দীর্ঘ ২২ বছর পর ময়মনসিংহের ঐতিহাসিক সার্কিট হাউজ মাঠে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী জনসভায় জামায়াতকে ইঙ্গিত করে কড়া ভাষায় প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, বিএনপির বিরুদ্ধে যে দলটি দুর্নীতির অভিযোগ তুলছে, তাদেরই দুই নেতা বিএনপি সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। তাহলে বিএনপি যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হতো, তারা তখন কেন পদত্যাগ করেননি?
২০০৪ সালের ইউনিয়ন প্রতিনিধি সভার পর প্রায় ২২ বছর পেরিয়ে গতকাল মঙ্গলবার ময়মনসিংহে বিশাল নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন তারেক রহমান। যুক্তরাজ্যে দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফিরে টানা নির্বাচনী জনসভা করে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করছেন তিনি। স্বপ্নময় ও অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্যে বর্তমান রাজনৈতিক সংকট, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার নিয়ে কথা বলেন বিএনপি চেয়ারম্যান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, একটি রাজনৈতিক দল বিএনপির বিরুদ্ধে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচারের ভাষায় মিথ্যাচার চালাচ্ছে। তারা বিএনপিকে দুর্নীতির চ্যাম্পিয়ন বলছে। অথচ ২০০১-২০০৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় তাদেরই দুজন নেতা মন্ত্রিসভায় ছিলেন। তিনি প্রশ্ন করেন, বিএনপি যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হতো, তাহলে তারা কেন সরকারে থেকে পুরো মেয়াদ দায়িত্ব পালন করলেন?
তিনি বলেন, তারা পদত্যাগ করেননি কারণ তারা ভালোভাবেই জানতেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানও প্রমাণ করে, খালেদা জিয়ার সময়ে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে দুর্নীতির ভয়াবহ অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছিল।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরে তারেক রহমান ভোটার ও নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ভোটের দিন তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে ফজরের নামাজের পর ভোটকেন্দ্রে যেতে হবে। শুধু ভোট দিয়ে চলে এলে হবে না, ভোট গণনা সঠিক হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করতে কেন্দ্র পাহারা দিতে হবে।
বিএনপি ক্ষমতায় এলে ময়মনসিংহ ও জামালপুর অঞ্চলে মাছ চাষকে শিল্পে রূপান্তরের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির অঙ্গীকার করেন তারেক রহমান। কৃষকদের জন্য ‘কৃষি কার্ড’ এবং নারীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর ঘোষণা দেন তিনি। পাশাপাশি যুবসমাজকে মাদক থেকে দূরে রাখতে আইটি ও কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান।
তিনি বলেন, ময়মনসিংহ অঞ্চলে মাছের পোনা চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে এই খাতকে সম্প্রসারণ করে বিদেশে মাছের পোনা রফতানি উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন জেলায় মাদক সমস্যা মোকাবিলায় যুবকদের কর্মসংস্থান, ব্যবসা ও বাণিজ্যে যুক্ত করতে কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
ভোটের দিন দলীয় নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ভোটের দিন তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে ফজরের নামাজ ভোটকেন্দ্রের সামনে আদায় করবেন। এরপর ভোট দেবেন। শুধু ভোট দিয়ে চলে আসলেই হবে না ভোট গণনা সঠিকভাবে হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রেই অবস্থান করতে হবে।
জনসভায় তারেক রহমান বলেন, বিএনপি মানুষের জন্য রাজনীতি করে এবং দেশ পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা একমাত্র এই দলেরই রয়েছে। দেশের বিদ্যমান সমস্যার সমাধান চাইলে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। একটি দল পলাতক স্বৈরাচারের ভাষায় কথা বলছে এবং দুর্নীতি নিয়ে মিথ্যাচার করছে। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে পেছনে ফেলে কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ কারণেই আমরা ফ্যামিলি কার্ডের মতো উদ্যোগের কথা বলছি। আমি-ডামি ও নিশিরাতের ভোট সবার অধিকার কেড়ে নিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তারেক রহমান।
এর আগে সেøাগানে সেøাগানে তাকে স্বাগত জানান স্থানীয় নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা ‘তারেক রহমানের আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম’ এবং ‘আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান’ বলে সেøাগান দিতে থাকেন। ময়মনসিংহের পক্ষ থেকে তাকে লাল গোলাপ শুভেচ্ছা জানানো হয়। তারেক রহমান মঞ্চে ওঠার পর তার কাছে ময়মনসিংহের তারাকান্দাকে পৌরসভায় রূপান্তরের দাবি জানান স্থানীয় নেতারা।
তারেক রহমান মঞ্চে ওঠার আগে ময়মনসিংহ বিভাগের ২৪টি আসনের ধানের শীষের প্রার্থীরা বক্তব্য রাখেন। প্রার্থীদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ইকবাল হোসেন, সুলতানা আহমেদ বাবু, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, মোতায়ের হোসেন বাবু, মাহমুদুল হক, ফরিদুল কবির তালুকদার, সিরাজুল হক, মাহবুব রহমান লিটন, মোস্তাফিজুর রহমান বাবলু, লৎফুরজ্জামান বাবর।
বক্তব্যে প্রার্থীরা নিজেদের মধ্যকার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত করতে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান। তারা সেøাগান দেন ‘নৌকা গেছে ভারতে, ধানের শীষ গদিতে’। লুৎফুজ্জামান বাবর বলেন, আমরা ময়মনসিংহ বিভাগের ২৪টি আসন তারেক রহমানকে উপহার দিতে চাই এবং আগামী দিনে তাকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাই। সরেজমিনে দেখা গেছে, সমাবেশে আসা নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশই ছিলেন মধ্যবয়সী। তারা স্মৃতিচারণ করে বলেন, এই মাঠেই তারা এর আগে সদ্যপ্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার সমাবেশে অংশ নিয়েছিলেন।
ময়মনসিংহের ইতিহাসে স্মরণকালের সর্ববৃহৎ এই জনসভায় সভাপতিত্ব করেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও ময়মনসিংহ-৫ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী জাকির হোসেন বাবলু। সমাবেশে ময়মনসিংহ বিভাগের ২৪টি আসনের ধানের শীষের প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জনসভায় প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ মানুষের সমাগম ঘটে। দলীয় নেতারা বলছেন, এই জনসভা প্রমাণ করেছে ময়মনসিংহ বিএনপির শক্ত ঘাঁটি এবং আসন্ন নির্বাচনে ধানের শীষের পক্ষে গণরায়ের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে।
Reporter Name 
























