ঢাকা ০৩:৪৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
জনগণের দোরগোড়ায় দ্রুত সেবা পৌঁছে দিতে হবে : ডিএসসিসি প্রশাসক বগুড়াকে আধুনিক শিক্ষা নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে চান প্রধানমন্ত্রী: শিক্ষামন্ত্রী আগামী বৈশাখ থেকে প্রতি জেলায় হবে গ্রামীণ খেলাধুলা : ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জুন মাসের মধ্যে হেলথ কার্ড দেওয়া হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিরোধী দলের ওপর স্বৈরাচারের ভূত আছর করেছে : প্রধানমন্ত্রী মাদক নির্মূলে শিগগিরই শুরু হবে বিশেষ অভিযান : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বৈশাখী সাজে শোবিজ তারকারা জুলাই সনদের প্রত্যেকটি অক্ষর বিএনপি বাস্তবায়ন করবে: প্রধানমন্ত্রী হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী ‘লাল কাপড়ের মোড়ানো খাতা’ কৃষি ও কৃষকই অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি: তথ্যমন্ত্রী

বাংলাদেশের ভোটে বিশ্ববাসীর চোখ

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:৪১:৪১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৪১ বার

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিনে সাংবিধানিক, নির্বাচনী ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বিষয়ে গণভোটও হবে, যা দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামোকে নতুন রূপ দেবে বলে দাবি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের। এই জোড়া ভোটকে কেন্দ্র করে বিশ্ববাসীর নজর এখন বাংলাদেশের দিকে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ববাসী মূলত এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতিফলন দেখতে চায়। আন্তর্জাতিক মহলের প্রত্যাশা—এই নির্বাচন হবে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ, যা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আস্থাহীনতা দূর করবে। বিশ্ববাসী চায় বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক উত্তরণ যেন স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কোনো অস্থিরতা তৈরি না করে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, ভারত ও পাকিস্তানসহ প্রভাবশালী দেশগুলো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের রূপরেখা এবং অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতা নিয়ে গভীর আগ্রহী।

এবারের নির্বাচন ঘিরে বিদেশিদের আগ্রহ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বিভিন্ন দেশ থেকে শুরু করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কমনওয়েলথের মতো সংস্থাগুলো নিবিড়ভাবে এই প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও এই নির্বাচনকে ঘিরে সক্রিয়। তাদের প্রধান উদ্বেগ ও চাওয়া হলো—নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় মানবাধিকারের পূর্ণ সুরক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং নাগরিকদের ভয়-ডরহীন অংশগ্রহণ।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই নির্বাচনকে একটি ‘লিটমাস টেস্ট’ হিসেবে দেখছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো সংস্থাগুলো এরই মধ্যে মানবাধিকার রক্ষা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে কড়া তাগিদ দিয়েছে। বিদেশিদের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা; তবে তাদের মনে রয়েছে কিছু গভীর শঙ্কাও। বিশেষ করে ইসলামপন্থি দলগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের অনুপস্থিতিতে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বিরাজ করছে। তাদের ভয়, রাজনৈতিক বিভাজন যদি চরম আকার ধারণ করে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এই বহুমুখী প্রত্যাশা আর শঙ্কাকে সঙ্গী করেই বিশ্ববাসী এখন বাংলাদেশের ভোটের দিনটির অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। দায়িত্ব নেওয়ার পরই সরকার একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের তারিখ নির্ধারিত হয়। প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটার এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন, যেখানে ৩০০ আসনে লড়ছেন এক হাজারেরও বেশি প্রার্থী। সরকারের পক্ষ থেকে একে ‘ইতিহাসের সেরা ও সর্বাধিক স্বচ্ছ নির্বাচন’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস গত বছরের আগস্টে এই নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করেন এবং ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ জারি করেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিক সংস্কার। এবারের নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি জোট এবং ১১ দলীয় জামায়াত-ই-ইসলামী জোট।

বিদেশিদের আগ্রহের কারণ কী: বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব একে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র চায় বাংলাদেশে চীনের প্রভাব কমাতে। বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে পণ্য আমদানি করে এবং চীনের বিনিয়োগ নেয়। বাংলাদেশসহ পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে সীমান্ত থাকা ভারত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে চীন তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অংশ হিসেবে চট্টগ্রামে শিল্পাঞ্চল বিনিয়োগ এবং তিস্তা প্রকল্পে যুক্ত হতে চায়। এ লক্ষ্যে দেশটি সব দলের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখছে। এদিকে গণতান্ত্রিক সরকার এবং মানবাধিকারের সুরক্ষা চায় যুক্তরাষ্ট্র। বাণিজ্য ও সামরিক খাতে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য একটি উদার সরকার প্রত্যাশা করে দেশটি। পাকিস্তান এতদিন বাংলাদেশের রাজনীতিতে দৃশ্যমান সক্রিয়তা না দেখালেও অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বে আসার পর নানা ক্ষেত্রে নিজেদের আগ্রহ প্রকাশ করছে। বাণিজ্য ও শ্রম অধিকার প্রত্যাশা করা ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে নির্বাচনী সংস্কার এবং সহিংসতা এড়াতে চায়। মূলত সবাই চায় একটি স্থিতিশীল সরকার, যা তাদের অর্থনৈতিক এবং ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করবে।

বাংলাদেশ নিয়ে চীন ও পশ্চিমাদের আগ্রহের কারণ কী জানতে চাইলে চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ কালবেলাকে বলেন, এ দেশগুলোর বহুমুখী ব্যবসা রয়েছে, বিনিয়োগ রয়েছে, ফলে তারা বাংলাদেশকে নজরে রাখবে এটি স্বাভাবিক। যদি নির্বাচিত সরকার এ দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে কাজ না করে তাহলে বাংলাদেশ ক্ষতির মুখে পড়লে সেসব দেশেরও স্বার্থের ক্ষতি হবে।

বাংলাদেশ ঘিরে চীন ও পাকিস্তানের এমন সক্রিয় আগ্রহ আগে দেখা যায়নি মন্তব্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ কালবেলাকে বলেন, ‘অতীতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বা নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে বিদেশি আগ্রহের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা সবসময়ই লক্ষণীয় ছিল। তারা গণতান্ত্রিক মান, মানবাধিকার এবং সুশাসনের প্রশ্ন তুলে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও মন্তব্য করতেন। এটা নতুন কিছু নয়; কিন্তু চীন ও পাকিস্তানের এ ধরনের সক্রিয় আগ্রহ বা প্রকাশ্য অবস্থান গ্রহণের ঘটনা অতীতে তেমন দেখা যায়নি।’

তিনি বলেন, ‘চীন সাধারণত অহস্তক্ষেপ নীতির আড়ালে থেকে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোকেন্দ্রিক সম্পর্ক বজায় রাখত, আর পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কও মূলত ঐতিহাসিক ও কৌশলগত দূরত্বের কারণে সীমিত ছিল। এবারের পরিস্থিতিতে চীন ও পাকিস্তানের তুলনামূলকভাবে বেশি দৃশ্যমান ও সক্রিয় অবস্থান। চীন এখন শুধু বিনিয়োগকারী নয়, স্থানীয় জনমত ও রাজনৈতিক গতিপ্রবাহের প্রতি সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানও নিজের অবস্থানকে আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশ করছে। পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘ দূরত্ব থাকলেও এখন প্রেক্ষাপটের ফলে তারাও দৌড়ঝাঁপ চালাচ্ছে, যা আসলেই অবাক করার মতো।’

রেকর্ডসংখ্যক বিদেশি পর্যবেক্ষক: নির্বাচনের স্বচ্ছতা যাচাই করতে প্রায় ৫০০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক ঢাকায় আসছেন। এর মধ্যে ৩৫০ জনের বেশি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ১৭৮ জন এবং ওয়াইসি থেকে ৬৩ জন পর্যবেক্ষক আসছেন। এ ছাড়া ১৬টি দেশ থেকে ৫৭ জন দ্বিপক্ষীয় পর্যবেক্ষক আসছেন, যার মধ্যে মালয়েশিয়া থেকে সর্বোচ্চ ১৪ জন, তুরস্ক থেকে ১২, ইন্দোনেশিয়া থেকে ৫, জাপান থেকে ৪, পাকিস্তান থেকে ৩ এবং চীন, ভুটান, মালদ্বীপ, ফিলিপাইন, জর্ডান, জর্জিয়া, রাশিয়া, কিরগিজস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা প্রভৃতি দেশ থেকে ১-২ জন করে। এ ছাড়া ৩২ জন ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষকও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যোগ দিচ্ছেন।

কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষক দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ঘানার সাবেক প্রেসিডেন্ট নানা আকুফো-আড্ডো। এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনসও ২২ সদস্যের দল পাঠিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ব্যাপক আন্তর্জাতিক উপস্থিতি নির্বাচনের স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

নির্বাচন ঘিরে বেড়েছে কূটনীতিকদের দৌড়ঝাঁপ: নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিকদের তৎপরতা তত বাড়ছে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে তাদের কাছে। দফায় দফায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে দেখা করছেন প্রভাবশালী বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা। এ বিষয়ে সরকারের এক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ‘শেষ এ মুহূর্তে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে বিদেশিদের তেমন কিছু পাওয়ার নেই—এমন বাস্তবতা দেশগুলো বুঝতে পেরে রাজনৈতিক দলগুলোকেই এ মুহূর্তে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।’

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানাচ্ছে, বিদেশিরা মূলত ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্র পরিচালনা কেমন হবে এবং বিনিয়োগের নিরাপত্তা কী থাকবে, তার নিশ্চয়তা খুঁজছে। গত ২৫ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইইউ ও জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ ছাড়া মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন এবং ইইউ অ্যাম্বাসাডর মাইকেল মিলার নিয়মিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।

বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে বিদেশিদের রসায়ন: গত জানুয়ারি থেকে বিএনপি প্রায় ১৫টি কূটনৈতিক বৈঠক করেছে। ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাও তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর যোগাযোগ নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। মার্কিন দূতাবাসের একটি সূত্র কালবেলাকে বলেন, ‘বিগত সময়ে জামায়াতের উত্থানের এমন অপার সম্ভাবনা লক্ষ্য হয়নি ফলে আমরা সেসময় কেবল দলটির সঙ্গে ক্যাজুয়াল আলোচনা বা যোগাযোগ রাখতাম। তবে চব্বিশ-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ইসলামী দলের উত্থান আমরা দেখতে পাচ্ছি, তাই দলটির সঙ্গে আমাদের সংযোগ বেড়েছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়মিত কাজের অংশ।’

এদিকে, ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মার্কিন কূটনীতিকরা জামায়াতকে ‘বন্ধু’ হিসেবে পেতে আগ্রহী এবং তাদের আলোচনায় নিয়ে আসার পরামর্শ দিচ্ছেন। যদিও অফিসিয়াল অবস্থান অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট দলকে সমর্থন করে না, তবে বিশ্লেষকরা একে ‘প্র্যাগম্যাটিক কূটনীতি’ হিসেবে দেখছেন।

আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি ও বৈধতার সংকট: দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী দল আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এবারের নির্বাচনকে এক অদ্ভুত সমীকরণে দাঁড় করিয়েছে। অনেকে মনে করছেন, ভোটারদের একটি বড় অংশ প্রতিনিধিত্বহীন থাকায় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ কালবেলাকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ না করার বিষয়টি শেষ পর্যন্ত দেশের জনগণের অবস্থান ও প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমেই স্পষ্ট হবে এবং এটাই বিশ্ববাসীকে সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তা দেবে। নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার যদি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় অথবা জনগণ যদি আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও সেই প্রশ্নগুলো অনিবার্যভাবে তুলবে।’ তিনি আরও যোগ করেন যে, ২০২৪ সালে বিএনপির অনুপস্থিতিতে যেমন প্রশ্ন উঠেছিল, এবারও একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হতে পারে।

মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ: আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল নির্বাচনের আগে মানবাধিকার সমুন্নত রাখার দাবি জানিয়েছে। সংস্থাটির মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড এক চিঠিতে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইনে দেশটির ওপর থাকা বাধ্যবাধকতা মেনে মানবাধিকার সমুন্নত রাখার ম্যান্ডেট বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের রয়েছে। সরকার সেই দায়িত্ব পালন করবে কি না, তা প্রমাণে আগামী কয়েকটি সপ্তাহ হবে চূড়ান্ত পরীক্ষা।’ চিঠিতে সাংবাদিকদের ওপর সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহার এবং ময়মনসিংহে গণপিটুনির মতো ঘটনার নিন্দা জানানো হয়েছে।

ভোটের পরিবেশ নিয়ে আছে শঙ্কাও: ভোটের পরিবেশ নিয়ে বিদেশি কূটনীতিকদের মধ্যে শঙ্কাও কম নয়। ইসলামপন্থি দলগুলোর দ্রুত উত্থান এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। ভারত এরই মধ্যে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে তাদের কূটনীতিকদের পরিবারকে সরিয়ে নিয়েছে। যদিও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন দাবি করেছেন, বিদেশি কর্মকর্তাদের নিরাপত্তায় কোনো ঝুঁকি নেই।

ঢাকায় নিযুক্ত একাধিক বিদেশি কূটনীতিক নির্বাচন ইস্যুতে কালবেলাকে জানায়, আসন্ন নির্বাচন নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হোক এটা তাদের প্রথম চাওয়া। তবে ক্ষমতায় যে সরকারই আসবে তাকে ভারসাম্য রক্ষার নীতি মেনে চলতে হবে বলে তারা মনে করেন।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বর্তমানে যে মতপার্থক্য বিরাজ করছে তা ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য অশনিসংকেত উল্লেখ করে পশ্চিমা দেশের এক কূটনীতিক বলেন, নির্বাচনের পরেও দলগুলোর মধ্যে বিভাজনের রাজনীতি করার প্রবণতা লক্ষনীয়। তবে বাংলাদেশের রাজনীতি ‘ইসলামিক’ দিকে কিছুটা সরে যাচ্ছে। ফলে নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক, নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার জন্য ইসলামপন্থি দলগুলোর সঙ্গে তারা যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন, যাতে অর্থনৈতিক লিভারেজ ব্যবহার করে পরিস্থিতি ‘ম্যানেজেবল’ রাখা যায়।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

জনগণের দোরগোড়ায় দ্রুত সেবা পৌঁছে দিতে হবে : ডিএসসিসি প্রশাসক

বাংলাদেশের ভোটে বিশ্ববাসীর চোখ

আপডেট টাইম : ১১:৪১:৪১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিনে সাংবিধানিক, নির্বাচনী ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বিষয়ে গণভোটও হবে, যা দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামোকে নতুন রূপ দেবে বলে দাবি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের। এই জোড়া ভোটকে কেন্দ্র করে বিশ্ববাসীর নজর এখন বাংলাদেশের দিকে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ববাসী মূলত এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতিফলন দেখতে চায়। আন্তর্জাতিক মহলের প্রত্যাশা—এই নির্বাচন হবে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ, যা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আস্থাহীনতা দূর করবে। বিশ্ববাসী চায় বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক উত্তরণ যেন স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কোনো অস্থিরতা তৈরি না করে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, ভারত ও পাকিস্তানসহ প্রভাবশালী দেশগুলো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের রূপরেখা এবং অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতা নিয়ে গভীর আগ্রহী।

এবারের নির্বাচন ঘিরে বিদেশিদের আগ্রহ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বিভিন্ন দেশ থেকে শুরু করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কমনওয়েলথের মতো সংস্থাগুলো নিবিড়ভাবে এই প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও এই নির্বাচনকে ঘিরে সক্রিয়। তাদের প্রধান উদ্বেগ ও চাওয়া হলো—নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় মানবাধিকারের পূর্ণ সুরক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং নাগরিকদের ভয়-ডরহীন অংশগ্রহণ।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই নির্বাচনকে একটি ‘লিটমাস টেস্ট’ হিসেবে দেখছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো সংস্থাগুলো এরই মধ্যে মানবাধিকার রক্ষা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে কড়া তাগিদ দিয়েছে। বিদেশিদের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা; তবে তাদের মনে রয়েছে কিছু গভীর শঙ্কাও। বিশেষ করে ইসলামপন্থি দলগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের অনুপস্থিতিতে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বিরাজ করছে। তাদের ভয়, রাজনৈতিক বিভাজন যদি চরম আকার ধারণ করে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এই বহুমুখী প্রত্যাশা আর শঙ্কাকে সঙ্গী করেই বিশ্ববাসী এখন বাংলাদেশের ভোটের দিনটির অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। দায়িত্ব নেওয়ার পরই সরকার একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের তারিখ নির্ধারিত হয়। প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটার এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন, যেখানে ৩০০ আসনে লড়ছেন এক হাজারেরও বেশি প্রার্থী। সরকারের পক্ষ থেকে একে ‘ইতিহাসের সেরা ও সর্বাধিক স্বচ্ছ নির্বাচন’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস গত বছরের আগস্টে এই নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করেন এবং ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ জারি করেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিক সংস্কার। এবারের নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি জোট এবং ১১ দলীয় জামায়াত-ই-ইসলামী জোট।

বিদেশিদের আগ্রহের কারণ কী: বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব একে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র চায় বাংলাদেশে চীনের প্রভাব কমাতে। বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে পণ্য আমদানি করে এবং চীনের বিনিয়োগ নেয়। বাংলাদেশসহ পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে সীমান্ত থাকা ভারত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে চীন তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অংশ হিসেবে চট্টগ্রামে শিল্পাঞ্চল বিনিয়োগ এবং তিস্তা প্রকল্পে যুক্ত হতে চায়। এ লক্ষ্যে দেশটি সব দলের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখছে। এদিকে গণতান্ত্রিক সরকার এবং মানবাধিকারের সুরক্ষা চায় যুক্তরাষ্ট্র। বাণিজ্য ও সামরিক খাতে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য একটি উদার সরকার প্রত্যাশা করে দেশটি। পাকিস্তান এতদিন বাংলাদেশের রাজনীতিতে দৃশ্যমান সক্রিয়তা না দেখালেও অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বে আসার পর নানা ক্ষেত্রে নিজেদের আগ্রহ প্রকাশ করছে। বাণিজ্য ও শ্রম অধিকার প্রত্যাশা করা ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে নির্বাচনী সংস্কার এবং সহিংসতা এড়াতে চায়। মূলত সবাই চায় একটি স্থিতিশীল সরকার, যা তাদের অর্থনৈতিক এবং ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করবে।

বাংলাদেশ নিয়ে চীন ও পশ্চিমাদের আগ্রহের কারণ কী জানতে চাইলে চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ কালবেলাকে বলেন, এ দেশগুলোর বহুমুখী ব্যবসা রয়েছে, বিনিয়োগ রয়েছে, ফলে তারা বাংলাদেশকে নজরে রাখবে এটি স্বাভাবিক। যদি নির্বাচিত সরকার এ দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে কাজ না করে তাহলে বাংলাদেশ ক্ষতির মুখে পড়লে সেসব দেশেরও স্বার্থের ক্ষতি হবে।

বাংলাদেশ ঘিরে চীন ও পাকিস্তানের এমন সক্রিয় আগ্রহ আগে দেখা যায়নি মন্তব্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ কালবেলাকে বলেন, ‘অতীতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বা নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে বিদেশি আগ্রহের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা সবসময়ই লক্ষণীয় ছিল। তারা গণতান্ত্রিক মান, মানবাধিকার এবং সুশাসনের প্রশ্ন তুলে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও মন্তব্য করতেন। এটা নতুন কিছু নয়; কিন্তু চীন ও পাকিস্তানের এ ধরনের সক্রিয় আগ্রহ বা প্রকাশ্য অবস্থান গ্রহণের ঘটনা অতীতে তেমন দেখা যায়নি।’

তিনি বলেন, ‘চীন সাধারণত অহস্তক্ষেপ নীতির আড়ালে থেকে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোকেন্দ্রিক সম্পর্ক বজায় রাখত, আর পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কও মূলত ঐতিহাসিক ও কৌশলগত দূরত্বের কারণে সীমিত ছিল। এবারের পরিস্থিতিতে চীন ও পাকিস্তানের তুলনামূলকভাবে বেশি দৃশ্যমান ও সক্রিয় অবস্থান। চীন এখন শুধু বিনিয়োগকারী নয়, স্থানীয় জনমত ও রাজনৈতিক গতিপ্রবাহের প্রতি সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানও নিজের অবস্থানকে আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশ করছে। পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘ দূরত্ব থাকলেও এখন প্রেক্ষাপটের ফলে তারাও দৌড়ঝাঁপ চালাচ্ছে, যা আসলেই অবাক করার মতো।’

রেকর্ডসংখ্যক বিদেশি পর্যবেক্ষক: নির্বাচনের স্বচ্ছতা যাচাই করতে প্রায় ৫০০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক ঢাকায় আসছেন। এর মধ্যে ৩৫০ জনের বেশি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ১৭৮ জন এবং ওয়াইসি থেকে ৬৩ জন পর্যবেক্ষক আসছেন। এ ছাড়া ১৬টি দেশ থেকে ৫৭ জন দ্বিপক্ষীয় পর্যবেক্ষক আসছেন, যার মধ্যে মালয়েশিয়া থেকে সর্বোচ্চ ১৪ জন, তুরস্ক থেকে ১২, ইন্দোনেশিয়া থেকে ৫, জাপান থেকে ৪, পাকিস্তান থেকে ৩ এবং চীন, ভুটান, মালদ্বীপ, ফিলিপাইন, জর্ডান, জর্জিয়া, রাশিয়া, কিরগিজস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা প্রভৃতি দেশ থেকে ১-২ জন করে। এ ছাড়া ৩২ জন ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষকও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যোগ দিচ্ছেন।

কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষক দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ঘানার সাবেক প্রেসিডেন্ট নানা আকুফো-আড্ডো। এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনসও ২২ সদস্যের দল পাঠিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ব্যাপক আন্তর্জাতিক উপস্থিতি নির্বাচনের স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

নির্বাচন ঘিরে বেড়েছে কূটনীতিকদের দৌড়ঝাঁপ: নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিকদের তৎপরতা তত বাড়ছে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে তাদের কাছে। দফায় দফায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে দেখা করছেন প্রভাবশালী বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা। এ বিষয়ে সরকারের এক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ‘শেষ এ মুহূর্তে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে বিদেশিদের তেমন কিছু পাওয়ার নেই—এমন বাস্তবতা দেশগুলো বুঝতে পেরে রাজনৈতিক দলগুলোকেই এ মুহূর্তে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।’

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানাচ্ছে, বিদেশিরা মূলত ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্র পরিচালনা কেমন হবে এবং বিনিয়োগের নিরাপত্তা কী থাকবে, তার নিশ্চয়তা খুঁজছে। গত ২৫ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইইউ ও জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ ছাড়া মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন এবং ইইউ অ্যাম্বাসাডর মাইকেল মিলার নিয়মিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।

বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে বিদেশিদের রসায়ন: গত জানুয়ারি থেকে বিএনপি প্রায় ১৫টি কূটনৈতিক বৈঠক করেছে। ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাও তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর যোগাযোগ নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। মার্কিন দূতাবাসের একটি সূত্র কালবেলাকে বলেন, ‘বিগত সময়ে জামায়াতের উত্থানের এমন অপার সম্ভাবনা লক্ষ্য হয়নি ফলে আমরা সেসময় কেবল দলটির সঙ্গে ক্যাজুয়াল আলোচনা বা যোগাযোগ রাখতাম। তবে চব্বিশ-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ইসলামী দলের উত্থান আমরা দেখতে পাচ্ছি, তাই দলটির সঙ্গে আমাদের সংযোগ বেড়েছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়মিত কাজের অংশ।’

এদিকে, ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মার্কিন কূটনীতিকরা জামায়াতকে ‘বন্ধু’ হিসেবে পেতে আগ্রহী এবং তাদের আলোচনায় নিয়ে আসার পরামর্শ দিচ্ছেন। যদিও অফিসিয়াল অবস্থান অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট দলকে সমর্থন করে না, তবে বিশ্লেষকরা একে ‘প্র্যাগম্যাটিক কূটনীতি’ হিসেবে দেখছেন।

আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি ও বৈধতার সংকট: দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী দল আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এবারের নির্বাচনকে এক অদ্ভুত সমীকরণে দাঁড় করিয়েছে। অনেকে মনে করছেন, ভোটারদের একটি বড় অংশ প্রতিনিধিত্বহীন থাকায় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ কালবেলাকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ না করার বিষয়টি শেষ পর্যন্ত দেশের জনগণের অবস্থান ও প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমেই স্পষ্ট হবে এবং এটাই বিশ্ববাসীকে সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তা দেবে। নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার যদি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় অথবা জনগণ যদি আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও সেই প্রশ্নগুলো অনিবার্যভাবে তুলবে।’ তিনি আরও যোগ করেন যে, ২০২৪ সালে বিএনপির অনুপস্থিতিতে যেমন প্রশ্ন উঠেছিল, এবারও একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হতে পারে।

মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ: আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল নির্বাচনের আগে মানবাধিকার সমুন্নত রাখার দাবি জানিয়েছে। সংস্থাটির মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড এক চিঠিতে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইনে দেশটির ওপর থাকা বাধ্যবাধকতা মেনে মানবাধিকার সমুন্নত রাখার ম্যান্ডেট বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের রয়েছে। সরকার সেই দায়িত্ব পালন করবে কি না, তা প্রমাণে আগামী কয়েকটি সপ্তাহ হবে চূড়ান্ত পরীক্ষা।’ চিঠিতে সাংবাদিকদের ওপর সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহার এবং ময়মনসিংহে গণপিটুনির মতো ঘটনার নিন্দা জানানো হয়েছে।

ভোটের পরিবেশ নিয়ে আছে শঙ্কাও: ভোটের পরিবেশ নিয়ে বিদেশি কূটনীতিকদের মধ্যে শঙ্কাও কম নয়। ইসলামপন্থি দলগুলোর দ্রুত উত্থান এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। ভারত এরই মধ্যে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে তাদের কূটনীতিকদের পরিবারকে সরিয়ে নিয়েছে। যদিও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন দাবি করেছেন, বিদেশি কর্মকর্তাদের নিরাপত্তায় কোনো ঝুঁকি নেই।

ঢাকায় নিযুক্ত একাধিক বিদেশি কূটনীতিক নির্বাচন ইস্যুতে কালবেলাকে জানায়, আসন্ন নির্বাচন নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হোক এটা তাদের প্রথম চাওয়া। তবে ক্ষমতায় যে সরকারই আসবে তাকে ভারসাম্য রক্ষার নীতি মেনে চলতে হবে বলে তারা মনে করেন।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বর্তমানে যে মতপার্থক্য বিরাজ করছে তা ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য অশনিসংকেত উল্লেখ করে পশ্চিমা দেশের এক কূটনীতিক বলেন, নির্বাচনের পরেও দলগুলোর মধ্যে বিভাজনের রাজনীতি করার প্রবণতা লক্ষনীয়। তবে বাংলাদেশের রাজনীতি ‘ইসলামিক’ দিকে কিছুটা সরে যাচ্ছে। ফলে নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক, নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার জন্য ইসলামপন্থি দলগুলোর সঙ্গে তারা যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন, যাতে অর্থনৈতিক লিভারেজ ব্যবহার করে পরিস্থিতি ‘ম্যানেজেবল’ রাখা যায়।