জেসমিন চৌধুরী ।।
ফেসবুক ও অনলাইন পত্রিকায় নারী অধিকারের ওপর আগুন ঝড়া সব লেখা আসছে আজকাল। লক্ষ করেছি নারী পাঠকরাই এসব লেখায় তুলনামূলকভাবে বেশি ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন। কিছু আলোকিত মনা পুরুষ পাঠকও আছেন, কিন্তু অনেক প্রতিবাদমুখর পুরুষ পাঠকের লম্ফঝম্ফ দেখে আমার বাবার কথা মনে পড়ে। নারীর অধিকার বিষয়ে তার প্রতিবাদ ছিল তীব্রতর, কিন্তু তিনি একজন প্রকৃত পুরুষ ছিলেন বলেই বোধ হয় তার প্রতিবাদ ছিল নারীর পক্ষে, বিপক্ষে নয়।
আমার আব্বা লে. কর্নেল এ আর চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের শেষ তিনমাস তিনজন অতিরিক্ত সহ-সর্বাধিনায়কের একজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয় অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বের মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত করতে অসামান্য ভূমিকা রাখেন। যুদ্ধ শেষ হবার পরও আজীবন নিজের মতো করে দেশ ও সমাজ গড়ার যুদ্ধে লিপ্ত এই মানুষটি যে কোন অন্যায়, যে কোনো অবিচারের বিরুদ্ধে নির্ভয়ে রুখে দাঁড়াতেন। অপরাধী যে’ই হোক না কেন, কাউকে ছেড়ে কথা বলতেন না। একটা মানুষ কঠিন নীতি অবলম্বনের মাধ্যমে একহাতে তার চারপাশের জঞ্জাল কতটা সাফ করতে পারে, আব্বা ছিলেন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
ছোটবেলায় আব্বার নিয়মকানুনের অত্যাচারে আমার দম বন্ধ হয়ে উঠতো। একজন সৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা এবং সমাজসেবক হিসেবে কাজ করার বাইরে তিনি যে জীবন বাঁচতেন তা ছিল সেই সময়ের আর দশজন থেকে একবারেই আলাদা। আমাদেরকে তিনি সামরিক কায়দায় বড় করার চেষ্টা করেছিলেন। বস্তুত আমাদের বাড়ির সঙ্গে কোনো মিলিটারি ব্যারাকের পার্থক্য ছিল খুবই কম।তার কাছে বেঁচে থাকা নয়, বরং যথাযথভাবে বেঁচে থাকার নামই ছিল জীবন এবং তিনি আমাদেরকে তার দৃষ্টি ভঙ্গি থেকে জীবনকে দেখতে বাধ্য করতেন।
আব্বার সঙ্গে আমার সম্পর্ক সবসময়ই ছিল একটু লাভ-হেট টাইপের। কিছুটা বড় হবার পর তার প্রতি ভয় কিছুটা কমে এলেও কোথাও একটা দেয়াল ছিল যা পেরুতে পারতাম না। তিনি মানুষ হিসেবে খুব সাধারণ ছিলেন না বলেই হয়ত। তাছাড়া ভীষণ রাগী মানুষ ছিলেন তিনি, তার শেষ বয়সের সন্তান হিসেবে আমি বাবার আদর আহ্লাদ পাইনি বললেই চলে, বরং সবসময় ভয়ে ভয়ে তার থেকে দূরেই থেকেছি। কিন্তু আমার নিজের জীবন দর্শন যে কয়েকটি বিশেষ ভিত্তির উপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে তার অনেকগুলোই আমার বাবার কোন ধমক বা বকুনি থেকে পাওয়া।
আট বছর বয়সে লুকিয়ে কান ফুটো করার পর কানের দুল কিনতে চাইলে আব্বা ধমক দিয়ে বলেছিলেন, ‘মেয়েমানুষ হবার চেষ্টা করোনা, মানুষ হতে চেষ্টা করো’। সেই থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এই চেষ্টাই করে যাচ্ছি। একবার এক বিতর্ক প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়ে বাড়ি ফিরে মায়ের কাছে গল্প করছিলাম আমার প্রতিপক্ষ কত বোকা ছিল, তাদের যুক্তিগুলো কত দুর্বল ছিল। বাবা আমাকে ডেকে নিয়ে বললেন, ‘কাউকে হারানোর পর কখনো তার নিন্দা করবে না, এতে তোমার নিজের বিজয়কেই ছোট করা হয়। দুর্বল প্রতিপক্ষকে হারানোর মধ্যে তেমন একটা গৌরব নেই।’
একবার আব্বার জন্মদিনে কার্ড কিনতে হলমার্কে গিয়ে পড়লাম বিপাকে, কোনো কার্ডের লেখাকেই আব্বার জন্য সঠিক মনে হয়না। সবই খুব স্বাভাবিক, সাধারণ, পুতুপুতু ধরনের লেখা। তারপরও ‘No matter where I go, no matter what I become/ I can seek peace by holding my daddy’s thumb’ জাতীয় লেখাগুলো পড়ে আমার শৈশবের অভিমান ফিরে এলো। মেয়েদের প্রতি বাবাদের আহ্লাদের উপলব্ধি বা স্বীকৃতি জাতীয় কোন উক্তিই আমার বাবার বেলায় খাটে না।
অবশেষে একটা কার্ড পাওয়া গেল যা তাকে দেয়া যায়। অনেকদিন আগের কথা তাই উক্তিটা পুরোপুরি মনে নেই, তবে কথাগুলো ছিল অনেকটা এরকম, ‘I am proud to be the daughter of a man so tough but true/ I think you are the greatest not because you are my dad but because what I see in you.’
ভাবলে অবাক লাগে যে মানুষটাকে এতো ভয় পেতাম, মানুষ হিসেবে আমার আত্মবিশ্বাস এবং লড়াই করার স্পৃহা তার কাছ থেকেই পেয়েছি। নারী অধিকার নিয়ে মুক্তভাবে চিন্তাভাবনা করার সাহসও তার কাছ থেকেই পাওয়া।
একবার চা নিয়ে ড্রইংরুমে ঢুকে শুনি আব্বা উত্তেজিত কন্ঠে মেহমানের সাথে চিৎকার করছেন, ‘How dare you undermine women? মনে রেখো একটা মেয়ের শরীরের যে জায়গাকে সবচেয়ে অপবিত্র, সবচেয়ে লজ্জাকর ভাবো তোমরা, সেই জায়গা দিয়ে তুমি পৃথিবীতে এসেছো। আর সেই নারীকে নিজের চেয়ে ছোট ভাব?‘
আমি মাথা নীচু করে টেবিলে চা নামিয়ে রাখছি দেখে মেহমান আমতা আমতা করে বললেন ‘আপনার মেয়ে শুনছে তো’।
আব্বা হুংকার দিয়ে বললেন, ‘শুনুক, আমি চাই আমার মেয়ে জানবে তার স্থান তোমাদের মত পুরুষদের থেকে অনেক উপরে’।
কী নিয়ে তর্ক হচ্ছিল জানতাম না, কিন্তু আব্বার কথা শুনে পিঠ সোজা করে দাঁড়িয়েছিলাম। কী অসীম সাহস অনুভব করেছিলাম তা বুঝিয়ে বলা যাবে না।
সে সময়ে আমাদের পরিচিত মহলে বিয়ের আলাপ সালাপে আব্বাকে ডাকা হতো। বিয়ের অনুষ্ঠানে আব্বার উপস্থিতি ছিল অপরিহার্য, বিশেষ করে কনে পক্ষের জন্য, কারণ তার উপস্থিতিতে বরপক্ষ কিছুতেই কোন বাড়তি সুবিধা আদায় করতে পারতো না।
একবার জানা গেল আমাদের গ্রামের এক বাড়িতে নতুন বৌয়ের কাপড় চোপড় মাটিতে ফেলে রাখা হয়েছে কারণ বাপের বাড়ি থেকে কনের সাথে আলমারি দেওয়া হয়নি। খবর পেয়ে আব্বা তার হাতীর হাঁড়ের লাঠি নিয়ে ছুটে গেলেন। বরকে বললেন, ‘বৌয়ের কাপড় রাখার ব্যবস্থা নেই তো বিয়ে করেছিস কেন উল্লুক? তোর বাড়ি্তে আলমারিও নেই? তোর তো ঘর জামাই হবার কথা ছিল রে। তোদের সাবধান করে দিচ্ছি, যদি এই মেয়েকে আর কোন হয়রানী করা হয় এই লাঠি দিয়ে পিটায়ে হাড্ডি ভেংগে দেব সবগুলার’।
আব্বা যে কখনো ভুল করেননি তা কিন্তু নয়। বৃদ্ধ বয়সের অনিশ্চয়তা এড়াতে তার সবচেয়ে ছোট মেয়েটিকে অনেক অল্প বয়সে বিয়ে দেবার মত বিরাট ভুলটি করেছিলেন তিনি, তবে বিয়ের আগের দিন এক কোণায় ডেকে নিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমাকে অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে অনেক দূরে পাঠিয়ে দিচ্ছি, কিন্তু কখনো অসহায় বোধ করবেনা। নিজের সম্মানে আঘাত লাগলে ফিরে এসো’।
এই আশ্বাসবানী সত্ত্বেও সটান ফিরে আসতে না পারার অপরাধ কার ছিল জানিনা, হয়তো এমন একজন লড়াকু মানুষের মেয়ে বলেই ফিরে আসতেও আমার আত্মসম্মানে লেগেছিল, তাই সময় নিয়েছিলাম অনেক।
কিন্তু যেদিন ফিরে এসেছিলাম, আব্বা তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আমাকে আশ্রয় দিলেও আস্কারা দেননি মোটেও। একদিন বাচ্চাদেরকে কর্ন ফ্লেকস খাওয়াচ্ছি দেখে রেগে গেলেন,
‘যে মেয়ে স্বামীকে ছেড়ে আসে, যে মেয়ের শিক্ষা নেই, উপার্জন নেই, সে কেন বাচ্চাদের কর্ন ফ্লেকস খাওয়াবে? নিজ হাতে আটার রুটি বানিয়ে খাওয়াও’।
আমার শিক্ষা বা উপার্জন না থাকার অপরাধটা যে আমার ছিলনা, অথবা নিজের বাচ্চাদেরকে ভাল জিনিষ খাওয়ানোর সখ যে স্বামীকে ফেলে আসা মায়েরও থাকে, প্রচণ্ড অভিমানে এসব কিছুই আব্বাকে বলিনি। কিন্তু পরদিনই বাড়ি ছেড়ে বাচ্চাদেরকে নিয়ে ভাগ্যান্বেষণে বেরিয়ে পড়ি। তখনো আব্বা আমাকে আটকানোর চেষ্টা করেননি বলেই হয়তো জেদের বশে খুব দ্রুত শিক্ষা এবং উপার্জনের ব্যবস্থা করে ফেলতে পেরেছিলাম। বাজারের সবচেয়ে দামী কর্নফ্লেকস কেনার সামর্থ অর্জন করেছিলাম একসময়, নিজের হাতে আটার রুটি বানিয়ে খাওয়ানোর সুবুদ্ধিও তার আগে হয়নি।
আব্বার মৃত্যুর পর আমরা, তার মেয়েরা, আবারও নতুন করে সম্মানিত হলাম। তার উইল যখন পড়ে শোনানো হলো, আমরা পাঁচ বোন তখন বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্মানিত কন্যা সন্তান। আব্বা বলে গেছেন তার সম্পত্তি যেন ছেলেমেয়েদের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়, ছেলেরা যেন বেশি না পায়।
আব্বার কথা আমি যতই লিখি ফুরাবেনা। তিনি একজন স্নেহপ্রবণ পিতা ছিলেন না, স্বামীকে ছেড়ে আসার পর তিনি আমার সাথে মিষ্টি আচরণ করেননি, কিন্তু তার কঠোরতাই সেই সময়ে আমাকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে, আগুনে পুড়িয়ে শক্ত বানিয়েছে।
একজন ডিভোর্সি নারী হিসেবে পদে পদে সমাজের কাছেপ্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অনেক সমালোচনার শিকার হয়েছি যা আমাকে বারবার ভেংগে গুড়িয়ে দিতে চেয়েছে। সেই সময় আমার প্রতি আব্বার সব কথা বা আচরণ হয়তো ন্যায্য ছিল না, কিন্তু সমালোচনা করবার সময়ও তিনি আমাকে নারী নয়, বরং একজন মানুষ হিসেবে দেখতেন যা আমাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে। তিনি ভাল বাবা ছিলেন না, কিন্তু তার চেয়ে ভাল কমান্ডো ট্রেইনার খুব বেশি জন্মেছে কি’না সন্দেহ।
Reporter Name 

























