ঢাকা ১০:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ মে ২০২৪, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

জাতীয় ইতিহাসের একটি মাইলফলক

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:০৩:৫০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৪
  • ১৮ বার
আজ ১৭ এপ্রিল, মুজিবনগর দিবস। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল ভারতের আগরতলায় গঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার, যা মুজিবনগর সরকার নামে সমধিক পরিচিত। আর ১৭ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের ভূখণ্ড মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায়, যা পরবর্তী সময়ে মুজিবনগর হিসেবে নামকরণ হয়। বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা।

স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় মুক্তিযুদ্ধ হঠাৎ করে আবির্ভূত হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ আন্দোলন ও অতল ত্যাগের ইতিহাস। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সময়েই বিভিন্ন জনসভায় বঙ্গবন্ধু তুলে ধরতেন, বাঙালিদের জন্য একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা। এ লক্ষ্যেই পাকিস্তান সৃষ্টির পাঁচ মাসেরও কম সময়ের মধ্যে  ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু গড়ে তোলেন ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’।

পরবর্তী সময়ে ১৯৫৩ সালে মুসলিম শব্দ বাদ দেওয়া হয়, যা বর্তমানে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। স্বাধীনতার নেতৃত্ব দানকারী দল আওয়ামী লীগের গোড়াপত্তন হয় ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। ১৯৭২ সালের ১৮ মার্চ সংবাদ পত্রিকায় কমরেড মণি সিংহের বরাত দিয়ে প্রকাশিত হয়, বঙ্গবন্ধু ১৯৫১ সালে কারাগারে থাকাকালেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। চিঠিপত্র আদান-প্রদানের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর এই পরিকল্পনার কথা জানতে পেরেছিলেন বলে মণি সিংহ উল্লেখ করেন।

মণি সিংহ আরো বলেছেন, যদিও আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল তথাপি বঙ্গবন্ধু তাঁর কাছে এটা জানতে চেয়ে প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন যে স্বাধীনতাসংগ্রামকে তিনি (মণি সিংহ) সমর্থন করবেন কি না।

১৯৫১ সালে পাকিস্তান ভাঙার কথা বোধ করি কেউ নির্জনে বসেও চিন্তা করার দুঃসাহস করেননি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলার কথা কেবল চিন্তাই করেননি, তা বাস্তবায়নের জন্য অন্য দলের নেতাদের সাহায্য কামনা করেছেন। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি তাঁর বই  ‘India, Mujibur Rahman, Bangladesh Liberation & Pakistan’-এ লিখেছেন, বঙ্গবন্ধু ১৯৬২ সালের ২৪ ডিসেম্বর গভীর রাতে মানিক মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে ভারতীয় উপহাইকমিশনে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন এবং প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরুকে লেখা চিঠি হস্তান্তর করে বলেছিলেন, ‘আমি ভারতের কাছে সমমর্যাদার বন্ধুত্বের দাবি নিয়ে স্বাধীনতার প্রশ্নে সমর্থন চাইছি।’ সেই সময়টাতে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ সৃষ্টির কথা বলা রীতিমতো রাষ্ট্রদ্রোহ।

স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ভারতের সহযোগিতা চাইতে ওই সময় ত্রিপুরার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলাল সিং ত্রিপুরার কাছেও গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু্। মঈদুল হাসান ‘মূলধারা ৭১’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘আপৎকালে আওয়ামী লীগপন্থি যুবকদের সশস্ত্র ট্রেনিং দেওয়ার জন্য শেখ মুজিব ভারত সরকারকে অনুরোধ করেছিলেন।’ মঈদুল হাসান আরো লিখেছেন, ‘ভারত সরকার ঢাকাস্থ ডেপুটি হাইকমিশনার কে সি সেনগুপ্তের মাধ্যমে ১৭ মার্চ নিশ্চিত করে ভারতের সাহায্য-সহযোগিতার আশ্বাস।…(পাকিস্তানি) আঘাত যদি নিতান্তই আসে, তবে ভারত আক্রান্ত মানুষের জন্য সম্ভাব্য সকল সহযোগিতা প্রদান করবে।’

মঈদুল হাসানের লেখার সত্যতা মেলে ওই সময় ভারতের লোকসভা ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যসভার উত্থাপিত দুটি প্রস্তাবে। গণহত্যা শুরুর পাঁচ দিনের মাথায় ৩১ মার্চ ভারতীয় সংসদ একটি সর্বসম্মত প্রস্তাব পাস করে, যেখানে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আক্রমণের অবর্ণনীয় চিত্র বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা হয় এবং বাংলাদেশের মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। প্রস্তাবটি ছিল এমন—

‘This House calls upon all peoples and Governments of the world to take urgent and constructive steps to prevail upon the Government of Pakistan to put an end immediately to the systematic decimation of people which amounts to genocide. …wishes to assure them that their struggle and sacrifices will receive the wholehearted sympathy and support of the people of India.’

(লোকসভা বিতর্ক, ৩১ মার্চ ১৯৭১)। অন্যদিকে মুজিবনগর সরকার প্রতিষ্ঠার আগেই বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি ওঠে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সংসদে। সংসদ সদস্য রাজ নারায়ণ ও বিহারী দাস রাজ্যসভায় বাংলাদেশের স্বীকৃতির বিষয়টি উথাপন করেন ১ এপ্রিল। ওই অধিবেশনে সংসদ সদস্য দ্বিজেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত যুক্তি দেন—‘

It is our bounden duty to take up the cause of the East Bengal people as our own.’ (রাজ্যসভা বিতর্ক, ১ এপ্রিল ১৯৭১)।

বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখতেন, স্বপ্ন দেখাতেন। তিনি বাঙালি জাতিকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন একটি স্বাধীন, অসাম্প্রদায়িক, শোষণমুক্ত ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশের। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য বঙ্গবন্ধু ধাপে ধাপে জাতিকে প্রস্তুত করেছেন, বিদেশি সহায়তা নিশ্চিত করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধের পর্যায়ে নিয়ে যেতে বঙ্গবন্ধু ভাষা আন্দোলনকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে রূপ দিয়েছেন। এরপর জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনে রূপ দিয়েছেন। স্বায়ত্তশাসনকে স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ দিয়ে অর্জন করেছেন স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। ২৫ মার্চ বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা বাঙালি নিধনে নৃশংস গণহত্যাযজ্ঞ শুরু করলে গ্রেপ্তারের আগ মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ওয়্যারলেসের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সেই বার্তা ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। ওই রাতে সর্বশেষ যে দুই ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন, তাঁদের একজন সাংবাদিক আতাউস সামাদ। বঙ্গবন্ধু আতাউস সামাদকে বলেন,  ‘I have given you independence. Now go and preserve it. দলীয় ক্যাডারদের বলা হয়েছে কী করণীয় এবং প্রতিরোধ শুরু হয়ে গ্যাছে।’ (তথ্যসূত্র : অধ্যাপক রেহমান সোবহান, বাংলাদেশের অভ্যুদয় : একজন প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য;

Afsan Chowdhury, 1971: Memories, Facts, and Words Overheard, Strategic Analysis)|

২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও রাষ্ট্র গঠনের আবশ্যিক উপাদান একটি আনুষ্ঠানিক সরকারের প্রয়োজনীয়তা আইন ও বাস্তবতার নিরিখে ব্যাপকভাবে অনুভূত হতে থাকে। সরকার গঠনের বাস্তব সত্যকে উপলব্ধি করেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে গঠিত হয় যুদ্ধকালীন সরকার তথা স্বাধীন বংলাদেশের প্রথম সরকার।

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল তথা মুক্তিযুদ্ধ শুরুর মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে মুজিবনগর সরকার গঠন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পরিচালিত ধারাবাহিক ঘটনার পরম্পরা। ১৯৭০-এর নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হয় ৩ মার্চ। ওই অধিবেশনে উপস্থাপনের জন্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সংবিধানের একটি খসড়া রচনা করা হয়। খসড়া সংবিধান দলীয় অনুমোদনের জন্য ১ মার্চ পূর্বাণী হোটেলে পার্লামেন্টারি পার্টির একটি অধিবেশন ডাকা হয়। গণপরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের নেতা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কোনোরূপ আলাপ-আলোচনা ও পরামর্শ ছাড়া ৩ মার্চ অনুষ্ঠেয় গণপরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা। এমন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা ঐকমত্যের ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সর্বময় ক্ষমতা অর্পণ করেন। তিনি যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন, সেটাই হবে বাংলাদেশ গণপরিষদের সিদ্ধান্ত। বঙ্গবন্ধু দলের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও চার সহসভাপতিকে নিয়ে পাকিস্তান জান্তা সরকারের সমান্তরাল একটি অনানুষ্ঠানিক সরকার গড়ে তোলেন, যা সেই সময় ‘হাইকমান্ড’ নামে পরিচিত ছিল। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সব প্রশাসন এই হাইকমান্ডের নির্দেশে পরিচালিত হচ্ছিল। হাইকমান্ড একটি নির্বাচিত অনানুষ্ঠানিক সরকারে পরিণত হয়। হাইকমান্ডের আদলে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত মুজিবনগর সরকার। শুধু নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকার গঠন ইতিহাসে বিরল। এমনকি মুজিবনগর সরকারের প্রধান সেনাপতিও ছিলেন জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি। মুজিবনগর সরকার গঠনের দিনই এই সরকার রাষ্ট্রের কার্যাবলি পরিচালনার জন্য গণপরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত ক্রান্তিকালীন সংবিধান স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রও জারি করে। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র তথা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধানে বাংলাদেশকে গণপ্রজাতন্ত্রী সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

মুজিবনগর সরকার গঠিত না হলে আমরা আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদী অথবা বিদ্রোহী হয়ে পড়তাম। পৃথিবীর ইতিহাসে কত স্বাধীনতার সংগ্রাম ব্যর্থ হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। গত শতাব্দীর সত্তরের দশক পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোভাব ছিল রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিশ্চিত করতে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রয়োগ করা যাবে না। বিশ্বে রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতাকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতার পরিপন্থী কোনো রকম বিচ্ছিন্নতাবাদী পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক মহল থেকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। কাতাঙ্গা, বায়াফ্রা, সুদান, সাদ, ইথিওপিয়া, তিব্বত, বেলুচিস্তান, কুর্দিস্তান কিংবা ফরমোসা কোনো ক্ষেত্রেই জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রয়োগকে আন্তর্জাতিক মহল স্বীকৃতি দেয়নি। কাতাঙ্গা যখন ১৯৬০ সালে কঙ্গোর বিরুদ্ধে অথবা বায়াফ্রা যখন ১৯৬৭ সালে নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করে, তখন তাদের স্বাধীনতার ঘোষণাকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অপপ্রয়াসরূপে চিহ্নিত করা হয় এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ব তাদের রাষ্ট্ররূপে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে। একই কারণে নস্যাৎ হয়েছে আইআরএ আন্দোলন, স্পেনের বাস্ক জাতীয়তাভিত্তিক রাষ্ট্র আন্দোলন ও তামিল টাইগারদের আন্দোলন।

বিশ্বের দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। যেকোনো পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সংহতি রক্ষার জন্য তখন যুক্তরাষ্ট্রের নিক্সন-কিসিঞ্জার প্রশাসন ছিল বদ্ধপরিকর। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ও বাঙালি সম্পর্কে কিসিঞ্জারের ধারণা ছিল, আওয়ামী লীগ ও বাঙালি রাজনৈতিকভাবে বাম  (Gary Bass, The Blood Telegraph, 2013)| মুজিবনগর সরকারের অনুপস্থিতিতে সমন্বয়হীন এবং নিয়ন্ত্রণহীন স্বাধীনতাসংগ্রাম বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে চিহ্নিত হওয়ার আশঙ্কাও ছিল যথেষ্ট। মুক্তিযুদ্ধকে সফল করতে তাই আইনানুগ সরকার গঠনের বিকল্প ছিল না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যেকোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নয়, বরং এটি একটি ন্যায়সংগত ও বাস্তবভিত্তিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিক অংশ, মুজিবনগর সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তা বিশ্বের কাছে তুলে ধরা হয়। বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছে মুক্তিযুদ্ধের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করতে মুজিবনগর সরকার গঠন অপরিহার্য ছিল। এই সরকার গঠিত না হলে বহির্বিশ্বের সহায়তা পাওয়াও সম্ভব হতো না।

মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি মুজিবনগরকে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়। মুজিবনগরে কেবল বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রই পাঠ করা হয়নি, ওই দিন যুদ্ধকালীন সরকারের শপথগ্রহণও অনুষ্ঠিত। সেই হিসেবে মুজিবনগর ফিলাডেলফিয়ার চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে সীমিত সামর্থ্য নিয়ে মুজিবনগর সরকার দক্ষতার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ ও প্রশাসন পরিচালনা করেছে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ষড়যন্ত্রের মোকাবেলা করেছে। অসম স্বাধীনতাযুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় মুজিবনগর সরকারের ভূমিকা ছিল অনন্য। তাই বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে মুজিবনগর সরকারের নাম। অতল দেশপ্রেমের পাশাপাশি মেধা, সততা ও ইস্পাতকঠিন ঐক্য ছাড়া এই গুরুদায়িত্ব পালন সম্ভব হতো না।

মুজিবনগর সরকার সম্পর্কে আমাদের যথার্থ মনোযোগের অভাবে স্বাধীনতার শত্রুরা সক্রিয় রয়েছে। স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব নিয়ে, মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত প্রথম সরকার নিয়ে তারা সমাজ ও রাষ্ট্রে বিস্তর বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপপ্রয়াসে লিপ্ত রয়েছে। ১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকারকে প্রত্যাখ্যান করে এর বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিল পাকিস্তান সরকার ও তার এ দেশীয় দোসররা। আর এখন সক্রিয় বিএনপি ও তার মিত্ররা।

মুজিবনগর সরকারের গৌরবগাথা ও স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় এই সরকারের সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে আরো সক্রিয় হতে হবে। মুজিবনগর দিবস আমাদের জাতীয় ইতিহাসের একটি মাইলফলক। পলাশীর আম্রকুঞ্জে বাঙালি পরাধীনতার শৃঙ্খলবন্দি হয়; আর মুজিবনগরের আম্রকুঞ্জে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। অথচ আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিক দল মুজিবনগর দিবস পালন করে না। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় মুজিবনগর দিবসের গুরুত্ব বিবেচনায় তাই এটি অবিচার নয় কি

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জাতীয় ইতিহাসের একটি মাইলফলক

আপডেট টাইম : ১১:০৩:৫০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৪
আজ ১৭ এপ্রিল, মুজিবনগর দিবস। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল ভারতের আগরতলায় গঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার, যা মুজিবনগর সরকার নামে সমধিক পরিচিত। আর ১৭ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের ভূখণ্ড মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায়, যা পরবর্তী সময়ে মুজিবনগর হিসেবে নামকরণ হয়। বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা।

স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় মুক্তিযুদ্ধ হঠাৎ করে আবির্ভূত হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ আন্দোলন ও অতল ত্যাগের ইতিহাস। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সময়েই বিভিন্ন জনসভায় বঙ্গবন্ধু তুলে ধরতেন, বাঙালিদের জন্য একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা। এ লক্ষ্যেই পাকিস্তান সৃষ্টির পাঁচ মাসেরও কম সময়ের মধ্যে  ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু গড়ে তোলেন ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’।

পরবর্তী সময়ে ১৯৫৩ সালে মুসলিম শব্দ বাদ দেওয়া হয়, যা বর্তমানে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। স্বাধীনতার নেতৃত্ব দানকারী দল আওয়ামী লীগের গোড়াপত্তন হয় ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। ১৯৭২ সালের ১৮ মার্চ সংবাদ পত্রিকায় কমরেড মণি সিংহের বরাত দিয়ে প্রকাশিত হয়, বঙ্গবন্ধু ১৯৫১ সালে কারাগারে থাকাকালেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। চিঠিপত্র আদান-প্রদানের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর এই পরিকল্পনার কথা জানতে পেরেছিলেন বলে মণি সিংহ উল্লেখ করেন।

মণি সিংহ আরো বলেছেন, যদিও আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল তথাপি বঙ্গবন্ধু তাঁর কাছে এটা জানতে চেয়ে প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন যে স্বাধীনতাসংগ্রামকে তিনি (মণি সিংহ) সমর্থন করবেন কি না।

১৯৫১ সালে পাকিস্তান ভাঙার কথা বোধ করি কেউ নির্জনে বসেও চিন্তা করার দুঃসাহস করেননি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলার কথা কেবল চিন্তাই করেননি, তা বাস্তবায়নের জন্য অন্য দলের নেতাদের সাহায্য কামনা করেছেন। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি তাঁর বই  ‘India, Mujibur Rahman, Bangladesh Liberation & Pakistan’-এ লিখেছেন, বঙ্গবন্ধু ১৯৬২ সালের ২৪ ডিসেম্বর গভীর রাতে মানিক মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে ভারতীয় উপহাইকমিশনে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন এবং প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরুকে লেখা চিঠি হস্তান্তর করে বলেছিলেন, ‘আমি ভারতের কাছে সমমর্যাদার বন্ধুত্বের দাবি নিয়ে স্বাধীনতার প্রশ্নে সমর্থন চাইছি।’ সেই সময়টাতে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ সৃষ্টির কথা বলা রীতিমতো রাষ্ট্রদ্রোহ।

স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ভারতের সহযোগিতা চাইতে ওই সময় ত্রিপুরার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলাল সিং ত্রিপুরার কাছেও গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু্। মঈদুল হাসান ‘মূলধারা ৭১’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘আপৎকালে আওয়ামী লীগপন্থি যুবকদের সশস্ত্র ট্রেনিং দেওয়ার জন্য শেখ মুজিব ভারত সরকারকে অনুরোধ করেছিলেন।’ মঈদুল হাসান আরো লিখেছেন, ‘ভারত সরকার ঢাকাস্থ ডেপুটি হাইকমিশনার কে সি সেনগুপ্তের মাধ্যমে ১৭ মার্চ নিশ্চিত করে ভারতের সাহায্য-সহযোগিতার আশ্বাস।…(পাকিস্তানি) আঘাত যদি নিতান্তই আসে, তবে ভারত আক্রান্ত মানুষের জন্য সম্ভাব্য সকল সহযোগিতা প্রদান করবে।’

মঈদুল হাসানের লেখার সত্যতা মেলে ওই সময় ভারতের লোকসভা ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যসভার উত্থাপিত দুটি প্রস্তাবে। গণহত্যা শুরুর পাঁচ দিনের মাথায় ৩১ মার্চ ভারতীয় সংসদ একটি সর্বসম্মত প্রস্তাব পাস করে, যেখানে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আক্রমণের অবর্ণনীয় চিত্র বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা হয় এবং বাংলাদেশের মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। প্রস্তাবটি ছিল এমন—

‘This House calls upon all peoples and Governments of the world to take urgent and constructive steps to prevail upon the Government of Pakistan to put an end immediately to the systematic decimation of people which amounts to genocide. …wishes to assure them that their struggle and sacrifices will receive the wholehearted sympathy and support of the people of India.’

(লোকসভা বিতর্ক, ৩১ মার্চ ১৯৭১)। অন্যদিকে মুজিবনগর সরকার প্রতিষ্ঠার আগেই বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি ওঠে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সংসদে। সংসদ সদস্য রাজ নারায়ণ ও বিহারী দাস রাজ্যসভায় বাংলাদেশের স্বীকৃতির বিষয়টি উথাপন করেন ১ এপ্রিল। ওই অধিবেশনে সংসদ সদস্য দ্বিজেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত যুক্তি দেন—‘

It is our bounden duty to take up the cause of the East Bengal people as our own.’ (রাজ্যসভা বিতর্ক, ১ এপ্রিল ১৯৭১)।

বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখতেন, স্বপ্ন দেখাতেন। তিনি বাঙালি জাতিকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন একটি স্বাধীন, অসাম্প্রদায়িক, শোষণমুক্ত ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশের। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য বঙ্গবন্ধু ধাপে ধাপে জাতিকে প্রস্তুত করেছেন, বিদেশি সহায়তা নিশ্চিত করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধের পর্যায়ে নিয়ে যেতে বঙ্গবন্ধু ভাষা আন্দোলনকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে রূপ দিয়েছেন। এরপর জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনে রূপ দিয়েছেন। স্বায়ত্তশাসনকে স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ দিয়ে অর্জন করেছেন স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। ২৫ মার্চ বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা বাঙালি নিধনে নৃশংস গণহত্যাযজ্ঞ শুরু করলে গ্রেপ্তারের আগ মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ওয়্যারলেসের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সেই বার্তা ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। ওই রাতে সর্বশেষ যে দুই ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন, তাঁদের একজন সাংবাদিক আতাউস সামাদ। বঙ্গবন্ধু আতাউস সামাদকে বলেন,  ‘I have given you independence. Now go and preserve it. দলীয় ক্যাডারদের বলা হয়েছে কী করণীয় এবং প্রতিরোধ শুরু হয়ে গ্যাছে।’ (তথ্যসূত্র : অধ্যাপক রেহমান সোবহান, বাংলাদেশের অভ্যুদয় : একজন প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য;

Afsan Chowdhury, 1971: Memories, Facts, and Words Overheard, Strategic Analysis)|

২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও রাষ্ট্র গঠনের আবশ্যিক উপাদান একটি আনুষ্ঠানিক সরকারের প্রয়োজনীয়তা আইন ও বাস্তবতার নিরিখে ব্যাপকভাবে অনুভূত হতে থাকে। সরকার গঠনের বাস্তব সত্যকে উপলব্ধি করেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে গঠিত হয় যুদ্ধকালীন সরকার তথা স্বাধীন বংলাদেশের প্রথম সরকার।

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল তথা মুক্তিযুদ্ধ শুরুর মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে মুজিবনগর সরকার গঠন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পরিচালিত ধারাবাহিক ঘটনার পরম্পরা। ১৯৭০-এর নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হয় ৩ মার্চ। ওই অধিবেশনে উপস্থাপনের জন্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সংবিধানের একটি খসড়া রচনা করা হয়। খসড়া সংবিধান দলীয় অনুমোদনের জন্য ১ মার্চ পূর্বাণী হোটেলে পার্লামেন্টারি পার্টির একটি অধিবেশন ডাকা হয়। গণপরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের নেতা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কোনোরূপ আলাপ-আলোচনা ও পরামর্শ ছাড়া ৩ মার্চ অনুষ্ঠেয় গণপরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা। এমন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা ঐকমত্যের ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সর্বময় ক্ষমতা অর্পণ করেন। তিনি যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন, সেটাই হবে বাংলাদেশ গণপরিষদের সিদ্ধান্ত। বঙ্গবন্ধু দলের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও চার সহসভাপতিকে নিয়ে পাকিস্তান জান্তা সরকারের সমান্তরাল একটি অনানুষ্ঠানিক সরকার গড়ে তোলেন, যা সেই সময় ‘হাইকমান্ড’ নামে পরিচিত ছিল। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সব প্রশাসন এই হাইকমান্ডের নির্দেশে পরিচালিত হচ্ছিল। হাইকমান্ড একটি নির্বাচিত অনানুষ্ঠানিক সরকারে পরিণত হয়। হাইকমান্ডের আদলে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত মুজিবনগর সরকার। শুধু নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকার গঠন ইতিহাসে বিরল। এমনকি মুজিবনগর সরকারের প্রধান সেনাপতিও ছিলেন জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি। মুজিবনগর সরকার গঠনের দিনই এই সরকার রাষ্ট্রের কার্যাবলি পরিচালনার জন্য গণপরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত ক্রান্তিকালীন সংবিধান স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রও জারি করে। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র তথা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধানে বাংলাদেশকে গণপ্রজাতন্ত্রী সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

মুজিবনগর সরকার গঠিত না হলে আমরা আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদী অথবা বিদ্রোহী হয়ে পড়তাম। পৃথিবীর ইতিহাসে কত স্বাধীনতার সংগ্রাম ব্যর্থ হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। গত শতাব্দীর সত্তরের দশক পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোভাব ছিল রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিশ্চিত করতে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রয়োগ করা যাবে না। বিশ্বে রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতাকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতার পরিপন্থী কোনো রকম বিচ্ছিন্নতাবাদী পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক মহল থেকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। কাতাঙ্গা, বায়াফ্রা, সুদান, সাদ, ইথিওপিয়া, তিব্বত, বেলুচিস্তান, কুর্দিস্তান কিংবা ফরমোসা কোনো ক্ষেত্রেই জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রয়োগকে আন্তর্জাতিক মহল স্বীকৃতি দেয়নি। কাতাঙ্গা যখন ১৯৬০ সালে কঙ্গোর বিরুদ্ধে অথবা বায়াফ্রা যখন ১৯৬৭ সালে নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করে, তখন তাদের স্বাধীনতার ঘোষণাকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অপপ্রয়াসরূপে চিহ্নিত করা হয় এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ব তাদের রাষ্ট্ররূপে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে। একই কারণে নস্যাৎ হয়েছে আইআরএ আন্দোলন, স্পেনের বাস্ক জাতীয়তাভিত্তিক রাষ্ট্র আন্দোলন ও তামিল টাইগারদের আন্দোলন।

বিশ্বের দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। যেকোনো পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সংহতি রক্ষার জন্য তখন যুক্তরাষ্ট্রের নিক্সন-কিসিঞ্জার প্রশাসন ছিল বদ্ধপরিকর। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ও বাঙালি সম্পর্কে কিসিঞ্জারের ধারণা ছিল, আওয়ামী লীগ ও বাঙালি রাজনৈতিকভাবে বাম  (Gary Bass, The Blood Telegraph, 2013)| মুজিবনগর সরকারের অনুপস্থিতিতে সমন্বয়হীন এবং নিয়ন্ত্রণহীন স্বাধীনতাসংগ্রাম বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে চিহ্নিত হওয়ার আশঙ্কাও ছিল যথেষ্ট। মুক্তিযুদ্ধকে সফল করতে তাই আইনানুগ সরকার গঠনের বিকল্প ছিল না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যেকোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নয়, বরং এটি একটি ন্যায়সংগত ও বাস্তবভিত্তিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিক অংশ, মুজিবনগর সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তা বিশ্বের কাছে তুলে ধরা হয়। বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছে মুক্তিযুদ্ধের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করতে মুজিবনগর সরকার গঠন অপরিহার্য ছিল। এই সরকার গঠিত না হলে বহির্বিশ্বের সহায়তা পাওয়াও সম্ভব হতো না।

মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি মুজিবনগরকে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়। মুজিবনগরে কেবল বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রই পাঠ করা হয়নি, ওই দিন যুদ্ধকালীন সরকারের শপথগ্রহণও অনুষ্ঠিত। সেই হিসেবে মুজিবনগর ফিলাডেলফিয়ার চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে সীমিত সামর্থ্য নিয়ে মুজিবনগর সরকার দক্ষতার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ ও প্রশাসন পরিচালনা করেছে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ষড়যন্ত্রের মোকাবেলা করেছে। অসম স্বাধীনতাযুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় মুজিবনগর সরকারের ভূমিকা ছিল অনন্য। তাই বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে মুজিবনগর সরকারের নাম। অতল দেশপ্রেমের পাশাপাশি মেধা, সততা ও ইস্পাতকঠিন ঐক্য ছাড়া এই গুরুদায়িত্ব পালন সম্ভব হতো না।

মুজিবনগর সরকার সম্পর্কে আমাদের যথার্থ মনোযোগের অভাবে স্বাধীনতার শত্রুরা সক্রিয় রয়েছে। স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব নিয়ে, মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত প্রথম সরকার নিয়ে তারা সমাজ ও রাষ্ট্রে বিস্তর বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপপ্রয়াসে লিপ্ত রয়েছে। ১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকারকে প্রত্যাখ্যান করে এর বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিল পাকিস্তান সরকার ও তার এ দেশীয় দোসররা। আর এখন সক্রিয় বিএনপি ও তার মিত্ররা।

মুজিবনগর সরকারের গৌরবগাথা ও স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় এই সরকারের সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে আরো সক্রিয় হতে হবে। মুজিবনগর দিবস আমাদের জাতীয় ইতিহাসের একটি মাইলফলক। পলাশীর আম্রকুঞ্জে বাঙালি পরাধীনতার শৃঙ্খলবন্দি হয়; আর মুজিবনগরের আম্রকুঞ্জে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। অথচ আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিক দল মুজিবনগর দিবস পালন করে না। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় মুজিবনগর দিবসের গুরুত্ব বিবেচনায় তাই এটি অবিচার নয় কি