জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক, জেন জি প্রজন্মের ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম অগ্রনায়ক, জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আত্মপ্রকাশ করা রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম ইনকিলাব মঞ্চ-এর প্রতিষ্ঠাকালীন আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসারত অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিঊন। গতরাত সাড়ে নয়টার দিকে ইনকিলাব মঞ্চ ও ওসমান হাদির ফেসবুক পেজ থেকে এ তথ্য জানানো হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের চিকিৎসক ও ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের (এনএইচএ) সদস্যসচিব ডা. মো. আব্দুল আহাদ। গতরাতে এক টিভি চ্যানেলকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এসব তথ্য জানান।
ডা. মো. আব্দুল আহাদ বলেন, বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টার দিকে ওসমান হাদির পরিবার অস্ত্রোপচারের জন্য সম্মতি দেয়। এরপর তাকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়। “অপারেশন শেষ হওয়ার পর আর কোনো আপডেট পাওয়া যায়নি। পরে সরাসরি তার মৃত্যুর খবর জানানো হয়,” বলেন তিনি।
হাদির লাশ দেশে আনার বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. আহাদ বলেন, মৃত্যুর খবরটি এইমাত্র পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
অকুতোভয় ওসমান হাদির ইন্তেকালের খবর জানার সাথে সাথে সারা দেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। রাজধানী ঢাকার শোকার্ত মানুষ প্রতিবাদ জানাতে রাজপথে নেমে আসে। রাজধানীর শাহবাগে সমবেত হয়ে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ শুরু করে। ঢাকার সব সড়কে মানুষের মিছিল শাহবাগমুখি হয়ে যায়। বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ দেশের সকল জেলা সদর, উপজেলা এমন কি অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিক্ষোভে ফেটে পড়েন সবস্তরের জনতা। সড়ক-মহাসড়কে বিক্ষোভ মিছিল হওয়ায় বিভিন্ন স্থানে যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে।
এদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন শরীফ ওসমান হাদির শাহাদাতবরণের খবরটি আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিকে জানান। একই সঙ্গে তিনি হাদির রূহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারবর্গের প্রতি সমবেদনা জানান। তিনি ওসমান হাদির স্ত্রী সন্তানের যাবতীয় দায়িত্ব সরকার নেবে বলে ঘোষণা দেন। এছাড়া আজ বাদ জুমা দেশের সব মসজিদে শরীফ ওসমান হাদির রূহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া-মোনাজাত করার আহ্বান জানান। তিনি ঘোষণা করেন যে, শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুতে আগামীকাল শনিবার দেশে এক দিনের শোক পালন করা হবে। সব সরকারি দফতরে এবং বিদেশে বাংলাদেশ মিশনসমূহে এসময় জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। প্রধান উপদেষ্টা আততায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানে সরকারের অঙ্গীকারের কথা ঘোষণা করেন।
গত শুক্রবার রাজধানীর পল্টন এলাকায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সেখান থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেয়া হয়। তারপর সোমবার উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়েছে।
স্বল্প সময়ের মধ্যেই হাদি রাজপথ, ক্যাম্পাস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসেন। ওসমান হাদির জন্ম ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলায় এক ধর্মভীরু মুসলিম পরিবারে। তার বাবা ছিলেন একজন মাদরাসা শিক্ষক ও স্থানীয় ইমাম। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। শৈশব থেকেই পারিবারিক পরিবেশে ধর্মীয় শিক্ষা, শৃঙ্খলা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার চর্চা তার ব্যক্তিত্ব গঠনে ভূমিকা রাখে।
হাদির প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শুরু নলছিটির একটি মাদরাসায়। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত সেখানে পড়াশোনার পর তিনি ঝালকাঠি এন এস কামিল মাদরাসায় ভর্তি হন এবং আলিম পরীক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি রাজধানী ঢাকায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই তার রাজনৈতিক চিন্তা ও নেতৃত্বগুণ আরো বিকশিত হয়। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল ওসমান হাদির রাজনৈতিক জীবনের মোড় ঘোরানো অধ্যায়। ওই সময় তিনি ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন এবং ঢাকার রামপুরা এলাকায় সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। তরুণদের সংগঠিত করা, মিছিল-সমাবেশে বক্তব্য দেয়া এবং রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি তুলে ধরার মাধ্যমে তিনি দ্রুত পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
তারপর জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার অভিজ্ঞতা ও দাবির ভিত্তিতে ওসমান হাদির নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ইনকিলাব মঞ্চ। সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য হলো সব ধরনের আধিপত্যবাদ ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা। গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ, ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক জবাবদিহিকে এই প্ল্যাটফর্মের মূল ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়।
ওসমান হাদি বিভিন্ন সময়ে সংবাদ সম্মেলন ও জনসভায় দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে পুরোনো ধারার রাজনীতির কঠোর সমালোচনা করেন।
বিএনপি প্রসঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, জনগণকেন্দ্রিক রাজনীতি ছাড়া ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাঠামোগত দুর্বলতার সমালোচনা করে সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন। ২০২৫ সালে আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাসী ও রাষ্ট্রদ্রোহী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করার দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে ওসমান হাদি ছিলেন অন্যতম আলোচিত তরুণ নেতা। ‘ন্যাশনাল অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট ইউনিটি’ ব্যানারের অধীনে পরিচালিত এই আন্দোলনে ইনকিলাব মঞ্চ সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন ওসমান হাদি। মতিঝিল, শাহবাগ, রমনা, পল্টন ও শাহজাহানপুর নিয়ে গঠিত এ আসনে তিনি প্রচলিত রাজনীতির বাইরে গিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি মতবিনিময়, ‘চা-সিঙ্গাড়া’ আড্ডা এবং পথসভা আয়োজনের ঘোষণা দেন। তার এই ভিন্নধর্মী প্রচারণা গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়ার কারণে একাধিকবার প্রাণনাশের হুমকি পাওয়ার কথা আগেই জানিয়েছিলেন ওসমান হাদি।
গত ১২ ডিসেম্বর ২০২৫, জুমার নামাজের পর রাজধানীর বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে তিনি গুরুতর আহত হন। প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর নেয়া হলেও গতরাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন।
গত শুক্রবার গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গত রোববার রাতে ফয়সালকে আসামি করে পল্টন থানায় মামলা করেন ইনকিলাব মঞ্চের যুগ্ম সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের।
এ মামলায় ফয়সালের বাবা-মা গত বুধবার আদালতে জবানবন্দি দিয়ে ফয়সালকে পালাতে সহযোগিতার কথা স্বীকার করেছেন। গত বুধবার মাইক্রোবাসে করে ফয়সালকে পালাতে সহযোগিতা করার অভিযোগে গ্রেফতার নুরুজ্জামানকে তিন দিন ও গত মঙ্গলবার ফয়সালের ঘনিষ্ঠ সহযোগী কবির ওরফে দাঁতভাঙা কবিরকে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। এ মামলায় ফয়সাল করিমের স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া, শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ শিপু ও বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমাকে গ্রেফতারের পর গত সোমবার রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।
তার আগের দিন একটি মোটরসাইকেলের মালিক আব্দুল হান্নানকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে তিন দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। ইতোমধ্যে হাদি হত্যাচেষ্টা মামলার প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদকে অবৈধ পথে ভারতে পালাতে সহায়তার অভিযোগে ময়মনসিংহের ধোবাউড়া ও হালুয়াঘাট থেকে গ্রেফতার দুজনকে তিন দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। সহায়তাকারী দুই আদিবাসী হলেন সিবিউন দিউ ও সঞ্জয় চিসন।
এর আগে গত বুধবার মাইক্রোবাসে করে ফয়সালকে পালাতে সহযোগিতা করার অভিযোগে গ্রেফতার নুরুজ্জামানকে তিন দিন ও গত মঙ্গলবার ফয়সালের ঘনিষ্ঠ সহযোগী কবির ওরফে দাঁতভাঙা কবিরকে সাত দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। এ মামলায় ফয়সাল করিমের স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া, শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ শিপু ও বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমাকে গ্রেফতারের পর গত সোমবার রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। তার আগের দিন একটি মোটরসাইকেলের মালিক আব্দুল হান্নানকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। গতকাল তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
গতকাল বৃহস্পতিপার রাতে ইনকিলাব মঞ্চের এক বার্তায় জানানো হয়, যদি ওসমান হাদি রবের ডাকে সাড়া দিয়ে শহীদের কাতারে শামিল হন, সেক্ষেত্রে দেশের স্বাধীনতাকামী মজলুম জনতাকে সার্বভৌমত্ব নিশ্চিতকরণে রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় জড়ো হওয়ার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, হত্যাকারীরা গ্রেফতার না হওয়া পর্যন্ত শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি চলবে এবং প্রয়োজন হলে সারা বাংলাদেশ অচল করে দেওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। পাশাপাশি, যদি অভিযুক্ত খুনি ভারতে পালিয়ে গিয়ে থাকে, তবে ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে যেকোনো মূল্যে তাকে গ্রেফতারপূর্বক দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানানো হয়।
Reporter Name 
























