পীর হাবিবুর রহমান (ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে)
বার্মার স্বাধীনতার নায়ক অং সান। স্বাধীনতা প্রাপ্তির দু’বছরের মাথায় আততায়ীর গুলিতে নিহত হন।তখন তার তৃতীয় সন্তান অং সান সু চি’র বয়স মাত্র দু’বছর। বাবা-মা ও পিতার নানীর নামের অক্ষর বসিয়ে নাম রাখা হয়েছিল অং সান সু চি।
দীর্ঘ সামরিক শাসন কবলিত বার্মার আট-দশজন সাধারণ নারীর মতোই শারীরিক গঠন নিয়ে বেড়ে ওঠা সু চি ব্রিটিশ নাগরিক মাইকেল এরিসকে বিয়ে করেছিলেন। শর্ত দিয়েছিলেন, আগে তার দেশ। মায়ের অসুস্থতার সংবাদে দেশে ফিরে জড়িয়ে পড়েছিলেন গণতন্ত্রের সংগ্রামে।
দীর্ঘ দুই দশক তিনি কখনো গৃহবন্দী, কখনো বা কারাবন্দী হয়ে জীবন কাটানোর জন্য পারিবারিক জীবনের সমাপ্তি ঘটেছিল। তার স্বামীর মৃত্যুর সময়ও তিনি কাছে ছিলেন না। বার্মার সামরিক সরকারের বন্দী জীবন কাটাচ্ছিলেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের মহান নেতা নেনসন ম্যান্ডেলার পর তিনিই সর্বোচ্চ বন্দিজীবন কাটিয়ে এক জীবন্ত কিংবদন্তীতে পরিণত হন। অহিংস গণতন্ত্রবাদী হিসেবে তার খ্যাতি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। সেই কবে কখন অং সান সু চি হৃদয়ে আসন নিয়েছিলেন জানা নেই।
তার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় আবেগ-আপ্লুত হয়েছি অনেকবার। আমার ছোট্ট ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমের দেয়ালে কোনো পেইন্টিং নেই। তবে জগতবিখ্যাত রাজনৈতিক নেতাদের বাধাই করা পোর্টেট শোভা পাচ্ছে। বাঙালির মহত্ত্বম নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি তো শোভা পাচ্ছেই। তার পাশে সারিবদ্ধ হয়ে আছেন মহাত্মা গান্ধী, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, নেলসন ম্যান্ডেলা ও শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। নানা কারণে তারা আমার আবেগ, অনুভূতি ও শ্রদ্ধার আসন নিয়েছেন।
ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের গরিমায় তীব্রভাবে আকর্ষণ করেছেন। সবসময় মনে হয়েছে, এদের পাশে আরেক জীবন্ত কিংবদন্তী বার্মার গণতন্ত্রের নেত্রী অং সান সু চির একটি পোর্টেট থাকা দরকার। সেটি টানাবো টানাবো করে হয়ে উঠেনি।
কিন্তু আজকে ২৫ বছরের সংগ্রাম শেষে গণরায় নিয়ে ক্ষমতায় আসা সু চির দলের শাসনামলে রোহিঙ্গা মুসলমানদের যেভাবে হত্যা করছে সামরিক ও নিরাপত্তা রক্ষীরা সেখানে অহিংস গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য শান্তিতে নোবেল বিজয়ী সু চি নীরব!!!
সামরিক শাসন জমানায় রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর যখন নির্যাতন নেমে এসেছে, তখনো সু চি তার প্রতিবাদ করেননি। ধর্মান্ধ বা উগ্র জাতীয়তাবাদী সংখ্যাগরিষ্ঠ শক্তির কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছেন। প্রতিবাদ করেননি।
জাতিসংঘ বলেছে, রোহিঙ্গাদের দেশ ছাড়া করতে চায়। ভিটেমাটি ছেড়ে মৃত্যুর মুখে পালাচ্ছে ওরা। জীবন দিচ্ছে রোহিঙ্গা মুসলমানরা। শাসক দলের নেত্রী অং সান সু চির এই ভূমিকা নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় তুলেছে। অনেকে বলছেন, তার নোবেল শান্তি পুরষ্কার ফিরিয়ে নেয়া হোক। নোবেল কমিটি কি করবে জানি না।
কিন্তু আমার হৃদয়ের আসন থেকে ঘৃণা, লজ্জ্বা, অপমানে সু চিকে নির্বাসিতই করছি না, রীতিমতো করুণা করছি। খুব নিন্দা ও ঘৃণা রয়েছে আমার সকল বর্ণবাদী উগ্রগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। সকল উগ্র, ধর্মান্ধ শক্তির বিরুদ্ধে রয়েছে ক্ষোভ, দ্রোহ ও ঘৃণা। রয়েছে হৃদয় নিঃসৃত প্রতিবাদ।
কাউকে বিশ্বাস করার, শ্রদ্ধা করার, সম্মানিত করার অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি বিশ্বাস ভঙ্গের অপরাধে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে ত্যাগ করারও শক্তি রয়েছে। বার্মায় আজ খোড়া অজুহাতে মুসলমান নিরপরাধ মানুষ হত্যার নামে গণহত্যা চলছে।
আমার দেয়ালে মানবিক শক্তির বিরুদ্ধে নিজের আবাস ভূমি ও সভ্যতার কল্যাণে জীবন-যৌবন উৎসর্গ করা বিশ্বনন্দিত নেতাদের পাশে সু চির ছবি না টানিয়ে সঠিক কাজই করেছি। দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার যেমন নিন্দনীয় তেমনি বার্মায় রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর যুগের পর যুগ যেভাবে হত্যা, নির্যাতন করা হচ্ছে, দেশত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে, তাতে অহিংস গণতন্ত্রবাদী নেত্রীর নিরবতা সহিংস খুনিদের উন্মাসিক ও বেপোরোয়াই করছে না বিশ্ববিবেকের হৃদয়কে ব্যথিত করেছে। তার প্রতি আমাদের সকল বিশ্বাস ভেঙ্গে গেছে।
লেখক: প্রধান সম্পাদক, পূর্বপশ্চিমবিডি.নিউজ
Reporter Name 

























