,

12

দুর্নীতির ডালপালা

হাওর বার্তা ডেস্কঃ সাম্প্রতিক সময়ে করোনা কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়া জেকেজির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা চৌধুরী ও রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ করিম  গ্রেফতার হওয়ার পর সরকারি তরফ থেকে ‘প্রত্যয়বাণী’ বর্ষণ করা হচ্ছে। গণমাধ্যমের সুবাদে জানতে পারলাম, ‘সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে, কেবল সাহেদ বা সাবরিনাই নন, আওয়ামী লীগ ও সরকারের নাম ভাঙিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি বা অপরাধ করার চেষ্টা করলে কাউকেই রেহাই দেয়া হবে না। প্রত্যেককেই শাস্তির আওতায় আনা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা (জিরো টলারেন্স) নীতি নিয়েছেন।’ আমরা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই বলতে চাই, সাধারণ মানুষ এই ‘জিরো টলারেন্স’ উচ্চারণটির প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে; প্রয়োগবিহীন যে কোনো সাবধানবাণী বারবার উচ্চারিত হলে সেটি তার অন্তর্নিহিত শক্তি হারিয়ে ফেলে।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সারা বিশ্ব; আতঙ্কিত পৃথিবীর তাবৎ জনগোষ্ঠী। এমন একটি অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়েও দুর্নীতিবাজরা বসে নেই। আমরা তার প্রচুর নমুনা এরই মধ্যে প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু দেখার বিষয় হল, শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই এ ধরনের দুর্নীতিবাজদের আগমন ঘটেছে। বাংলাদেশে সে তুলনায় একটু বেশিই হয়েছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস সংবাদের শিরোনাম করেছে,‘বিগ বিজনেস ইন বাংলাদেশ: সেলিং ফেক করোনাভাইরাস সার্টিফিকেট’। তবে উন্নত সভ্যতার দেশ বলে আমরা যে দেশকে জ্ঞান করি, সেখানেও করোনার সুযোগ নিয়েছেন অনেকেই। তাদের মধ্যে একজন হলেন ফ্রাঙ্ক লুডলো। ৫৯ বছর বয়সী লুডলো কোভিড-১৯-এর জাল কিট তৈরি করে মার্চ মাসে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। নিম্নমানের পরীক্ষার কিট ক্রয় করেছিলেন জিম্বাবুয়ের স্বাস্থ্যমন্ত্রী, সেই অপরাধে তার মন্ত্রিত্ব চলে যায়। আমরা জানি, সোমালিয়া হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ। সেদেশে যা হওয়ার তাই হয়েছে। হাসপাতাল থেকে পিপিই চুরি হয়ে খোলা বাজারে চড়া দামে বিক্রি করা হয়েছে। গ্রিসে আবার অভিনব কাণ্ড ঘটেছে। সেখানকার একটি হাসপাতালে পুরনো রোগীদের রোগমুক্তির সার্টিফিকেট দিয়ে নতুন নতুন রোগী ভর্তি করা হয়েছে; নতুন রোগীর কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছিল বলে সেদেশের পুলিশ জানায়। ভারতের অমৃতসরে আরেক ধরনের জালিয়াতি ধরা পড়েছে। সেখানকার ইএমসি নামের একটি হাসপাতালে সুস্থ রোগীদের করোনা ‘পজিটিভ’ দেখিয়ে চিকিৎসার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছিল।

স্বাস্থ্য খাতে স্বাভাবিক সময়েও দুর্নীতি চলে এবং তা বিশ্বব্যাপী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিওএইচও) তথ্যমতে, সারা বিশ্বে স্বাস্থ্য খাতের গড় বাজেট হচ্ছে ৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ৭ শতাংশ মিলিয়ে যায় দুর্নীতির কবলে। সে হিসাবে বছরে ৪৯০ বিলিয়ন ডলার (আমাদের চলতি জাতীয় বাজেটের সাতগুণেরও বেশি) অর্থ দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়ে থাকে। করোনাকালে এই অবস্থার আরও অবনতি ঘটবে। কারণ বিভিন্ন দেশের সরকারগুলো এখন জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ক্রয় করছে। সময়ের ভয়াবহতা স্বাভাবিকতাকে গ্রাস করেছে। যেমন, ব্রাজিলের কথাই ধরা যাক। সেখানে কোনো রকমের প্রতিযোগিতা ছাড়াই মাস্ক কেনা হচ্ছে এবং তা ৬৭ শতাংশ বেশি দরে। ইতালির সরকার এমন দু’জন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৪০ লাখ মাস্ক কিনেছে, যারা ইতোমধ্যে প্রতারণার দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন। স্লোভেনিয়ার সুরক্ষাসামগ্রীর বিষয়ে চুক্তি করা হয়েছে এমন এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে- যার জুয়া, ইলেকট্রনিক্স ও রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা আছে; কিন্তু স্বাস্থ্য খাতে কোনো অভিজ্ঞতা নেই। বসনিয়া ভেন্টিলেটরের চুক্তি করেছে একজন কৃষি খামারির সঙ্গে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় দেশ রাশিয়া ভেন্টিলেটরের চুক্তি করেছে একদমই অপরিচিত ও সন্দেহজনক কোম্পানির সঙ্গে।

অর্থাৎ করোনার প্রকোপে প্রতিটি দেশই যখন দিশেহারা, তখন একদল দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি সরকারের অসহায়ত্বকে ‘ফায়দা লোটার’ সুযোগ মনে করছে। বাংলাদেশের জেকেজি ও রিজেন্টের মতো প্রতিষ্ঠান সে সুযোগটিকেই কাজে লাগিয়ে বিশ্বমানচিত্রে আমাদের কলঙ্কিত করেছে। কিন্তু এর প্রতিরোধে ব্যবস্থা কী? এর উত্তর পাওয়া যাবে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) একটি উদ্যোগে। চারজন বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে একটি রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে। সদস্যরা হলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিভাগের প্রধান ডেভিড ক্লার্ক; এইডস, যক্ষ্মা ও ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ সংক্রান্ত গ্লোবাল ফান্ডের দুর্নীতি দমন বিশেষজ্ঞ অনিতা ওয়েয়ারজিনস্কা; ইউএনডিপির এইচআইভি, স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন টিমের নীতি বিশেষজ্ঞ মার্ক ডিবিয়াম এবং ইউএনডিপির দুর্নীতি সম্পর্কিত গ্লোবাল কর্মসূচির উপদেষ্টা আঙ্গা টিমিলসিনা। তাদের পরামর্শ হল, ‘কোভিড-১৯ এর মহামারীর সময়ে একটি কার্যকর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। এর ফলে দুর্নীতির যে বাড়তি সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা প্রতিরোধে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে একটি কাঠামো গড়ে তোলাটাও জরুরি হয়ে পড়েছে। এই কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিষয়টি। এজন্য সরকার, নাগরিক সমাজ, বিশেষজ্ঞ এবং দুর্নীতি দমন ও নিরীক্ষা সংস্থাগুলোকে সঙ্গে নিয়ে একটি তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।’ আশা করি, আমাদের সরকার পরামর্শটিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।

আমাদের আশা করা ছাড়া আর কীইবা করার আছে? তবে আশাহত হওয়ার ঘটনা যেন আমাদের নিত্যসঙ্গী। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ‘জিরো টলারেন্সের’ ঘোষণার মধ্যেই ২১ জুলাই যুগান্তরে প্রকাশিত হয়েছে আশাহত হওয়ার একটি খবর। এটিও দুর্নীতি সংক্রান্ত। পত্রিকাটি বলেছে, ‘কোনোভাবেই থামছে না সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পে পণ্য ক্রয়ে অস্বাভাবিক দামের প্রস্তাব দেয়া। এ যেন স্থায়ী সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এবার ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পে ১০ হাজার টাকা করে ধরা হয়েছে এককটি প্লাস্টিকের ড্রাম ও বঁটির দাম। শুধু তা-ই নয়, একটি অ্যালুমিনিয়ামের বড় চামচ এক হাজার টাকা ও এক কেজি মসলা রাখার প্লাস্টিকের পাত্রের দাম দুই হাজার টাকা প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।’ উল্লেখ্য, ১৪ জুলাই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ৩ হাজার ২০ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়।

আপনি কোথায় যাবেন? এ তো নতুন কিছু নয়। এর আগে একাধিক প্রকল্পে এ ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি লক্ষ করা গেছে। এর মধ্যে আছে রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের বালিশ কেলেঙ্কারি। এছাড়া ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের ৩৭ লাখ টাকার পর্দা, বিভিন্ন প্রকল্পে ক্লিনারের বেতন ৪ লাখ টাকা, একটি মাস্কের দাম ৮৫ হাজার টাকা ও একটি স্যালাইন স্ট্যান্ডের দাম ৬০ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হয়েছিল। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ দিনরাত অমানুষিক পরিশ্রম করে সরকারকে ভ্যাট-ট্যাক্সের জোগান দেয়, আর সেই কষ্টার্জিত টাকার এত অপব্যবহার! আশঙ্কার বিষয় হল, এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দিন দিন তা বেড়েই চলেছে। এমন চলতে থাকলে সরকার প্রধানের আশ্বাসের প্রতি মানুষের আস্থা যথাযথ মাত্রায় থাকবে কি?

আমরা যে ‘উন্নয়নের’ গল্প বলতে ভালোবাসি, তার অনেক রকম মারপ্যাঁচ আছে। সামন্ত ব্যবস্থায় কোষাগার ছিল রাজার, রাষ্ট্রের নয়। কিন্তু পুঁজিবাদি সমাজে কোষাগারটা রাষ্ট্রীয়, সেখানে কোনো সরকারপ্রধান চাইলেই অর্থ নিয়ে নিতে পারবেন না; আইনগত প্রক্রিয়ার প্রয়োজন। তাই কোনো সরকারপ্রধান যদি দুর্নীতিবাজ হন, যদি জনস্বার্থবিরোধী হন কিংবা স্বৈরাচারী হন; অর্থাৎ সব নেতিবাচক চরিত্রের ধারকও হন, তবুও সে রাষ্ট্রে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে। কারণ জনগণের কাছ থেকে সরকারের আহরিত ভ্যাট-ট্যাক্স খরচ করতে হলে কোনো না কোনো অজুহাত লাগবে। সেখানে অবকাঠামোগত প্রকল্প হাতে নিয়ে সেই প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করার সুযোগ তৈরি করবে; তবে উন্নয়ন কিছুটা হলেও হবে। আবার যদি তুলনামূলক উন্নয়কে বিবেচনা করি, সেখানেও হিসাবের গরমিল আছে। ধরা যাক, আপনি প্রকৃত অর্থে একজন ভালো শাসক। আপনার সময়ে ভ্যাট-ট্যাক্স আদায় হয়েছে ১০০ টাকা। আপনি স্বচ্ছভাবে সে অর্থ ব্যয় করলেন। কিন্তু আমি একজন মন্দ শাসক, আমার সময়ে ভ্যাট-ট্যাক্স আদায় হয়েছে ২০০ টাকা। আমি তা উন্নয়ন খাতে ব্যয় করলাম এবং ১২০ টাকা প্রকৃত ব্যয় করে বাকি ৮০ টাকা নানা উপায়ে তছরুপ করলাম। অঙ্কের হিসাবে আপনি উন্নয়ন খাতে ব্যয় করেছিলেন ১০০ টাকা আর আমি করেছি ১২০ টাকা; আমারটাই বড় হবে। কিন্তু প্রকতৃভাবে বিবেচনার বিষয় হল, আপনি একটি টাকাও তছরুপ করেননি; আর আমি করেছি ৮০ টাকা। যে কারণে আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে, উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব হয়েছে কিনা। তা না হলে ‘লাভের গুড়’ পিঁপড়ায় খাবে।

 

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর