কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন ঘিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস এখন সরগরম। শুক্রবার ছুটির দিনেও প্রচার কার্যক্রম চালাতে মাঠে ছিলেন প্রায় সব প্যানেলের প্রার্থীরা। আবাসিক হলগুলোর পাশাপাশি অনাবাসিক ভোটারদের আকৃষ্ট করতে আটঘাট বেঁধে নেমেছেন হেভিওয়েট থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থীরা। কেউ দলগতভাবে আবার কেউ স্বতন্ত্রভাবে দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। কষছেন নানা হিসাব-নিকাশ। এরই মধ্যে কেউ রাজনৈতিক কারণে, কেউ বা অভিনব প্রচার তৎপরতা ও সাবলীল বাচনভঙ্গির কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন। শুরু থেকেই তারা অনলাইন ও অফলাইনে বেশ সক্রিয়। আর উৎসবের আমেজের মধ্যেও থেমে নেই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। প্রশাসন থেকে শুরু করে শিক্ষক কিংবা বিভিন্ন সংগঠন এবং প্যানেলের বিরুদ্ধে নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গের নানা অভিযোগ তোলা হচ্ছে। তবে সাধারণ ভোটাররা বলছেন, নির্বাচনে কে এগিয়ে আর কে পিছিয়ে তা এখনই বলা সম্ভব নয়। অনেক প্রার্থীই নানা প্রতিশ্রুতির বুলি আওরাচ্ছেন, আকাশ-কুসুম স্বপ্ন দেখাচ্ছেন।
শুক্রবার ঢাবির ফজলুল হক মুসলিম হল, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ হল, অমর একুশে হল, কবি সুফিয়া কামাল হল, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল, রোকেয়া হল, সূর্যসেন হল, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল, কবি জসীম উদ্দীন হল, টিএসসি, কলাভবন এবং অনাবাসিক একাধিক শিক্ষার্থী জানান, দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি বন্ধ, আবাসন সংকট নিরসন, হলের খাবারের মানোন্নয়ন, পরিবহন সংকট সমাধান, কারিকুলাম ও গবেষণার আধুনিকায়ন, হয়রানিমুক্ত প্রশাসনিক সেবা, সর্বোপরি বসবাসযোগ্য ও নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়ে তোলা এবং সর্বোপরি সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা নিশ্চিতে বাস্তবায়নে যারা অগ্রাধিকার দেবে তাদেরকেই ডাকসুর নেতৃত্বে দেখতে চান তারা।
কবি জসীম উদ্দীন হলের শিক্ষার্থী মারুফ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, আমরা যখন ভর্তি হই তখন ক্যাম্পাসে এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতি ছিল। কিন্তু ৫ আগস্টের পর তা এখন নেই। গণরুম কিংবা টর্চার সেল নেই। এবারের নির্বাচনে যে প্রার্থীই পাস করুক না কেন দলীয় ছাত্র বা শিক্ষক-রাজনীতির ক্ষেত্রে আমরা লেজুড়বৃত্তি চাই না। যে যেই রাজনীতিই করুন না কেন, সেটি হতে হবে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে। এখানে অন্য কোনো দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা যাবে না।
রোকেয়া হলের শিক্ষার্থী প্রেরণা মহৎ সময়ের আলোকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন সংকট নিরসন, প্রশাসনিক ও ডিপার্টমেন্টালসহ নানা সমস্যা রয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে মেয়েদের নিরাপত্তার বিষয়টি। মেয়েদের অনেকেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয়। যারা পাশ করবে তারা যেন নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দেয়। প্রার্থীদের কাছে এমনটাই প্রত্যাশা করি।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী আশরাফুর রহমান বলেন, ডাকসু নির্বাচন ঘিরে শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস দেখতে পাচ্ছি। আবাসন সংকট সমাধান ও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টিসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন প্রার্থীরা। কিন্তু কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবেন এখন সেটাই দেখার বিষয়। কারণ এখানে ৪০ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছেন এবং সমস্যাও অনেক। সুতরাং, এবারের কোনো হুজুগে নয় বরং পরীক্ষিত ও যোগ্য প্রার্থীকেই হল ও কেন্দ্রীয় সংসদে ভোট দেবেন ভোটাররা।
বাম গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট সমর্থিত প্যানেলটির ভিপি প্রার্থী শেখ তাসনিম আফরোজ (ইমি) বলেন, শিক্ষার্থীরা সব সময়ই অবহেলিত। আবাসন সমস্যা দূর করা, রাজনৈতিক অস্থিরতা-বিভেদ দূর করে সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশের চর্চা নিশ্চিতে কাজ করব। কারণ আমরা চাই প্রত্যেকে তার নিজের পরিচয়-মর্যাদায় রাজনীতি করার অধিকার পাক। আর এই অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই আমরা দীর্ঘদিন ধরে করছি। সে জন্যই আমার মনে হয় যে, শিক্ষার্থীরা আমাদের বেছে নিতে পারেন।
ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে গত ২৬ আগস্ট থেকে প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার শুরু করে। শুক্রবার চতুর্থ দিনে বেশির ভাগ প্রার্থী প্রচার চালান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে। এ দিন সকালে ক্যাম্পাসে ঢিলেঢালা প্রচার থাকলেও বাদ জুমা গতি পায় বিভিন্ন পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রার্থীদের প্রচার কার্যক্রম। তারা পোস্টার-লিফলেট বিতরণের পাশাপাশি কুশল বিনিময় করে নানা প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন শিক্ষার্থীদের সামনে। ছাত্রদল মনোনীত প্যানেল, ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ (বাগছাস) প্যানেল ও প্রতিরোধ পর্ষদ স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্যসহ বিভিন্ন প্যানেলভুক্ত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রচার চালাতে গেছে।
কোনো কোনো প্রার্থী লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের দাবি জানান। অনেকের দাবি ভোটকেন্দ্র বাড়ানোর। আবার কোনো প্রার্থী অভিযোগ করেন, সাইবার আক্রমণ নিয়ে।
জুমার নামাজ শেষে গতকাল বিজয় একাত্তর হলে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন, ছাত্রদল সমর্থিত ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম।
তিনি অভিযোগ তোলেন, একটি গ্রুপ তাদের প্যানেলের প্রার্থীদের আইডি হ্যাক করে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
আবিদুল ইসলাম বলেন, প্রার্থীদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে অনলাইনে ভুয়া তথ্য দিয়ে নানা ধরনের অপচেষ্টা চলছে। আমাদের দুজন প্রার্থীর একজনের আইডি হ্যাক করা হয়েছে, আর আরেকজনের আইডি হ্যাক করার অপচেষ্টা চালানো হলো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কোনো অপপ্রচারে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আবিদুল বলেন, ‘যে ঘটনাই ঘটুক না কেন, পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে তারপর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। আমরা কোনো অপরাধ করলে শিক্ষার্থীদের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে প্রস্তুত আছি। কিন্তু কোনো মিথ্যা ঘটনা আমাদের ওপর চাপিয়ে দেবেন না।’
দুপুর ২টার পর প্রচার তৎপরতা শুরু করেন শিবির সমর্থিত ভিপি প্রার্থী সাদিক কায়েম। এ সময় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
সাদিক কায়েম বলেন, কোনো একটা ছাত্র সংগঠনকে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া এবং এর মাধ্যমে ছাত্র ও শিক্ষকদের মধ্যে একটা অবস্থান তৈরি হয়ে যাওয়া কোনোটাই কাম্য নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের যে মূল কাজ অর্থাৎ জ্ঞান উৎপাদন, বিতরণ বা জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ তৈরি করা, সেই কাজটা কিন্তু আমরা করতে পারিনি।
আচরণবিধি লঙ্ঘন হলেও প্রশাসন নির্লিপ্ত বলে অভিযোগ করেছে এনসিপির ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস)।
ভিপি প্রার্থী আবদুল কাদের বলেন, ডাকসুতে একজন ভোটারকে ৪১টা ভোট দিতে হবে, সে ক্ষেত্রে ৬ থেকে ৭ মিনিট করে সময় লাগবে। সেই সময় দেওয়ার মতো ক্যাপাসিটি কিংবা বুথগুলো এই ৩৯ হাজার শিক্ষার্থীর কথা চিন্তা করে মনে হয় না সাজানো হয়েছে। আমরা বলেছি ভোট কেন্দ্রগুলো কীভাবে কাছাকাছি আনা যায়।
আচরণবিধি লঙ্ঘন হলেও প্রশাসন নির্লিপ্ত বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পাশাপাশি, মাত্র ৮টি বুথে ৪০ হাজার ভোটগ্রহণ নিয়েও আপত্তি জানান তারা। একইসঙ্গে বুথ সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানায় বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ। বৃহস্পতিবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য প্যানেলের সহ-সভাপতি (ভিপি) পদপ্রার্থী উমামা ফাতেমা ডিজিটাল মোবাইল জার্নালিজম কার্যক্রম পুরো নির্বাচনের পরিবেশকে নষ্ট করছে বলে অভিযোগ করেন।
উমামা ফাতেমা ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ক্যাম্পাসের ডাকসু নির্বাচনে ডিজিটাল মোবাইল জার্নালিজম পুরো নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করছে। প্রার্থীদের সঙ্গে ভোটারদের কথা বলার সহজ স্বাভাবিক প্রসেসকে কঠিন করে দিচ্ছে। প্রার্থীদের পেছনে প্রতিটা পদক্ষেপ ভিডিও করতে থাকা কতটা সমীচীন দেখায় সেটা আমার প্রশ্ন!
বারবার নিষেধ করার পরও সাংবাদিকদের এ ধরনের নীতিবহির্ভূত কার্যক্রম থামানো যাচ্ছে না। ব্যক্তির কনসেপ্টের বাইরে গিয়ে ভিডিও করা, ক্রপ করে ভিডিও ভিন্ন অ্যাঙ্গেলে প্রদর্শন করার কাজ থামানো যায় না বলেও তিনি পোস্টে উল্লেখ করেন।
পোস্টের শেষে তিনি সাংবাদিকদের অনুরোধ করে বলেন, আপনারা প্রার্থী ও ভোটারের প্রাইভেসি (গোপনীয়তা) মেনে চলুন। ভোটার ও প্রার্থীর সম্মতির বাইরে অযাচিতভাবে ভিডিও করে ভোটের পরিবেশটা নষ্ট করবেন না।
নির্বাচনের আচরণবিধি অনুযায়ী, প্রতিদিন রাত ১১টা পর্যন্ত প্রচার চালাতে পারবেন প্রার্থীরা। ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে প্রচার, ৯ সেপ্টেম্বর নির্বাচন।
জাকসুর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-জাকসু নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। এতে জাকসুর ২৫ পদের জন্য লড়াই করবেন ১৭৯ জন।
শুক্রবার বিকাল সোয়া ৫টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো প্রশাসনিক ভবনের সিনেট হলে এক সংবাদ সম্মেলনে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেন নির্বাচন কমিশনের সদস্য সচিব অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম।
চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকায় সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে ১০ জন, সাধারণ সম্পাদক পদে নয়জন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (নারী) পদে ছয়জন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (পুরুষ) পদে ১০ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
এ ছাড়া শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক পদে নয়জন, পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণ-বিষয়ক সম্পাদক পদে ছয়জন, সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে আটজন, সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে আটজন, সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে আটজন, নাট্য সম্পাদক পদে পাঁচজন, ক্রীড়া সম্পাদক পদে তিনজন, সহ-ক্রীড়া সম্পাদক পদে ছয়জন, তথ্য-প্রযুক্তি ও গ্রন্থাগার সম্পাদক পদে সাতজন, সমাজসেবা ও মানব সম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক পদে আটজন, সহ-সমাজসেবা ও মানব সম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক (নারী) পদে সাতজন, সহ-সমাজসেবা ও মানব সম্পদ উন্নয়ন সম্পাদক (পুরুষ) পদে সাতজন, স্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তাবিষয়ক সম্পাদক পদে সাতজন, পরিবহন ও যোগাযোগ সম্পাদক পদে সাতজন, কার্যকরী সদস্য (নারী) পদে ১৬ জন ও কার্যকরী সদস্য (পুরুষ) পদে ২৬ জন লড়ছেন।
Reporter Name 





















