ঢাকা ১০:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
সংসদে ‘অঙ্গুলিনির্দেশ’ এক্সপাঞ্জের দাবি হিলালীর, স্পিকার বললেন—‘করা যাবে না’ হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অপরিষ্কার পরিবেশ দেখে ক্ষোভ বাজেট-জনবল সংকটের অজুহাতে নাগরিক সেবা ব্যাহত করা যাবে না প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরীক্ষার ফি নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসলো সরকার পদোন্নতি পেয়ে সচিব হলেন ২ কর্মকর্তা ওসমান হাদি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমার তারিখ ২৮ জুন পিতা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ, অথচ জামায়াতের এমপি জন্মেছেন ১৯৮১ সালে মায়ের ঘনিষ্ঠ সহচর ও সাবেক এমপি খালেদা রাব্বানীকে দেখতে গেলেন প্রধানমন্ত্রী ভারত সীমান্তের স্পর্শকাতর স্থানে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পরিকল্পনা বিবেচনাধীন : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘মেসি এত ভালো খেলে কেন’, প্রশ্ন বুবলীর

জলবায়ুর অভিঘাতে বিপন্ন ১১৮ দেশী মাছ, অতিথি মাছে বাজার সয়লাব

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:৪৮:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • ২০০ বার

বৃষ্টির মৌসুমে খরা, বিদায়ী বর্ষায় বন্যা, শীতের দৈর্ঘ্য হ্রাস, অতি বৃষ্টি, অনাবৃষ্টি কিংবা বজ্রপাতের হার বেড়ে যাওয়া—সবকেই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঘটনাক্রম বলে উল্লেখ করছেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা। এর বিরূপ প্রভাব শুধু প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপরই পড়ছে না, মানুষের বাস্তুসংস্থান, খাদ্যসংস্থান, মানবদেহে প্রাণিজ আমিষের ঘাটতি এবং জীবিকার ওপরও আঘাত হানছে। আধুনিক সভ্যতার নতুন ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এটি। ধরিত্রীর অংশ হিসেবে জনবহুল বাংলাদেশের জন্য যা আরও বেশি ভাবনার বিষয়।

জলবায়ু অভিঘাত ঃ বিজ্ঞানী, কৃষিবিদ ও পরিবেশবিদরা জানাচ্ছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক ধাক্কা লাগছে জীববৈচিত্র্যের ওপর। জলবায়ুর অভিঘাত ভেঙে দিচ্ছে মানুষ ও প্রাণীর আবাস, খাদ্য শৃঙ্খল এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন। বিশেষভাবে বলতে গেলে গুরুতর আঘাত এসেছে দেশীয় মৎস্যসম্পদের ওপর। মাছের বিচরণ ও আবাসস্থল দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। মাছের প্রজনন, নার্সারি ও উৎপাদন এলাকা কমে যাচ্ছে। প্লাবনভূমি, বিল ও অন্যান্য জলাশয়ের পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। ভারতের পানি আগ্রাসনে আমাদের নদীতে প্রবাহ কমেই চলেছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের নিম্নগামিতা ভয়াবহ সঙ্কটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। খাল, বিল, হাওরের সঙ্গে নদীর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। মাছের অভিপ্রয়াণ পথ ভরাট ও রুদ্ধ হচ্ছে। দিন-রাত ও ঋতুভেদে তাপমাত্রার তারতম্য বাড়ছে। বৃষ্টিপাতের মাত্রা, তীব্রতা, সময় ও ধরনেও আসছে পরিবর্তন। বন্যা, খরা, ঝড়, বজ্রপাত, দাবদাহ ও সাইক্লোনের মাত্রা ও তীব্রতা বাড়ছে। গত চার দশকে এ প্রক্রিয়ার সরাসরি ফল হচ্ছে নদীমাতৃক দেশটিতে মিঠাপানির মাছের প্রায় বিলুপ্তি।

পরিবেশবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনে মৎস্য খাতে প্রভাব মূলত তিন পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে। প্রথমত, উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছের সার্বিক উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রভাব। দ্বিতীয়ত, মাছ চাষের উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রভাব। তৃতীয়ত, মাছের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব মহলের জীবিকায় প্রভাব। মৎস্য খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক প্রভাবের মধ্যে অন্যতম হলো উন্মুক্ত জলাশয়ে সার্বিক মাছ উৎপাদন ও জীববৈচিত্র্যের ওপর সুস্পষ্ট বিরূপ প্রভাব, যা সমগ্র মৎস্য খাতের জন্য উদ্বেগজনক। উল্লেখযোগ্য প্রভাবগুলোর মধ্যে রয়েছে নদীসহ সব সংযোগ খালের নাব্যতা হ্রাস পাওয়ায় পানির প্রবাহ বন্ধ বা অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া। আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ায় প্রজনন কমে গিয়ে উন্মুক্ত জলাশয়ে নতুন মজুদ কমছে। প্লাবনভূমি ও বিল শুকিয়ে যাওয়ায় সেচে মাছ ধরার প্রবণতা বাড়ছে, ফলে মাছের বংশ ধ্বংস হচ্ছে। পলি জমার কারণে পানি কমে বা শুকিয়ে যাওয়ায় অভিপ্রয়াণ বা স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত হচ্ছে। তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের তারতম্যের কারণে পানির ভৌত-রাসায়নিক ও জৈবিক গুণাবলির ক্রমাবনতি হচ্ছে।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে শুষ্ক মৌসুমে নদীর উজানে লোনাপানি প্রবেশ করছে, এতে মিঠাপানির জীববৈচিত্র্য হ্রাস পাচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার পরিবর্তনে মাছের প্রজনন ও স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। নানা কারণে মাছের পরিপক্বতা ও প্রজননকাল পরিবর্তিত হচ্ছে, এমনকি অনেক মাছ উপযুক্ত পরিবেশ না পেয়ে প্রজনন থেকে বিরত থাকছে।

মৎস্য গবেষক জাহাঙ্গীর আলম কবির জানিয়েছেন, মিঠাপানির দেশীয় প্রজাতির মাছ আশঙ্কাজনক হারে কমছে। ২৬০ প্রজাতির মধ্যে ৬৪টি মহাবিপন্ন অবস্থায় রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব ন্যাচার (আইইউসিএন) প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, ১১৮ জাতের দেশীয় মাছ বিপন্ন অবস্থায় আছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী ৫০ বছরে মিঠাপানির মাছ কেবল জাদুঘরে পাওয়া যাবে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা। দেশীয় মাছের স্থান দখল করে নিচ্ছে বিদেশি প্রজাতির মাছ, যার মধ্যে রয়েছে অনেক রাক্ষসী মাছ।

গবেষণায় দেখা গেছে, দেশীয় মাছ বিলুপ্ত হওয়ার পেছনে রয়েছে বিদেশি রাক্ষসী মাছের চাষ, বিদেশি মাছ খাওয়ার অভ্যাস তৈরি, দেশীয় মাছের প্রতি অনাগ্রহ, প্রজনন ঋতুতে নির্বিচারে মা মাছ শিকার, মাছের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা, অতিরিক্ত মাছ ধরা, বাণিজ্যিক মাছ চাষে বিষ প্রয়োগ, কৃষিজমিতে ঘের তৈরি, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার, উচ্চফলনশীল ধানের চাষ, আধুনিক সেচ ব্যবস্থা, পানি শূন্য করে মাছ ধরা, কারেন্ট জাল ও মশারি জাল দিয়ে পোনা ধ্বংস, ভারতের পানি আগ্রাসনে প্লাবনভূমি হ্রাস, মরুকরণ, কৃষিজমি ও নদী-খাল ভরাট, প্লাস্টিক ও রাসায়নিক বর্জ্যের দূষণ ইত্যাদি।

এ ছাড়া বাঁধ ও খাল নির্মাণ মাছের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্লাবনের সময় বহু মাছ স্থানান্তরিত হয়, কিন্তু প্রজননকালে ফিরে আসতে গিয়ে বাধার মুখে পড়ে। অপরিকল্পিত ও স্বল্পসংখ্যক ফিশপাস মাছের গমনপথ রোধ করছে।

বাংলাদেশে বিদেশি মাছ চাষ শুরু হয় ১৯৫০-এর দশকে। ১৯৫২ সালে সিঙ্গাপুর থেকে সিয়ামিজ গৌরামী, ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান থেকে গোল্ডফিশ, ১৯৫৪ সালে থাইল্যান্ড থেকে তেলাপিয়া, ১৯৫৭ সালে একই দেশ থেকে গাপ্পি, ১৯৬০ সালে কমন কার্প, ১৯৭০ সালে জাপান থেকে গ্রাস কার্প ও সিলভার কার্প, ১৯৭৫ সালে থাইল্যান্ড থেকে লাইলোটিকা, ১৯৭৯ সালে নেপাল থেকে মিরর কার্প, ১৯৮১ সালে বিগহেড কার্প, ১৯৮৬ সালে থাইল্যান্ড থেকে থাই সরপুটি এবং ১৯৮৯ সালে আফ্রিকান মাগুর আনা হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রাক্ষসী পিরানহা আনা হয়। এর মধ্যে তেলাপিয়া, কমন কার্প, গ্রাস কার্প, সিলভার কার্প, থাই সরপুটি, আফ্রিকান মাগুর, পাঙ্গাস ও থাই কই এখন পুকুর-জলাশয় ও বাজার দখল করে নিয়েছে। এসব বিদেশি মাছ দেশীয় মাছের পোনা খেয়ে ফেলে, যা দেশীয় মাছের উৎপাদন হ্রাসের বড় কারণ।

দেশীয় মাছের মধ্যে গুলশা, শোল, গজার, পাবদা, মাগুর, শিং, চিতল, আইড়, বোয়াল, চেলি, কই, খলিশা, ফোলুই, টাকি, বাইন, চান্দা, ভেদা, পুঁটি, বাটা, টেংরা, রুই, কালবাউশ, মহাশোলসহ অগণিত প্রজাতি বিলুপ্তির পথে। এসব মাছ বর্তমান প্রজন্মের কাছে অপরিচিত হয়ে পড়ছে, অনেকেই এগুলোকে বিদেশি মাছ ভেবে বিভ্রান্ত হন।

পুরনো আইন দিয়ে দেশীয় মাছ রক্ষার চেষ্টা চলছে। ১৯৫০ সালের একটি আইন দিয়েই আজও এ খাতে লড়াই করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. অনুরাধা ভদ্র বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে জনবহুল এ দেশে। ফলে দেশীয় জাতের মাছ ক্রমেই বিলুপ্ত হচ্ছে। সংরক্ষণের চেষ্টা থাকলেও আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ১৯৫০ সালের আইনে মৎস্য অপরাধের শাস্তি অপ্রতুল। যুগোপযোগী আইন প্রণয়নের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

সংসদে ‘অঙ্গুলিনির্দেশ’ এক্সপাঞ্জের দাবি হিলালীর, স্পিকার বললেন—‘করা যাবে না’

জলবায়ুর অভিঘাতে বিপন্ন ১১৮ দেশী মাছ, অতিথি মাছে বাজার সয়লাব

আপডেট টাইম : ১১:৪৮:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫

বৃষ্টির মৌসুমে খরা, বিদায়ী বর্ষায় বন্যা, শীতের দৈর্ঘ্য হ্রাস, অতি বৃষ্টি, অনাবৃষ্টি কিংবা বজ্রপাতের হার বেড়ে যাওয়া—সবকেই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঘটনাক্রম বলে উল্লেখ করছেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা। এর বিরূপ প্রভাব শুধু প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপরই পড়ছে না, মানুষের বাস্তুসংস্থান, খাদ্যসংস্থান, মানবদেহে প্রাণিজ আমিষের ঘাটতি এবং জীবিকার ওপরও আঘাত হানছে। আধুনিক সভ্যতার নতুন ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এটি। ধরিত্রীর অংশ হিসেবে জনবহুল বাংলাদেশের জন্য যা আরও বেশি ভাবনার বিষয়।

জলবায়ু অভিঘাত ঃ বিজ্ঞানী, কৃষিবিদ ও পরিবেশবিদরা জানাচ্ছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক ধাক্কা লাগছে জীববৈচিত্র্যের ওপর। জলবায়ুর অভিঘাত ভেঙে দিচ্ছে মানুষ ও প্রাণীর আবাস, খাদ্য শৃঙ্খল এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন। বিশেষভাবে বলতে গেলে গুরুতর আঘাত এসেছে দেশীয় মৎস্যসম্পদের ওপর। মাছের বিচরণ ও আবাসস্থল দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। মাছের প্রজনন, নার্সারি ও উৎপাদন এলাকা কমে যাচ্ছে। প্লাবনভূমি, বিল ও অন্যান্য জলাশয়ের পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। ভারতের পানি আগ্রাসনে আমাদের নদীতে প্রবাহ কমেই চলেছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের নিম্নগামিতা ভয়াবহ সঙ্কটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। খাল, বিল, হাওরের সঙ্গে নদীর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। মাছের অভিপ্রয়াণ পথ ভরাট ও রুদ্ধ হচ্ছে। দিন-রাত ও ঋতুভেদে তাপমাত্রার তারতম্য বাড়ছে। বৃষ্টিপাতের মাত্রা, তীব্রতা, সময় ও ধরনেও আসছে পরিবর্তন। বন্যা, খরা, ঝড়, বজ্রপাত, দাবদাহ ও সাইক্লোনের মাত্রা ও তীব্রতা বাড়ছে। গত চার দশকে এ প্রক্রিয়ার সরাসরি ফল হচ্ছে নদীমাতৃক দেশটিতে মিঠাপানির মাছের প্রায় বিলুপ্তি।

পরিবেশবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনে মৎস্য খাতে প্রভাব মূলত তিন পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে। প্রথমত, উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছের সার্বিক উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রভাব। দ্বিতীয়ত, মাছ চাষের উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রভাব। তৃতীয়ত, মাছের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব মহলের জীবিকায় প্রভাব। মৎস্য খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক প্রভাবের মধ্যে অন্যতম হলো উন্মুক্ত জলাশয়ে সার্বিক মাছ উৎপাদন ও জীববৈচিত্র্যের ওপর সুস্পষ্ট বিরূপ প্রভাব, যা সমগ্র মৎস্য খাতের জন্য উদ্বেগজনক। উল্লেখযোগ্য প্রভাবগুলোর মধ্যে রয়েছে নদীসহ সব সংযোগ খালের নাব্যতা হ্রাস পাওয়ায় পানির প্রবাহ বন্ধ বা অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া। আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ায় প্রজনন কমে গিয়ে উন্মুক্ত জলাশয়ে নতুন মজুদ কমছে। প্লাবনভূমি ও বিল শুকিয়ে যাওয়ায় সেচে মাছ ধরার প্রবণতা বাড়ছে, ফলে মাছের বংশ ধ্বংস হচ্ছে। পলি জমার কারণে পানি কমে বা শুকিয়ে যাওয়ায় অভিপ্রয়াণ বা স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত হচ্ছে। তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের তারতম্যের কারণে পানির ভৌত-রাসায়নিক ও জৈবিক গুণাবলির ক্রমাবনতি হচ্ছে।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে শুষ্ক মৌসুমে নদীর উজানে লোনাপানি প্রবেশ করছে, এতে মিঠাপানির জীববৈচিত্র্য হ্রাস পাচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার পরিবর্তনে মাছের প্রজনন ও স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। নানা কারণে মাছের পরিপক্বতা ও প্রজননকাল পরিবর্তিত হচ্ছে, এমনকি অনেক মাছ উপযুক্ত পরিবেশ না পেয়ে প্রজনন থেকে বিরত থাকছে।

মৎস্য গবেষক জাহাঙ্গীর আলম কবির জানিয়েছেন, মিঠাপানির দেশীয় প্রজাতির মাছ আশঙ্কাজনক হারে কমছে। ২৬০ প্রজাতির মধ্যে ৬৪টি মহাবিপন্ন অবস্থায় রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব ন্যাচার (আইইউসিএন) প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, ১১৮ জাতের দেশীয় মাছ বিপন্ন অবস্থায় আছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী ৫০ বছরে মিঠাপানির মাছ কেবল জাদুঘরে পাওয়া যাবে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা। দেশীয় মাছের স্থান দখল করে নিচ্ছে বিদেশি প্রজাতির মাছ, যার মধ্যে রয়েছে অনেক রাক্ষসী মাছ।

গবেষণায় দেখা গেছে, দেশীয় মাছ বিলুপ্ত হওয়ার পেছনে রয়েছে বিদেশি রাক্ষসী মাছের চাষ, বিদেশি মাছ খাওয়ার অভ্যাস তৈরি, দেশীয় মাছের প্রতি অনাগ্রহ, প্রজনন ঋতুতে নির্বিচারে মা মাছ শিকার, মাছের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা, অতিরিক্ত মাছ ধরা, বাণিজ্যিক মাছ চাষে বিষ প্রয়োগ, কৃষিজমিতে ঘের তৈরি, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার, উচ্চফলনশীল ধানের চাষ, আধুনিক সেচ ব্যবস্থা, পানি শূন্য করে মাছ ধরা, কারেন্ট জাল ও মশারি জাল দিয়ে পোনা ধ্বংস, ভারতের পানি আগ্রাসনে প্লাবনভূমি হ্রাস, মরুকরণ, কৃষিজমি ও নদী-খাল ভরাট, প্লাস্টিক ও রাসায়নিক বর্জ্যের দূষণ ইত্যাদি।

এ ছাড়া বাঁধ ও খাল নির্মাণ মাছের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্লাবনের সময় বহু মাছ স্থানান্তরিত হয়, কিন্তু প্রজননকালে ফিরে আসতে গিয়ে বাধার মুখে পড়ে। অপরিকল্পিত ও স্বল্পসংখ্যক ফিশপাস মাছের গমনপথ রোধ করছে।

বাংলাদেশে বিদেশি মাছ চাষ শুরু হয় ১৯৫০-এর দশকে। ১৯৫২ সালে সিঙ্গাপুর থেকে সিয়ামিজ গৌরামী, ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান থেকে গোল্ডফিশ, ১৯৫৪ সালে থাইল্যান্ড থেকে তেলাপিয়া, ১৯৫৭ সালে একই দেশ থেকে গাপ্পি, ১৯৬০ সালে কমন কার্প, ১৯৭০ সালে জাপান থেকে গ্রাস কার্প ও সিলভার কার্প, ১৯৭৫ সালে থাইল্যান্ড থেকে লাইলোটিকা, ১৯৭৯ সালে নেপাল থেকে মিরর কার্প, ১৯৮১ সালে বিগহেড কার্প, ১৯৮৬ সালে থাইল্যান্ড থেকে থাই সরপুটি এবং ১৯৮৯ সালে আফ্রিকান মাগুর আনা হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রাক্ষসী পিরানহা আনা হয়। এর মধ্যে তেলাপিয়া, কমন কার্প, গ্রাস কার্প, সিলভার কার্প, থাই সরপুটি, আফ্রিকান মাগুর, পাঙ্গাস ও থাই কই এখন পুকুর-জলাশয় ও বাজার দখল করে নিয়েছে। এসব বিদেশি মাছ দেশীয় মাছের পোনা খেয়ে ফেলে, যা দেশীয় মাছের উৎপাদন হ্রাসের বড় কারণ।

দেশীয় মাছের মধ্যে গুলশা, শোল, গজার, পাবদা, মাগুর, শিং, চিতল, আইড়, বোয়াল, চেলি, কই, খলিশা, ফোলুই, টাকি, বাইন, চান্দা, ভেদা, পুঁটি, বাটা, টেংরা, রুই, কালবাউশ, মহাশোলসহ অগণিত প্রজাতি বিলুপ্তির পথে। এসব মাছ বর্তমান প্রজন্মের কাছে অপরিচিত হয়ে পড়ছে, অনেকেই এগুলোকে বিদেশি মাছ ভেবে বিভ্রান্ত হন।

পুরনো আইন দিয়ে দেশীয় মাছ রক্ষার চেষ্টা চলছে। ১৯৫০ সালের একটি আইন দিয়েই আজও এ খাতে লড়াই করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. অনুরাধা ভদ্র বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে জনবহুল এ দেশে। ফলে দেশীয় জাতের মাছ ক্রমেই বিলুপ্ত হচ্ছে। সংরক্ষণের চেষ্টা থাকলেও আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ১৯৫০ সালের আইনে মৎস্য অপরাধের শাস্তি অপ্রতুল। যুগোপযোগী আইন প্রণয়নের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।