,

ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং:১৩ জেলাতে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বৃষ্টি মাথায় উপকূলবাসীর ছুট

হাওর বার্তা ডেস্কঃ ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে দেশের উপকুলসহ বেশিরভাগ অঞ্চলেই সোমবার সকাল থেকে ভারী বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়া শুরু হয়েছে। বৃদ্ধি পেয়েছে উপকুলের কাছাকাছি নদ-নদীর পানি। এরইমধ্যে উপকূলের মানুষ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ছুটে যাচ্ছেন নিরাপদ আশ্রয়ে।

ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং সোমবার সন্ধ্যার দিকে বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানবে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান।

তিনি বলেছেন, দেশের উপকূলভর্তি জেলাগুলোর মধ্যে ১৩টিতে আঘাত হানতে পারে সিত্রাং। তবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে আছে বরগুনা ও পটুয়াখালী।

প্রতিমন্ত্রী আরো জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে উপকূলীয় জেলাগুলোর প্রায় ২৫ লাখ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

খুলনা: জেলার ৪০৯টি আশ্রয় কেন্দ্র খুলে দেওয়া হয়েছে। দাকোপ-কয়রাসহ উপকূলের মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে সকাল থেকে চলছে মাইকিং। এছাড়া ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে উপকূলের সকল মসজিদে মাইকিং করা হয়েছে। নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে। নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নম্বর ০২৪-৭৭৭২৬৫৯২।

ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে জেলা প্রশাসক মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার বলেছেন, ‘জরুরি শুকনো খাবার প্রস্তুত রাখা, আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নেওয়া মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

পটুয়াখালী: ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলায় পটুয়াখালীতে প্রস্তুত রয়েছে ৭০৩টি আশ্রয়কেন্দ্র। এছাড়া প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে মেডিকেল টিম গঠন, দরকারি ওষুধ ও শুকনো খাবার রাখা হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফ হোসেন বলেন, সাম্ভব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় পটুয়াখালী ও কলাপাড়া সার্কেলের আওতায় লোকবলসহ ১০ হাজার জিও ব্যাগ নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পাঠানো হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত নগদ টাকা, শুকনো খাবার জেলা প্রশাসনের হাতে রয়েছে। প্রস্তুত রয়েছে ৭০৩টি আশ্রয়কেন্দ্র।

বরগুনা: বরগুনায় ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে বৃষ্টির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। নদ-নদীর পানি এখনো স্বাভাবিক রয়েছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৬৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র। বরগুনায় ৭ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। সিপিপি ও রেড ক্রিসেন্টের সদস্যরা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য মাইকিং করে সতর্ক করছেন। দুর্যোগকালীন সময়ে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য জেলায় ৪২টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মো. হাবিবুর রহমান বলেন, বরগুনায় ৬৪২টি সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জেলার ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের বাসিন্দাদের সন্ধ্যার আগেই সাইক্লোন শেল্টারে নেওয়া হবে।

ঝালকাঠি: ঝালকাঠিতে ৪ আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত ১১০ গ্রাম তলিয়ে গেছে।

জেলা প্রশাসক জোহর আলী জানান, জেলায় ত্রাণের শুকনো খাবার মজুদ নেই। তবে নগদ টাকা ও অন্যান্য সব ব্যবস্থা রয়েছে। ৪ লাখ মানুষ আশ্রয় দেওয়ার জন্য আশ্রায়ণ কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ৬১টি সাইক্লোন শেল্টারসহ ৪ শতাধিক আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। এছাড়াও জরুরি স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, ফায়ার সার্ভিস, খাদ্য ও যোগাযোগসহ গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের এবং সেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রয়েছে।

পিরোজপুর: এ জেলায় ২৬১টি সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ৭ নম্বর হুশিয়ারি সংকেত পাওয়ার পর সাইক্লোন শেল্টারে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। জেলার পাড়েরহাট মৎস্য বন্দরে ট্রলারগুলো নোঙর করে আছে।

জেলা প্রশাসক মো. জাহেদুর রহমান, প্রতিটি উপজেলার আ্শ্রয় কেন্দ্রগুলোতে শুকনো খাবার, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, নগদ টাকা, জিআর চালসহ জেলায় মোট ৬৩টি মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

চট্টগ্রাম: ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের আঘাত থেকে রক্ষা ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছেন।

বন্দর সূত্র জানায়, দুর্যোগ মোকাবিলায় বন্দরের গাইড লাইন অনুযায়ী সতর্কতা সংকেত বাড়ায় জেটির জাহাজগুলো সোমবার সকাল ৮টা থেকে বহিঃনোঙরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কর্ণফুলী নদীতে অবস্থানরত লাইটারেজ জাহাজগুলো নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

বন্দরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আবহাওয়া অধিদপ্তর দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোকে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলেছে। তাই বন্দরের গাইডলাইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজার: জেলা ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলা করতে জেলায় ৫৭৬টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছে।

জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর জানিয়েছেন, আশ্রয়কেন্দ্রে পাঁচ লক্ষাধিক লোকের ধারণক্ষমতা আছে। এ ছাড়া ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা, ২৯৮ টন চাল, ২০০ বান্ডিল ঢেউটিন ও ১৮০ প্যাকেট শুকনা খাবার মজুদ রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, উপকূলের লোকজনকে সরিয়ে নিতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা হাতে রাখা হয়েছে। প্রয়োজনীয় উদ্ধার কাজের জন্য স্থানীয়ভাবে যানবাহন ও স্পিডবোট প্রস্তুত আছে। এছারা ৮ হাজার ৬০০ স্বেচ্ছাসেবক, ১০৮টি মেডিকেল টিম ও সার্বক্ষণিক মোবাইল টিম আগে থেকেই প্রস্তুত আছে।

ভোলা: আগাম সতর্কতা হিসেবে ভোলায় মোট ৭৪৬ টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ জেলায় রাত থেকে ঝড়ো হাওয়া ও মুষলধারে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। নদী ও সাগর মোহনা উত্তাল হয়ে উঠায় সকাল থেকে ভোলার সকল রুটে লঞ্চ ও ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। সকাল থেকে ভোলার বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের মানুষকে মূল ভূখণ্ডে আনার জন্য কার্যক্রম শুরু করেছে স্থানীয় প্রশাসন।

জেলা প্রশাসক মো. তৌফিক ই-লাহী চৌধুরীর জানান, ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় জেলার ৭৪৬টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছে। সাত উপজেলায় খোলা হয়েছে ৮টি কন্ট্রোল রুম। গঠন করা হয়েছে ৭৬টি মেডিকেল টিম। দুর্যোগ মোকাবেলায় ১৩ হাজার ৬০০ জন সিপিপি স্বেচ্ছাসেবক মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। জেলার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নোয়াখালী: সাগর উত্তাল থাকায় নোয়াখালীর হাতিয়ার সঙ্গে সারাদেশের নৌ-যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে হাতিয়া, সুবর্ণচর, কোম্পানীগঞ্জসহ জেলার প্রতিটি স্থানে ঝড়ো বাতাস হচ্ছে। ৭ নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় রয়েছে নোয়াখালী।

নোয়াখালী জেলা প্রশাসক দেওয়ান মাহবুবুর রহমান বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় ৪০১ আশ্রয়ণ কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সকল ধরনের প্রতিকূলতা মোকাবিলায় প্রায় ১০হাজার সেচ্ছাসেবী প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পর্যাপ্ত পরিমাণে শুকনো খাবার মজুত রাখা হয়েছে।

সাতক্ষীরা: আগাম সতর্কতা হিসেবে সাতক্ষীরায় মোট ২৫৭ টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। এছাড়া পর্যাপ্ত শুকনো খাবার মজুদ করে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন।

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হুমায়ূন কবির জানান, জেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুটি বিভাগের ৭৮০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্য ১০টি পয়েন্টে ৮০ কিলোমিটার বাঁধ ঝুকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ভাঙন এড়াতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে ২০ হাজার জিও ব্যাগ মজুদ রাখা হয়েছে। এছাড়া জেলার আশাশুনি উপজেলায় ১০৮টি, শ্যামনগর উপজেলায় ১০৩ টি আশ্রয় কেন্দ্র ও ৪৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়া দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত শুকনো খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুদ, সুপেয় পানিসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

সর্বশেষ আবহাওয়া বার্তায় উপকূলীয় সাতক্ষীরা জেলায় ৯ নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলার পর থেকে উপকূলজুড়ে শুরু হয়েছে মাইকিং।

মৌলভীবাজার: ঘুর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে দেশের অন্যান্য এলাকার মতো মৌলভীবাজারে দিনভর বৃষ্টি হচ্ছে।

জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ চাঁদু মিয়া ঢাকা টাইমসকে বলেন, ঘুর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে বৃষ্টিপাত শুরু হলেও মৌলভীবাজারে তেমন ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা নেই।

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর