ঢাকা ০৩:৪৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস আজ কোমল হাতে কঠোর কাজ

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:৪২:২১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ জুন ২০১৬
  • ৩৮৫ বার

পরিবারের প্রয়োজনে ছয় বছর বয়স থেকে শামীম তেঁতুলিয়া নদীকে আপন করে নিয়েছে। জীবনখেলায় সে এখন পাকা জেলে।
পাঁচ থেকে ছয় ফুট উঁচু ঢেউ। এমন উত্তাল তেঁতুলিয়া নদীতে একা মাছ ধরে ৯ বছরের শিশু শামীম। কোমল হাতে বৈঠা ধরে নদীর ঢেউ থেকে নৌকা বাঁচায় এবং সামাল দেয় জাল। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার চর ব্যারেটের এই শিশুটি সরকারের বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত।

গত শুক্রবার দুপুরে তেঁতুলিয়া নদীতে মাছ শিকার করে বাড়ি ফেরার পথে উত্তর তেঁতুলিয়ার দক্ষিণ মিয়াজানের খালে শামীমের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের দেখা। চর ব্যারেটের কাশেম মাঝির ছেলে সে। তিন ভাই ও চার বোনসহ ৯ সদস্যের সংসার। তিন বছর আগে থেকে সংসারের ব্যয় মেটাতে নদীতে যেতে হয়। এ কারণে রাত-দিন নদীতে কাটে তার। ওই দিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রায় ৮০০ গ্রাম ওজনের মাত্র দুটি ইলিশ ধরা পড়ছে। এ কারণে তাঁর মন ভালো নেই। সে বলে, ‘মাছ পাইলে ভালো লাগে। না পাইলে কী করমু? সন্ধ্যায় আবার নদীতে মাছ ধরতে নামমু। হারাদিন (সারাদিন) এত কষ্ট ভালো লাগে না। মাছের জোবা থাকলে (পাওয়া গেলে) নদীর তোন আই না।’ তীরে ফিরে মাছ বিক্রি করা এবং দুপুরে দুমুঠো খাবার পর আবার সন্ধ্যায় মাছ ধরার ধান্ধা শামীমকে ভাবিয়ে রাখে সব সময়।

লেখাপড়া, খেলাধুলা কিংবা অন্য কোনো বিনোদন শামীমের জন্য বিলাসিতা। মাঝেমধ্যে ডুবসাঁতারে সমবয়সীদের সঙ্গে খেলা করে আনন্দ পায়। সে জানায়, সংসারে অভাবের কারণে লেখাপড়া হয়নি। আর চরের শিশুরা ছয় থেকে সাত বছর বয়স হলে পরিবারের সহযোগী হিসেবে মাছ ধরায় ঝুঁকে পড়ে। এটাই তাদের প্রধান পেশা। এ ছাড়া কখনো ধানের ছড়া কুড়ানো, দিনমজুরিও করতে হয়।

শামীম বলে, ‘আমাগো জমি নাই। ধান-চাউল নাই। পানি ছাড়া আমরা সব কিন্যা খাই। বাপ-মায় চাইর পাঁচ বচ্ছর বয়স পর্যন্ত খাওনের পর কাম কইরগা খাইতে কয়। ইসকুলে যামু কোন কালে আর আনন্দ-ফুরতি করমু কোন কালে? ডরাইয়া (ভয়ে) নদীতে যদি না যাই তাহেলে কি খামু? চরের সব গুরাগ্যারার (ছেলে-মেয়ে) জীবন এইরোমই।’

তার সঙ্গে দেখা হওয়ার প্রায় ৩৫ মিনিট পর আরেক শিশু সাইফুলের (১০) সঙ্গে দেখা। সেও নদীতে মাছ ধরে বাড়ি ফিরছিল। তার জীবনও একই বেরাজালে ঘেরা। চর ব্যারেটের মাসুদ হাওলাদারের ছেলে সে। বলে, ‘আমাগো বাপ-দাদার পেশা। হেরাও ছোডকাল অইতে নদীতে মাছ ধরছে, অ্যাহন আমরাও ধরি। আমাগো গরিবের এইডাই কাম। প্যাডে মানে না এই লইগ্যা নদীর তুহান (তুফান) ডরাই না।’ তার নৌকা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় গত বছর তেঁতুলিয়া নদীর রিজির মার ভারানির কাছাকাছি স্থানে ঝড়ের কবলে পড়ে। নৌকা ডুবেও দুইবার বেঁচে যায় সে।

এই দুই শিশুর মতো তেঁতুলিয়া, রামনাবাদ, লোহালিয়া, পায়রা, আন্ধারমানিক ও বুড়াগৌরাঙ্গ নদনদীর পাড়ে কিংবা জেগে ওঠা চরে হাজারও শিশু নদীতে মাছ শিকার করে। এর মধ্যে বাউফল, দশমিনা, রাঙ্গাবালী উপজেলার চর ও নদনদী তীরবর্তী এলাকার সিংহভাগ শিশু রয়েছে। মেয়ে শিশুরা বাগদা চিংড়ির রেণু আহরণ করে তা বিক্রির অর্থ দিয়ে সংসারে আয়ের জোগান দেয়।

এ বিষয়ে জেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা শাহিদা বেগম বলেন, ‘গলাচিপা উপজেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে জাতিসংঘের জরুরি শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) অর্থায়নে একটি প্রকল্প চালু রয়েছে। প্রকল্পের আওতাধীন শিশুদের বাল্য বিয়ে দেওয়া যাবে না। নিয়মিত স্কুলে উপস্থিত থাকতে হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ কোনো কাজ তাদের দিয়ে করানো যাবে না। প্রকল্পটির পরিধি অন্যান্য উপজেলার চরাঞ্চলে বৃদ্ধি পেলে শিশুশ্রম বন্ধ হবে এবং অধিকারবঞ্চিত শিশুরা একটা নিয়মের ধারায় ফিরে আসবে।’

জেলা প্রশাসক (ডিসি) এ কে এম শামীমুল হক সিদ্দিকী বলেন, ‘চরাঞ্চলের শিশুদের জন্য আমাদের বিশেষ কোনো প্রকল্প নেই। তবে সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড চলছে। অভিভাবকদের সচেতন করে তাদের সন্তানদের শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে পারলে চরের শিশুরা আর শিক্ষা বা অধিকারবঞ্চিত থাকবে না।’

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস আজ কোমল হাতে কঠোর কাজ

আপডেট টাইম : ১১:৪২:২১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ জুন ২০১৬

পরিবারের প্রয়োজনে ছয় বছর বয়স থেকে শামীম তেঁতুলিয়া নদীকে আপন করে নিয়েছে। জীবনখেলায় সে এখন পাকা জেলে।
পাঁচ থেকে ছয় ফুট উঁচু ঢেউ। এমন উত্তাল তেঁতুলিয়া নদীতে একা মাছ ধরে ৯ বছরের শিশু শামীম। কোমল হাতে বৈঠা ধরে নদীর ঢেউ থেকে নৌকা বাঁচায় এবং সামাল দেয় জাল। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার চর ব্যারেটের এই শিশুটি সরকারের বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত।

গত শুক্রবার দুপুরে তেঁতুলিয়া নদীতে মাছ শিকার করে বাড়ি ফেরার পথে উত্তর তেঁতুলিয়ার দক্ষিণ মিয়াজানের খালে শামীমের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের দেখা। চর ব্যারেটের কাশেম মাঝির ছেলে সে। তিন ভাই ও চার বোনসহ ৯ সদস্যের সংসার। তিন বছর আগে থেকে সংসারের ব্যয় মেটাতে নদীতে যেতে হয়। এ কারণে রাত-দিন নদীতে কাটে তার। ওই দিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রায় ৮০০ গ্রাম ওজনের মাত্র দুটি ইলিশ ধরা পড়ছে। এ কারণে তাঁর মন ভালো নেই। সে বলে, ‘মাছ পাইলে ভালো লাগে। না পাইলে কী করমু? সন্ধ্যায় আবার নদীতে মাছ ধরতে নামমু। হারাদিন (সারাদিন) এত কষ্ট ভালো লাগে না। মাছের জোবা থাকলে (পাওয়া গেলে) নদীর তোন আই না।’ তীরে ফিরে মাছ বিক্রি করা এবং দুপুরে দুমুঠো খাবার পর আবার সন্ধ্যায় মাছ ধরার ধান্ধা শামীমকে ভাবিয়ে রাখে সব সময়।

লেখাপড়া, খেলাধুলা কিংবা অন্য কোনো বিনোদন শামীমের জন্য বিলাসিতা। মাঝেমধ্যে ডুবসাঁতারে সমবয়সীদের সঙ্গে খেলা করে আনন্দ পায়। সে জানায়, সংসারে অভাবের কারণে লেখাপড়া হয়নি। আর চরের শিশুরা ছয় থেকে সাত বছর বয়স হলে পরিবারের সহযোগী হিসেবে মাছ ধরায় ঝুঁকে পড়ে। এটাই তাদের প্রধান পেশা। এ ছাড়া কখনো ধানের ছড়া কুড়ানো, দিনমজুরিও করতে হয়।

শামীম বলে, ‘আমাগো জমি নাই। ধান-চাউল নাই। পানি ছাড়া আমরা সব কিন্যা খাই। বাপ-মায় চাইর পাঁচ বচ্ছর বয়স পর্যন্ত খাওনের পর কাম কইরগা খাইতে কয়। ইসকুলে যামু কোন কালে আর আনন্দ-ফুরতি করমু কোন কালে? ডরাইয়া (ভয়ে) নদীতে যদি না যাই তাহেলে কি খামু? চরের সব গুরাগ্যারার (ছেলে-মেয়ে) জীবন এইরোমই।’

তার সঙ্গে দেখা হওয়ার প্রায় ৩৫ মিনিট পর আরেক শিশু সাইফুলের (১০) সঙ্গে দেখা। সেও নদীতে মাছ ধরে বাড়ি ফিরছিল। তার জীবনও একই বেরাজালে ঘেরা। চর ব্যারেটের মাসুদ হাওলাদারের ছেলে সে। বলে, ‘আমাগো বাপ-দাদার পেশা। হেরাও ছোডকাল অইতে নদীতে মাছ ধরছে, অ্যাহন আমরাও ধরি। আমাগো গরিবের এইডাই কাম। প্যাডে মানে না এই লইগ্যা নদীর তুহান (তুফান) ডরাই না।’ তার নৌকা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় গত বছর তেঁতুলিয়া নদীর রিজির মার ভারানির কাছাকাছি স্থানে ঝড়ের কবলে পড়ে। নৌকা ডুবেও দুইবার বেঁচে যায় সে।

এই দুই শিশুর মতো তেঁতুলিয়া, রামনাবাদ, লোহালিয়া, পায়রা, আন্ধারমানিক ও বুড়াগৌরাঙ্গ নদনদীর পাড়ে কিংবা জেগে ওঠা চরে হাজারও শিশু নদীতে মাছ শিকার করে। এর মধ্যে বাউফল, দশমিনা, রাঙ্গাবালী উপজেলার চর ও নদনদী তীরবর্তী এলাকার সিংহভাগ শিশু রয়েছে। মেয়ে শিশুরা বাগদা চিংড়ির রেণু আহরণ করে তা বিক্রির অর্থ দিয়ে সংসারে আয়ের জোগান দেয়।

এ বিষয়ে জেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা শাহিদা বেগম বলেন, ‘গলাচিপা উপজেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে জাতিসংঘের জরুরি শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) অর্থায়নে একটি প্রকল্প চালু রয়েছে। প্রকল্পের আওতাধীন শিশুদের বাল্য বিয়ে দেওয়া যাবে না। নিয়মিত স্কুলে উপস্থিত থাকতে হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ কোনো কাজ তাদের দিয়ে করানো যাবে না। প্রকল্পটির পরিধি অন্যান্য উপজেলার চরাঞ্চলে বৃদ্ধি পেলে শিশুশ্রম বন্ধ হবে এবং অধিকারবঞ্চিত শিশুরা একটা নিয়মের ধারায় ফিরে আসবে।’

জেলা প্রশাসক (ডিসি) এ কে এম শামীমুল হক সিদ্দিকী বলেন, ‘চরাঞ্চলের শিশুদের জন্য আমাদের বিশেষ কোনো প্রকল্প নেই। তবে সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড চলছে। অভিভাবকদের সচেতন করে তাদের সন্তানদের শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে পারলে চরের শিশুরা আর শিক্ষা বা অধিকারবঞ্চিত থাকবে না।’