ঢাকা ০৭:১৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬, ১৫ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

অষ্টগ্রামে মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্র দখলে: চিকিৎসা সেবার বদলে দোকানপাট, চরম ভোগান্তিতে জনপদ

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৭:১৪:৪৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬
  • ০ বার

Oplus_16908288

কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নে অবস্থিত একসময়ের গুরুত্বপূর্ণ মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি আজ পরিণত হয়েছে অবহেলা, দখল ও বিশৃঙ্খলার এক করুণ প্রতিচ্ছবিতে। যেখানে একসময় মা ও শিশুদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হতো, সেখানে এখন গড়ে উঠেছে অসংখ্য টিনশেড দোকান—চলছে বাণিজ্যিক কার্যক্রম।

ধ্বংসস্তূপে পরিণত স্বাস্থ্যকেন্দ্র:

১৯৬৫ সালে ৪২ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে আশপাশের মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা ছিল। কিন্তু প্রায় দুই দশক আগে চিকিৎসকের অবসরের পর আর কোনো চিকিৎসক নিয়োগ না হওয়ায় কেন্দ্রটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ধীরে ধীরে প্রভাবশালী একটি মহল পুরো এলাকাটি দখলে নিয়ে সেখানে দোকানপাট স্থাপন করে।

বর্তমানে ভবনটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। দরজা-জানালা নেই, দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়ে মরিচাধরা রড বেরিয়ে এসেছে। ভেতরে জমেছে ময়লা-আবর্জনা, সৃষ্টি হয়েছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। একসময়ের প্রাণবন্ত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি এখন পরিত্যক্ত ধ্বংসস্তূপ।

দুর্গম এলাকায় চরম স্বাস্থ্য সংকট:

অষ্টগ্রামের আদমপুর ইউনিয়ন একটি হাওরবেষ্টিত দুর্গম এলাকা। উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে এর দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার। যাতায়াতের জন্য নির্ভর করতে হয় নৌকা, পায়ে হাঁটা কিংবা সীমিত যানবাহনের ওপর। পাশের আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন এলাকাতেও কার্যকর কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকায় এই কেন্দ্রটিই ছিল দুই ইউনিয়নের মানুষের একমাত্র চিকিৎসা ভরসা।

বর্তমানে সামান্য চিকিৎসার জন্যও যেতে হচ্ছে কিশোরগঞ্জ জেলা সদর কিংবা হবিগঞ্জ—যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি সাধারণ চিকিৎসা নিতে গিয়েও খরচ হচ্ছে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা, যা দরিদ্র মানুষের জন্য বড় ধরনের চাপ।

দখল, ভাড়া ও অনিয়মের অভিযোগ:

স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি সম্পত্তি হওয়া সত্ত্বেও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জমিতে দোকান বসিয়ে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। অনেক ব্যবসায়ী মাসিক ভাড়া দিয়ে দোকান পরিচালনা করছেন, আবার কেউ কেউ স্থায়ী দোকানও নির্মাণ করেছেন। এতে করে সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তিগত আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

তবে অভিযুক্ত পক্ষের দাবি, জমির একটি অংশ নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। সরকার চাইলে জমি ছেড়ে দিতে তারা প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ক্ষোভে ফুঁসছে স্থানীয়রা:

এলাকার প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, একসময় এই কেন্দ্র থেকেই সহজে চিকিৎসা পাওয়া যেত। বর্তমানে সামান্য অসুস্থতায়ও দূরে যেতে হচ্ছে, যা সময় ও অর্থ—দুটোই নষ্ট করছে। স্থানীয় তরুণ সমাজও স্বাস্থ্যসেবার এই সংকটে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

প্রশাসনের আশ্বাস, বাস্তবায়ন অনিশ্চিত:

অষ্টগ্রাম উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে জমি সংক্রান্ত মামলা জটিলতার কারণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হচ্ছে।
এদিকে, পাশের এলাকায় ১০ শয্যার একটি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের ভবন নির্মিত হলেও সেখানে এখনো চিকিৎসাসেবা চালু হয়নি, যা পুরো অঞ্চলের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলেছে।

দ্রুত সমাধানের দাবি:

স্থানীয়দের একটাই দাবি—আইনি জটিলতা দ্রুত নিষ্পত্তি করে দখলদারদের উচ্ছেদ এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি পুনরায় চালু করা হোক। অন্যথায়, এই জনপদের মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

একসময়ের প্রাণচঞ্চল এই স্বাস্থ্যকেন্দ্র আজ নীরবে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে—অবহেলা ও দখলের এই চক্র থেকে কবে মুক্তি পাবে সাধারণ মানুষ?

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

অষ্টগ্রামে মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্র দখলে: চিকিৎসা সেবার বদলে দোকানপাট, চরম ভোগান্তিতে জনপদ

আপডেট টাইম : ০৭:১৪:৪৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬

কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নে অবস্থিত একসময়ের গুরুত্বপূর্ণ মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি আজ পরিণত হয়েছে অবহেলা, দখল ও বিশৃঙ্খলার এক করুণ প্রতিচ্ছবিতে। যেখানে একসময় মা ও শিশুদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হতো, সেখানে এখন গড়ে উঠেছে অসংখ্য টিনশেড দোকান—চলছে বাণিজ্যিক কার্যক্রম।

ধ্বংসস্তূপে পরিণত স্বাস্থ্যকেন্দ্র:

১৯৬৫ সালে ৪২ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে আশপাশের মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা ছিল। কিন্তু প্রায় দুই দশক আগে চিকিৎসকের অবসরের পর আর কোনো চিকিৎসক নিয়োগ না হওয়ায় কেন্দ্রটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ধীরে ধীরে প্রভাবশালী একটি মহল পুরো এলাকাটি দখলে নিয়ে সেখানে দোকানপাট স্থাপন করে।

বর্তমানে ভবনটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। দরজা-জানালা নেই, দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়ে মরিচাধরা রড বেরিয়ে এসেছে। ভেতরে জমেছে ময়লা-আবর্জনা, সৃষ্টি হয়েছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। একসময়ের প্রাণবন্ত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি এখন পরিত্যক্ত ধ্বংসস্তূপ।

দুর্গম এলাকায় চরম স্বাস্থ্য সংকট:

অষ্টগ্রামের আদমপুর ইউনিয়ন একটি হাওরবেষ্টিত দুর্গম এলাকা। উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে এর দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার। যাতায়াতের জন্য নির্ভর করতে হয় নৌকা, পায়ে হাঁটা কিংবা সীমিত যানবাহনের ওপর। পাশের আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন এলাকাতেও কার্যকর কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকায় এই কেন্দ্রটিই ছিল দুই ইউনিয়নের মানুষের একমাত্র চিকিৎসা ভরসা।

বর্তমানে সামান্য চিকিৎসার জন্যও যেতে হচ্ছে কিশোরগঞ্জ জেলা সদর কিংবা হবিগঞ্জ—যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি সাধারণ চিকিৎসা নিতে গিয়েও খরচ হচ্ছে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা, যা দরিদ্র মানুষের জন্য বড় ধরনের চাপ।

দখল, ভাড়া ও অনিয়মের অভিযোগ:

স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি সম্পত্তি হওয়া সত্ত্বেও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জমিতে দোকান বসিয়ে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। অনেক ব্যবসায়ী মাসিক ভাড়া দিয়ে দোকান পরিচালনা করছেন, আবার কেউ কেউ স্থায়ী দোকানও নির্মাণ করেছেন। এতে করে সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তিগত আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

তবে অভিযুক্ত পক্ষের দাবি, জমির একটি অংশ নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। সরকার চাইলে জমি ছেড়ে দিতে তারা প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ক্ষোভে ফুঁসছে স্থানীয়রা:

এলাকার প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, একসময় এই কেন্দ্র থেকেই সহজে চিকিৎসা পাওয়া যেত। বর্তমানে সামান্য অসুস্থতায়ও দূরে যেতে হচ্ছে, যা সময় ও অর্থ—দুটোই নষ্ট করছে। স্থানীয় তরুণ সমাজও স্বাস্থ্যসেবার এই সংকটে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

প্রশাসনের আশ্বাস, বাস্তবায়ন অনিশ্চিত:

অষ্টগ্রাম উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে জমি সংক্রান্ত মামলা জটিলতার কারণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হচ্ছে।
এদিকে, পাশের এলাকায় ১০ শয্যার একটি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের ভবন নির্মিত হলেও সেখানে এখনো চিকিৎসাসেবা চালু হয়নি, যা পুরো অঞ্চলের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলেছে।

দ্রুত সমাধানের দাবি:

স্থানীয়দের একটাই দাবি—আইনি জটিলতা দ্রুত নিষ্পত্তি করে দখলদারদের উচ্ছেদ এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি পুনরায় চালু করা হোক। অন্যথায়, এই জনপদের মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

একসময়ের প্রাণচঞ্চল এই স্বাস্থ্যকেন্দ্র আজ নীরবে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে—অবহেলা ও দখলের এই চক্র থেকে কবে মুক্তি পাবে সাধারণ মানুষ?