ঢাকা ০১:৩৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৪ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগে চুক্তির আড়ালে চুরি

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:১৯:২৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৫
  • ৫২ বার

রাষ্ট্রয়াত্ত্ব পরিবহন সংস্থা বিআরটিসিতে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও লাভের মুখ দেখছে না সরকার। বছরের পর বছর লোকসানের অঙ্ক গুনতে গুনতে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিকে ‘লাভজনক’ বলা হলেও এর নেপথ্যে রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি।

লাভের অঙ্ক হিসাব করতে হয় লগ্নিকৃত টাকার পরিমান দিয়ে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে লগ্নিকৃত অঙ্কের সাথে লাভের অঙ্কের কোনো মিল নেই। পেছনের বছরগুলোতে শত শত কোটি টাকার শত শত বাস যে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে সেটা হিসাবে না ধরে সাম্প্রতিক লগ্নিকেই সামনে আনা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, প্রায় দুই হাজার কর্মচারিকে বসিয়ে বসিয়ে বেতন দিয়ে চুক্তিতে চালানো হচ্ছে বিআরটিসি’র বাস। তাতে বাসগুলো দিন দিন লক্কর-ঝক্কর হয়ে সম্পদের ‘অপব্যবহার’ বা ‘অপচয়’ হিসাবের খাতায় আনা হচ্ছে না। এর নেপথ্যেও রয়েছে পুকুরচুরি।

বেসরকারি পরিবহন মালিক সমিতির নেতারা যেখানে হাসিনার আমলে চালু করা চুক্তি পদ্ধতি বাতিল করে পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করছেন সেখানে বিআরটিসির উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পুরনো ফরমেটেই লাভের হিসাব সামনে রেখে চুটিয়ে দুর্নীতি করে যাচ্ছেন। বিআরটিসির তথ্য মতে, ২০১৮ সালে বিআরটিসির বহরে মোট ১ হাজার ৪৩৫টি বাস ছিল। সেখানে চলার উপযোগী বাস ছিল ৯৩৭টি। ২০১৯ সালে ১ হাজার ৮৫৪টি বাসের মধ্যে সড়কে চলতো ১ হাজার ২৯টি বাস। ২০২০ সালে ১ হাজার ৮২৫ বাসের মধ্যে ৮২৫টি বাস চলাচল করতে পারতো। এভাবে বিআরটিসির বাস বহরে সূচক নেমে কমছে বাসের সংখ্যা। আবার পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বেসরকারি বাসে পরিবহন নির্ভরতা।

জানা গেছে, বিআরটিসির বহরে স্বল্প পরিমাণ বাস রয়েছে, এর মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি দপ্তরে বাস চুক্তিতে ভাড়া দেয়াকে সরকারি অর্থের অপচয় বলে মনে করছে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। বেসরকারি পরিবহন মালিকদের মতে, চুক্তিতে কোন বাস ভাড়া দিলে যারা ভাড়া নেন, তারা সাধারণত ট্রিপ হিসাবে ভাড়া নির্ধারণ করেন। একটি বাস সর্বোচ্চ আপ-ডাউন ২/২ ট্রিপ হিসাবে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দেখা যায়, লাভের আশায় ভাড়াটিয়া দিনে ৫/৭ ট্রিপ দিতেও দ্বিধা করে না। এতে করে বাসের ইঞ্জিনের উপর প্রেসার পড়ে, বডি নষ্ট হয়ে যায়, সর্বোপরী বাসটির আয়ুস্কাল কমে যায়। এভাবেই বিগত বছরগুলোতে বিআরটিসির বাসের সংখ্যা দেড় হাজার থেকে ৮শ’র ঘরে নেমে এসেছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে ভারত থেকে আমদানি করা নি¤œমানের শত শত বাস নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। সেগুলো মেরামতের নামে লাখ লাখ টাকা চুরি হয়েছে। এখনও হচ্ছে।

বেসরকারি পরিবহন মালিকরা জানান, চুক্তি মানে আসলে চুরি। মালিক-শ্রমিক মিলে চুক্তিতে ভাড়া নিয়ে ট্রিপ বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে দুর্ঘটনা ঘটায়। গাড়ির পার্স প্রায়ই নষ্ট হয়। কে কার আগে যাবে- এ নিয়ে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে দুর্ঘটনাসহ সড়কে বিশৃঙ্খলা লেগেই থাকে। এ কারণে বর্তমান ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি চুক্তি নিষিদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে। অথচ বিআরটিসি হাঁটছে উল্টো পথে। এটা যেমন রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়, তেমনি দুর্নীতিবাজদের সুযোগ করে দেয়ার সামিল। অথচ দেশের গণপরিবহনে বিআরটিসি ২ শতাংশ ভূমিকাও রাখতে পারছে না। আর যাত্রীসেবার দিক দিয়ে বিবেচনা করলে বিআরটিসি ন্যূনতম সেবাও দিতে পারে না। কয়েকদিন আগে যাত্রাবাড়ি বিআরটিসি ডিপোতে দিয়ে দেখা গেছে, একজন মালিক বাস নিয়ে অভিযাগে দিতে এসেছেন। তিনি ডিপো ম্যানেজারকে জানান, তার বাসের ছাদ ও জানালা দিয়ে পানি পড়ে। ছাদে কয়েকবার ঝালাই দেয়ার পরেও কোনো কাজ হচ্ছে না। এখন ছাদ পরিবর্তন করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। আরেক মালিক একই রকম অভিযোগ নিয়ে আসেন। তিনি ম্যানেজারকে বলেন, ট্রিপ হিসাবে ভাড়া ধরেছেন, কয়েকদিন যাবত গাড়ি চলছে না। আমি কী জমি বিক্রি করে ভাড়া দিবো? আলাপকালে একজন মালিক জানান, কিছুদিন আগেও যাত্রাবাড়ি ডিপোর সব কিছু দেখতো ম্যানেজার গোলাম ফারুক। যিনি কয়েকদিন আগে পদোন্নতি পেয়ে ডিজিএম চলতি দায়িত্ব) হয়েছেন। লোকটা আওয়ামী লীগের দালাল। আওয়ামী লীগকে সুবিধা দেয়ার জন্য যা খুশি তাই করছেন। মন্ত্রণালয়ের আদেশকেও তোয়াক্কা করছেন না। তাকে ওই পদ থেকে না সরালে বিআরটিসির উন্নতি হবে না। বরং ফ্যাসিস্টদের সুবিধা দিন দিন বাড়তেই থাকবে। অভিযোগ রয়েছে, গোলাম ফারুক কাগজপত্রে একরকম চুক্তি করেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে টাকা নেন আরও বেশি, যেটা সরকারি খাতে জমা হয় না। আর এজন্য তিনি চেয়ারম্যান ও পরিচালক (প্রশাসন ও অপারেশন) কে মাসোহারার বিনিময়ে ম্যানেজ করে রাখেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগে চুক্তির আড়ালে চুরি

আপডেট টাইম : ১০:১৯:২৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৫

রাষ্ট্রয়াত্ত্ব পরিবহন সংস্থা বিআরটিসিতে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও লাভের মুখ দেখছে না সরকার। বছরের পর বছর লোকসানের অঙ্ক গুনতে গুনতে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিকে ‘লাভজনক’ বলা হলেও এর নেপথ্যে রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি।

লাভের অঙ্ক হিসাব করতে হয় লগ্নিকৃত টাকার পরিমান দিয়ে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে লগ্নিকৃত অঙ্কের সাথে লাভের অঙ্কের কোনো মিল নেই। পেছনের বছরগুলোতে শত শত কোটি টাকার শত শত বাস যে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে সেটা হিসাবে না ধরে সাম্প্রতিক লগ্নিকেই সামনে আনা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, প্রায় দুই হাজার কর্মচারিকে বসিয়ে বসিয়ে বেতন দিয়ে চুক্তিতে চালানো হচ্ছে বিআরটিসি’র বাস। তাতে বাসগুলো দিন দিন লক্কর-ঝক্কর হয়ে সম্পদের ‘অপব্যবহার’ বা ‘অপচয়’ হিসাবের খাতায় আনা হচ্ছে না। এর নেপথ্যেও রয়েছে পুকুরচুরি।

বেসরকারি পরিবহন মালিক সমিতির নেতারা যেখানে হাসিনার আমলে চালু করা চুক্তি পদ্ধতি বাতিল করে পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করছেন সেখানে বিআরটিসির উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পুরনো ফরমেটেই লাভের হিসাব সামনে রেখে চুটিয়ে দুর্নীতি করে যাচ্ছেন। বিআরটিসির তথ্য মতে, ২০১৮ সালে বিআরটিসির বহরে মোট ১ হাজার ৪৩৫টি বাস ছিল। সেখানে চলার উপযোগী বাস ছিল ৯৩৭টি। ২০১৯ সালে ১ হাজার ৮৫৪টি বাসের মধ্যে সড়কে চলতো ১ হাজার ২৯টি বাস। ২০২০ সালে ১ হাজার ৮২৫ বাসের মধ্যে ৮২৫টি বাস চলাচল করতে পারতো। এভাবে বিআরটিসির বাস বহরে সূচক নেমে কমছে বাসের সংখ্যা। আবার পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বেসরকারি বাসে পরিবহন নির্ভরতা।

জানা গেছে, বিআরটিসির বহরে স্বল্প পরিমাণ বাস রয়েছে, এর মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি দপ্তরে বাস চুক্তিতে ভাড়া দেয়াকে সরকারি অর্থের অপচয় বলে মনে করছে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। বেসরকারি পরিবহন মালিকদের মতে, চুক্তিতে কোন বাস ভাড়া দিলে যারা ভাড়া নেন, তারা সাধারণত ট্রিপ হিসাবে ভাড়া নির্ধারণ করেন। একটি বাস সর্বোচ্চ আপ-ডাউন ২/২ ট্রিপ হিসাবে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দেখা যায়, লাভের আশায় ভাড়াটিয়া দিনে ৫/৭ ট্রিপ দিতেও দ্বিধা করে না। এতে করে বাসের ইঞ্জিনের উপর প্রেসার পড়ে, বডি নষ্ট হয়ে যায়, সর্বোপরী বাসটির আয়ুস্কাল কমে যায়। এভাবেই বিগত বছরগুলোতে বিআরটিসির বাসের সংখ্যা দেড় হাজার থেকে ৮শ’র ঘরে নেমে এসেছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে ভারত থেকে আমদানি করা নি¤œমানের শত শত বাস নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। সেগুলো মেরামতের নামে লাখ লাখ টাকা চুরি হয়েছে। এখনও হচ্ছে।

বেসরকারি পরিবহন মালিকরা জানান, চুক্তি মানে আসলে চুরি। মালিক-শ্রমিক মিলে চুক্তিতে ভাড়া নিয়ে ট্রিপ বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে দুর্ঘটনা ঘটায়। গাড়ির পার্স প্রায়ই নষ্ট হয়। কে কার আগে যাবে- এ নিয়ে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে দুর্ঘটনাসহ সড়কে বিশৃঙ্খলা লেগেই থাকে। এ কারণে বর্তমান ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি চুক্তি নিষিদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে। অথচ বিআরটিসি হাঁটছে উল্টো পথে। এটা যেমন রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়, তেমনি দুর্নীতিবাজদের সুযোগ করে দেয়ার সামিল। অথচ দেশের গণপরিবহনে বিআরটিসি ২ শতাংশ ভূমিকাও রাখতে পারছে না। আর যাত্রীসেবার দিক দিয়ে বিবেচনা করলে বিআরটিসি ন্যূনতম সেবাও দিতে পারে না। কয়েকদিন আগে যাত্রাবাড়ি বিআরটিসি ডিপোতে দিয়ে দেখা গেছে, একজন মালিক বাস নিয়ে অভিযাগে দিতে এসেছেন। তিনি ডিপো ম্যানেজারকে জানান, তার বাসের ছাদ ও জানালা দিয়ে পানি পড়ে। ছাদে কয়েকবার ঝালাই দেয়ার পরেও কোনো কাজ হচ্ছে না। এখন ছাদ পরিবর্তন করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। আরেক মালিক একই রকম অভিযোগ নিয়ে আসেন। তিনি ম্যানেজারকে বলেন, ট্রিপ হিসাবে ভাড়া ধরেছেন, কয়েকদিন যাবত গাড়ি চলছে না। আমি কী জমি বিক্রি করে ভাড়া দিবো? আলাপকালে একজন মালিক জানান, কিছুদিন আগেও যাত্রাবাড়ি ডিপোর সব কিছু দেখতো ম্যানেজার গোলাম ফারুক। যিনি কয়েকদিন আগে পদোন্নতি পেয়ে ডিজিএম চলতি দায়িত্ব) হয়েছেন। লোকটা আওয়ামী লীগের দালাল। আওয়ামী লীগকে সুবিধা দেয়ার জন্য যা খুশি তাই করছেন। মন্ত্রণালয়ের আদেশকেও তোয়াক্কা করছেন না। তাকে ওই পদ থেকে না সরালে বিআরটিসির উন্নতি হবে না। বরং ফ্যাসিস্টদের সুবিধা দিন দিন বাড়তেই থাকবে। অভিযোগ রয়েছে, গোলাম ফারুক কাগজপত্রে একরকম চুক্তি করেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে টাকা নেন আরও বেশি, যেটা সরকারি খাতে জমা হয় না। আর এজন্য তিনি চেয়ারম্যান ও পরিচালক (প্রশাসন ও অপারেশন) কে মাসোহারার বিনিময়ে ম্যানেজ করে রাখেন।