ঢাকা ০৮:৫৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কারাগারে যেভাবে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০১:০৩:৩১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ নভেম্বর ২০১৬
  • ৪১৬ বার

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার ভয়াল কালরাতের পর ৩ নভেম্বর আরেকটি নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যায় করা হয় জাতীয় চার নেতাকে।

অবৈধভাবে ক্ষমতাদখলকারী প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক এবং বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি ফারুক ও রশিদ সেই রাতে পুরো চক্রান্ত সম্পর্কেই জানতো। খুনি মোশতাকের নির্দেশেই ৩ নভেম্বর রাতে কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতর বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রিসভার সদস্য ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে রাষ্ট্রীয় শক্তির মদদ ও সমর্থনেই হত্যা করা হয়েছিল।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে থাকা শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের এমন পরিকল্পিত ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড সারা পৃথিবীতেই বিরল ঘটনা। জাতীয় এই চার নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও অনুসারী।

তারা স্বাধীনতার পর নতুন করে দেশ বিনির্মাণে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছর পর সেই স্বাধীন দেশের কারাগারেই বন্দি অবস্থায় হত্যার শিকার হতে হয়েছিল জাতীয় এই চার নেতাকে।

যা ঘটেছিল সেই রাতে: ভোর তখন প্রায় ৪টা। বাইরে খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর লোকজন ট্যাংক নিয়ে পুরো ঢাকায় মহড়া দিচ্ছে। ঐ সময় বঙ্গভবনে একটি ফোন বেজে উঠলো। ফোনটি ধরলেন বঙ্গবন্ধুর খুনি শাহরিয়ার রশিদ খান। রশিদের ভাষায়- টেলিফোনের অন্যপ্রান্ত থেকে এক ভারী কণ্ঠে বলছে, ‘আমি ডিআইজি প্রিজন কথা বলছি, মহামান্য রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আমি আলাপ করতে চাই।’

রশিদ খন্দকার মোশতাককে টেলিফোনটি দিলে, তিনি কিছুক্ষণ ধরে কেবল হ্যাঁ, হ্যাঁ করতে থাকনে। তার কথা পরিষ্কার বুঝা না গেলেও যেকোনো ব্যাপারেই হোক তিনি সম্মতি দিয়েছিলেন। ’

টেলিফোনে যখন আলাপ শেষ হলো তখন ঘৃণ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য রিসালদার মুসলেহউদ্দিন তার দলবল নিয়ে কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশের অপেক্ষায়। কারাগারের প্রবেশ করা নিয়ে ডিআইজি প্রিজনের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা শেষে রাষ্ট্রপতির অনুমতি সাপেক্ষে কারাগারের ভেতরে প্রবেশ করে। তখন ভোর সাড়ে ৪ টা।

তাজউদ্দিন আহমেদ এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম কারাগারের একটি সেলেই ছিলেন। মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামান ছিলেন পাশের সেলে। তাদেরকে একত্রিত করে তাজউদ্দিনের সেলে আনা হয়। একত্রিত অবস্থায় খুব কাছ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলিতে তাদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।

জাতীয় চার নেতাকে একত্রে গুলি করা হলে তিনজন সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তাজউদ্দিন আহমেদের পায়ে ও পেটে গুলি লাগার কারণে তিনি গুলির পরও অনেক সময় বেঁচে ছিলেন। রক্তক্ষরণের ফলে আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে পরে মারা যান।

পাশের সেলে কারাবন্দিরা জানিয়েছিল, গুলির পরও প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে একজনের আর্তনাদ শুনেছিলেন তারা। আর ‘পানি, পানি’ বলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাঁতরানোর মর্মভেদী শব্দ তাদের কানে আসছিলো। কিন্তু বর্বর ঘাতক মুসলেউদ্দিন গ্যাং চলে যাবার আগে সেলটিকে খুব শক্তভাবে তালাবদ্ধ করে রেখে যাওয়ায় মৃত্যুর আগে তাজউদ্দিন আহমেদের মুখে এক ফোঁটা পানিও কেউ তুলে দিতে পারেনি। ওই পিপাসা নিয়েই মৃত্যুর কোলে ঢলে পরেন তাজউদ্দিন আহমেদ।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

কারাগারে যেভাবে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে

আপডেট টাইম : ০১:০৩:৩১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ নভেম্বর ২০১৬

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার ভয়াল কালরাতের পর ৩ নভেম্বর আরেকটি নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যায় করা হয় জাতীয় চার নেতাকে।

অবৈধভাবে ক্ষমতাদখলকারী প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক এবং বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি ফারুক ও রশিদ সেই রাতে পুরো চক্রান্ত সম্পর্কেই জানতো। খুনি মোশতাকের নির্দেশেই ৩ নভেম্বর রাতে কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতর বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রিসভার সদস্য ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে রাষ্ট্রীয় শক্তির মদদ ও সমর্থনেই হত্যা করা হয়েছিল।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে থাকা শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের এমন পরিকল্পিত ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড সারা পৃথিবীতেই বিরল ঘটনা। জাতীয় এই চার নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও অনুসারী।

তারা স্বাধীনতার পর নতুন করে দেশ বিনির্মাণে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছর পর সেই স্বাধীন দেশের কারাগারেই বন্দি অবস্থায় হত্যার শিকার হতে হয়েছিল জাতীয় এই চার নেতাকে।

যা ঘটেছিল সেই রাতে: ভোর তখন প্রায় ৪টা। বাইরে খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর লোকজন ট্যাংক নিয়ে পুরো ঢাকায় মহড়া দিচ্ছে। ঐ সময় বঙ্গভবনে একটি ফোন বেজে উঠলো। ফোনটি ধরলেন বঙ্গবন্ধুর খুনি শাহরিয়ার রশিদ খান। রশিদের ভাষায়- টেলিফোনের অন্যপ্রান্ত থেকে এক ভারী কণ্ঠে বলছে, ‘আমি ডিআইজি প্রিজন কথা বলছি, মহামান্য রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আমি আলাপ করতে চাই।’

রশিদ খন্দকার মোশতাককে টেলিফোনটি দিলে, তিনি কিছুক্ষণ ধরে কেবল হ্যাঁ, হ্যাঁ করতে থাকনে। তার কথা পরিষ্কার বুঝা না গেলেও যেকোনো ব্যাপারেই হোক তিনি সম্মতি দিয়েছিলেন। ’

টেলিফোনে যখন আলাপ শেষ হলো তখন ঘৃণ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য রিসালদার মুসলেহউদ্দিন তার দলবল নিয়ে কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশের অপেক্ষায়। কারাগারের প্রবেশ করা নিয়ে ডিআইজি প্রিজনের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা শেষে রাষ্ট্রপতির অনুমতি সাপেক্ষে কারাগারের ভেতরে প্রবেশ করে। তখন ভোর সাড়ে ৪ টা।

তাজউদ্দিন আহমেদ এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম কারাগারের একটি সেলেই ছিলেন। মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামান ছিলেন পাশের সেলে। তাদেরকে একত্রিত করে তাজউদ্দিনের সেলে আনা হয়। একত্রিত অবস্থায় খুব কাছ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলিতে তাদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।

জাতীয় চার নেতাকে একত্রে গুলি করা হলে তিনজন সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তাজউদ্দিন আহমেদের পায়ে ও পেটে গুলি লাগার কারণে তিনি গুলির পরও অনেক সময় বেঁচে ছিলেন। রক্তক্ষরণের ফলে আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে পরে মারা যান।

পাশের সেলে কারাবন্দিরা জানিয়েছিল, গুলির পরও প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে একজনের আর্তনাদ শুনেছিলেন তারা। আর ‘পানি, পানি’ বলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাঁতরানোর মর্মভেদী শব্দ তাদের কানে আসছিলো। কিন্তু বর্বর ঘাতক মুসলেউদ্দিন গ্যাং চলে যাবার আগে সেলটিকে খুব শক্তভাবে তালাবদ্ধ করে রেখে যাওয়ায় মৃত্যুর আগে তাজউদ্দিন আহমেদের মুখে এক ফোঁটা পানিও কেউ তুলে দিতে পারেনি। ওই পিপাসা নিয়েই মৃত্যুর কোলে ঢলে পরেন তাজউদ্দিন আহমেদ।