আমি মনে করি, এটা ঠিক নয়। নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ স্বাধীন একটা প্রতিষ্ঠান। এটা তাদের নিজস্ব এখতিয়ার। এখানে তাদের চাপ দেওয়াটা উচিত বলে আমি মনে করি না।’সাংবাদিক, কলামিস্ট ও চর্চার সম্পাদক সোহরাব হাসান বলেন, ‘আমরা কারিগরি সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছি। রাজনৈতিক সমস্যা নিয়ে কম আলোচনা হয়েছে। আর আমাদের একটা ধারণা হয়েছে যে পাঁচজন নির্বাচন কমিশনার মঙ্গলগ্রহ থেকে এসেছেন, সব কিছুর দায় তাদের। আমরা অন্যায় করব, অনিয়ম করব, ভোট জালিয়াতি করব, চুরি করব, ভোট আনতে দেব না। কিন্তু ইসিকে কাজটা করতে হবে। এটা সম্ভব নয়।’
তিনি বলেন, ‘নির্বাচন করে জনগণ। কিন্তু জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকার, ইসি ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর। তারা সহায়তা না করলে সম্ভব না।’
তিনি আরো বলেন, ‘আপনাদের নির্বাচন করার যেমন মানসিকতা থাকতে হবে, তেমনি নির্বাচন না করার মানসিকতাও থাকতে হবে। আপনাদের বিবেচনায় যদি মনে করেন সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় তাহলে নির্বাচন থেকে সরে আসা উচিত, পদত্যাগ করা উচিত। বিগত ইসিকেও একই কথা বলে ছিলাম। নির্বাচন মানেই বাছাইয়ে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা। সেটা না থাকার যথেষ্ট পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি হচ্ছে জিততে চাওয়া। সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরায় হিসেবে যে শক্তি আসবে আমরা তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াব। কিন্তু আমরা তো সেই শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। সব প্রার্থী একই মঞ্চে প্রচার করবে এমন ব্যবস্থা করতে হবে। এতে কালো টাকার প্রভাব কমবে।’
সোহরাব হাসান বলেন, ‘কিছু দলকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করার প্রস্তুতি চলছে। একটি পক্ষকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়ার কথা চলছে। ঐকমত্য কমিশনে ৩০টি দলের সঙ্গে কথা হচ্ছে। সেখান থেকেও কেউ যদি বলে নির্বাচনে যাবে না, তাহলে পরিস্থিতি কী হবে, সে বিষয়টা ভাবতে হবে। প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, সেরা নির্বাচন হবে। তাহলে কাউকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করলে সেরা নির্বাচন কিভাবে হবে।’
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধূরী বলেন, ‘৫৫ বছর পরও নারীদের জন্য মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ আসনের কথা শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে গেছি। এটা মেনে নেওয়া যায় না। আমাদের ন্যূনতম দাবি—৩৩ শতাংশ আসন নারীদের জন্য নিশ্চিত করা। এ ছাড়া প্রবাসীদের সন্তানরা পড়াশোনার জন্য দেশে থাকে। তাদের নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণও গুরুত্ব দিতে হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রুবায়েত ফেরদৌস বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের কাছে একটা অনুরোধ…সত্যি যদি আপনাদের মেরুদণ্ড থাকে, যদি আপনারা চ্যালেঞ্জ নিতে পারেন তাহলে কিন্তু আপনারা সফল হতে পারবেন। পুরো জাতি কিন্তু তাকিয়ে আছে নির্বাচন কমিশনের দিকে। তাই নির্বাচন কমিশনকে কিন্তু স্বচ্ছ হতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘ভোটার তালিকা বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। গণমাধ্যমকে অবাধ করে দিতে হবে যতটা পারা যায়। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষককে যত পারেন যুক্ত করতে হবে। প্রান্তিক নারীদের ও মাইনোরিটিদের এমপাওয়ার (ক্ষমতায়ন) করতে হবে।’
সব আসনে ‘না’ ভোটের কথা উল্লেখ করে টিআইবির পরিচালক মোহাম্মদ বদিউজ্জামান বলেন, ‘মনোনয়ন পত্র দাখিল ও হলফনামায় তারা (প্রার্থী) যা দেয় তাই; এসব তথ্যের যাচাই-বাছাই করার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সিস্টেম আমাদের নেই। আমার মনে হয় এটা আমাদের যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন।’
তিনি আরো বলেন, ‘না ভোটের ব্যবস্থা যেন সব আসনেই থাকে। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী কোনো আসনে একজন প্রার্থী থাকলে তাকে না ভোটের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে।’
জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান বলেন, ‘এই নির্বাচনকে যদি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে হয় তাহলে আপনাদের মেরুদণ্ড শক্ত হয়ে দাঁড়াতে হবে। এখনও প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে স্বৈরাচারের প্রেতাত্মারা রয়েছে তারা কিন্তু সুন্দর নির্বাচন হতে বাধা দিবে। এই বিষয় ইসিকে সজাগ থাকতে হবে। আর নির্বাচন অবাধ করতে গেলে প্রথমে প্রয়োজন আপনাদের সদিচ্ছা।’
বিজিএমইএ পরিচালক রশিদ আহমদ হোসাইনী বলেন, ‘এই সংলাপ যেনো সংলাপ হয়েই না থাকে। আমরা চাইবো সুন্দর সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করবেন। শুধু ঋণ খেলাপিদের না, যারা অর্থ পাচারকারী তারাও যাতে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে সেই আইন করতে হবে।’
পুলিশ রিফর্ম কমিশনের সদস্য মোহাম্মদ হারুন চৌধুরী বলেন, ‘স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা যেন ভোটাররা পায়, তা এখনই দৃশ্যমান করতে হবে। অনেক প্রার্থী পোলিং এজেন্ট দিতে পারে না। বড় দলগুলো ভয়ভীতি দেখায়। এটা যেন না হয় তা কমিশনকে নিশ্চিত করতে হবে।’
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইস) এ এম এম নাসির উদ্দিন সমাপনী বক্তব্যে বলেন, ‘আমরা নির্বাচনকে স্বচ্ছ করতে চাই। সবাই যাতে দেখতে পারে সে ব্যবস্থা করতে চাই। বিদেশি পর্যবেক্ষকদের স্বাগতম জানাব। দেশীয় পর্যবেক্ষক যতটা পারি বেশি নিবন্ধন দিতে চাই। আমরা চেষ্টা করব আপনাদের পরামর্শ বাস্তবায়ন করার। অতীতের মতো হবে না। অনিয়ম হলে পুরো আসনের নির্বাচন বাতিল করার ক্ষমতা ফিরিয়ে এনেছি।’
নির্বাচনী এই সংলাপে সভাপতিত্বে করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। এছাড়া অন্য চার নির্বাচন কমিশনার, ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদসহ ইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সংলাপে সুশীল সমাজ ও বুদ্ধিজীবী প্রতিনিধির ১৪ জন অংশগ্রহণ করেন।