ঢাকা ১২:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
শিক্ষার্থীদের স্বার্থই সরকারের অগ্রাধিকার: মাহদী আমিন ফের লঘুচাপ সৃষ্টির আভাস, আবহাওয়া নিয়ে নতুন বার্তা অধিদপ্তরের চলতি অর্থবছরেই ৪১ লাখ নতুন ফ্যামিলি কার্ড দেবে সরকার দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা সরকারের প্রধান নীতিগত অগ্রাধিকার : প্রধানমন্ত্রী সংসদে ‘ব্যক্তিগত মন্তব্য’ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করলেন শিক্ষামন্ত্রী আদমদীঘিতে কাঁচা মরিচের দামে ‘সেঞ্চুরি’, স্বস্তিতে কৃষক ব্রয়লার মুরগি খাওয়া কতটা নিরাপদ ‘ব্রয়লার মুরগি’ মন্তব্য নিয়ে যে ব্যাখ্যা দিলেন ছাত্রদলের নাছির দেশের যেসব অঞ্চলে রাত ১টার মধ্যে ঝড়ের আভাস দিল্লিতে বসে হুঙ্কার দিয়ে লাভ নেই, সীমানায় ঢুকলেই গ্রেপ্তার: আইনমন্ত্রী

শালিখা নামের উৎস যে শালিক, সেই পাখিই আজ বিলুপ্তির পথে

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:৫৭:১৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১১৭ বার

মাগুরার চারটি উপজেলার মধ্যে শালিখা একটি। শালিখা নামকরণের পেছনে শালি ধান ও শালিক পাখির ইতিহাস থাকলেও সময়ের ব্যবধানে হারিয়ে যেতে বসেছে সেই চিরচেনা শালিক পাখি। একসময় মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলায় অসংখ্য শালিক পাখির কিচিরমিচিরে মুখরিত থাকত গ্রাম-গঞ্জ, মাঠ-ঘাট ও বনাঞ্চল। ভোরবেলা শালিকের কলকাকলিতে মানুষের ঘুম ভাঙত। সেই শালিক পাখির নাম থেকেই উপজেলার নামকরণ-শালিখা। অথচ কালের বিবর্তনে আজ সেই শালিক পাখিই বিলুপ্তির পথে।

শালিক একটি মাঝারি আকারের বৃক্ষচর পাখি। গ্রামবাংলার অতি পরিচিত পাখিদের মধ্যে কাঠ শালিক অন্যতম। এদের মাথা, পিঠ ও লেজ ধূসর-রূপালি রঙের, গলার নিচ থেকে বুক পর্যন্ত হালকা খয়েরি বর্ণের। গলায় মালার মতো অতিরিক্ত ধূসর পালক থাকে। বসন্তের শুরু থেকে বর্ষা পর্যন্ত শালিকের প্রজনন মৌসুম। এ সময় মা শালিক সাধারণত ৩ থেকে ৪টি হালকা নীল রঙের ডিম পাড়ে। দলবদ্ধভাবে বসবাসকারী এই পাখি স্বভাবে লাজুক এবং সাধারণত মানুষের কাছাকাছি কম আসে। গাছের কোটরে গর্ত করে এরা বাসা বাঁধে। শালিকের গড় আয়ু ৫ থেকে ৭ বছর হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৯ বছর পর্যন্ত বাঁচে।

অন্য অনেক পাখির মতো শালিকও সর্বভূক। শহর-গ্রাম, প্রান্তর এমনকি ডাস্টবিনেও এদের খাবার খুঁজতে দেখা যায়। পোকামাকড়, শুঁয়োপোকা, কেঁচো, ফল, শস্যদানা, বীজ, ছোট সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী প্রাণীসহ মানুষের ফেলে দেওয়া খাবারও এদের খাদ্যতালিকায় রয়েছে। সুযোগ পেলে মৃত ছোট প্রাণীও খায় শালিক।

সরেজমিনে শালিখা উপজেলার ধনেশ্বরগাতী, গঙ্গারামপুর, বুনাগাতী, শতখালী ও শালিখা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও কোথাও ঝোপঝাড়ে অল্প কিছু পাখি থাকলেও আগের তুলনায় তা খুবই নগণ্য।

শতখালী ইউনিয়নের বইরা গ্রামের বাসিন্দা ছান্টু মিয়া বলেন, এক সময় আমাদের এলাকায় শালিক, দোয়েল আর ময়নাসহ নানা দেশি পাখিতে চারদিক ভরে থাকত। ভোর হলেই পাখির ডাক শোনা যেত। কিন্তু এখন পরিবেশের প্রতিকূলতা আর খাদ্যের অভাবে সেই পাখিগুলো আগের মতো আর চোখে পড়ে না, সংখ্যা অনেকটাই কমে গেছে।

গঙ্গারামপুর ইউনিয়নের মধুখালী গ্রামের বাসিন্দা মাজেদুল ইসলাম বলেন, আগে গ্রামে অনেক বাগান আর বড় বড় গাছ ছিল, সেগুলোতেই পাখিরা থাকত। এখন গাছ কমে যাওয়ায় তাদের থাকার জায়গাও নষ্ট হচ্ছে। তাই দিন দিন দেশি পাখির সংখ্যাও কমে যাচ্ছে।

স্থানীয় পাখিপ্রেমীরা জানান, আগে বাঁশঝাড়, আমবাগান কিংবা বাড়ির আশপাশে সকাল-দুপুর-সন্ধ্যায় যেসব পাখি চোখে পড়ত, এখন সেগুলোর অনেকই আর দেখা যায় না। কোথাও কোথাও ঘুঘু, কাক বা মাছরাঙা দেখা গেলেও শালিক প্রায় অনুপস্থিত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শালিক পাখি ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফসল রক্ষা করে এবং মলত্যাগের মাধ্যমে জমির উর্বরতা বাড়িয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু পরিবেশ দূষণ, নির্বিচারে গাছ কাটা, ফসলি জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার, জলাভূমি ও বনাঞ্চল ধ্বংস, খাদ্য সংকট, পাখির অভয়াশ্রমের অভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শালিকসহ নানা দেশীয় পাখি আজ অস্তিত্ব সংকটে।

শ্রী ইন্দ্রনীল গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ইন্দ্রনীল বিশ্বাস বলেন, পাখি শিকার, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে দোয়েলসহ অনেক দেশীয় পাখি এখন সচরাচর দেখা যায় না। পাখি শিকার বন্ধ, খাল-বিল-নদী রক্ষা এবং সামাজিকভাবে মানুষকে সচেতন করা গেলে শালিকসহ দেশীয় পাখির প্রজনন আবার বাড়তে পারে।

স্থানীয় সচেতন মহল পাখি শিকার বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা, বন ও জলাভূমি সংরক্ষণ এবং দেশীয় পাখির জন্য নিরাপদ আবাসস্থল গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন। নচেৎ শালিখার নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শালিক পাখি কেবল গল্পেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

শালিখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বনি আমিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, দেশি পাখি প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নির্বিচারে পাখি শিকার ও আবাসস্থল ধ্বংসের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। পাখি শিকার বন্ধে উপজেলা প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী পাখি শিকার, ধরা, বিক্রি ও নিধন দণ্ডনীয় অপরাধ। এ বিষয়ে নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি জোরদার করা হবে। পাখি রক্ষায় শুধু আইন প্রয়োগই নয়, জনসচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। গাছ লাগানো, বাগান সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার মাধ্যমে পাখিদের নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

শিক্ষার্থীদের স্বার্থই সরকারের অগ্রাধিকার: মাহদী আমিন

শালিখা নামের উৎস যে শালিক, সেই পাখিই আজ বিলুপ্তির পথে

আপডেট টাইম : ১০:৫৭:১৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬

মাগুরার চারটি উপজেলার মধ্যে শালিখা একটি। শালিখা নামকরণের পেছনে শালি ধান ও শালিক পাখির ইতিহাস থাকলেও সময়ের ব্যবধানে হারিয়ে যেতে বসেছে সেই চিরচেনা শালিক পাখি। একসময় মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলায় অসংখ্য শালিক পাখির কিচিরমিচিরে মুখরিত থাকত গ্রাম-গঞ্জ, মাঠ-ঘাট ও বনাঞ্চল। ভোরবেলা শালিকের কলকাকলিতে মানুষের ঘুম ভাঙত। সেই শালিক পাখির নাম থেকেই উপজেলার নামকরণ-শালিখা। অথচ কালের বিবর্তনে আজ সেই শালিক পাখিই বিলুপ্তির পথে।

শালিক একটি মাঝারি আকারের বৃক্ষচর পাখি। গ্রামবাংলার অতি পরিচিত পাখিদের মধ্যে কাঠ শালিক অন্যতম। এদের মাথা, পিঠ ও লেজ ধূসর-রূপালি রঙের, গলার নিচ থেকে বুক পর্যন্ত হালকা খয়েরি বর্ণের। গলায় মালার মতো অতিরিক্ত ধূসর পালক থাকে। বসন্তের শুরু থেকে বর্ষা পর্যন্ত শালিকের প্রজনন মৌসুম। এ সময় মা শালিক সাধারণত ৩ থেকে ৪টি হালকা নীল রঙের ডিম পাড়ে। দলবদ্ধভাবে বসবাসকারী এই পাখি স্বভাবে লাজুক এবং সাধারণত মানুষের কাছাকাছি কম আসে। গাছের কোটরে গর্ত করে এরা বাসা বাঁধে। শালিকের গড় আয়ু ৫ থেকে ৭ বছর হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৯ বছর পর্যন্ত বাঁচে।

অন্য অনেক পাখির মতো শালিকও সর্বভূক। শহর-গ্রাম, প্রান্তর এমনকি ডাস্টবিনেও এদের খাবার খুঁজতে দেখা যায়। পোকামাকড়, শুঁয়োপোকা, কেঁচো, ফল, শস্যদানা, বীজ, ছোট সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী প্রাণীসহ মানুষের ফেলে দেওয়া খাবারও এদের খাদ্যতালিকায় রয়েছে। সুযোগ পেলে মৃত ছোট প্রাণীও খায় শালিক।

সরেজমিনে শালিখা উপজেলার ধনেশ্বরগাতী, গঙ্গারামপুর, বুনাগাতী, শতখালী ও শালিখা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও কোথাও ঝোপঝাড়ে অল্প কিছু পাখি থাকলেও আগের তুলনায় তা খুবই নগণ্য।

শতখালী ইউনিয়নের বইরা গ্রামের বাসিন্দা ছান্টু মিয়া বলেন, এক সময় আমাদের এলাকায় শালিক, দোয়েল আর ময়নাসহ নানা দেশি পাখিতে চারদিক ভরে থাকত। ভোর হলেই পাখির ডাক শোনা যেত। কিন্তু এখন পরিবেশের প্রতিকূলতা আর খাদ্যের অভাবে সেই পাখিগুলো আগের মতো আর চোখে পড়ে না, সংখ্যা অনেকটাই কমে গেছে।

গঙ্গারামপুর ইউনিয়নের মধুখালী গ্রামের বাসিন্দা মাজেদুল ইসলাম বলেন, আগে গ্রামে অনেক বাগান আর বড় বড় গাছ ছিল, সেগুলোতেই পাখিরা থাকত। এখন গাছ কমে যাওয়ায় তাদের থাকার জায়গাও নষ্ট হচ্ছে। তাই দিন দিন দেশি পাখির সংখ্যাও কমে যাচ্ছে।

স্থানীয় পাখিপ্রেমীরা জানান, আগে বাঁশঝাড়, আমবাগান কিংবা বাড়ির আশপাশে সকাল-দুপুর-সন্ধ্যায় যেসব পাখি চোখে পড়ত, এখন সেগুলোর অনেকই আর দেখা যায় না। কোথাও কোথাও ঘুঘু, কাক বা মাছরাঙা দেখা গেলেও শালিক প্রায় অনুপস্থিত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শালিক পাখি ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফসল রক্ষা করে এবং মলত্যাগের মাধ্যমে জমির উর্বরতা বাড়িয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু পরিবেশ দূষণ, নির্বিচারে গাছ কাটা, ফসলি জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার, জলাভূমি ও বনাঞ্চল ধ্বংস, খাদ্য সংকট, পাখির অভয়াশ্রমের অভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শালিকসহ নানা দেশীয় পাখি আজ অস্তিত্ব সংকটে।

শ্রী ইন্দ্রনীল গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ইন্দ্রনীল বিশ্বাস বলেন, পাখি শিকার, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে দোয়েলসহ অনেক দেশীয় পাখি এখন সচরাচর দেখা যায় না। পাখি শিকার বন্ধ, খাল-বিল-নদী রক্ষা এবং সামাজিকভাবে মানুষকে সচেতন করা গেলে শালিকসহ দেশীয় পাখির প্রজনন আবার বাড়তে পারে।

স্থানীয় সচেতন মহল পাখি শিকার বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা, বন ও জলাভূমি সংরক্ষণ এবং দেশীয় পাখির জন্য নিরাপদ আবাসস্থল গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন। নচেৎ শালিখার নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শালিক পাখি কেবল গল্পেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

শালিখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বনি আমিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, দেশি পাখি প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নির্বিচারে পাখি শিকার ও আবাসস্থল ধ্বংসের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। পাখি শিকার বন্ধে উপজেলা প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী পাখি শিকার, ধরা, বিক্রি ও নিধন দণ্ডনীয় অপরাধ। এ বিষয়ে নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি জোরদার করা হবে। পাখি রক্ষায় শুধু আইন প্রয়োগই নয়, জনসচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। গাছ লাগানো, বাগান সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার মাধ্যমে পাখিদের নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।