দেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাত এক সময় দ্রুত প্রবৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হলেও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নানা অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং আস্থার সংকট এ খাতকে বড় ধরনের চাপে ফেলেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে রেমিট্যান্স সংগ্রহ ও আমানত প্রবাহে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ব্যাংকিং খাতের আমানত প্রবাহে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর অংশ ক্রমেই কমে আসছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে মোট আমানতে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের অংশ সাড়ে ২৪ শতাংশের নিচে নেমেছে, যা এক বছর আগেও ছিল প্রায় ২৫ শতাংশ। এ সময়ে প্রবাসী আয় সংগ্রহে তাদের অংশ দাঁড়িয়েছে ২৬ শতাংশের কম, যা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ছিল ৩৬ শতাংশের বেশি। এ ছাড়া একীভূত হওয়া ৫ ইসলামী ব্যাংক এখনও তারল্য সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
মূলত নতুন আমানত সংগ্রহের গতি কমে যাওয়া এবং পুরনো আমানতের একটি অংশ তুলে নেওয়ার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল শক্তি ছিল গ্রাহকের আস্থা ও শরিয়াহভিত্তিক পরিচালনার স্বচ্ছতা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঋণ বিতরণে অনিয়ম, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার
দুর্বলতা এবং কিছু প্রতিষ্ঠানে করপোরেট সুশাসনের ঘাটতি এ ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দিয়েছে। ফলে আমানতকারীদের একটি অংশ ধীরে ধীরে প্রচলিত ব্যাংক বা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে ঝুঁকছে।
দেশে বর্তমানে ৬১টি তফসিলি ব্যাংক রয়েছে। এর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক ১০টি। আর ১৭টি ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং শাখা রয়েছে। এর বাইরে শুধু ‘উইন্ডো’ রয়েছে প্রচলতি ধারার ২১টি ব্যাংকের। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ৭৩ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মোট আমানত ৪ লাখ ৮১ হাজার ১৯২ কোটি টাকা। এটি মোট আমানতের ২৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। তিন মাস আগে ১৯ লাখ ১৪ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকার আমানতের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের অংশ ছিল ৪ লাখ ৭০ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা বা ২৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ। আর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ১৭ লাখ ৭৬ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা আমানতের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের অংশ ছিল ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা বা ২৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
মূলত ২০২২ সালে কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকের অনিয়ম ও জালিয়াতির তথ্য সামনে আসার পর আতঙ্কিত হয়ে অনেকেই আমানত তুলে নিতে শুরু করেন। আবার নতুন আমানত আসাও কমতে শুরু করে। সূত্রগুলো বলছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে এক ডজনেরও বেশি ব্যাংকে সীমাহীন লুটপাট হয়েছে; যার অর্ধেকের বেশি শরিয়াভিত্তিক ব্যাংক। লুটপাটের মাধ্যমে এসব ব্যাংক থেকে ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এরই মধ্যে পাঁচটি শরিয়াহ ব্যাংককে দুর্দশাগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করে একীভূত করে রাষ্ট্রীয় মালিকানার একটি শরিয়াহ ব্যাংক করার উদ্যোগ নিয়েছে। এ তালিকায় রয়েছে এক্সিম, সোশ্যাল ইমলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এর মধ্যে প্রথম চারটি বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল, আর এক্সিম ব্যাংক ছিল নাসা গ্রুপের নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে। গত এক বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের তারল্য সহায়তা দিয়েও এসব ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটানো যায়নি। তাই আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ফেরাতে এসব ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
শুধু আমানত সংগ্রহ নয়, ঋণ বিতরণেও (বিনিয়োগ) ইসলামী ব্যাংকিংয়ের অংশ কমেছে। গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে মোট ঋণ বিতরণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৪ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ঋণ বিতরণের অংশ ৫ লাখ ২৫ হাজার ৭১ কোটি টাকা বা ২৯ দশমিক ১০ শতাংশ। তিন মাস আগে গত সেপ্টেম্বরে ব্যাংক খাতে ঋণ বিতরণের স্থিতি ছিল ১৭ লাখ ৭১ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকিংয়ে ঋণ বিতরণের অংশ ছিল ৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা বা ২৯ দশমিক ২২ শতাংশ।
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, গত বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর এ তিন মাসে ব্যাংক খাতের মাধ্যমে মোট রেমিট্যান্স আসে ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এসেছে ২৭ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা বা ২৫ দশমিক ৯৭ শতাংশ। ২০২৪ সালের একই সময়ে ব্যাংক খাতের মাধ্যমে রেমিট্যান্স এসেছিল ৮৬ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এসেছিল ৩১ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা বা ৩৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
এদিকে গত ডিসেম্বরে এ খাতের ৫টি ব্যাংক তারল্য ঘাটতিতে ছিল। ব্যাংকগুলো হলোÑ সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক।
তবে সার্বিকভাবে ইসলামী ব্যাংকিং খাতে তারল্য উদ্বৃত্ত রয়েছে। গত ডিসেম্বরে এ খাতে তারল্য উদ্বৃত্ত ছিল ১৯ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। মূলত প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর ইসলামী ব্যাংকিং শাখা এবং উইন্ডোতে ব্যাপক প্রবৃদ্ধির কারণে সামগ্রিকভাবে তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
Reporter Name 

























