,

02

চাপে পড়ে কমিটি ভেঙে দিয়েছে হেফাজত, কমিটির পাঁচজনের চারজনই বাবুনগরীর আত্মীয়

হাওর বার্তা ডেস্কঃ তিন ধরনের চাপে পড়ে কমিটি ভেঙে দিয়েছে বাবুনগরী নেতৃত্বাধীন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। একের পর এক নাশকতা ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় অনেক নেতার গ্রেপ্তারে কোণঠাসা হয়ে পড়ে সংগঠনটি। নাশকতার মামলায় নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার এড়াতে ও বহুমুখী তদন্তের হাত থেকে বাঁচতে সরকারের সঙ্গে সমঝোতার জোর চেষ্টা চালান সংগঠনটির নেতারা। এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকও হয়েছে। সেই বৈঠকে হেফাজতকে সংগঠন থেকে রাজনৈতিক নেতাদের বাদ দেওয়াসহ তিনটি কড়া শর্ত দেওয়া হয় বলে খবর বেরিয়েছে। এই চাপের সঙ্গে সংগঠনের ভেতর আরো দুটি চাপে পড়ে হেফাজত। এর একটি হচ্ছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নাশকতার কর্মসূচিসহ কিছু কার্যক্রমের বিরোধিতা করে কয়েকজন নেতার পদত্যাগের পর আরো অনেকে পদত্যাগের হুমকি দিচ্ছিলেন। আরেকটি হচ্ছে, গ্রেপ্তার বন্ধের ব্যবস্থা করতে শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ওপর সংগঠনের নেতাকর্মীদের চাপ বাড়ছিল।

এই তিন চাপে দিশাহারা শীর্ষস্থানীয় নেতারা নিজেদের গ্রেপ্তারের ঝুঁকির মধ্যে পড়ে তড়িঘড়ি করে হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। গত রবিবার রাত ১১টার দিকে ফেসবুকে এক ভিডিও বার্তায় সংগঠনের আমির জুনাইদ বাবুনগরী বলেন, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটির কিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতার পরামর্শে কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হলো। আগামী দিনে আহ্বায়ক কমিটির মাধ্যমে হেফাজতের কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

এর পরও সংগঠনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে মধ্যরাতেই আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করে বাবুনগরীপক্ষ। রাত পৌনে ৩টার দিকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে প্রথমে তিন সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। যেখানে বিলুপ্ত কমিটির উপদেষ্টা মহিবুল্লাহ বাবুনগরীর নেতৃত্বে আহ্বায়ক কমিটিতে প্রথমে বিদায়ী আমির জুনাইদ বাবুনগরী ও বিদায়ী মহাসচিব নুরুল ইসলাম জিহাদীকে রাখা হয়। তিন সদস্যের কমিটিতে বর্তমান নেতারাই থাকায় সমঝোতার আলোচনায় প্রশ্ন উঠতে পারে ভেবে আবারও দুজনকে যুক্ত করা হয়। পরে রাত ৪টার সময় আরেকটি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আহ্বায়ক কমিটিতে সদস্য হিসেবে সালাহউদ্দিন নানুপুরী ও অধ্যাপক মিজানুর রহমান চৌধুরীকে যুক্ত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে পাঁচজনের আহ্বায়ক কমিটি।

প্রশাসনের একটি সূত্র জানিয়েছে, এমন কৌশলের কারণে হেফাজতের ওপর সরকার ও প্রশাসনের নাশকতাবিরোধী হিসেবে বিশ্বাস তৈরি হয়নি। সন্দেহের চোখে এখনো পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে হেফাজতের কর্মকাণ্ড। মামলায় শীর্ষস্থানীয় নেতাদের গ্রেপ্তার ও তদন্তের প্রক্রিয়ায় কোনো নতুন নির্দেশনা নেই।

এদিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দুই দফায় আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হলেও এই কমিটি নিয়ে হেফাজতের অনেকেই নাখোশ। কমিটি ভাঙায় ক্ষোভ-হতাশা সাধারণ কর্মীদের মধ্যেও। তবে নেতারা নতুন মেরুকরণের দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। আহ্বায়ক কমিটির মধ্যে অধ্যাপক মিজানুর রহমান ছাড়া অন্য চারজনই জুনাইদ বাবুনগরীর আত্মীয়। মহিবুল্লাহ বাবুনগরী তাঁর আপন মামা, নুরুল ইসলাম জিহাদী ফুফাতো ভাই ও সালাউদ্দিন নানুপুরী মেয়ের ভাশুর ও ভাগ্নে সম্পর্ক। জুনাইদ বাবুনগরীসহ চারজনের বাড়ি চট্টগ্রামের হাটহাজারীর পাশের উপজেলা ফটিকছড়িতে। শুরুতেই কমিটিতে আত্মীয়করণ করায় হেফাজতের নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই এই আহ্বায়ক কমিটিকে ‘ফটিকছড়ি কমিটি’ বলেও আখ্যায়িত করছেন। অরাজনৈতিক ধর্মীয় বৃহৎ এ সংগঠনে ২০ দলীয় জোটের একাধিক শরিক দলসহ ইসলামী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা ছিলেন কমিটিতে। নতুন এ কমিটি গঠনপ্রক্রিয়ায় অরাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়েও দেখা দিয়েছে সংশয়। কেন্দ্রীয় ২০১ সদস্যের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণার পাশাপাশি ঢাকা মহানগর কমিটিও বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ঢাকায় আগের কমিটির নেতারা ছাড়া কাউকে সক্রিয় দেখা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র।

শফীপন্থী ও নিষ্ক্রিয় অনেক নেতা বলছেন, সরকার ও প্রশাসনের চাপে থাকলেও জোনাইদ বাবুনগরীসহ রাজনৈতিক বলয়ের শক্তি হেফাজতের নিয়ন্ত্রণ কৌশলে ধরে রাখতে চাচ্ছে। এ কারণে তারা কমিটিতে নিজস্ব লোকজন রাখছে। আবার শফীপন্থীরাও হেফাজতের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। শফীপন্থী গ্রুপেও রাজনৈতিক নেতারা আছেন। এসব কারণে হেফাজতের কমিটি ভাঙনের প্রক্রিয়াটি কোনো পক্ষের মধ্যেই আস্থা তৈরি করতে পারেনি।

জানতে চাইলে সদ্যোবিলুপ্ত কমিটির সহকারী অর্থ সম্পাদক মো. আহসান বলেন, ‘আপাতত পাঁচ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি (আংশিক) গঠিত হয়েছে। আহ্বায়ক কমিটির পরিধি আরো বাড়বে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আলেম-উলামাদের রাখা হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ইতিমধ্যে আমাদের সংগঠনের প্রায় ৪৮০-৪৮৫ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩২ জন কেন্দ্রীয় নেতারা রয়েছেন। কমিটি বিলুপ্ত করার বিষয়টি নিয়ে পাঁচ-সাত দিন ধরে ভার্চুয়ালি আলোচনা চলছিল। নীতিনির্ধারকের মতামত নিয়ে কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে।’ কেন্দ্রীয় সাবেক আরেক নেতা বলেন, আহ্বায়ক কমিটি ৫০ সদস্যবিশিষ্ট হতে পারে। এই কমিটি সুবিধাজনক সময়ে সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করবে।

নতুন আহ্বায়ক কমিটি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মঈনুদ্দিন রুহী বলেন, ‘নতুন আহ্বায়ক কমিটিতে আত্মীয়করণ হয়েছে। জুনাইদ বাবুনগরীর আত্মীয়-স্বজনকেই বেশির ভাগ পদে নিয়ে আসা হয়েছে। পাঁচজনের মধ্যে চারজন উনার আত্মীয়। আগে থেকেই বলে আসছি হেফাজতে ইসলামের গত কেন্দ্রীয় কমিটিতে (সদ্যোবিলুপ্ত) নেতৃত্বের শূন্যতা, আদর্শ ও লক্ষ্যহীন হওয়ায় এই গাড়ি (হেফাজতে ইসলামের গত কমিটি) দুর্ঘটনায় পড়বে বলে যে আশঙ্কা করেছিলাম এখন তা-ই হয়েছে। ড্রাইভারবিহীন গাড়ির অবস্থা এমনই।’

প্রতিষ্ঠাতা আমির মরহুম আল্লামা শাহ আহমদ শফীর অনুসারীরা কি এর সঙ্গে আছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে মঈনুদ্দিন রুহী বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে এ ব্যাপারে কোনো যোগাযোগ হয়নি। আমরা চাই আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নীতি-আদর্শকে ধারণ করে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ পরিচালিত হোক। এতে দল-মত-নির্বিশেষে সংগঠন সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে।’

সংগঠনের সূত্রগুলো জানায়, আলোচনা চলছিল বিতর্কিত ও রাজনৈতিক নেতাদের কমিটি থেকে বহিষ্কার করা হবে কি না এ বিষয়টি নিয়ে। এ পথে না গিয়ে প্রধান দুই কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করায় হেফাজতে ইসলামের অনেক নেতাকর্মীর মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। তাঁদের অনেকেই মাঠে থেকে মামলা-মোকদ্দমায় পড়েছেন। অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছেন। আবার অনেকেই গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে রয়েছেন।

এদিকে ঢাকায় পুলিশের গোয়েন্দাদের একাধিক কর্মকর্তা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে  বলেন, হেফাজতে ইসলামের নেতাদের মামলা ও তদন্তের ব্যাপারে নতুন কোনো নির্দেশনা নেই। তবে কমিটি ভেঙে দেওয়া এবং কাওমি মাদরাসায় রাজনীতি বন্ধ করার উদ্যোগকে ইতিবাচক দেখা হচ্ছে। জুনাইদ বাবুনগরীর নিয়ন্ত্রিত আহ্বায়ক কমিটিকে কৌশলী পদক্ষেপ বিবেচনা করে হেফাজত প্রকৃতপক্ষে রাজনীতি বাদ দেয় কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সংশোধনের কার্যক্রম গ্রহণ করা হলে পুলিশ প্রশাসন ও সরকারের বিভিন্ন পক্ষ আলোচনায় বসবে বলে জানায় সূত্র।

যেভাবে তিন চাপে হেফাজত

২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে নাশকতার ঘটনায় মামলা ও গ্রেপ্তারের চাপে পড়লেও এক পর্যায়ে সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসে হেফাজতে ইসলাম। মাঝে কয়েক বছর নাশকতার মামলাগুলো স্থবির পড়ে থাকে। তবে গত বছর আল্লামা আহমদ শফীর মৃত্যুর পর হেফাজতের নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। এরপর বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করে জুনাইদ বাবুনগরী, মাওলানা মামুনুল হকসহ কয়েকজন নেতা বক্তব্য দিলে একটি বিতর্ক তৈরি হয়। ওই সময় কুষ্টিয়ায় ভাস্কর্য ভাঙার ঘটনায় মামলাও হয় তাঁদের বিরুদ্ধে। গত মার্চে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের বিরোধিতায় কর্মসূচির নামে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক নাশকতা চালায় হেফাজত। এপ্রিলের শুরু থেকে একের পর এক মামলা দায়ের ও হেফাজত নেতাদের গ্রেপ্তার শুরু হয়। এরই মধ্যে মামুনুল হকসহ কেন্দ্রীয় ১৯ নেতা গ্রেপ্তার হয়েছেন ঢাকায়। কওমি মাদরাসা ছুটি ঘোষণা করে সরকার। এমন পরিস্থিতে গ্রেপ্তার বন্ধ করা, মাদরাসা খোলাসহ কয়েকটি সমঝোতার দাবি নিয়ে গত সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের গোয়েন্দাদের সঙ্গে দেখা করে হেফাজতের একটি প্রতিনিধিদল। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের কোনো আশ্বাস না দিলেও পুলিশের গোয়েন্দাদের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক নেতাদের সংগঠন থেকে বাদ দিয়ে নতুন কমিটি গঠন, কওমি মাদরাসায় রাজনীতি বন্ধ এবং পরিচালানায় নতুন পদ্ধতি চালুর শর্ত দেওয়া হয়। এরপর হেফাজতের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও শর্ত পূরণ ছাড়া আলোচনা হবে না বলে জানানো হয়। গ্রেপ্তার অভিযানও আছে অব্যাহত। চাঙ্গা করা হয়েছে ২০১৩ সালের মামলা। অন্যদিকে এপ্রিলের শুরু থেকে সংগঠনের কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করে দুজন নায়েবে আমিরসহ চারজন পদত্যাগ করেছেন। আরো কয়েকজন নেতা পদত্যাগ করতে পারেন বলে ঘোষণাও দিয়েছেন। এমন অবস্থায় সংগঠনের ভেতরও চাপে পড়ে হেফাজতের কমিটি।

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর