,

271588507_1299702140441022_1355361445430442275_n

তক তকে ঝক ঝকে স্কুল জীবনের স্মৃতিগুলো রুমন্থন করা কতো না মধুর

ড. গোলসান আরা বেগমঃ বাড়ীর পাশেই স্বল্পমারীয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হই। বাবা ছিলেন সেই বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ছোট বেলায় ছিলাম উড়নচন্ডি স্বভাবের মেয়ে। বই, খাতা, কলম বা স্কুলে সম্পৃক্ত করতে পারেনি মা বাবা আজ আর মনে নেই কেমন করে হঠাৎ স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলাম। দ্বিতীয় শ্রেণির প্রথম পরীক্ষার ফলাফল দেখে সবাই অবাক হয়ে যায়। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।  শ্রদ্ধেয় স্যাররা অত্যান্ত আদর ও take care করতেন। বরাবরই শ্রেণি রোল ক্রমে দুই নম্বর স্থানটি ধরে রাখতাম। সেই প্রাথমিক শিক্ষার বন্ধুরা আজ কে কোথায় আছে জানি না। আমার প্রাণের সই তার বাবার এক মাত্র মেয়ে ঠান্ডার মা চরমারীয়া গ্রামে বসবাস করছে স্বামী সন্তান,নাতি পুঁতির ভালোবাসায় জড়িয়ে। সে হয়তো এখনও শুনে ঘুঘু পাখীর ডাকাডাকি, হুক্কা হুয়া শিয়ালের কান্না, দেখে বাড়ীর পাশে রোদের গড়াগড়ি,গেঁয়ো সংস্কৃতির আলোড়ন।

পঞ্চম শ্রেণিতে টেলেন্টপুলে বৃত্তি পেলে ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায় আলোর দিশারী হয়ে। বাবা আমাকে কিশোরগঞ্জ এস ভি সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেয়। আমাদের গ্রামের বাড়ি থেকে পাঁচ মাইল দুরে স্কুলটিতে পায়ে হেঁটে ঝড় বৃস্টি উপেক্ষা করে প্রতিদিন যেতাম। যে দিন শীলা বৃস্টি হতো, বই মাথায় রেখে দৌড়ে পাড়ি দিতাম কৃষ জমির ভেতর দিয়ে গড়ানো দুই পায়ের রাস্তা। পড়ার প্রতি এতো আগ্রহ দেখে, বাবাতো ঘোষনা দিয়েছিলেন, আমাকে ডাক্তার বানাবেন,অল্প বয়সে বিয়ে দিবেন না। আমিও সেই চুড়ান্ত লক্ষে পৌঁছানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছিলাম।কিন্তু ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়নি। এস ভি স্কুলে বরাবর শ্রেণি রোল ছিলো তিন।গ্রাম থেকে ছুটে এসে শহরের ছাত্রীদের সাথে পাল্লা দিয়ে গোল্ডেন অবস্থানে জায়গা করে নেয়া চাট্টিখানি কথা নয়,। অস্ম ও এস এস সিতে বৃত্তি পেয়েছিলাম।এই সফলতার জন্য আমাকে অনেক সাধনা করতে হয়েছে,ব্যয় করতে হয়েছে মেধা, বুদ্ধি, শ্রম,ঘাম। ঘুম থেকেই রাজ্জাক স্যার কাছে ম্যাথ, কাইয়ুম স্যারের ইংরেজী প্রাইভেট পড়তে চলে যেতাম।

সেখান থেকে যেতাম স্কুলে। ফিরে আসতাম বাড়ীতে বিকেলে। এসে দেখতাম আরো একজন শিক্ষ দাঁড়িয়ে আছে প্রইভেট পড়ানোর জন্য।এ ভাবেই সময় মেপে মেপে পড়াশুনা করেছি। আকাশের তুলো মেঘ যেমন ধরে রাখা যায় না, ঠিক তেমনি স্মৃতিগুলো রোমন্থন করা ছাড়া সোনার কৌটায় ভরে লুকিয় রাখা যায় না। স্মৃতির পেছনে ফড়িং এর মতো স্মৃতিগুলো চোখের কোনে উড়ে ও ব্যথা বেদনার জলে ভাসায়। টেনে নিয়ে যায় সেই স্মৃতির রোদেলা দুপুরে।৬ জানুয়ারী ২০২২ এ গিয়েছিলাম আমার প্রিয় স্কুলে বই বিতরণ অনুষ্টানে। ড. দৌলতুন্নাহার খানম বর্তমানে মোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্যদের সদস্য। আমার লিখা ১৫ টি বই,বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বই ১৭ টি দিয়েছে ক্লাশমেট ড. দৌলতুন্নাহার খানম এস ভি স্কুলের বঙ্গবন্ধু কর্ণারে রাখার জন্য।উদ্দেশ্য একটাই, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আর্দশকে পরবর্তি প্রজন্মের মর্মে গেঁথে দেয়া। প্রধান শিক্ষক, স্কুলের অন্যান্য শিক্ষকদোর মিলন মেলায় কিছু স্মৃতি কথা তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছিলাম।বেশ ভালো লেগেছিলো স্কুলের খেলার মাঠে, দরজা,জানালায়,সবুজ ঘাসে খোঁজেছি আমার হাতে পায়ের ফিঙ্গার প্রিন্ট। কিন্তু না নতুনের ভিড়ে আমি বা আমরা কোথাও নেই। ১৯৭৫ এ এস এম সি পরীক্ষায় ৬টা লেটারসহ ভালো ফলাফল করেছি।

আমার গ্রাম থেকে দল বেঁধে যারা স্কুলে যেতাম, তাদের কেউ উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পায়নি। তারা স্বামী, সন্তানের সেবা ও গাড়ি পাতিলের আওয়াজে বিলিয়ে দিয়েছে জীবন। গালস গাইডে অংশ গ্রহন,স্কুলের দেয়াল ম্যাগাজিনে কবিতা লিখা, জেলা পর্যায়ে রাইফেল সুটিংয়ে দ্বিতীয় পর্যারের পুরস্কার চিনিয়ে আনা, এথলেটিকসে শুধু বর্ষা নিক্ষেপ খেলেছি,তাও বেশী ভালো পর্যায়ে নয়। ফেইজবুক ফেইজে, জাতীয় সংবাদ মাধ্যমে যখন স্কুলটির সুবার্তা বেড়িয়ে আসে, তখন গর্ব অহংকারে আত্মাটা লাফিয়ে ওঠে। এই বিদ্যালয়ের মেয়েরা সারা বিশ্বে আলোর আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে। সত্যি কিশোরগঞ্জ বাসির অমূল্য সম্পদ এস ভি সরকারী বালিকা বিদ্যাল। বেগম রাজিয়া বহু জাতীয় পর্যায়ের পুস্কার পেয়েছেন ও সুনাম কুড়িয়েছেন। তিনি একজন সুলেখক,ছড়াকার, প্রাবন্ধুিক।আমরা ১৯৭৫ এ পড়ালেখা শেষ করে চলে আসি, তখন তিনি ছিলেন প্রধান শিক্ষক।

তিনি যে রুমে বসতেন, সেই একই রুমে রমে প্রধান শিক্ষকের চেয়ারে বসে বেশ দক্ষতার সাথে বিদ্যালয়টি পরিচালনা করছেন। স্কুলে অবকাঠামোগত বেশ পরিবতর্ন এসেছে। পুকুর টা বন্ধ করে মেখানে তিন তলা ভবন নির্মান করা হয়েছে। টিনের মিলনায়তন ভবনটি ভেঙ্গে সরিয়ে, সেখানেও তিন তলা ভবন ওঠেছে।একটি সুন্দর নান্দনিক গেইট নির্মান করা হয়েছে। থাপে থাপে সাজানো স্কুলের সিঁড়ি পেরিয়ে চল যাই,ঢাকা সরকারি ইডেন কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করে ঢুকে যাই সংসার জীবনে ও মানুষ গড়ার কারিগড় হিসেবে শিক্ষকতা পেশায়। প্রতিষ্টাতা অধ্যক্ষের দায়িত্ব নিয়ে বাইশ বছর চেষ্টা করে প্রতিষ্টা করি কিশোরগঞ্জ জেলার সদর থানায় আর এস আইডিয়েল কলেজ।

সেখান থেকেই অবসরে যাই ২০২০ এর ৩০ এপ্রিল। অবসর জীবনে লেখালেখির জগতে জড়িয়ে সাহিত্য চর্চ্চা করছি। আওয়ামী আদর্শের রাজনীতি করে যাচ্ছি। কবে কখন জীবন প্রদীপ নিভে যাবে জানি না। প্রস্তুতি রাখছি না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার। এই তো আমার তক তকে ঝক ঝকে জীবনের স্মৃতিগুলো স্মৃতির রোমন্থ পালা কাহিনী। তেষ্টটিতে দাঁড়িয়ে করছি স্মরণ।

 

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর