,

বিএনপিতে ছাঁটাই আতঙ্ক

ছাঁটাই আতঙ্ক শুরু হয়েছে বিএনপিতে। পুনর্গঠন নিয়ে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে আলোচনা আসায় নড়ে-চড়ে বসছেন জাতীয় নির্বাহী কমিটির নিষ্ক্রিয় সদস্যরা। সর্বশেষ তিন মাসের আন্দোলনে নির্বাহী কমিটির অধিকাংশ সদস্যই ছিলেন নিষ্ক্রিয়। বিএনপি প্রধানের পক্ষ থেকে নানাভাবে যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি অনেক সদস্যকে। এ নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের বড় একটি অংশের ওপরই ক্ষুব্ধ চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তাই কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সব পর্যায়ে নতুনভাবে দলকে গোছাবেন তিনি। আর এমন খবরে দলে নিষ্ক্রিয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে ছাঁটাই আতঙ্ক চলছে। দলীয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

জানা যায়, কয়েকজন নেতার সঙ্গে সম্প্রতি আলাপকালে বেগম জিয়া সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দলে আমূল পরিবর্তন করতে চান। বাদ দেবেন আন্দোলনে নিষ্ক্রিয় থাকা নেতাদের। এক্ষেত্রে কারও সুপারিশই মানবেন না তিনি। পদোন্নতি দেবেন দলের দুঃসময়ের আন্দোলনে ‘সক্রিয়’ থাকা নেতাদের। দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অপেক্ষাকৃত তরুণদের দায়িত্ব দেবেন। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সিনিয়র নেতারা কারামুক্ত হলেই দলের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। চলতি বছরজুড়েই এ কার্যক্রম চলবে। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবির পর দল পুনর্গঠন করে বিএনপি। ২০০৯ সালের জুন মাসে একসঙ্গে ৭২টি সাংগঠনিক জেলা কমিটি ভেঙে দিয়ে আহ্বায়ক কমিটি করা হয়। ওই বছরের ৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিল। পরের বছর জানুয়ারিতে গঠন করা হয় ৩৮৬ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় নির্বাহী কমিটি। তিন বছর মেয়াদি কমিটির সময় আড়াই বছর আগেই শেষ হয়েছে। এর আগে দুই দফা কাউন্সিল করার প্রস্তুতি নিলেও পরিবর্তিত রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। দলের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দলের পুনর্গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। আগামীতে যে কমিটি হবে, তাতে অবশ্যই আন্দোলনে সক্রিয় থাকা নেতারা গুরুত্ব পাবেন বেশি। দলকে আন্দোলনমুখী করতে হলে এর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই।’ সূত্র জানায়, চলতি বছরের শেষের দিকে দলের জাতীয় কাউন্সিল করার চিন্তাভাবনা করছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। এর আগে ঢাকা মহানগর, অপূর্ণাঙ্গ জেলা-উপজেলাসহ অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোতে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হবে। ৭৫টি সাংগঠনিক জেলা ভেঙে দেওয়া হতে পারে। ডাকা হবে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সভা। গণতন্ত্র ও গঠনতান্ত্রিকভাবে কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতা নির্বাচনের চিন্তা বিএনপি প্রধানের। তবে মির্জা ফখরুলকে এবার ভারমুক্ত করে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করা হবে।

জানা যায়, দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এমন আলোচনা শুরু হওয়ার পর হঠাৎ করেই আন্দোলনে নিষ্ক্রিয় থাকা নেতাদের গুলশান কার্যালয়ে আনাগোনা বেড়ে গেছে। দুই বছরের টানা আন্দোলনে মাঠে দেখা না গেলেও মামলা না থাকা এসব নেতা ঠিকই যোগাযোগ করছেন গুলশান কার্যালয়ে। আন্দোলনে নিজেদের সক্রিয় থাকার সার্টিফিকেটও নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে বিএনপি প্রধান তার সিদ্ধান্তে অনড়। কোনোভাবেই নিষ্ক্রিয়দের দলে না রাখার পক্ষে তিনি। সূত্রমতে, বিএনপির সর্বস্তরের কমিটিতে এবার অপেক্ষাকৃত তরুণ ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতাদের জায়গা করে দেওয়া হবে। নির্বাহী কমিটিতে ঢুকবেন কয়েক ডজন তরুণ নেতা। বিশেষ করে আন্দোলনে থাকা সাবেক ছাত্রনেতাদের অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ পদ পাবেন। বিএনপির নির্বাহী কমিটির পাশাপাশি তাদের কেউ কেউ অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ পদে দায়িত্ব পাবেন। এর মধ্যে রয়েছেন- সাবেক ছাত্রনেতা শফিউল বারী বাবু, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, ফরহাদ হোসেন আজাদ, আমিরুল ইসলাম আলিম, সেলিমুজ্জামান সেলিম, শহীদুল ইসলাম বাবুল, আবদুল বারী ড্যানী, মাহবুবুল হক নান্নু, এসএম জাহাঙ্গীর, হায়দার আলী লেনিন, বজলুর রশীদ আবেদ, আবদুল মতিন, আমিরুজ্জামান খান শিমুল, হাসান মামুন, এসএম জিলানী, আবদুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল, হাবিবুর রশীদ হাবিব, নূরুল ইসলাম নয়ন, ফখরুল ইসলাম রবিন, আবু সাঈদ, মুখলেসুর রহমান প্রমুখ।

গতকাল নয়াপল্টন কার্যালয়ে সাবেক ছাত্রনেতাদের অনেককেই জড়ো হতে দেখা গেছে। শিগগিরই বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করবেন বলেও জানান একাধিক ছাত্রনেতা। সম্প্রতি অ্যাডভোকেট আবদুস সালামকে বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও তাইফুল ইসলাম টিপুকে সহ-দফতর সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা দুজনই বয়সে তরুণ। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির ১৯ সদস্যের মধ্যে কয়েকজন দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। তারা দলের কোনো কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন না। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তাদের ‘গোল্ডেন হ্যান্ডশেক’ করে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। তাছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীও বাদ পড়তে পারেন স্থায়ী কমিটি থেকে। বয়োবৃদ্ধ স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্যকে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। ১৮ সদস্যের ভাইস চেয়ারম্যান পদেও আসবে পরিবর্তন। শূন্যও রয়েছে একাধিক পদ। নিষ্ক্রিয় নেতাদের সংখ্যাও কম নয়। কারাগারে রয়েছেন একজন। মামলা নিয়ে দেশের বাইরেও অবস্থান করছেন একজন। আন্দোলনে থাকা নেতাদের রেখে বাকি সবাইকে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে বিদায় দেওয়া হবে বলে জানা যায়।

সূত্রমতে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হলে পদাধিকার বলে স্থায়ী কমিটির সদস্যও হবেন। তাছাড়া তার সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদেও নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে কারাবন্দী বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নাম আলোচনায় রয়েছে। যুগ্ম মহাসচিবের ৭ পদেও নতুন মুখ আসবে। সেখান থেকে কেউ কেউ পদোন্নতি পেয়ে স্থায়ী কমিটি ও ভাইস চেয়ারম্যান পদেও যেতে পারেন। বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক পদেও বেশ কিছু পরিবর্তন হবে। বিশেষ করে আন্দোলনের সময় যারা দলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিলেন, তারা বাদ পড়বেন নতুন কমিটিতে। ৭ সদস্যের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদেও আসবে পরিবর্তন। পদ পাওয়ার পর অনেকেই বিএনপি থেকে যোগাযোগই বিচ্ছিন্ন করে রাখেন। তাদের স্থান পূরণ করা হবে যোগ্যদের মাধ্যমে। ২৬৫ জন নির্বাহী কমিটির সদস্য পদেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, সদস্যদের বড় অংশই ছিল আন্দোলনে অনুপস্থিত। তাই নির্বাহী কমিটিতে শুদ্ধি অভিযান চালাবেন বিএনপি প্রধান। জানা যায়, জেলা-উপজেলা পর্যায়েও একক আধিপত্য থাকবে না সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের। গত দুই বছরে আন্দোলনের হিসাব-নিকাশ করেই ওইসব কমিটি দেওয়া হবে। এ নিয়ে খোঁজ-খবর নিতেও শুরু করেছেন বেগম জিয়া। নিরপেক্ষভাবে কাউন্সিল করে তৃণমূল থেকে নতুন নেতৃত্ব বাছাই করার চিন্তাভাবনা করছেন তিনি। এ প্রসঙ্গে দলের যুগ্ম মহাসচিব মো. শাহজাহান বলেন, ‘পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনায় বিএনপি পুনর্গঠন করার চিন্তাভাবনা চলছে। এখনো এ নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। দলের সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতেই যে কোনো সময় এ প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে বিএনপির কারাবন্দী নেতা-কর্মীদের মুক্তিই এ মুহূর্তে আমাদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে।’

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর