ঢাকা ০৬:২৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬, ১৬ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে জিবরাইল (আ.) এর চার প্রশ্ন

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৯:৫৪:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ নভেম্বর ২০১৯
  • ৩১৯ বার

হাওর বার্তা ডেস্কঃ ফেরেশতাদের প্রধান হজরত জিবরাইল (আ.)। তিনি নবী-রাসূলদের কাছে অহি প্রেরণের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর উপাধি হলো, রুহুল আমিন তথা বিশ্বস্ত আত্মা। তিনি হলেন আকাশের আমিন। জমিনের আমিন হলেন বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

আকাশের আমিন জিবরাইল (আ.) জমিনের আমিন রাসূল (সা.) এর কাছে ওহি নিয়ে আসতেন। কোনো কোনো সময় সবার অলক্ষ্যে ওহি নাজিল করে চলে যেতেন। আবার কোনো কোনো সময় মানব আকৃতিতে আগমন করতেন। তিনি প্রায় সময় দাহিয়াতুল কালবি (রা.)-এর আকৃতি ধারণ করে আসতেন। ফেরেশতা কুকুর ও শূকর ছাড়া যেকোনো আকৃতি ধারণ করতে পারেন।

একবার জিবরাইল (আ.) ধবধবে সাদা পোশাকে এবং নিকষ কালো কেশবিশিষ্ট অবস্থায় ছদ্মবেশে মহানবী (সা.) এর দরবারে এসে হাজির হন। হাদিস বিশারদদের মতে, দশম হিজরিতে বিদায় হজের কিছুকাল আগে জিবরাইল (আ.) সাহাবায়ে কেরামদের দ্বিন শিক্ষা দেয়ার জন্য এসেছিলেন। তার মধ্যে সফরের কোনো চিহ্ন পরিলক্ষিত হয়নি।

মহানবী (সা.) তখন সাহাবায়ে কেরাম দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলেন। ওমর (রা.) বলেন, আমাদের কেউ তাকে চিনতে পারেনি। কোনো কোনো হাদিস বিশারদের মতে প্রথমে মহানবী (সা.)ও চিনতে পারেননি। অবশেষে লোকটি মহানবী (সা.) এর সামনে এসে এবং স্বীয় হাঁটুদ্বয় মহানবী (সা.) এর পবিত্র হাঁটুদ্বয়ের সঙ্গে মিলিয়ে বসে পড়েন। অত:পর স্বীয় হস্তদ্বয় তার পবিত্র উরুদ্বয়ের ওপর রাখেন। সাহাবায়ে কেরাম অবাক হয়ে তার কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেন। লোকটি মহানবী (সা.)-কে চারটি বিষয়ে প্রশ্ন করেন। তা হলো, ইসলাম, ঈমান, ইহসান ও কিয়ামতের সময়।

প্রথম প্রশ্ন : লোকটি প্রথমে প্রশ্ন করেন, হে মুহাম্মাদ (সা.)! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে অবহিত করুন। মহানবী (সা.) প্রত্যুত্তরে বলেন, ইসলাম হচ্ছে (১) তোমার এ সাক্ষ্য দেয়া যে আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসূল। (২) নামাজ কায়েম করা, (৩) জাকাত প্রদান করা, ৪. রমজানের রোজা রাখা এবং (৫) পথ খরচের সামর্থ্য থাকলে হজব্রত পালন করা। মহানবী (সা.) এর কথা শ্রবণ করার পর লোকটি বলেন, আপনি সত্যিই বলেছেন। উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম লোকটির কথা শুনে অবাক হলেন। কারণ তিনি নিজে প্রশ্ন করছেন আবার সত্যায়নও করছেন। কিন্তু তারা কোনো কথা বলেননি।

দ্বিতীয় প্রশ্ন : লোকটি আবার প্রশ্ন করলেন, আমাকে ঈমান সম্পর্কে অবহিত করুন। মহানবী (সা.) প্রত্যুত্তরে বলেন, ঈমান হলো- (১) আল্লাহ তায়ালা, (২) তাঁর ফেরেশতাকুল, (৩) আসমানি কিতাবগুলো, (৪) রাসূলগণ, ৫. পরকাল এবং তাকদিরের ভালো-মন্দের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। লোকটি এবারো বলেন, আপনি সত্যিই বলেছেন। সাহাবায়ে কেরাম আগের মতো এবারও আশ্চর্য বোধ করলেন।

তৃতীয় প্রশ্ন : লোকটি আবার প্রশ্ন করলেন, আমাকে ইহসান সম্পর্কে অবহিত করুন। মহানবী (সা.) জবাবে বলেন, ইহসান হলো, মহান আল্লাহর এমনভাবে ইবাদত করা, যেন তুমি আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছ। আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও, তাহলে মনে করবে, তিনি তোমাকে দেখতে পাচ্ছেন।

চতুর্থ প্রশ্ন : এরপর লোকটি চতুর্থ প্রশ্ন করলেন, আমাকে কেয়ামত সম্পর্কে অবহিত করুন। প্রত্যুত্তরে মহানবী (সা.) বলেন, জিজ্ঞাসাকারী থেকে জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি অধিক জ্ঞাত নয়। অর্থাৎ আপনার চেয়ে আমি এ প্রসঙ্গে অধিক অবগত নই। প্রশ্নকারী বলেন, তাহলে আমাকে কেয়ামতের কিছু নিদর্শন বলে দিন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, কেয়ামতের নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি হলো- (১) দাসী তার মনিবকে প্রসব করবে অর্থাৎ দাসী তার মনিবের সন্তান জন্ম দেবে এবং পরবর্তী সময়ে সে সন্তানটিই তার মনিবের স্থলাভিষিক্ত হবে। ২. আরেকটি নিদর্শন হলো, তুমি দেখতে পাবে যে যাদের পায়ে জুতা ও গায়ে জামা নেই, যারা শূন্য হাতে একসময় জীবনযাপন করত এবং মেষ চরাত তারাই পরবর্তী সময়ে বড় বড় প্রাসাদ গড়ে তুলবে এবং এসব কাজে প্রতিযোগিতা করবে। এসব প্রশ্ন করে লোকটি চলে গেলেন। ওমর ফারুক (রা.) বলেন, আমরা কিছু সময় নীরব বসে রইলাম। অত:পর মহানবী (সা.) আমাকে লক্ষ্য করে বলেন, হে ওমর! আগন্তুক এ প্রশ্নকারীকে কি তুমি চিনতে পেরেছ? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-ই বেশি জ্ঞাত।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, তিনি হলেন, জিবরাইল (আ.)। তিনি দ্বিন শিক্ষা দেয়ার লক্ষ্যে তোমাদের কাছে এসেছিলেন। অন্য বর্ণনামতে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কেয়ামতের আরেকটি নিদর্শন হলো, নগ্নপদ, নগ্নদেহ বিশিষ্ট, মূক ও বধিরদের তোমরা পৃথিবীর শাসক হিসেবে দেখতে পাবে। অত:পর মহানবী (সা.) সূরা লুকমানের সর্বশেষ আয়াত পাঠ করে বলেন, পাঁচটি বিষয়ের জ্ঞান আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না। (১) কেয়ামত কখন হবে, (২) কখন বৃষ্টি হবে, (৩) গর্ভাশয়ে সন্তান কী অবস্থায় আছে, (৪) আগামীকাল কী উপার্জন করবে, (৫) কোন জায়গায় সে মৃত্যুবরণ করবে। উল্লিখিত বর্ণনাটি হাদিসে জিবরাইল হিসেবে পরিচিত। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৮, আবু দাউদ, হাদিস : ৪৬৯৫)।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে জিবরাইল (আ.) এর চার প্রশ্ন

আপডেট টাইম : ০৯:৫৪:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ নভেম্বর ২০১৯

হাওর বার্তা ডেস্কঃ ফেরেশতাদের প্রধান হজরত জিবরাইল (আ.)। তিনি নবী-রাসূলদের কাছে অহি প্রেরণের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর উপাধি হলো, রুহুল আমিন তথা বিশ্বস্ত আত্মা। তিনি হলেন আকাশের আমিন। জমিনের আমিন হলেন বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

আকাশের আমিন জিবরাইল (আ.) জমিনের আমিন রাসূল (সা.) এর কাছে ওহি নিয়ে আসতেন। কোনো কোনো সময় সবার অলক্ষ্যে ওহি নাজিল করে চলে যেতেন। আবার কোনো কোনো সময় মানব আকৃতিতে আগমন করতেন। তিনি প্রায় সময় দাহিয়াতুল কালবি (রা.)-এর আকৃতি ধারণ করে আসতেন। ফেরেশতা কুকুর ও শূকর ছাড়া যেকোনো আকৃতি ধারণ করতে পারেন।

একবার জিবরাইল (আ.) ধবধবে সাদা পোশাকে এবং নিকষ কালো কেশবিশিষ্ট অবস্থায় ছদ্মবেশে মহানবী (সা.) এর দরবারে এসে হাজির হন। হাদিস বিশারদদের মতে, দশম হিজরিতে বিদায় হজের কিছুকাল আগে জিবরাইল (আ.) সাহাবায়ে কেরামদের দ্বিন শিক্ষা দেয়ার জন্য এসেছিলেন। তার মধ্যে সফরের কোনো চিহ্ন পরিলক্ষিত হয়নি।

মহানবী (সা.) তখন সাহাবায়ে কেরাম দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলেন। ওমর (রা.) বলেন, আমাদের কেউ তাকে চিনতে পারেনি। কোনো কোনো হাদিস বিশারদের মতে প্রথমে মহানবী (সা.)ও চিনতে পারেননি। অবশেষে লোকটি মহানবী (সা.) এর সামনে এসে এবং স্বীয় হাঁটুদ্বয় মহানবী (সা.) এর পবিত্র হাঁটুদ্বয়ের সঙ্গে মিলিয়ে বসে পড়েন। অত:পর স্বীয় হস্তদ্বয় তার পবিত্র উরুদ্বয়ের ওপর রাখেন। সাহাবায়ে কেরাম অবাক হয়ে তার কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেন। লোকটি মহানবী (সা.)-কে চারটি বিষয়ে প্রশ্ন করেন। তা হলো, ইসলাম, ঈমান, ইহসান ও কিয়ামতের সময়।

প্রথম প্রশ্ন : লোকটি প্রথমে প্রশ্ন করেন, হে মুহাম্মাদ (সা.)! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে অবহিত করুন। মহানবী (সা.) প্রত্যুত্তরে বলেন, ইসলাম হচ্ছে (১) তোমার এ সাক্ষ্য দেয়া যে আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসূল। (২) নামাজ কায়েম করা, (৩) জাকাত প্রদান করা, ৪. রমজানের রোজা রাখা এবং (৫) পথ খরচের সামর্থ্য থাকলে হজব্রত পালন করা। মহানবী (সা.) এর কথা শ্রবণ করার পর লোকটি বলেন, আপনি সত্যিই বলেছেন। উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম লোকটির কথা শুনে অবাক হলেন। কারণ তিনি নিজে প্রশ্ন করছেন আবার সত্যায়নও করছেন। কিন্তু তারা কোনো কথা বলেননি।

দ্বিতীয় প্রশ্ন : লোকটি আবার প্রশ্ন করলেন, আমাকে ঈমান সম্পর্কে অবহিত করুন। মহানবী (সা.) প্রত্যুত্তরে বলেন, ঈমান হলো- (১) আল্লাহ তায়ালা, (২) তাঁর ফেরেশতাকুল, (৩) আসমানি কিতাবগুলো, (৪) রাসূলগণ, ৫. পরকাল এবং তাকদিরের ভালো-মন্দের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। লোকটি এবারো বলেন, আপনি সত্যিই বলেছেন। সাহাবায়ে কেরাম আগের মতো এবারও আশ্চর্য বোধ করলেন।

তৃতীয় প্রশ্ন : লোকটি আবার প্রশ্ন করলেন, আমাকে ইহসান সম্পর্কে অবহিত করুন। মহানবী (সা.) জবাবে বলেন, ইহসান হলো, মহান আল্লাহর এমনভাবে ইবাদত করা, যেন তুমি আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছ। আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও, তাহলে মনে করবে, তিনি তোমাকে দেখতে পাচ্ছেন।

চতুর্থ প্রশ্ন : এরপর লোকটি চতুর্থ প্রশ্ন করলেন, আমাকে কেয়ামত সম্পর্কে অবহিত করুন। প্রত্যুত্তরে মহানবী (সা.) বলেন, জিজ্ঞাসাকারী থেকে জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি অধিক জ্ঞাত নয়। অর্থাৎ আপনার চেয়ে আমি এ প্রসঙ্গে অধিক অবগত নই। প্রশ্নকারী বলেন, তাহলে আমাকে কেয়ামতের কিছু নিদর্শন বলে দিন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, কেয়ামতের নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি হলো- (১) দাসী তার মনিবকে প্রসব করবে অর্থাৎ দাসী তার মনিবের সন্তান জন্ম দেবে এবং পরবর্তী সময়ে সে সন্তানটিই তার মনিবের স্থলাভিষিক্ত হবে। ২. আরেকটি নিদর্শন হলো, তুমি দেখতে পাবে যে যাদের পায়ে জুতা ও গায়ে জামা নেই, যারা শূন্য হাতে একসময় জীবনযাপন করত এবং মেষ চরাত তারাই পরবর্তী সময়ে বড় বড় প্রাসাদ গড়ে তুলবে এবং এসব কাজে প্রতিযোগিতা করবে। এসব প্রশ্ন করে লোকটি চলে গেলেন। ওমর ফারুক (রা.) বলেন, আমরা কিছু সময় নীরব বসে রইলাম। অত:পর মহানবী (সা.) আমাকে লক্ষ্য করে বলেন, হে ওমর! আগন্তুক এ প্রশ্নকারীকে কি তুমি চিনতে পেরেছ? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-ই বেশি জ্ঞাত।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, তিনি হলেন, জিবরাইল (আ.)। তিনি দ্বিন শিক্ষা দেয়ার লক্ষ্যে তোমাদের কাছে এসেছিলেন। অন্য বর্ণনামতে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কেয়ামতের আরেকটি নিদর্শন হলো, নগ্নপদ, নগ্নদেহ বিশিষ্ট, মূক ও বধিরদের তোমরা পৃথিবীর শাসক হিসেবে দেখতে পাবে। অত:পর মহানবী (সা.) সূরা লুকমানের সর্বশেষ আয়াত পাঠ করে বলেন, পাঁচটি বিষয়ের জ্ঞান আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না। (১) কেয়ামত কখন হবে, (২) কখন বৃষ্টি হবে, (৩) গর্ভাশয়ে সন্তান কী অবস্থায় আছে, (৪) আগামীকাল কী উপার্জন করবে, (৫) কোন জায়গায় সে মৃত্যুবরণ করবে। উল্লিখিত বর্ণনাটি হাদিসে জিবরাইল হিসেবে পরিচিত। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৮, আবু দাউদ, হাদিস : ৪৬৯৫)।