ঢাকা ০৪:১৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
৩০০ কর্মকর্তার সমন্বয়ে নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি গঠন করল ইসি সুদানে সন্ত্রাসী হামলায় হতাহত বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের পরিচয় জানাল আইএসপিআর সুষ্ঠু ভোটে বড় চ্যালেঞ্জ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেশেই আছেন ওসমান হাদির ওপর হামলাকারী মূল আসামি: ডিএমপি ‘মনে হলো মাথায় বাজ পড়েছে’, হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়া নিয়ে প্রতিক্রিয়া সিইসি’র এবার রাজধানীতে যাত্রীবাহী বাসে আগুন মেয়ের কথায় কীভাবে ১৮ কেজি কমালেন বাঁধন রাজাকারের ঘৃণাস্তম্ভে জুতা নিক্ষেপ, লক্ষ্যভেদে মিলছে পুরস্কার ডিমের উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি, দামে পতন: লোকসান বাড়ছে খামারিদের মাঠের বাইরে আমি একজন অলস মানুষ

গুতুম মাছের গল্প

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৯:২৫:৩১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর ২০২৫
  • ৫০ বার

উন্মুক্ত জলাশয় থেকে দেশি মাছ ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে—এ ধরনের সংবাদ পত্রিকা খুললেই চোখে পড়ে। অতি সম্প্রতি প্রকৃতির লীলাভূমি চলনবিলের ওপর দেশের একটি জাতীয় দৈনিকে সংবাদ ছাপা হয়েছে। সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে, গত পাঁচ দশকে ৮০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে পানিসম্পন্ন চলনবিল এখন মাত্র ৬৬ বর্গকিলোমিটারে এসে দাঁড়িয়েছে। এতে মাছের আবাসস্থল সংকোচনসহ জীববৈচিত্র্য ও জলজ বাস্তুতন্ত্র হুমকিতে পড়েছে।

মৎস্য সেক্টরের সঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে সম্পৃক্ত একজন কর্মী হিসেবে এই সংবাদটি আমার জন্য কষ্টের।

প্রকৃতিতে বিল ও হাওর হচ্ছে দেশি মাছের প্রধান আবাসস্থল। এগুলোর মধ্যে চলনবিল অন্যতম। নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার ৯টি থানা নিয়ে চলনবিলের অবস্থান।

এটি দেশের সর্ববৃহৎ বিল। এই বিলের মাছের স্বাদই আলাদা। দেশ-বিদেশে এখনো চলনবিলের মাছের যথেষ্ট কদর ও চাহিদা রয়েছে। এ ছাড়া বৃহত্তর সিলেট, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের হাওরকে দেশি মাছের অন্যতম উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কিন্তু পানিশাসন, অপরিকল্পিত রাস্তা বা বাঁধ নির্মাণ ও দূষণের কারণে এসব হাওরও এখন অনেকটা বিপর্যস্ত।

আমাদের মিঠা পানির ২৬১ প্রজাতির মাছের মধ্যে গুতুম ছোট প্রজাতির একটি মাছ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Lepidocephalus guntea এবং ইংরেজি নাম Peppered loach বা Guntea loach| Cobitidae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এই মাছটিকে এলাকাভেদে গুটিয়া, মরিচ পুঁইয়া, গোতরা কিংবা গোরকুন নামে ডাকা হয়। বাংলাদেশে Lepidocephalus গণের আরো তিনটি প্রজাতি রয়েছে। এগুলো হচ্ছে Lepidocephalus annandalei (Annandale loach), খ. rorata (Loktak loach) এবং খ. berdmorei (Burmese loach)| বর্তমানে চলনবিল, ছোট যমুনা নদী, হালতি বিল এবং নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জের হাওরে গুতুম মাছ বেশি পাওয়া যায়।

বাংলাদেশে গুতুম মাছ (Lepidocephalus guntea) দৈর্ঘ্যে সাধারণত ৬-৭ সেন্টিমিটার এবং সর্বোচ্চ ৯.৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত পাওয়া গেছে। এদের দেহ লম্বাটে এবং পার্শ্বীয়ভাবে সামান্য চাপা। মুখে তিন জোড়া স্পর্শী আছে; এর মধ্যে দুই জোড়া চঞ্চুতে এবং এক জোড়া ওপরের চোয়ালে অবস্থিত। পরিপক্ব পুরুষ মাছের বক্ষ পাখনার ওপর অস্থিসদৃশ স্পাইন আছে। গুতুম মাছের গায়ের রং সাধারণত গাঢ় হলদে। এর মাথার পেছন থেকে পুচ্ছ পাখনা পর্যন্ত কালো কালো দাগ আছে। এদের দেহ পিচ্ছিল এবং আঁষ খুবই ছোট। সুস্বাদু এবং কাঁটা কম হওয়ায় মাছটি খেতে অনেকে পছন্দ করে। একই বয়সের পরিপক্ব স্ত্রী মাছ পুরুষ মাছের চেয়ে আকারে বড় হয়। প্রজননকালে একটি স্ত্রী গুতুম মাছ থেকে প্রতি গ্রাম দেহ ওজনের ১৭০০ থেকে ৪২০০টি পর্যন্ত ডিম পাওয়া যায়। জুন মাস এদের সর্বোচ্চ প্রজননকাল। এভাবে জলাশয়ের তলদেশের গলিত ও পচা খাবার খেয়ে গুতুম মাছ জলজ বাস্তুতন্ত্র পরিষ্কার রাখে। এরা জলাশয়ের তলদেশে বসবাস করে। গুতুম শান্ত প্রকৃতির মাছ এবং তাৎক্ষণিক লুকানোর জন্য এরা কাদা, বালু কিংবা নুড়িপাথরময় এলাকায় বসবাস করতে পছন্দ করে।

এরা ছয়-সাত মাসের মধ্যে পরিপক্ব বা বাজারজাতযোগ্য হয়ে যায়। বাংলাদেশে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে এই মাছটির কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তি ২০১৭ সালে উদ্ভাবন করা হয়েছে। প্রযুক্তি উদ্ভাবনে প্রধান গবেষক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন ড. খন্দকার মো. রশীদুল হাসান। প্রজনন প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হলেও এর চাষ প্রযুক্তি এখনো অজানা। গুতুম মাছে প্রচুর ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড আছে। গুতুম মাছ সাধারণত চচ্চড়ি করে রান্না করা হয়। রোগ প্রতিরোধে এবং শিশুদের হাড় ও দাঁত মজবুত করতে এই মাছ খুবই উপকারী। তা ছাড়া ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।

লেখক : কৃষিবিদ ও মৎস্য বিশেষজ্ঞ; ই-মেইল : yahiamahmud@yahoo.com

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

৩০০ কর্মকর্তার সমন্বয়ে নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি গঠন করল ইসি

গুতুম মাছের গল্প

আপডেট টাইম : ০৯:২৫:৩১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর ২০২৫

উন্মুক্ত জলাশয় থেকে দেশি মাছ ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে—এ ধরনের সংবাদ পত্রিকা খুললেই চোখে পড়ে। অতি সম্প্রতি প্রকৃতির লীলাভূমি চলনবিলের ওপর দেশের একটি জাতীয় দৈনিকে সংবাদ ছাপা হয়েছে। সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে, গত পাঁচ দশকে ৮০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে পানিসম্পন্ন চলনবিল এখন মাত্র ৬৬ বর্গকিলোমিটারে এসে দাঁড়িয়েছে। এতে মাছের আবাসস্থল সংকোচনসহ জীববৈচিত্র্য ও জলজ বাস্তুতন্ত্র হুমকিতে পড়েছে।

মৎস্য সেক্টরের সঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে সম্পৃক্ত একজন কর্মী হিসেবে এই সংবাদটি আমার জন্য কষ্টের।

প্রকৃতিতে বিল ও হাওর হচ্ছে দেশি মাছের প্রধান আবাসস্থল। এগুলোর মধ্যে চলনবিল অন্যতম। নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার ৯টি থানা নিয়ে চলনবিলের অবস্থান।

এটি দেশের সর্ববৃহৎ বিল। এই বিলের মাছের স্বাদই আলাদা। দেশ-বিদেশে এখনো চলনবিলের মাছের যথেষ্ট কদর ও চাহিদা রয়েছে। এ ছাড়া বৃহত্তর সিলেট, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের হাওরকে দেশি মাছের অন্যতম উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কিন্তু পানিশাসন, অপরিকল্পিত রাস্তা বা বাঁধ নির্মাণ ও দূষণের কারণে এসব হাওরও এখন অনেকটা বিপর্যস্ত।

আমাদের মিঠা পানির ২৬১ প্রজাতির মাছের মধ্যে গুতুম ছোট প্রজাতির একটি মাছ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Lepidocephalus guntea এবং ইংরেজি নাম Peppered loach বা Guntea loach| Cobitidae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এই মাছটিকে এলাকাভেদে গুটিয়া, মরিচ পুঁইয়া, গোতরা কিংবা গোরকুন নামে ডাকা হয়। বাংলাদেশে Lepidocephalus গণের আরো তিনটি প্রজাতি রয়েছে। এগুলো হচ্ছে Lepidocephalus annandalei (Annandale loach), খ. rorata (Loktak loach) এবং খ. berdmorei (Burmese loach)| বর্তমানে চলনবিল, ছোট যমুনা নদী, হালতি বিল এবং নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জের হাওরে গুতুম মাছ বেশি পাওয়া যায়।

বাংলাদেশে গুতুম মাছ (Lepidocephalus guntea) দৈর্ঘ্যে সাধারণত ৬-৭ সেন্টিমিটার এবং সর্বোচ্চ ৯.৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত পাওয়া গেছে। এদের দেহ লম্বাটে এবং পার্শ্বীয়ভাবে সামান্য চাপা। মুখে তিন জোড়া স্পর্শী আছে; এর মধ্যে দুই জোড়া চঞ্চুতে এবং এক জোড়া ওপরের চোয়ালে অবস্থিত। পরিপক্ব পুরুষ মাছের বক্ষ পাখনার ওপর অস্থিসদৃশ স্পাইন আছে। গুতুম মাছের গায়ের রং সাধারণত গাঢ় হলদে। এর মাথার পেছন থেকে পুচ্ছ পাখনা পর্যন্ত কালো কালো দাগ আছে। এদের দেহ পিচ্ছিল এবং আঁষ খুবই ছোট। সুস্বাদু এবং কাঁটা কম হওয়ায় মাছটি খেতে অনেকে পছন্দ করে। একই বয়সের পরিপক্ব স্ত্রী মাছ পুরুষ মাছের চেয়ে আকারে বড় হয়। প্রজননকালে একটি স্ত্রী গুতুম মাছ থেকে প্রতি গ্রাম দেহ ওজনের ১৭০০ থেকে ৪২০০টি পর্যন্ত ডিম পাওয়া যায়। জুন মাস এদের সর্বোচ্চ প্রজননকাল। এভাবে জলাশয়ের তলদেশের গলিত ও পচা খাবার খেয়ে গুতুম মাছ জলজ বাস্তুতন্ত্র পরিষ্কার রাখে। এরা জলাশয়ের তলদেশে বসবাস করে। গুতুম শান্ত প্রকৃতির মাছ এবং তাৎক্ষণিক লুকানোর জন্য এরা কাদা, বালু কিংবা নুড়িপাথরময় এলাকায় বসবাস করতে পছন্দ করে।

এরা ছয়-সাত মাসের মধ্যে পরিপক্ব বা বাজারজাতযোগ্য হয়ে যায়। বাংলাদেশে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে এই মাছটির কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তি ২০১৭ সালে উদ্ভাবন করা হয়েছে। প্রযুক্তি উদ্ভাবনে প্রধান গবেষক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন ড. খন্দকার মো. রশীদুল হাসান। প্রজনন প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হলেও এর চাষ প্রযুক্তি এখনো অজানা। গুতুম মাছে প্রচুর ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড আছে। গুতুম মাছ সাধারণত চচ্চড়ি করে রান্না করা হয়। রোগ প্রতিরোধে এবং শিশুদের হাড় ও দাঁত মজবুত করতে এই মাছ খুবই উপকারী। তা ছাড়া ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।

লেখক : কৃষিবিদ ও মৎস্য বিশেষজ্ঞ; ই-মেইল : yahiamahmud@yahoo.com