ঢাকা ০৫:১১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লুটের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রী কতটা অসহায়

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:০৩:০৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ মার্চ ২০১৬
  • ৫০০ বার

পীর হাবিবুর রহমান:

লুটের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে আমাদের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত কতটা অসহায়? বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮০০ কোটি টাকা চুরি হয়ে যাওয়ার পর বিতর্কের মুখে ব্যর্থতার দায় কাঁধে নিয়ে গভর্নর ড. আতিউর রহমান পদত্যাগ করেছেন। এই পদত্যাগ তাকে মুক্তি দিলেও দেশের অর্থনৈতিক খাতের শৃঙ্খলার বিষয়টি প্রবল ঝাঁকুনি খেয়ে উঠে এসেছে সরকারের ভেতরে বাইরে সর্বত্র। সরকারি দলের ভেতরে-বাইরে থেকেও অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগেরও দাবি উঠেছে। ঘটনার পর কয়েক দিন জুড়ে অর্থমন্ত্রী পদত্যাগ করছেন এমন গুঞ্জন ছড়িয়েছিল সর্বত্র। পর্যবেক্ষকদের অনুসন্ধিৎসু চোখ বলছে, অর্থনৈতিক খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তা ব্যক্তিদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব যতটা নেই তার চেয়ে বেশি রয়েছে নিজেদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার। মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে রাষ্টায়াত্ব ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নেই সমন্বয়। সমন্বয়হীনতা রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ মন্ত্রনালয়ের সঙ্গে পুঁজিবাজারের। ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নানা মহল থেকে কমিশন গঠনের দাবি উঠেছে অনেক। কিন্তু কমিশন গঠন হচ্ছে না। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, কমিশন গঠন হলেই রাষ্ট্রয়াত্ব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে কারা কারা মন্দ ঋণ দানে ভূমিকা রেখেছেন, ব্যাংক লুটে কারা সহায়তা দিয়েছেন, তাদের চেহারা উন্মোচিত হয়ে যাবে। সেই জন্য ব্যাংক কমিশন গঠিত হচ্ছে না। ব্যাংক কমিশন গঠন করে তদন্ত, অনিয়ম ও দোষীদের চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। জনগণের রিজার্ভে থাকা সম্পদের ৮০০ কোটি টাকা চুরি হওয়ার চাইতেও বড় বড় লুটের ঘটনা দেশের পুঁজিবাজার ও ব্যাংকিং সেক্টরে ঘটে গেছে।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের পুঁজিবাজারে ৩২ লাখ বিনিয়োগকারী রিক্ত নিঃস্ব হয়েছেন। গতকাল প্রকাশিত এক দৈনিকের খবরে বলা হয়েছে, ২০১০ সালে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি শেয়ার বাজার থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়ে গেছেন। ২০১২ সালে সোনালী ব্যাংক থেকে হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে লুট হয়েছে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা। এখানে অভিযুক্ত হয়েছেন তানভীর মাহমুদ ও তার স্ত্রী জেসমিন ইসলাম। ২০১২-১৩ সালে বেসিক ব্যাংক থেকে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের জন্য অভিযুক্ত হয়েছেন ব্যাংকের চেয়ারম্যান শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু। ২০১১-১২ সালে বিসমিল্লাহ গ্রুপের ১১শ কোটি টাকা লুটের জন্য খাজা সুলাইমান ও নওরীন হাসিব অভিযুক্ত হয়েছেন। ২০১৬ থেকে ২০১২ এমএলএম কোম্পানি ডেসটিনির ৪ হাজার ১১৯ কোটি টাকা লুটের জন্য অভিযুক্ত হয়েছেন রফিকুল আমীন। রিজার্ভ চুরির ঘটনায় মামলা হয়েছে। তদন্ত চলছে। টাকা আদৌ ফিরে আসবে কিনা কেউ নিশ্চিত নন। শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারিতে ইব্রাহীম খালেদের তদন্ত কমিশন ও সুপারিশ এলেও বিচারের আওতায় এনে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। হলমার্ক কেলেঙ্কারি বিষয়টি বিচারাধীন রয়েছে, সাজা হয়নি। ব্যাংক টাকা ফিরে পাবে কিনা তাও পরিষ্কার নয়। বেসিক ব্যাংকের টাকা লুটের ঘটনায় অভিযুক্ত চেয়ারম্যান শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু ব্যক্তিগতভাবে বিত্ত বৈভব ও বিশাল অর্থ সম্পদের ওপরে নিরাপদ জীবন যাপন করছেন। কিন্তু তাকে স্পর্শ করার সাহস হচ্ছে না কারো। বিসমিল্লাহ গ্রুপের কেলেঙ্কারির বিষয়টি বিচারাধীন থাকলেও এখনো সাজা হয়নি। সাজা হয়নি বিচারাধীন ডেসটিনির ঘটনারও। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত মহান সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, শেয়ার কেলেঙ্কারির নায়কদের হাত অনেক লম্বা। সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি আরও বলেছিলেন, সোনালী ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকের লুটপাট নিয়ে আমাদের তথ্য-প্রমাণ আছে। কিন্তু রাজনৈতিক তদবিরের কারণে আমারা ব্যবস্থা নিতে পারিনি। দফায় দফায় তার এই অভিব্যক্তি প্রমাণ করেছে স্বাধীন দেশের একজন অর্থমন্ত্রী কতটা অসহায়। লুটের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রী যখন বারে বারে ব্যর্থতার আর্তনাদ শোনান তখন সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক খাত নিয়ে ন্যায় বিচার বা আশার আলো দেখা কতটা অসম্ভব। সেই সময় প্রশ্ন উঠেছিল, একজন অর্থমন্ত্রীর জন্য একটি স্বাধীন দেশের গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য বা রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের চেয়েও কি ওদের হাত বড়?

শেয়ার বাজারকে চাঙা করতে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক পরবর্তীতে কার্যকর ভূমিকা রাখা দূরে থাক পথে পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছ। এমন অভিযোগ শেয়ার বাজার সংশ্লিষ্টদের আলোচনায় পাওয়া যায়। ব্যক্তিগতভাবেই নয় দেশের সব মহলই অবগত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের সততার ইমেজ ক্লিন। ব্যক্তিগতভাবে সৎ, সুলেখক এবং ভাষাসৌনিক, মুক্তিযোদ্ধা একজন জাদরেল সাবেক আমলা হিসেবে প্রশংসিত। কিন্তু অর্থমন্ত্রী হিসেবে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় বা লুটেরাদের বিরুদ্ধে যার ব্যবস্থা গ্রহণের সামর্থ্য বা ক্ষমতা নেই এমন লুটের পাহাড়ে বসে থাকা এতো উঁচু দরের মন্ত্রিত্বে থাকার যুক্তি কতটা। কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতার দায় নিয়ে সরে দাঁড়ালেই বা কি আসে যায়! বিবেকের তাড়নায় পদত্যাগের নজির আমাদের দেশে রয়েছে কিন্তু স্বপ্রণোদিত হয়ে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘটনা খুব কম। বিএনপি সরকারের মন্ত্রী জহির উদ্দিন খান, আওয়ামী লীগ সরকারে প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজ, তত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হাসান মসউদ চৌধুরী, সিএম শফি সামি, ড. আকবর আলী খান ও এড. সুলতানা কামালসহ কয়েকজনের নাম রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে সংঘটিত ভয়াবহ সব অর্থ কেলেঙ্কারির পর কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারার দায় নিয়ে কেউ সরে দাঁড়াননি। প্রশ্নবিদ্ধ সংসদ রয়েছে। সেখানে বিবেকের তাড়নায় মানুষের প্রত্যাশার জায়গা থেকে বিতর্ক ও আলোচনা বা ব্যবস্থা গ্রহণের পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়না। প্রশ্নবিদ্ধ সংসদে যেমন কার্যত কোন বিরোধী দল নেই তেমনি রাজপথের বিরোধী দল বন্দি হয়েছে ঘরোয়া রাজনীতিতে। বিচ্ছিন্নভাবে সমাজের কেউ কেউ বিবেক তাড়িত হয়ে কথা বললেও তা বাতাসেই মিলিয়ে যাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী জানেন দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে থাকার জন্য বিশ্ব পরিস্থিতি সরকারের জন্য সহায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছ। বিশ্ব বাজারে খাদ্য, জ্বালানী তেল ও সারের দাম কমে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় যেমন কমেছে, সরকারকেও ভর্তুকি কম দিতে হচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে বড় বাজেটে এডিবির বরাদ্দ মোটা আকারে রাখা হলেও তা কাজ হয়নি। এডিবি কাট ছাট করতে হচ্ছে। জিএসপি ইস্যুতে গার্মেন্ট খাত ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও নন গার্মেন্ট খাত সাজা ভোগ করছে। রিজার্ভ নিয়ে গর্বটা বেশি হয়ে গেছে। যেখানে ৩ মাসের আমদানি খরচ রাখলেই হয় সেখানে ছয় মাস ক্রস করেছে। বিনিয়োগ বাড়েনি। এতে আর্থিক কাঠামো দুর্বল হয়েছে। বিনিয়োগ না বাড়ার কারণে এর জিটিপি ২৪- ২৬ পার্সেন্টে রয়ে গেছে। জিডিপি ৮ পার্সেন্টে নিতে হলে বিনিয়োগকে ৩২ পার্সেন্টে নিতে হবে। না হয় ৬ পার্সেন্ট টিকবে কিনা এ নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। ভারতের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বড় ধরণের ভরসা। ট্রানজিটকে ঘিরে সার্বিক চুক্তি বাণিজ্যের প্রসার ঘটাবে, এদেশে তাদের বড় বিনিয়োগ হবে কিন্তু এ খাতে রাস্তাঘাট অবকাঠামো উন্নয়নের কিছুই হয়নি। ব্যাংকিং খাতে সুদের হার কমানো যাবে না যদি না মন্দ ঋণগুলো থেকে ব্যাংকিং খাতকে মুক্ত করা যায়। পুঁজিবাজারে নতুন কিছু আইপিও আনা হলেও ভীতি কাটেনি। বাজার চাঙা হয়নি। যে কোন সময় অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাস থেকে পুঁজিবাজার আরো বেশি করে মুখ থুবরে পড়তে পারে। বিনিয়োগের প্রসার না ঘটলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। এতে করে সার্বিক অর্থনীতির উপর বিরূপ প্রভাব পরার সম্ভাবনা রয়েছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে পরিচালকদের ঋণ নেওয়ার ঘটনা রয়েছে নানা ফাঁকে। নতুন ব্যাংকগুলো উচ্চ সুদ দানের যে পথ নিয়েছে সেটিও ইঙ্গিতবহ। ব্যাংক সংস্কার কমিশন গঠিত হলে অর্থমন্ত্রীর সেই রাজনৈতিক তদবীরবাজদের চেহারা উন্মোচিত হতো। বিএনপির অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানকে এদেশের অর্থনীতির সংস্কারক বলা হয়। ব্যাংকিং খাতে পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক নিয়োগের ঘোর বিরোধী ছিলেন। ১৯৯১ সালের বিএনপি সরকার তাকে দিয়ে এটি করাতে পারেননি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর শাহ এমএস কিবরিয়া অর্থমন্ত্রী হন। সৎ, দক্ষ ও মেধাবী অর্থমন্ত্রী হলেও শেয়ার কেলেঙ্কারি তার আমলে ঘটে যায়। সেই সময় তিনি ব্যাংকিং খাতে অভিজ্ঞ আমলাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পরিবর্তে দক্ষ, পেশাদার, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসহ বিশেষজ্ঞদের ব্যাংকিং খাতে নিয়োগ দেন। সেই সময় যোগ্যদের স্থান দেওয়ার কারণে ব্যাংকিং খাতে এতো লুটপাটের ঘটনা ঘটেনি। ২০০১ সালে বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান তার ক্ষমতা, দক্ষতা এবং ব্যক্তিত্ব দিয়ে রাজনৈতিক নিয়োগ কিছুটা হলেও প্রতিরোধ করেছিলেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর অর্থমন্ত্রী হন আবুল মাল আব্দুল মুহিত। ব্যাংকিং সেক্টর পরিচালনায় অযোগ্যদের বসিয়ে দেওয়া হয়। যাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ছিলেন রাজপথের মিছিল করা সরকারি দলের কর্মী কিংবা দলকানাদের। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, এদের দিয়েই রাজনৈতিক প্রভাবে ব্যাংক লুটের ঘটনা ঘটে। বাগেরহাটের জাতীয় পার্টির কর্মী শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদের বান্ধবী জিনাত হোসেনের কাছের লোক। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর কোন অন্ধকার পথ দিয়ে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান হয়ে গেলেন এবং একের পর এক ঋণ দানের জন্য ব্যাংকের শাখা ওপেন করে করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটিকে লুটপাটের অভয়ারণ্যে পরিণত করলেন। পুঁজিবাজারের সংস্কার সম্পন্ন হয়নি। এসিসির চেয়ারম্যানও দলীয় অনুগত একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক। তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। দেশের আর্থিক খাতে লুটের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত জীবনের পড়ন্ত বেলায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারার সমালোচনা ও বোঝা বহন করেই যাবেন নাকি সরে দাঁড়াবেন। এই প্রশ্ন এখন সর্বত্র রয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

লুটের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রী কতটা অসহায়

আপডেট টাইম : ১২:০৩:০৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ মার্চ ২০১৬

পীর হাবিবুর রহমান:

লুটের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে আমাদের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত কতটা অসহায়? বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮০০ কোটি টাকা চুরি হয়ে যাওয়ার পর বিতর্কের মুখে ব্যর্থতার দায় কাঁধে নিয়ে গভর্নর ড. আতিউর রহমান পদত্যাগ করেছেন। এই পদত্যাগ তাকে মুক্তি দিলেও দেশের অর্থনৈতিক খাতের শৃঙ্খলার বিষয়টি প্রবল ঝাঁকুনি খেয়ে উঠে এসেছে সরকারের ভেতরে বাইরে সর্বত্র। সরকারি দলের ভেতরে-বাইরে থেকেও অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগেরও দাবি উঠেছে। ঘটনার পর কয়েক দিন জুড়ে অর্থমন্ত্রী পদত্যাগ করছেন এমন গুঞ্জন ছড়িয়েছিল সর্বত্র। পর্যবেক্ষকদের অনুসন্ধিৎসু চোখ বলছে, অর্থনৈতিক খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তা ব্যক্তিদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব যতটা নেই তার চেয়ে বেশি রয়েছে নিজেদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার। মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে রাষ্টায়াত্ব ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নেই সমন্বয়। সমন্বয়হীনতা রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ মন্ত্রনালয়ের সঙ্গে পুঁজিবাজারের। ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নানা মহল থেকে কমিশন গঠনের দাবি উঠেছে অনেক। কিন্তু কমিশন গঠন হচ্ছে না। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, কমিশন গঠন হলেই রাষ্ট্রয়াত্ব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে কারা কারা মন্দ ঋণ দানে ভূমিকা রেখেছেন, ব্যাংক লুটে কারা সহায়তা দিয়েছেন, তাদের চেহারা উন্মোচিত হয়ে যাবে। সেই জন্য ব্যাংক কমিশন গঠিত হচ্ছে না। ব্যাংক কমিশন গঠন করে তদন্ত, অনিয়ম ও দোষীদের চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। জনগণের রিজার্ভে থাকা সম্পদের ৮০০ কোটি টাকা চুরি হওয়ার চাইতেও বড় বড় লুটের ঘটনা দেশের পুঁজিবাজার ও ব্যাংকিং সেক্টরে ঘটে গেছে।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের পুঁজিবাজারে ৩২ লাখ বিনিয়োগকারী রিক্ত নিঃস্ব হয়েছেন। গতকাল প্রকাশিত এক দৈনিকের খবরে বলা হয়েছে, ২০১০ সালে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি শেয়ার বাজার থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়ে গেছেন। ২০১২ সালে সোনালী ব্যাংক থেকে হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে লুট হয়েছে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা। এখানে অভিযুক্ত হয়েছেন তানভীর মাহমুদ ও তার স্ত্রী জেসমিন ইসলাম। ২০১২-১৩ সালে বেসিক ব্যাংক থেকে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের জন্য অভিযুক্ত হয়েছেন ব্যাংকের চেয়ারম্যান শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু। ২০১১-১২ সালে বিসমিল্লাহ গ্রুপের ১১শ কোটি টাকা লুটের জন্য খাজা সুলাইমান ও নওরীন হাসিব অভিযুক্ত হয়েছেন। ২০১৬ থেকে ২০১২ এমএলএম কোম্পানি ডেসটিনির ৪ হাজার ১১৯ কোটি টাকা লুটের জন্য অভিযুক্ত হয়েছেন রফিকুল আমীন। রিজার্ভ চুরির ঘটনায় মামলা হয়েছে। তদন্ত চলছে। টাকা আদৌ ফিরে আসবে কিনা কেউ নিশ্চিত নন। শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারিতে ইব্রাহীম খালেদের তদন্ত কমিশন ও সুপারিশ এলেও বিচারের আওতায় এনে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। হলমার্ক কেলেঙ্কারি বিষয়টি বিচারাধীন রয়েছে, সাজা হয়নি। ব্যাংক টাকা ফিরে পাবে কিনা তাও পরিষ্কার নয়। বেসিক ব্যাংকের টাকা লুটের ঘটনায় অভিযুক্ত চেয়ারম্যান শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু ব্যক্তিগতভাবে বিত্ত বৈভব ও বিশাল অর্থ সম্পদের ওপরে নিরাপদ জীবন যাপন করছেন। কিন্তু তাকে স্পর্শ করার সাহস হচ্ছে না কারো। বিসমিল্লাহ গ্রুপের কেলেঙ্কারির বিষয়টি বিচারাধীন থাকলেও এখনো সাজা হয়নি। সাজা হয়নি বিচারাধীন ডেসটিনির ঘটনারও। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত মহান সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, শেয়ার কেলেঙ্কারির নায়কদের হাত অনেক লম্বা। সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি আরও বলেছিলেন, সোনালী ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকের লুটপাট নিয়ে আমাদের তথ্য-প্রমাণ আছে। কিন্তু রাজনৈতিক তদবিরের কারণে আমারা ব্যবস্থা নিতে পারিনি। দফায় দফায় তার এই অভিব্যক্তি প্রমাণ করেছে স্বাধীন দেশের একজন অর্থমন্ত্রী কতটা অসহায়। লুটের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রী যখন বারে বারে ব্যর্থতার আর্তনাদ শোনান তখন সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক খাত নিয়ে ন্যায় বিচার বা আশার আলো দেখা কতটা অসম্ভব। সেই সময় প্রশ্ন উঠেছিল, একজন অর্থমন্ত্রীর জন্য একটি স্বাধীন দেশের গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য বা রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের চেয়েও কি ওদের হাত বড়?

শেয়ার বাজারকে চাঙা করতে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক পরবর্তীতে কার্যকর ভূমিকা রাখা দূরে থাক পথে পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছ। এমন অভিযোগ শেয়ার বাজার সংশ্লিষ্টদের আলোচনায় পাওয়া যায়। ব্যক্তিগতভাবেই নয় দেশের সব মহলই অবগত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের সততার ইমেজ ক্লিন। ব্যক্তিগতভাবে সৎ, সুলেখক এবং ভাষাসৌনিক, মুক্তিযোদ্ধা একজন জাদরেল সাবেক আমলা হিসেবে প্রশংসিত। কিন্তু অর্থমন্ত্রী হিসেবে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় বা লুটেরাদের বিরুদ্ধে যার ব্যবস্থা গ্রহণের সামর্থ্য বা ক্ষমতা নেই এমন লুটের পাহাড়ে বসে থাকা এতো উঁচু দরের মন্ত্রিত্বে থাকার যুক্তি কতটা। কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতার দায় নিয়ে সরে দাঁড়ালেই বা কি আসে যায়! বিবেকের তাড়নায় পদত্যাগের নজির আমাদের দেশে রয়েছে কিন্তু স্বপ্রণোদিত হয়ে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘটনা খুব কম। বিএনপি সরকারের মন্ত্রী জহির উদ্দিন খান, আওয়ামী লীগ সরকারে প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজ, তত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হাসান মসউদ চৌধুরী, সিএম শফি সামি, ড. আকবর আলী খান ও এড. সুলতানা কামালসহ কয়েকজনের নাম রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে সংঘটিত ভয়াবহ সব অর্থ কেলেঙ্কারির পর কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারার দায় নিয়ে কেউ সরে দাঁড়াননি। প্রশ্নবিদ্ধ সংসদ রয়েছে। সেখানে বিবেকের তাড়নায় মানুষের প্রত্যাশার জায়গা থেকে বিতর্ক ও আলোচনা বা ব্যবস্থা গ্রহণের পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়না। প্রশ্নবিদ্ধ সংসদে যেমন কার্যত কোন বিরোধী দল নেই তেমনি রাজপথের বিরোধী দল বন্দি হয়েছে ঘরোয়া রাজনীতিতে। বিচ্ছিন্নভাবে সমাজের কেউ কেউ বিবেক তাড়িত হয়ে কথা বললেও তা বাতাসেই মিলিয়ে যাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী জানেন দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে থাকার জন্য বিশ্ব পরিস্থিতি সরকারের জন্য সহায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছ। বিশ্ব বাজারে খাদ্য, জ্বালানী তেল ও সারের দাম কমে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় যেমন কমেছে, সরকারকেও ভর্তুকি কম দিতে হচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে বড় বাজেটে এডিবির বরাদ্দ মোটা আকারে রাখা হলেও তা কাজ হয়নি। এডিবি কাট ছাট করতে হচ্ছে। জিএসপি ইস্যুতে গার্মেন্ট খাত ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও নন গার্মেন্ট খাত সাজা ভোগ করছে। রিজার্ভ নিয়ে গর্বটা বেশি হয়ে গেছে। যেখানে ৩ মাসের আমদানি খরচ রাখলেই হয় সেখানে ছয় মাস ক্রস করেছে। বিনিয়োগ বাড়েনি। এতে আর্থিক কাঠামো দুর্বল হয়েছে। বিনিয়োগ না বাড়ার কারণে এর জিটিপি ২৪- ২৬ পার্সেন্টে রয়ে গেছে। জিডিপি ৮ পার্সেন্টে নিতে হলে বিনিয়োগকে ৩২ পার্সেন্টে নিতে হবে। না হয় ৬ পার্সেন্ট টিকবে কিনা এ নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। ভারতের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বড় ধরণের ভরসা। ট্রানজিটকে ঘিরে সার্বিক চুক্তি বাণিজ্যের প্রসার ঘটাবে, এদেশে তাদের বড় বিনিয়োগ হবে কিন্তু এ খাতে রাস্তাঘাট অবকাঠামো উন্নয়নের কিছুই হয়নি। ব্যাংকিং খাতে সুদের হার কমানো যাবে না যদি না মন্দ ঋণগুলো থেকে ব্যাংকিং খাতকে মুক্ত করা যায়। পুঁজিবাজারে নতুন কিছু আইপিও আনা হলেও ভীতি কাটেনি। বাজার চাঙা হয়নি। যে কোন সময় অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাস থেকে পুঁজিবাজার আরো বেশি করে মুখ থুবরে পড়তে পারে। বিনিয়োগের প্রসার না ঘটলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। এতে করে সার্বিক অর্থনীতির উপর বিরূপ প্রভাব পরার সম্ভাবনা রয়েছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে পরিচালকদের ঋণ নেওয়ার ঘটনা রয়েছে নানা ফাঁকে। নতুন ব্যাংকগুলো উচ্চ সুদ দানের যে পথ নিয়েছে সেটিও ইঙ্গিতবহ। ব্যাংক সংস্কার কমিশন গঠিত হলে অর্থমন্ত্রীর সেই রাজনৈতিক তদবীরবাজদের চেহারা উন্মোচিত হতো। বিএনপির অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানকে এদেশের অর্থনীতির সংস্কারক বলা হয়। ব্যাংকিং খাতে পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক নিয়োগের ঘোর বিরোধী ছিলেন। ১৯৯১ সালের বিএনপি সরকার তাকে দিয়ে এটি করাতে পারেননি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর শাহ এমএস কিবরিয়া অর্থমন্ত্রী হন। সৎ, দক্ষ ও মেধাবী অর্থমন্ত্রী হলেও শেয়ার কেলেঙ্কারি তার আমলে ঘটে যায়। সেই সময় তিনি ব্যাংকিং খাতে অভিজ্ঞ আমলাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পরিবর্তে দক্ষ, পেশাদার, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসহ বিশেষজ্ঞদের ব্যাংকিং খাতে নিয়োগ দেন। সেই সময় যোগ্যদের স্থান দেওয়ার কারণে ব্যাংকিং খাতে এতো লুটপাটের ঘটনা ঘটেনি। ২০০১ সালে বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান তার ক্ষমতা, দক্ষতা এবং ব্যক্তিত্ব দিয়ে রাজনৈতিক নিয়োগ কিছুটা হলেও প্রতিরোধ করেছিলেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর অর্থমন্ত্রী হন আবুল মাল আব্দুল মুহিত। ব্যাংকিং সেক্টর পরিচালনায় অযোগ্যদের বসিয়ে দেওয়া হয়। যাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ছিলেন রাজপথের মিছিল করা সরকারি দলের কর্মী কিংবা দলকানাদের। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, এদের দিয়েই রাজনৈতিক প্রভাবে ব্যাংক লুটের ঘটনা ঘটে। বাগেরহাটের জাতীয় পার্টির কর্মী শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদের বান্ধবী জিনাত হোসেনের কাছের লোক। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর কোন অন্ধকার পথ দিয়ে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান হয়ে গেলেন এবং একের পর এক ঋণ দানের জন্য ব্যাংকের শাখা ওপেন করে করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটিকে লুটপাটের অভয়ারণ্যে পরিণত করলেন। পুঁজিবাজারের সংস্কার সম্পন্ন হয়নি। এসিসির চেয়ারম্যানও দলীয় অনুগত একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক। তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। দেশের আর্থিক খাতে লুটের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত জীবনের পড়ন্ত বেলায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারার সমালোচনা ও বোঝা বহন করেই যাবেন নাকি সরে দাঁড়াবেন। এই প্রশ্ন এখন সর্বত্র রয়েছে।