ঢাকা ০২:৩৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
ছোট এআই মডেলেই বড় চ্যালেঞ্জ: ক্লাউড সিস্টেমকে টক্কর দিচ্ছে নতুন প্রযুক্তি রিজার্ভের আড়ালে বাড়ছে ঝুঁকি কৃষক বাঁচলেই দেশ বাঁচবে: ত্রাণমন্ত্রী বিচারকদের সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান প্রধান বিচারপতির বগুড়ার আলোচিত তিন ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনে ডিসিকে প্রধানমন্ত্রীর চিঠি তাপমাত্রা ও বৃষ্টি নিয়ে নতুন বার্তা দিল আবহাওয়া অফিস নানা সংকটে চ্যালেঞ্জে পুলিশ মালয়েশিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর দুই দিনের সরকারি সফর শুরু কাল, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও সমঝোতা স্মারক সইয়ের সম্ভাবনা কার হাতে উঠবে বিশ্বকাপ, জানাল অক্টোপাস পলের উত্তরসূরিরা শুধু বেতন নয়, আরও যেসব সুবিধা পাচ্ছেন সরকারি চাকরিজীবীরা

দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ নিষ্পত্তি : সিলেটের অভিজ্ঞতা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৮:৩০:২৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯
  • ২৭৯ বার

হাওর বার্তা ডেস্কঃ মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্বের অস্তিত্ব ছিল। হয়তো গুহাবাসী মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত শুরু হতো শিকার করা পশুর ভাগ-বাটোয়ারা, হাতিয়ারের মালিকানা ইত্যাদি নিয়ে। সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত আরও জটিল হয় এবং বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।

এসব সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের আকাঙ্ক্ষাই প্রতিফলিত হয় বিভিন্ন দার্শনিক, সমাজতাত্ত্বিক ও অপরাধ বিজ্ঞানীদের তত্ত্বে। মোটা দাগে বলা যায়, মানুষের স্বার্থ-উদ্ভূত বিরোধ, সম্পত্তির মালিকানা, চুক্তিভিত্তিক দায়-দায়িত্ব ইত্যাদি নিরূপণ করা হয় দেওয়ানি বিচারব্যবস্থায় এবং সহিংসতা, রক্তপাত ও শারীরিক, মানসিক ও সম্পত্তির ক্ষতি হলে শাস্তি বিধানের ব্যবস্থা করা হয় ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে।

বর্তমানে আমরা যে বিচার প্রশাসন দেখি এর শুরু মূলত আধুনিককালে। প্রাচীন ভারতে মনুসংহিতায় বর্ণিত দণ্ড আরোপের অধিকার ছিল একমাত্র রাজার। রাজা দণ্ড আরোপের আগে ব্রাহ্মণের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারতেন। মুসলিম বিচারব্যবস্থায় কাজীর অস্তিত্ব ছিল। শরিয়ার আলোকে আইনি ব্যাখ্যা দেয়ার দায়িত্বে ছিলেন মুফতি, উলেমা ইত্যাদি ব্যক্তিরা। ভারতীয় উপমহাদেশে বর্তমানে বিদ্যমান বিচার কাঠামোর যাত্রা শুরু হয় ইংরেজ শাসনের হাত ধরে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক আদালত ও প্রশাসনের বাইরেও স্থানীয় পঞ্চায়েত, মাতব্বর ও চেয়ারম্যানরা বেশিরভাগ বিচার-আচার বা বিরোধ নিষ্পত্তি করে থাকেন। এ প্রসঙ্গে আমরা বিগত বছরগুলোতে ফতোয়াবাজদের

দৌরাত্ম্য স্মরণ করতে পারি, যেখানে প্রচলিত আইনের বিরুদ্ধে গিয়েও ধমের্র অপব্যাখ্যা দিয়ে মানুষকে হয়রানি করা হতো।

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্থানীয় বিরোধগুলো সাধারণত স্থানীয়ভাবেই নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়া হয়, যা অনেক সময় প্রভাবশালীদের স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার হয়ে ওঠে। আবার অনেক সময় এসব বিরোধ বংশ পরম্পরায় চলতেই থাকে।

মোটামুটি দীর্ঘ পুলিশিং জীবনে দীর্ঘদিনের বিরোধ-উদ্ভূত বহু রক্তপাত ও সহিংসতার ঘটনা আমি প্রত্যক্ষ করেছি। এসব সহিংসতা কিভাবে কার্যকর পুলিশিংয়ের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা যায়, আজ সে প্রসঙ্গেই আলোচনা করব।

বছর তিনেক আগে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলায় চার শিশুকে হত্যার পর মাটিচাপা দেয়ার এক রোমহর্ষক ও মর্মান্তিক অপরাধ সংঘটিত হয়। প্রতিদিনের অনেক মৃত্যু, হত্যা ও বিয়োগান্তক ঘটনার ভিড়েও হয়তো ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ১২ তারিখে সংঘটিত এ নৃশংস ঘটনাটি অনেকের স্মরণে রয়েছে। সেদিন উপজেলার সুন্দ্রাটিকি গ্রামে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে পূর্ব শত্রুতা ও আধিপত্য বিস্তারের নিষ্ঠুর খেলার বলি হয়ে প্রাণ দিতে হয় ৭ থেকে ১০ বছর বয়সের নিষ্পাপ চার শিশুকে। সুন্দ্রাটিকি গ্রামের আব্দুল খালেক তালুকদার ওরফে আব্দুল খালেক মাস্টার এক পক্ষের পঞ্চায়েত মুরুব্বি। প্রতিপক্ষের পঞ্চায়েত মুরুব্বি হচ্ছেন আব্দুল আলী বাগাল। একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাবেকি আমলের পঞ্চায়েত প্রথার অনুসারী এ মানুষজনের মধ্যে অহংকার ও প্রতিহিংসাপরায়ণতা ছিল বিপজ্জনকভাবে বেশি। এ কারণে তুচ্ছ বিষয়ে, কখনও বা বিষয় ছাড়াই বিরোধী পঞ্চায়েত সদস্যদের মধ্যে ঝগড়া-ফ্যাসাদ, মারামারি, সালিশ বৈঠক লেগেই থাকত। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিশোধপরায়ণ আব্দুল আলী বাগালের পক্ষের লোকজন ১২.০২.২০১৬ তারিখে গ্রামের ফুটবল খেলার মাঠ থেকে চার অবুঝ শিশুকে (মো. জাকারিয়া আহমেদ শুভ, মো. তাজেল মিয়া, মো. মানির মিয়া এবং মো. ইসমাইল হোসেন) কৌশলে অপহরণ করে নিয়ে যায় এবং হত্যার পর অনতিদূরে লেবু ও চা বাগানের পাশে মাটিচাপা দিয়ে মৃতদেহ লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করে। এ ঘটনার চারদিন পর ভিকটিমদের অর্ধগলিত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবিতে জনগণ সোচ্চার হয়। ভিকটিম মনির মিয়ার পিতা আব্দাল মিয়ার রুজুকৃত মামলায় তদন্ত ও বিচার শেষে তিনজনের মৃত্যুদণ্ড এবং দুইজনের ৭ বছরের কারাদণ্ডসহ সবার অর্থদণ্ডের রায় হয়।

ঘটনাটি যখন ঘটে তখন আমি সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হিসেবে কর্মরত। একযোগে চারটি শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা এবং হত্যার আলামত গোপন করার চেষ্টা, হত্যাকাণ্ডের শিকার শিশুদের হতভাগ্য পিতা-মাতার হৃদয়বিদারক আর্তনাদ এবং জনগণের ক্ষোভ অন্য অনেকের মতো আমারও দৃষ্টি এড়ায়নি। বরং প্রতিদিন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত এ সংক্রান্ত খবরাদি, পুলিশের তৎপরতা ও অগ্রগতি অনুসরণ করতে থাকি। বিষয়টি আমার মনোজগতে গভীর রেখাপাত করে। তুচ্ছ অহংবোধ, গ্রাম্য দলাদলির প্রতিক্রিয়ায় এমন নিষ্ঠুর, নির্মম, নৃশংস, অমানবিক হত্যাকাণ্ড কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। অনুসন্ধান করতে থাকি এমন একটি যুৎসই কৌশলের, যা প্রয়োগ করে এ ধরনের গোষ্ঠীগত, গ্রামে-গ্রামে, পাড়ায়-পাড়ায় দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড রোধ করা যায়। একটি খুবই সাধারণ, প্রয়োগযোগ্য ও বাস্তবায়নযোগ্য কৌশল মাথায় আসে। উপরে বর্ণিত ঘটনার কয়েক মাস পর সিলেট রেঞ্জে ডিআইজি হিসেবে যোগদানের পর সেই কৌশল বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করি।

স্থানীয় পত্রপত্রিকা ও অনলাইন নিউজ পোর্টালের কল্যাণে সিলেট বিভাগের সব জেলা-উপজেলার এ ধরনের সংঘাত-সংঘর্ষের খবর প্রতিদিন গোচরে আসে। বিশেষভাবে হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের কয়েকটি এলাকায় দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র সহযোগে মারামারি ও হতাহতের ঘটনা প্রায়ই সংবাদের শিরোনাম হয়। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এ প্রাণঘাতি প্রবণতা রোধে সিলেট রেঞ্জের চারটি জেলাতেই দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ নিস্পত্তির উদ্যোগ গ্রহণ করি বর্তমান কর্মস্থলে যোগদানের অল্পদিনের মধ্যেই।

দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ নিষ্পত্তির কৌশলটি খুবই সরল ও সাদামাটা। তবে দরকার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ব্যক্তিগত আগ্রহ ও অকৃত্রিম আন্তরিকতা। কৌশলটি হচ্ছে প্রথমেই বিরোধের তালিকা তৈরি করা এবং পরবর্তীকালে সেগুলোর সমাধানে ব্রতী হওয়া। থানার অফিসার ইনচার্জদের বিরোধের ইউনিয়নভিত্তিক তালিকা তৈরি করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। এতে বিরোধী পক্ষের লোকদের নাম-ঠিকানা, বিরোধের প্রকৃতি, বিরোধের স্থায়িত্ব, অতীত সংঘাত-সংঘর্ষের সংক্ষিপ্ত বিবরণ, মামলা-মোকদ্দমার তথ্য ইত্যাদি নির্ধারিত ছকে উল্লেখ করে রেজিস্টারভুক্ত করার জন্য বলা হয়। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, মেম্বার, বিট-পুলিশিং কর্মকর্তা ও এলাকাবাসীর মাধ্যমে যথাসম্ভব হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহের পরামর্শ দেয়া হয়।

বলতে দ্বিধা নেই, বাস্তবতার নিরিখে পুলিশের অধিকাংশ কাজকর্মই পরিচালিত হয় রি-অ্যাকটিভ পদ্ধতিতে। অর্থাৎ কোনো ঘটনা সংঘটিত হলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। অধুনা প্রো-অ্যাকটিভ পুলিশিংয়ের চর্চাও জোরেশোরে শুরু হয়েছে। আলোচ্য কৌশলটি প্রো-অ্যাকটিভ পুলিশিং চর্চার বাস্তব উদাহরণ।

তথ্য সংগ্রহ এবং বিরোধের তালিকা প্রস্তুত হয়ে গেলে পরবর্তী কার্যক্রম হচ্ছে সেগুলো নিষ্পত্তির উদ্যোগ গ্রহণ। তবে কাজটি থানার অফিসার ইনচার্জ নিজে করেন না। তিনি বিষয়টি উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান ও স্থানীয় অন্যান্য জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সহায়তায় নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেন। এক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা অনেকটা অনুঘটকের মতো। কিন্তু পুরো বিষয়টি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অফিসার ইনচার্জের ওপরই। এভাবে ইতিমধ্যেই অনেক বিরোধ নিষ্পত্তি করে এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে। এক্ষেত্রে একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য। কোনো চলমান ফৌজদারি মামলার কিংবা ফৌজদারি অপরাধ সংগঠিত হলে সেটি নিষ্পত্তির জন্য কোনো ধরনের উদ্যোগ পুলিশ গ্রহণ করে না। এ ধরনের কোনো উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্তও হয় না। জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করা না গেলে বিরোধী পক্ষদ্বয়কে আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তির পরামর্শ দেয়া হয়। তবে এক্ষেত্রে কোনো ধরনের সংঘাত, মারামারি থেকে বিরত থাকার জন্য পক্ষগুলোকে কড়া নির্দেশনা দেয়া হয়ে থাকে।

২০১৭ সাল থেকে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যক্রম শুরু হয়। প্রতি মাসে থানা থেকে এ সংক্রান্ত অগ্রগতি প্রতিবেদন সংগ্রহ করা হয়। থানা এলাকায় কোনো হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পর যদি বার্তায় জানানো হয় যে, পূর্ব-বিরোধের কারণে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, তাহলে বর্ণিত বিরোধ তালিকাভুক্ত ছিল কিনা তা যাচাই করা হয়। তালিকায় না থাকলে সংশ্লিষ্ট অফিসার ইনচার্জ এবং বিট পুলিশিং কর্মকর্তার কাছে এর ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। কার্যক্রম শুরুর পর থেকে সিলেট রেঞ্জের চারটি জেলায় এ পর্যন্ত মোট ৪১১টি বিরোধ তালিকাভুক্ত হয়। তার মধ্যে ২৮৭টি বিরোধ নিষ্পত্তি হয় এবং ১২৪টি বিরোধ নিষ্পত্তির অপেক্ষায় মূলতবী আছে। প্রতিটি ইউনিয়নে সম্প্রসারিত বিট পুলিশিং কার্যক্রম পূর্ণদ্যোমে চালু হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ নিষ্পত্তি কার্যক্রমও গতি পাবে বলে আমার বিশ্বাস।

এ উদ্যোগের সূচনা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত রেঞ্জ কার্যালয়ে আমার সহকর্মীরা, চার জেলার পুলিশ সুপার ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, বিশেষ করে অফিসার ইনচার্জরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় একটি যুগোপযোগী পুলিশি উদ্যোগ হিসেবে এটি সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীর কাছে প্রশংসিত ও সমাদৃত হয়েছে। এতে পুলিশের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কের ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে এবং পুলিশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত বিরোধের ফলস্বরূপ অস্বাভাবিক ও শত্রুভাবাপন্ন বিবদমান পরিবেশের স্থলে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের উদ্ভব হয়। ফলে সামাজিক বন্ধন মজবুত হয় এবং নিরাপত্তাবোধ সৃষ্টি হয়।

‘আমার বর্তমান কর্মস্থলে কর্মকালীন একটি অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুও যদি রোধ করতে পারি, তাহলেই মনে করব আমি সফল’- এ মনোভাব নিয়ে শুরু করেছিলাম দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যক্রম। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০১৭ সালের চেয়ে ২০১৮ সালে হত্যা মামলা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক হ্রাস পেয়েছে। ২০১৭ সালে পূর্ব-বিরোধজনিত খুনের মামলার সংখ্যা ছিল ৫২। পরবর্তী বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে এ সংখ্যা নেমে আসে ২৯-এ। এ উদ্যোগের ফলেই খুন কমেছে কিনা তা হয়তো নিশ্চিত করে বলা যাবে না, তবে অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়। সহকর্মীরা আন্তরিকতা, পেশার প্রতি একাগ্রতা ও নিষ্ঠা, মানবিকতা, ধৈর্য, সহনশীলতা ও ত্যাগের মানসিকতা নিয়ে দায়িত্ব পালন করে গেলে এ উদ্যোগের মাধ্যমে যে অনেক মৃত্যু রোধ করা যাবে; সে বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

ছোট এআই মডেলেই বড় চ্যালেঞ্জ: ক্লাউড সিস্টেমকে টক্কর দিচ্ছে নতুন প্রযুক্তি

দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ নিষ্পত্তি : সিলেটের অভিজ্ঞতা

আপডেট টাইম : ০৮:৩০:২৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯

হাওর বার্তা ডেস্কঃ মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্বের অস্তিত্ব ছিল। হয়তো গুহাবাসী মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত শুরু হতো শিকার করা পশুর ভাগ-বাটোয়ারা, হাতিয়ারের মালিকানা ইত্যাদি নিয়ে। সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত আরও জটিল হয় এবং বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।

এসব সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের আকাঙ্ক্ষাই প্রতিফলিত হয় বিভিন্ন দার্শনিক, সমাজতাত্ত্বিক ও অপরাধ বিজ্ঞানীদের তত্ত্বে। মোটা দাগে বলা যায়, মানুষের স্বার্থ-উদ্ভূত বিরোধ, সম্পত্তির মালিকানা, চুক্তিভিত্তিক দায়-দায়িত্ব ইত্যাদি নিরূপণ করা হয় দেওয়ানি বিচারব্যবস্থায় এবং সহিংসতা, রক্তপাত ও শারীরিক, মানসিক ও সম্পত্তির ক্ষতি হলে শাস্তি বিধানের ব্যবস্থা করা হয় ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে।

বর্তমানে আমরা যে বিচার প্রশাসন দেখি এর শুরু মূলত আধুনিককালে। প্রাচীন ভারতে মনুসংহিতায় বর্ণিত দণ্ড আরোপের অধিকার ছিল একমাত্র রাজার। রাজা দণ্ড আরোপের আগে ব্রাহ্মণের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারতেন। মুসলিম বিচারব্যবস্থায় কাজীর অস্তিত্ব ছিল। শরিয়ার আলোকে আইনি ব্যাখ্যা দেয়ার দায়িত্বে ছিলেন মুফতি, উলেমা ইত্যাদি ব্যক্তিরা। ভারতীয় উপমহাদেশে বর্তমানে বিদ্যমান বিচার কাঠামোর যাত্রা শুরু হয় ইংরেজ শাসনের হাত ধরে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক আদালত ও প্রশাসনের বাইরেও স্থানীয় পঞ্চায়েত, মাতব্বর ও চেয়ারম্যানরা বেশিরভাগ বিচার-আচার বা বিরোধ নিষ্পত্তি করে থাকেন। এ প্রসঙ্গে আমরা বিগত বছরগুলোতে ফতোয়াবাজদের

দৌরাত্ম্য স্মরণ করতে পারি, যেখানে প্রচলিত আইনের বিরুদ্ধে গিয়েও ধমের্র অপব্যাখ্যা দিয়ে মানুষকে হয়রানি করা হতো।

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্থানীয় বিরোধগুলো সাধারণত স্থানীয়ভাবেই নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়া হয়, যা অনেক সময় প্রভাবশালীদের স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার হয়ে ওঠে। আবার অনেক সময় এসব বিরোধ বংশ পরম্পরায় চলতেই থাকে।

মোটামুটি দীর্ঘ পুলিশিং জীবনে দীর্ঘদিনের বিরোধ-উদ্ভূত বহু রক্তপাত ও সহিংসতার ঘটনা আমি প্রত্যক্ষ করেছি। এসব সহিংসতা কিভাবে কার্যকর পুলিশিংয়ের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা যায়, আজ সে প্রসঙ্গেই আলোচনা করব।

বছর তিনেক আগে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলায় চার শিশুকে হত্যার পর মাটিচাপা দেয়ার এক রোমহর্ষক ও মর্মান্তিক অপরাধ সংঘটিত হয়। প্রতিদিনের অনেক মৃত্যু, হত্যা ও বিয়োগান্তক ঘটনার ভিড়েও হয়তো ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ১২ তারিখে সংঘটিত এ নৃশংস ঘটনাটি অনেকের স্মরণে রয়েছে। সেদিন উপজেলার সুন্দ্রাটিকি গ্রামে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে পূর্ব শত্রুতা ও আধিপত্য বিস্তারের নিষ্ঠুর খেলার বলি হয়ে প্রাণ দিতে হয় ৭ থেকে ১০ বছর বয়সের নিষ্পাপ চার শিশুকে। সুন্দ্রাটিকি গ্রামের আব্দুল খালেক তালুকদার ওরফে আব্দুল খালেক মাস্টার এক পক্ষের পঞ্চায়েত মুরুব্বি। প্রতিপক্ষের পঞ্চায়েত মুরুব্বি হচ্ছেন আব্দুল আলী বাগাল। একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাবেকি আমলের পঞ্চায়েত প্রথার অনুসারী এ মানুষজনের মধ্যে অহংকার ও প্রতিহিংসাপরায়ণতা ছিল বিপজ্জনকভাবে বেশি। এ কারণে তুচ্ছ বিষয়ে, কখনও বা বিষয় ছাড়াই বিরোধী পঞ্চায়েত সদস্যদের মধ্যে ঝগড়া-ফ্যাসাদ, মারামারি, সালিশ বৈঠক লেগেই থাকত। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিশোধপরায়ণ আব্দুল আলী বাগালের পক্ষের লোকজন ১২.০২.২০১৬ তারিখে গ্রামের ফুটবল খেলার মাঠ থেকে চার অবুঝ শিশুকে (মো. জাকারিয়া আহমেদ শুভ, মো. তাজেল মিয়া, মো. মানির মিয়া এবং মো. ইসমাইল হোসেন) কৌশলে অপহরণ করে নিয়ে যায় এবং হত্যার পর অনতিদূরে লেবু ও চা বাগানের পাশে মাটিচাপা দিয়ে মৃতদেহ লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করে। এ ঘটনার চারদিন পর ভিকটিমদের অর্ধগলিত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবিতে জনগণ সোচ্চার হয়। ভিকটিম মনির মিয়ার পিতা আব্দাল মিয়ার রুজুকৃত মামলায় তদন্ত ও বিচার শেষে তিনজনের মৃত্যুদণ্ড এবং দুইজনের ৭ বছরের কারাদণ্ডসহ সবার অর্থদণ্ডের রায় হয়।

ঘটনাটি যখন ঘটে তখন আমি সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হিসেবে কর্মরত। একযোগে চারটি শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা এবং হত্যার আলামত গোপন করার চেষ্টা, হত্যাকাণ্ডের শিকার শিশুদের হতভাগ্য পিতা-মাতার হৃদয়বিদারক আর্তনাদ এবং জনগণের ক্ষোভ অন্য অনেকের মতো আমারও দৃষ্টি এড়ায়নি। বরং প্রতিদিন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত এ সংক্রান্ত খবরাদি, পুলিশের তৎপরতা ও অগ্রগতি অনুসরণ করতে থাকি। বিষয়টি আমার মনোজগতে গভীর রেখাপাত করে। তুচ্ছ অহংবোধ, গ্রাম্য দলাদলির প্রতিক্রিয়ায় এমন নিষ্ঠুর, নির্মম, নৃশংস, অমানবিক হত্যাকাণ্ড কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। অনুসন্ধান করতে থাকি এমন একটি যুৎসই কৌশলের, যা প্রয়োগ করে এ ধরনের গোষ্ঠীগত, গ্রামে-গ্রামে, পাড়ায়-পাড়ায় দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড রোধ করা যায়। একটি খুবই সাধারণ, প্রয়োগযোগ্য ও বাস্তবায়নযোগ্য কৌশল মাথায় আসে। উপরে বর্ণিত ঘটনার কয়েক মাস পর সিলেট রেঞ্জে ডিআইজি হিসেবে যোগদানের পর সেই কৌশল বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করি।

স্থানীয় পত্রপত্রিকা ও অনলাইন নিউজ পোর্টালের কল্যাণে সিলেট বিভাগের সব জেলা-উপজেলার এ ধরনের সংঘাত-সংঘর্ষের খবর প্রতিদিন গোচরে আসে। বিশেষভাবে হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের কয়েকটি এলাকায় দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র সহযোগে মারামারি ও হতাহতের ঘটনা প্রায়ই সংবাদের শিরোনাম হয়। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এ প্রাণঘাতি প্রবণতা রোধে সিলেট রেঞ্জের চারটি জেলাতেই দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ নিস্পত্তির উদ্যোগ গ্রহণ করি বর্তমান কর্মস্থলে যোগদানের অল্পদিনের মধ্যেই।

দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ নিষ্পত্তির কৌশলটি খুবই সরল ও সাদামাটা। তবে দরকার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ব্যক্তিগত আগ্রহ ও অকৃত্রিম আন্তরিকতা। কৌশলটি হচ্ছে প্রথমেই বিরোধের তালিকা তৈরি করা এবং পরবর্তীকালে সেগুলোর সমাধানে ব্রতী হওয়া। থানার অফিসার ইনচার্জদের বিরোধের ইউনিয়নভিত্তিক তালিকা তৈরি করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। এতে বিরোধী পক্ষের লোকদের নাম-ঠিকানা, বিরোধের প্রকৃতি, বিরোধের স্থায়িত্ব, অতীত সংঘাত-সংঘর্ষের সংক্ষিপ্ত বিবরণ, মামলা-মোকদ্দমার তথ্য ইত্যাদি নির্ধারিত ছকে উল্লেখ করে রেজিস্টারভুক্ত করার জন্য বলা হয়। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, মেম্বার, বিট-পুলিশিং কর্মকর্তা ও এলাকাবাসীর মাধ্যমে যথাসম্ভব হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহের পরামর্শ দেয়া হয়।

বলতে দ্বিধা নেই, বাস্তবতার নিরিখে পুলিশের অধিকাংশ কাজকর্মই পরিচালিত হয় রি-অ্যাকটিভ পদ্ধতিতে। অর্থাৎ কোনো ঘটনা সংঘটিত হলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। অধুনা প্রো-অ্যাকটিভ পুলিশিংয়ের চর্চাও জোরেশোরে শুরু হয়েছে। আলোচ্য কৌশলটি প্রো-অ্যাকটিভ পুলিশিং চর্চার বাস্তব উদাহরণ।

তথ্য সংগ্রহ এবং বিরোধের তালিকা প্রস্তুত হয়ে গেলে পরবর্তী কার্যক্রম হচ্ছে সেগুলো নিষ্পত্তির উদ্যোগ গ্রহণ। তবে কাজটি থানার অফিসার ইনচার্জ নিজে করেন না। তিনি বিষয়টি উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান ও স্থানীয় অন্যান্য জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সহায়তায় নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেন। এক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা অনেকটা অনুঘটকের মতো। কিন্তু পুরো বিষয়টি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অফিসার ইনচার্জের ওপরই। এভাবে ইতিমধ্যেই অনেক বিরোধ নিষ্পত্তি করে এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে। এক্ষেত্রে একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য। কোনো চলমান ফৌজদারি মামলার কিংবা ফৌজদারি অপরাধ সংগঠিত হলে সেটি নিষ্পত্তির জন্য কোনো ধরনের উদ্যোগ পুলিশ গ্রহণ করে না। এ ধরনের কোনো উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্তও হয় না। জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করা না গেলে বিরোধী পক্ষদ্বয়কে আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তির পরামর্শ দেয়া হয়। তবে এক্ষেত্রে কোনো ধরনের সংঘাত, মারামারি থেকে বিরত থাকার জন্য পক্ষগুলোকে কড়া নির্দেশনা দেয়া হয়ে থাকে।

২০১৭ সাল থেকে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যক্রম শুরু হয়। প্রতি মাসে থানা থেকে এ সংক্রান্ত অগ্রগতি প্রতিবেদন সংগ্রহ করা হয়। থানা এলাকায় কোনো হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পর যদি বার্তায় জানানো হয় যে, পূর্ব-বিরোধের কারণে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, তাহলে বর্ণিত বিরোধ তালিকাভুক্ত ছিল কিনা তা যাচাই করা হয়। তালিকায় না থাকলে সংশ্লিষ্ট অফিসার ইনচার্জ এবং বিট পুলিশিং কর্মকর্তার কাছে এর ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। কার্যক্রম শুরুর পর থেকে সিলেট রেঞ্জের চারটি জেলায় এ পর্যন্ত মোট ৪১১টি বিরোধ তালিকাভুক্ত হয়। তার মধ্যে ২৮৭টি বিরোধ নিষ্পত্তি হয় এবং ১২৪টি বিরোধ নিষ্পত্তির অপেক্ষায় মূলতবী আছে। প্রতিটি ইউনিয়নে সম্প্রসারিত বিট পুলিশিং কার্যক্রম পূর্ণদ্যোমে চালু হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ নিষ্পত্তি কার্যক্রমও গতি পাবে বলে আমার বিশ্বাস।

এ উদ্যোগের সূচনা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত রেঞ্জ কার্যালয়ে আমার সহকর্মীরা, চার জেলার পুলিশ সুপার ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, বিশেষ করে অফিসার ইনচার্জরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় একটি যুগোপযোগী পুলিশি উদ্যোগ হিসেবে এটি সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীর কাছে প্রশংসিত ও সমাদৃত হয়েছে। এতে পুলিশের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কের ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে এবং পুলিশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত বিরোধের ফলস্বরূপ অস্বাভাবিক ও শত্রুভাবাপন্ন বিবদমান পরিবেশের স্থলে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের উদ্ভব হয়। ফলে সামাজিক বন্ধন মজবুত হয় এবং নিরাপত্তাবোধ সৃষ্টি হয়।

‘আমার বর্তমান কর্মস্থলে কর্মকালীন একটি অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুও যদি রোধ করতে পারি, তাহলেই মনে করব আমি সফল’- এ মনোভাব নিয়ে শুরু করেছিলাম দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যক্রম। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০১৭ সালের চেয়ে ২০১৮ সালে হত্যা মামলা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক হ্রাস পেয়েছে। ২০১৭ সালে পূর্ব-বিরোধজনিত খুনের মামলার সংখ্যা ছিল ৫২। পরবর্তী বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে এ সংখ্যা নেমে আসে ২৯-এ। এ উদ্যোগের ফলেই খুন কমেছে কিনা তা হয়তো নিশ্চিত করে বলা যাবে না, তবে অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়। সহকর্মীরা আন্তরিকতা, পেশার প্রতি একাগ্রতা ও নিষ্ঠা, মানবিকতা, ধৈর্য, সহনশীলতা ও ত্যাগের মানসিকতা নিয়ে দায়িত্ব পালন করে গেলে এ উদ্যোগের মাধ্যমে যে অনেক মৃত্যু রোধ করা যাবে; সে বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই।