায়ুবিদ্যুতের চেয়ে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় সম্ভাবনা দেখছেন সরকার।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির একাধিক উৎস আছে। দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ এবং সন্ধ্যার পর পানি ও বায়ুবিদ্যুৎ দিয়ে গ্রিডের সমতা বজায় রাখে। দেশে মূলত সম্ভাবনা আছে সৌরবিদ্যুতের। এ ক্ষেত্রে জমির স্বল্পতা একটা বড় সমস্যা। দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের শুরুটা হয় কাপ্তাইয়ের পানিবিদ্যুৎ থেকে। পার্বত্য জেলা রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে ১৯৫৭ সালে পানিবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শুরুর মধ্য দিয়ে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার শুরু হয়। এই কেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়ানো হয় ১৯৮৮ সালে। যদিও ২১০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার এ কেন্দ্র থেকে এখন উৎপাদন হয় ১০০ মেগাওয়াটের কম। ১৯৯৬ সালে শুরু হয় সোলার হোম সিস্টেম বসানোর প্রকল্প। যেসব এলাকায় বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছায়নি, সেসব এলাকার ঘরে ঘরে সৌরবিদ্যুৎ যন্ত্র বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। এ পর্যন্ত প্রায় ৬০ লাখ সোলার হোম সিস্টেম বসানো হয়েছে বলে দাবি করে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা)। এর মধ্যে দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়নের ব্যবস্থা করেছে সরকার। এ ফলে সোলার হোম সিস্টেমের বড় একটি অংশ অব্যবহৃত ও অকেজো হয়ে পড়ে রয়েছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য বলা হয়, গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে চুক্তি করে। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের জন্য চুক্তি হয়েছে ২৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের, যার সক্ষমতা ১ হাজার ১০৪ মেগাওয়াট। বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে সব মিলিয়ে ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আছে। এদের সক্ষমতা ১ হাজার ৫৯ মেগাওয়াট। এর বাইরে ৩৫৮ মেগাওয়াট সক্ষমতার ১২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন। বেসরকারি খাতে ২ হাজার ৫৯৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার আরও ৩১টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়া ছিল গত সরকারের সময়। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সম্মতিপত্র দেওয়া হয় দরপত্র ছাড়া, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইনের অধীনে। দায়মুক্তি আইন হিসেবে পরিচিত ওই আইন বাতিল করে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এর মধ্যে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ১২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা কমিটি। এগুলো এখন পিডিবির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির অপেক্ষায় আছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে। দরপত্রের মাধ্যমে যে দর পাওয়া গেছে, এগুলোর দাম আগের চেয়ে গড়ে ২১ শতাংশ কমেছে বলে বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে জানা গেছে, পাঁচ হাজার ২৩৮ মেগাওয়াটের ৫৫টি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য গত ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে গত ২০২৫ সালের মার্চের মধ্যে চারটি প্যাকেজে টেন্ডার আহ্বান করা হয়। প্রথম ধাপে তেমন সাড়া পড়েনি। দ্বিতীয় ধাপেও ১০টি প্ল্যান্টের জন্য মাত্র ২১টি দরপত্র জমা পড়ে। দরপত্র কম জমা হওয়ায় সময়সীমা পাঁচবার বাড়ানো হয়। সর্বশেষ দরপত্র খোলার নির্ধারিত গত ১৮ জুন। নতুন দরপত্রে ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক টার্নওভার চাওয়া হয়েছে ৮ দশমিক ২০ মিলিয়ন ডলার। ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল চাওয়া হয়েছে ৫৭ দশমিক ২০ মিলিয়ন ডলার এবং প্রতি মেগাওয়াটের জন্য পাঁচ হাজার ডলার টেন্ডার সিকিউরিটি চাওয়া হয়েছে। এছাড়া ভূমির জন্য স্থানীয় এসিল্যান্ড এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার ছাড়পত্র চাওয়া হয়েছে। এককভাবে ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড বিভিন্ন ক্ষমতার ২৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দরপত্র জমা দেয়। এককভাবে এটিই সবচেয়ে বেশি। এছাড়া দেশ এনার্জি ৯টি, কনফিডেন্স সাতটি, বারাকা ছয়টি এবং মীর পাঁচটি। কক্সবাজার (উত্তর) ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড সাবস্টেশনের সঙ্গে সংযুক্ত ৫০ মেগাওয়াট প্রস্তাবিত সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড, কর্ণফুলী-বারাকা শিকলবাহা কনসোর্টিয়াম এবং কনফিডেন্স পাওয়ার বগুড়া ইউনিট-২ লিমিটেড থেকে তিনটি দরপত্র পাওয়া গেছে। কক্সবাজার ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড সাবস্টেশনের সঙ্গে সংযুক্ত আরেকটি প্ল্যান্টও একইভাবে তিনটি প্রতিষ্ঠান থেকে দরপত্র পেয়েছে। গোপালগঞ্জ প্ল্যান্টের জন্য (একটি ১৩২/৩৩ কেভি সাবস্টেশন) ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড, দেশ এনার্জি, চাঁদপুর পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড এবং বিজনেস রিসার্চ ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন ইনক ও চাংঝু ট্রিনা ইন্টেলিজেন্স এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের একটি যৌথ উদ্যোগ থেকে তিনটি দরপত্র জমা পড়েছে। চুয়াডাঙ্গার প্ল্যান্টের জন্য (একটি ১৩২/৩৩ কেভি সাবস্টেশন) ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ছিল একমাত্র দরদাতা। জলঢাকা প্ল্যান্টটি ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড, কনকর্ড প্রগতি কনসোর্টিয়াম লিমিটেড এবং পিনাকেল ঝংবিংতাই ইন্টারন্যাশনাল বিডি লিমিটেড থেকে তিনটি দরপত্র পেয়েছে। ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড এবং কনফিডেন্স পাওয়ার বগুড়া ইউনিট-২ লিমিটেড স্থানীয় গ্রিড সাবস্টেশনের সঙ্গে সংযুক্ত ৫০ মেগাওয়াট প্ল্যান্টের জন্য দরপত্র জমা দিয়েছে। বিবিয়ানা ২৩০/১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড সাবস্টেশনের সঙ্গে সংযুক্ত প্ল্যান্টটি পিএইচএল-পিটিএল জেভি (প্যারামাউন্ট), দেশ এনার্জি চাঁদপুর পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড এবং এমটিএল-সিএইচআই-পিসিএল-এমএসএল জেভি থেকে দরপত্র পেয়েছে। মুক্তাগাছা ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড সাবস্টেশনের সঙ্গে সংযুক্ত প্ল্যান্টের জন্য ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ছিল একমাত্র দরদাতা আর শাহজিবাজারের সঙ্গে সংযুক্ত প্ল্যান্টের জন্য এমটিএল-সিএইচআই-পিসিএল-এমএসএল জেভি ছিল একমাত্র দরদাতা। এছাড়া দরপত্রে জমিসংক্রান্ত শর্তে বলা হয়, জমির মালিকানাসংক্রান্ত বিষয়ে স্থানীয় এসিল্যান্ডের সনদ জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।

দরপত্রে বলা হয়েছে, ৭০ শতাংশ অর্থ ডলারে এবং ৩০ শতাংশ বাংলাদেশি টাকায় পরিশোধ করা হবে, কিন্তু স্থানীয় অংশের জন্য কোনো মুদ্রাস্ফীতি অ্যাডজাস্টমেন্ট নেই। এসব বিবেচনায় যেসব উদ্যোক্তা দরপত্রে অংশ নিয়েছে, তাদের প্রস্তাবনাগুলো সঠিকভাবে যাচাই না হলে এ উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, এ প্রকল্পে অবশ্যই বিদেশি অর্থায়ন প্রয়োজন হবে। দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশ থেকে অর্থায়ন আনার চেষ্টা করবে। তবে বিনিয়োগকারীরা গ্যারান্টি পেলেই কেবল অর্থায়ন করবে, এটাই স্বাভাবিক। এগুলো ভালোভাবে তদারক করা প্রয়োজন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুৎতের পথে সরকার

আপডেট টাইম : ০৯:৪১:৫৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি নেই, বিদ্যুতের বিল সাশ্রয় হয় এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচ খুবই কম। বাসার লাইট, ফ্যান, টিভি থেকে শুরু করে বড় শিল্পকারখানায় এ বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ সোলার প্যানেল চীন উৎপাদন করে, যা বাংলাদেশে সোলার প্রযুক্তির খরচ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় দেশে দিন দিন সোলার পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। শ্রীলঙ্কায় ৭৫ শতাংশ বিদ্যুৎ আসে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। ভারতে আসে ৪০ শতাংশ। বাংলাদেশ এগোতে পারছে না। এ ছাড়া চীনের তুলনায় বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ চার গুণ বেশি। সারা দেশে সরকারি সব স্থাপনার ছাদ ব‍্যবহার করে ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে সরকার। প্রথম ধাপে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে তিনটি মন্ত্রণালয়ের ছয়টি বিভাগ যুক্ত হয়েছে। এর আওতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের ছাদ ব্যবহার করা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে সোলার প্যানেল উৎপাদন কারখানা স্থানান্তরের আহ্বান জানানোর পর চীনের একাধিক কোম্পানি বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ পর্যালোচনা করেছে সরকার। একই সাথে দেশের বিদ্যুৎ সঙ্কট মোকাবেলায় সোলার প্যানেল উৎপাদন বাড়াতে আগামী ১৫ বছরের নতুন পরিকল্পনা করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

দেশে বিদ্যুৎ সঙ্কট নিরসনে বড় উদ্যোগ নিয়েছে নতুন সরকার। এর অংশ হিসেবে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকায় নির্মাণ করা হবে ৫৫টি সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট বা সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র। ইতোমধ্যে এর দরপত্রও আহ্বান করা হয়েছে। অর্থায়নের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় থাকায় মিলছেন না বিনিয়োগ। কিন্তু কি কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে তার কারণ জানতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল রোববার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সোলার প্যানেল বিষয়ক অনুষ্ঠিত সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেবক রহমান এ নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

আগামী ২০২৭ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক আবহাওয়া বিপর্যয়কে আরও গভীর করে তুলবে। পর্যায়ে, যা সাধারণত প্রতি ১০ থেকে ১৫ বছরে ঘটে থাকে, সমুদ্রের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হয়, যা খরা, বন্যা, দাবদাহ, ঘূর্ণিঝড় এবং সমুদ্রের বরফ হ্রাসের মতো প্রভাবকে তীব্র করে। বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে নতুন রেকর্ডে পৌঁছে দিতে পারে। সাম্প্রতিক বছর গুলোতে নির্ধারিত সর্বোচ্চ তাপমাত্রাকেও ছাড়িয়ে যাবে মত প্রকাশ করেছেন বায়ুম-লে বিজ্ঞানী পল রাউন্ডি।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে অন্যতম যন্ত্র হলো সোলার প্যানেল। সূর্য থেকে আলো ও তাপ শোষণ করে বৈদ্যুতিক প্রবাহ উৎপন্ন করে এই প্যানেল। এটি আমদানি করা হয়। দেশেও এখন সীমিত পরিসরে সোলার প্যানেল তৈরি করা হচ্ছে। এটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাকৃতিক উৎস। তাই পরিবেশবান্ধব সবুজ জ্বালানি হিসেবে দুনিয়াজুড়ে এর ব্যবহার বাড়ছে। এ ছাড়া এটি নির্মাণের পর নতুন করে জ্বালানি কেনার খরচ নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ঠেকাতে সৌরবিদ্যুৎ মূল ভরসা হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশে সোলার প্যানেল উৎপাদন কারখানা স্থানান্তরের আহ্বান জানানোর পর চীনের একাধিক কোম্পানি বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ পর্যালোচনা করেছে। বিশ্বের বৃহত্তম সৌর প্যানেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘লংগি’ বাংলাদেশে অফিস স্থাপন এবং সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত। গত মার্চে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ) বলছে,গত ২০১২ থেকে ২০২০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে ৫৬ মেগাওয়াট। বর্তমানে এটি বেড়ে ১৬০ মেগাওয়াট হয়েছে। ছাদ ব্যবহার করে বড় ধরনের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ আছে দেশে। সএটি করা গেলে তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করতে পারে সরকার। ৬০ হাজার কোটি টাকার ৫৫ সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রে অনিশ্চয়তা। ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের নামে দেশীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ও বিদেশি বিনিয়োগ এনে আত্মসাৎ করায় তা আর আলোর মুখ দেখেনি। এ কারণে মুখ থুবড়ে পড়ে পুরো প্রকল্প। জুলাই বিপ্লবের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার আগের পরিকল্পনাটি স্থগিত করে বর্তমান নতুন সরকার এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনা নিয়েছে। বিশ্ববাজারে সৌরবিদ্যুৎ যন্ত্রপাতির দাম কমছে। এতে অনেকেই বিনিয়োগে উৎসাহী হবে। সারা দেশে সরকারি সব স্থাপনার ছাদ ব‍্যবহার করে ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে সরকার। প্রথম ধাপে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে তিনটি মন্ত্রণালয়ের ছয়টি বিভাগ যুক্ত হয়েছে। এর আওতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের ছাদ ব্যবহার করা হবে। গত বছর ২১ অক্টোবর তিন মন্ত্রণালয়ের ছয়টি বিভাগের সঙ্গে আলাদা করে সমঝোতা স্মারকে সই করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগ। ছয়টি বিভাগ হলো মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ। ছাদ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা। ৪৬ হাজার ৮৫৪টি প্রতিষ্ঠানে ১ হাজার ৪৫৪ দশমিক ৬১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। যদিও এতে তেমন অগ্রগতি নেই। দরপত্রের প্রক্রিয়া শেষ করে ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে চুক্তি করার সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে ১৩টি এলাকায় গবেষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজারে দুটি বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। ফেনীতে গত ২০০৫ সালে নির্মাণ করা হয় প্রথম বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র। এটির উৎপাদন সক্ষমতা ১ মেগাওয়াটের চেয়ে কম। যা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে কয়েক বছর আগে। গত ২০০৮ সালে কক্সবাজারে ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। একই এলাকায় ৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরও একটি বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র গত বছর উৎপাদনে এসেছে। এ ছাড়া সিরাজগঞ্জে ২ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র করা হয়েছে। দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে পানি ও বায়ুবিদ্যুতের চেয়ে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় সম্ভাবনা দেখছেন সরকার।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির একাধিক উৎস আছে। দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ এবং সন্ধ্যার পর পানি ও বায়ুবিদ্যুৎ দিয়ে গ্রিডের সমতা বজায় রাখে। দেশে মূলত সম্ভাবনা আছে সৌরবিদ্যুতের। এ ক্ষেত্রে জমির স্বল্পতা একটা বড় সমস্যা। দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের শুরুটা হয় কাপ্তাইয়ের পানিবিদ্যুৎ থেকে। পার্বত্য জেলা রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে ১৯৫৭ সালে পানিবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শুরুর মধ্য দিয়ে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার শুরু হয়। এই কেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়ানো হয় ১৯৮৮ সালে। যদিও ২১০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার এ কেন্দ্র থেকে এখন উৎপাদন হয় ১০০ মেগাওয়াটের কম। ১৯৯৬ সালে শুরু হয় সোলার হোম সিস্টেম বসানোর প্রকল্প। যেসব এলাকায় বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছায়নি, সেসব এলাকার ঘরে ঘরে সৌরবিদ্যুৎ যন্ত্র বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। এ পর্যন্ত প্রায় ৬০ লাখ সোলার হোম সিস্টেম বসানো হয়েছে বলে দাবি করে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা)। এর মধ্যে দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়নের ব্যবস্থা করেছে সরকার। এ ফলে সোলার হোম সিস্টেমের বড় একটি অংশ অব্যবহৃত ও অকেজো হয়ে পড়ে রয়েছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য বলা হয়, গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে চুক্তি করে। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের জন্য চুক্তি হয়েছে ২৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের, যার সক্ষমতা ১ হাজার ১০৪ মেগাওয়াট। বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে সব মিলিয়ে ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আছে। এদের সক্ষমতা ১ হাজার ৫৯ মেগাওয়াট। এর বাইরে ৩৫৮ মেগাওয়াট সক্ষমতার ১২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন। বেসরকারি খাতে ২ হাজার ৫৯৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার আরও ৩১টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়া ছিল গত সরকারের সময়। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সম্মতিপত্র দেওয়া হয় দরপত্র ছাড়া, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইনের অধীনে। দায়মুক্তি আইন হিসেবে পরিচিত ওই আইন বাতিল করে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এর মধ্যে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ১২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা কমিটি। এগুলো এখন পিডিবির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির অপেক্ষায় আছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে। দরপত্রের মাধ্যমে যে দর পাওয়া গেছে, এগুলোর দাম আগের চেয়ে গড়ে ২১ শতাংশ কমেছে বলে বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে জানা গেছে, পাঁচ হাজার ২৩৮ মেগাওয়াটের ৫৫টি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য গত ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে গত ২০২৫ সালের মার্চের মধ্যে চারটি প্যাকেজে টেন্ডার আহ্বান করা হয়। প্রথম ধাপে তেমন সাড়া পড়েনি। দ্বিতীয় ধাপেও ১০টি প্ল্যান্টের জন্য মাত্র ২১টি দরপত্র জমা পড়ে। দরপত্র কম জমা হওয়ায় সময়সীমা পাঁচবার বাড়ানো হয়। সর্বশেষ দরপত্র খোলার নির্ধারিত গত ১৮ জুন। নতুন দরপত্রে ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক টার্নওভার চাওয়া হয়েছে ৮ দশমিক ২০ মিলিয়ন ডলার। ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল চাওয়া হয়েছে ৫৭ দশমিক ২০ মিলিয়ন ডলার এবং প্রতি মেগাওয়াটের জন্য পাঁচ হাজার ডলার টেন্ডার সিকিউরিটি চাওয়া হয়েছে। এছাড়া ভূমির জন্য স্থানীয় এসিল্যান্ড এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার ছাড়পত্র চাওয়া হয়েছে। এককভাবে ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড বিভিন্ন ক্ষমতার ২৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দরপত্র জমা দেয়। এককভাবে এটিই সবচেয়ে বেশি। এছাড়া দেশ এনার্জি ৯টি, কনফিডেন্স সাতটি, বারাকা ছয়টি এবং মীর পাঁচটি। কক্সবাজার (উত্তর) ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড সাবস্টেশনের সঙ্গে সংযুক্ত ৫০ মেগাওয়াট প্রস্তাবিত সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড, কর্ণফুলী-বারাকা শিকলবাহা কনসোর্টিয়াম এবং কনফিডেন্স পাওয়ার বগুড়া ইউনিট-২ লিমিটেড থেকে তিনটি দরপত্র পাওয়া গেছে। কক্সবাজার ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড সাবস্টেশনের সঙ্গে সংযুক্ত আরেকটি প্ল্যান্টও একইভাবে তিনটি প্রতিষ্ঠান থেকে দরপত্র পেয়েছে। গোপালগঞ্জ প্ল্যান্টের জন্য (একটি ১৩২/৩৩ কেভি সাবস্টেশন) ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড, দেশ এনার্জি, চাঁদপুর পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড এবং বিজনেস রিসার্চ ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন ইনক ও চাংঝু ট্রিনা ইন্টেলিজেন্স এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের একটি যৌথ উদ্যোগ থেকে তিনটি দরপত্র জমা পড়েছে। চুয়াডাঙ্গার প্ল্যান্টের জন্য (একটি ১৩২/৩৩ কেভি সাবস্টেশন) ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ছিল একমাত্র দরদাতা। জলঢাকা প্ল্যান্টটি ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড, কনকর্ড প্রগতি কনসোর্টিয়াম লিমিটেড এবং পিনাকেল ঝংবিংতাই ইন্টারন্যাশনাল বিডি লিমিটেড থেকে তিনটি দরপত্র পেয়েছে। ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড এবং কনফিডেন্স পাওয়ার বগুড়া ইউনিট-২ লিমিটেড স্থানীয় গ্রিড সাবস্টেশনের সঙ্গে সংযুক্ত ৫০ মেগাওয়াট প্ল্যান্টের জন্য দরপত্র জমা দিয়েছে। বিবিয়ানা ২৩০/১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড সাবস্টেশনের সঙ্গে সংযুক্ত প্ল্যান্টটি পিএইচএল-পিটিএল জেভি (প্যারামাউন্ট), দেশ এনার্জি চাঁদপুর পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড এবং এমটিএল-সিএইচআই-পিসিএল-এমএসএল জেভি থেকে দরপত্র পেয়েছে। মুক্তাগাছা ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড সাবস্টেশনের সঙ্গে সংযুক্ত প্ল্যান্টের জন্য ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ছিল একমাত্র দরদাতা আর শাহজিবাজারের সঙ্গে সংযুক্ত প্ল্যান্টের জন্য এমটিএল-সিএইচআই-পিসিএল-এমএসএল জেভি ছিল একমাত্র দরদাতা। এছাড়া দরপত্রে জমিসংক্রান্ত শর্তে বলা হয়, জমির মালিকানাসংক্রান্ত বিষয়ে স্থানীয় এসিল্যান্ডের সনদ জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।

দরপত্রে বলা হয়েছে, ৭০ শতাংশ অর্থ ডলারে এবং ৩০ শতাংশ বাংলাদেশি টাকায় পরিশোধ করা হবে, কিন্তু স্থানীয় অংশের জন্য কোনো মুদ্রাস্ফীতি অ্যাডজাস্টমেন্ট নেই। এসব বিবেচনায় যেসব উদ্যোক্তা দরপত্রে অংশ নিয়েছে, তাদের প্রস্তাবনাগুলো সঠিকভাবে যাচাই না হলে এ উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, এ প্রকল্পে অবশ্যই বিদেশি অর্থায়ন প্রয়োজন হবে। দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশ থেকে অর্থায়ন আনার চেষ্টা করবে। তবে বিনিয়োগকারীরা গ্যারান্টি পেলেই কেবল অর্থায়ন করবে, এটাই স্বাভাবিক। এগুলো ভালোভাবে তদারক করা প্রয়োজন।