ঢাকা ০২:৫৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
এভারকেয়ার হাসপাতালে চলছে চিকিৎসা ওসমান হাদির অবস্থা আশঙ্কাজনক যুগে যুগে ইসলামি রাষ্ট্রে অমুসলিম প্রতিনিধি ফিরে দেখা ২০২৫ – বিজয়ের মাস ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন ওসমান হাদিকে দেখতে গিয়ে কাঁদলেন হাসনাত আব্দুল্লাহ মেসির সঙ্গে দেখা করবেন বলিউড বাদশাহ ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে নতুন নির্দেশনা চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের হাতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র রয়েছে : জামায়াত আমির কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে : সেনাপ্রধান পাশ্ববর্তী রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা গেল কয়েকমাসে অন্তত ৮০ জনকে দেশের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশ করিয়েছে মিশরে আন্তর্জাতিক কুরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশি বিচারক

রাস্তায় ফেলে যাওয়া নবজাতককে সারা রাত পাহারা দিল একদল কুকুর

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:৫০:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১৭ বার

শীতের রাতের শেষ প্রহরে, ভোরের ঠিক আগের নিস্তব্ধ সময়টাতে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার নদীপারে অবস্থিত নবদ্বীপ শহরটায় সবাই ঘুমিয়ে ছিল। ঠিক সেই সময়টাতে এক নবজাতককে পড়ে থাকতে দেখা গেল রেলওয়ে কর্মীদের কলোনির বাথরুমের বাইরের ঠান্ডা মাটিতে। আর তাকে ঘিরে আছে কয়েকটি কুকুর।

শিশুটির বয়স মাত্র কয়েক ঘণ্টা। জন্মের রক্ত তখনো শুকায়নি। গায়ে কোনো চাদর নেই, কোনো চিরকুট নেই, কাছাকাছি কেউ নেই। তবু সে একদম একা ছিল না। তাকে ঘিরে ছিল কয়েকটি কুকুর। প্রতিদিন যাদের লোকজন ধাওয়া করে তাড়ায়, সেই ভবঘুরে বেওয়ারিশ কুকুরগুলো একেবারে নিখুঁত একটি বৃত্ত তৈরি করে নবজাতকটিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল। ঘেউ ঘেউ নয়, ছুটোছুটি নয়, শুধু নীরব প্রহরা।

স্থানীয়রা বলছেন, এরপর রাতভর কুকুরগুলো কাউকেই শিশুটির কাছে যেতে দেয়নি। কেবল ভোরের আলো ফুটলেই কুকুরগুলো সরে যায়। স্থানীয় বাসিন্দা শুক্লা মণ্ডল বলেন, ‘ঘুম ভেঙে আমরা যা দেখেছিলাম, তাতে এখনো শরীর শিউরে উঠে।’ তিনি সবাইর আগে কুকুর বেষ্টিত শিশুটিকে দেখেন। তিনি বলেন, ‘কুকুরগুলো রাগী ছিল না। তারা যেন একধরনের সতর্কতায় দাঁড়িয়ে ছিল। যেন বুঝতে পারছিল এই বাচ্চাটা বাঁচার জন্য লড়ছে।’

আরেক বাসিন্দা সুভাষ পাল ভোরের একটু আগে শোনা ক্ষীণ কান্নার কথা স্মরণ করলেন। তিনি বলেন, ‘ভেবেছিলাম আশপাশের কোনো বাড়িতে অসুস্থ বাচ্চা আছে। কখনো কল্পনা করিনি বাইরে মাটিতে এক নবজাতক পড়ে আছে, আর তার চারপাশে কুকুরেরা পাহারা দিচ্ছে। তারা ঠিক প্রহরীর মতো আচরণ করছিল।’

অবশেষে শুক্লা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলে কুকুরগুলো নীরবে তাদের পাহারার বৃত্ত শিথিল করে। তিনি নিজের ওড়না দিয়ে শিশুটিকে জড়িয়ে ধরেন এবং প্রতিবেশীদের ডাকেন। তড়িঘড়ি করে শিশুটিকে প্রথমে মহেশগঞ্জ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, পরে সেখান থেকে কৃষ্ণনগর সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়।

ডাক্তাররা পরে জানান, শিশুটির শরীরে কোনো আঘাত নেই। মাথার রক্ত জন্মদাগ থেকেই হওয়া সম্ভব এবং সবকিছু দেখে মনে হয়েছে, জন্মের পরে কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাকে ফেলে রেখে যাওয়া হয়েছে। পুলিশের ধারণা, কলোনিরই কেউ রাতের আঁধারে শিশুটিকে সেখানে রেখে গেছে।

নবদ্বীপ থানার পুলিশ ও চাইল্ড হেল্প কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করেছে এবং শিশুটির দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার জন্য প্রক্রিয়া চালু করেছে। তবু প্রশাসনিক তৎপরতার আড়ালেও শহরের মানুষের চোখে লেগে আছে সেই রাতের দৃশ্য। প্রশিক্ষণহীন, অবহেলিত সেই কুকুরগুলো অদ্ভুত এক মানবিকতা দেখিয়েছে। স্থানীয় এক রেলকর্মী বলেন, ‘এরা সেই কুকুর, যাদের নিয়ে আমরা অভিযোগ করি। কিন্তু তারা সেই মানুষের চেয়ে বেশি মানবতা দেখিয়েছে, যে এই শিশুটিকে ফেলে গেছে।’

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

এভারকেয়ার হাসপাতালে চলছে চিকিৎসা ওসমান হাদির অবস্থা আশঙ্কাজনক

রাস্তায় ফেলে যাওয়া নবজাতককে সারা রাত পাহারা দিল একদল কুকুর

আপডেট টাইম : ১০:৫০:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২৫

শীতের রাতের শেষ প্রহরে, ভোরের ঠিক আগের নিস্তব্ধ সময়টাতে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার নদীপারে অবস্থিত নবদ্বীপ শহরটায় সবাই ঘুমিয়ে ছিল। ঠিক সেই সময়টাতে এক নবজাতককে পড়ে থাকতে দেখা গেল রেলওয়ে কর্মীদের কলোনির বাথরুমের বাইরের ঠান্ডা মাটিতে। আর তাকে ঘিরে আছে কয়েকটি কুকুর।

শিশুটির বয়স মাত্র কয়েক ঘণ্টা। জন্মের রক্ত তখনো শুকায়নি। গায়ে কোনো চাদর নেই, কোনো চিরকুট নেই, কাছাকাছি কেউ নেই। তবু সে একদম একা ছিল না। তাকে ঘিরে ছিল কয়েকটি কুকুর। প্রতিদিন যাদের লোকজন ধাওয়া করে তাড়ায়, সেই ভবঘুরে বেওয়ারিশ কুকুরগুলো একেবারে নিখুঁত একটি বৃত্ত তৈরি করে নবজাতকটিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল। ঘেউ ঘেউ নয়, ছুটোছুটি নয়, শুধু নীরব প্রহরা।

স্থানীয়রা বলছেন, এরপর রাতভর কুকুরগুলো কাউকেই শিশুটির কাছে যেতে দেয়নি। কেবল ভোরের আলো ফুটলেই কুকুরগুলো সরে যায়। স্থানীয় বাসিন্দা শুক্লা মণ্ডল বলেন, ‘ঘুম ভেঙে আমরা যা দেখেছিলাম, তাতে এখনো শরীর শিউরে উঠে।’ তিনি সবাইর আগে কুকুর বেষ্টিত শিশুটিকে দেখেন। তিনি বলেন, ‘কুকুরগুলো রাগী ছিল না। তারা যেন একধরনের সতর্কতায় দাঁড়িয়ে ছিল। যেন বুঝতে পারছিল এই বাচ্চাটা বাঁচার জন্য লড়ছে।’

আরেক বাসিন্দা সুভাষ পাল ভোরের একটু আগে শোনা ক্ষীণ কান্নার কথা স্মরণ করলেন। তিনি বলেন, ‘ভেবেছিলাম আশপাশের কোনো বাড়িতে অসুস্থ বাচ্চা আছে। কখনো কল্পনা করিনি বাইরে মাটিতে এক নবজাতক পড়ে আছে, আর তার চারপাশে কুকুরেরা পাহারা দিচ্ছে। তারা ঠিক প্রহরীর মতো আচরণ করছিল।’

অবশেষে শুক্লা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলে কুকুরগুলো নীরবে তাদের পাহারার বৃত্ত শিথিল করে। তিনি নিজের ওড়না দিয়ে শিশুটিকে জড়িয়ে ধরেন এবং প্রতিবেশীদের ডাকেন। তড়িঘড়ি করে শিশুটিকে প্রথমে মহেশগঞ্জ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, পরে সেখান থেকে কৃষ্ণনগর সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়।

ডাক্তাররা পরে জানান, শিশুটির শরীরে কোনো আঘাত নেই। মাথার রক্ত জন্মদাগ থেকেই হওয়া সম্ভব এবং সবকিছু দেখে মনে হয়েছে, জন্মের পরে কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাকে ফেলে রেখে যাওয়া হয়েছে। পুলিশের ধারণা, কলোনিরই কেউ রাতের আঁধারে শিশুটিকে সেখানে রেখে গেছে।

নবদ্বীপ থানার পুলিশ ও চাইল্ড হেল্প কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করেছে এবং শিশুটির দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার জন্য প্রক্রিয়া চালু করেছে। তবু প্রশাসনিক তৎপরতার আড়ালেও শহরের মানুষের চোখে লেগে আছে সেই রাতের দৃশ্য। প্রশিক্ষণহীন, অবহেলিত সেই কুকুরগুলো অদ্ভুত এক মানবিকতা দেখিয়েছে। স্থানীয় এক রেলকর্মী বলেন, ‘এরা সেই কুকুর, যাদের নিয়ে আমরা অভিযোগ করি। কিন্তু তারা সেই মানুষের চেয়ে বেশি মানবতা দেখিয়েছে, যে এই শিশুটিকে ফেলে গেছে।’