অন্যান্য আসনের মতো রাজধানীর ঢাকা-৯ সংসদীয় আসনেও দিন যতই গড়াচ্ছে, ততই বাড়ছে নির্বাচনী উত্তাপ। সবুজবাগ, খিলগাঁও ও মুগদাসহ বিভিন্ন এলাকায় চোখে পড়ছে পোস্টার, লিফলেট আর পথসভা। প্রার্থীদের সরব উপস্থিতি-অনুপস্থিতিতে সরগরম হয়ে উঠছে পুরো এলাকা।
এই আসনের নির্বাচনী মাঠে সবচেয়ে দৃশ্যমান বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হাবিবুর রশিদ হাবিব। দলীয় প্রতীক ধানের শীষে ভোট চেয়ে বড় শোডাউন ও ব্যাপক গণসংযোগে নেমেছেন তিনি। অন্যদিকে সামাজিক মাধ্যমে স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ দিয়ে পরিচিত মুখ, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে সরে আসা স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা তুলনামূলক ছোট পরিসরে মাঠে থাকলেও নারী ও তরুণ ভোটারদের মধ্যে কৌতূহল ও সাড়া ফেলতে পেরেছেন। জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপির (১০ দলের সমর্থিত) প্রার্থী সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী জাবেদ মিয়া রাসিন দলীয় পরিচয় সামনে রেখে বন্ধুমহল ও শুভানুধ্যায়ীনির্ভর প্রচার চালাচ্ছেন।
প্রচারের ভাষাতেও আছে ভিন্নতা। বিএনপি প্রার্থী হাবিব মাদক ও চাঁদাবাজমুক্ত এলাকা গড়ার অঙ্গীকার করে ধানের শীষে ভোট চাইছেন। ডা. জারা ফুটবল প্রতীকে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি ‘হ্যাঁ ভোট’-এর প্রচার চালাচ্ছেন। আর রাসিন শাপলা কলি প্রতীক সামনে রেখে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বড় বহর নিয়ে গণসংযোগে নামলেও হাবিবের বক্তৃতায় প্রতিপক্ষকে আক্রমণ বা বিষোদগার নেই। গতকাল দুটি স্থানে সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছেন তিনি। একইভাবে জারা ও রাসিনও আগামীর বাংলাদেশ গড়ার কথা বলছেন, কারও বিরুদ্ধে তীব্র ভাষা ব্যবহার করছেন না। দোকানপাট, হাটবাজার কিংবা পথসভা- সবখানেই ডা. জারার কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে একই বক্তব্য- ‘আমি ভিখারুননেসা নূন স্কুলে পড়েছি, ঢাকা মেডিক্যালে পড়েছি, বিদেশে পড়েছি ও পড়িয়েছি। এখন দেশ গড়ার সময় এসেছে। আপনাদের ভোট ও সমর্থন চাই।’ রাসিন বলছেন, তারা বিজয়ী হলে কেউ আর ন্যায্য অধিকারে হানা দিতে পারবে না; প্রত্যেকে নিজের স্বাধীনতা নিয়ে এগিয়ে যাবে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-৯ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৩৬০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩৭ হাজার ৭৭৩ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৩১ হাজার ৬৮২ জন এবং হিজড়া ভোটার ৫ জন। প্রতিবন্ধী ভোটার ও ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ভোটও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তুলনামূলকভাবে ভাসমান ভোটার কম এই আসনে। স্বাধীনতার পর ঢাকা-৯ আসনের সীমানা বদল হয়েছে দুবার-১৯৮৬ ও ২০০৮ সালে।
প্রভাব ও পরিচয়ের রাজনীতি : এই আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের প্রভাব রয়েছে। এক সময় এমপি ও মেয়র থাকা এই নেতা মন্ত্রী থাকাকালে সবুজবাগের ওয়াহাব কলোনিসহ একাধিক এলাকার বাসিন্দাদের ঠিকানা সমস্যার সমাধান করেন, খাসজমিতে থাকা বস্তিবাসীদের ঘর করে দেন। মুগদা ও বাসাবো এলাকাতেও রয়েছে তার স্বজন ও শুভানুধ্যায়ী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসবের বড় অংশের সুফল পাচ্ছেন হাবিব।
হাবিব নিজেও জন্মসূত্রে এই এলাকার মানুষ। এখান থেকেই রাজনীতির হাতেখড়ি, ছাত্রদল হয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন তিনি। দীর্ঘ পথচলায় নিজেকে বিতর্কের বাইরে রাখার চেষ্টা করেছেন- যার প্রভাব ভোটের মাঠে ইতিবাচক বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে ডা. তাসনিম জারা দীর্ঘদিন বিদেশে থেকেও ফেসবুক ও ইউটিউবে স্বাস্থ্যবিষয়ক কনটেন্টের মাধ্যমে দেশে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণ, এনসিপিতে যোগদান ও পরবর্তী সময়ে দল ছাড়ার গল্প- সব মিলিয়ে তার রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিন্নতা নারী ও তরুণ ভোটারদের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে। অ্যাডভোকেট রাসিন এনসিপির সমর্থন ও স্থানীয় বন্ধুমহলের সহায়তায় মাঠে থাকলেও ১০ দলের সমর্থিত প্রার্থী হয়েও প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা জামায়াতের প্রকাশ্য সমর্থন এখনও পাননি। ফলে শেষ মুহূর্তে ফল কোন দিকে গড়াবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
অনেকের মতে, ভিন্ন ধর্মালম্বীদের ভোট এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমর্থক ভোট এই আসনে বড় ফ্যাক্টর হতে পারে। পাশাপাশি নারী ও তরুণ ভোটাররাও ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তবে এখনও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ভোট দেওয়া নিয়ে কোনো নির্দেশনা আসেনি। নির্বাচনের কাছাকাছি সময়ে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত কাউকে সংঘবদ্ধভাবে সমর্থনের ঘোষণা নেই।
সব মিলিয়ে ঢাকা-৯ আসনে লড়াই যে ত্রিমুখী এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত টান টান থাকবে, তা বলাই যায়। শেষ হাসি কার মুখে ফুটবে, তার উত্তর মিলবে ভোটের দিন।
Reporter Name 

























