,

১৭

একটি সুন্দর দিন কাটাতে সকাল বেলার আমল

হাওর বার্তা ডেস্কঃ রাসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়মিত সকালবেলায় একটি দোয়া করতেন। দোয়াটি হলো,
اللهم اجعل اول هذا النهارصلاحأواوسطه فلا حأ وأخره نجاحأ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাজ্আল আওয়ালা হাযান নাহারা সলাহান, ওয়া আউসাতাহু ফালাহান, ওয়া আখিরাহু নাজাহান।

অর্থ: ‘হে আল্লাহ! এই দিনের শুরু অংশে আমাকে কল্যাণ কাজের ফয়সালা করুন, (অর্থাৎ এই দিনটি যেন কোনো নেক আমল ও কল্যাণকর কাজের মাধ্যমে শুরু হয় এবং এই দিনের শুরু অংশে আমাকে কল্যাণ দান করুন) হে আল্লাহ! এই দিনের মধ্য অংশে আমার জন্য সাফল্য ও কামিয়াবির ফয়সালা করুন। এবং দিনের শেষ অংশে ও আমার জন্য মঙ্গল নিহিত রাখুন।’

দিন শুরু হোক ভালো কাজের মাধ্যমে:
এই দোয়ার মধ্যে রাসূল করিম (সা.) দিনকে তিনটি অংশে ভাগ করে দিয়েছেন, তিনি প্রথম অংশ সম্পর্কে বলেছেন, হে আল্লাহ দিনের শুরু অংশে আমাকে সৎ ও নেক কাজ করার তাওফিক করুন, এই প্রার্থনার মাধ্যমে তিনি উম্মতকে এই শিক্ষা দিয়েছেন যে, যদি তোমরা উত্তম রূপে দিন অতিবাহিত করতে চাও, এবং ভাল ফল লাভ করতে চাও তাহলে দিনের প্রথম ভাগেই ভাল কাজের প্রার্থনা ও করুন। হে আল্লাহ আমাকে তাওফিক দিন, আমি যেন দিনের প্রথম অংশ থেকেই নিজেকে নেক কাজে নিয়োজিত রাখতে পারি, কারণ দিনের প্রথম অংশ যার নেক কাজের মাধ্যমে শুরু হবে, আশা করা যায় তার সার দিন ভাল ভাবেই কাটবে।

সকালে উঠে এই কাজ কর:
এ কারণেই ভোরে বিছানা ছাড়ার পর প্রথম কাজ হলো ফজরের নামাজ আদায় করা, এটি আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ এবং ফরজ বিধান। আল্লাহ তায়ালা বলেন, এরপর যখন সূর্য উঠবে, চারদিক ফর্সা হয়ে যাবে তখন দুই রাকাত এশরাক নামাজ আদায় করবে, এটি অবশ্য ফরজ না, ওয়াজিব না, সুন্নতে মুয়াক্কাদাও না, বরং নফল। তবে এই নফল নামাজ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদেরকে বলেছেন,

يا ابن ادم ـ اركع لي ركعتين في اول النهار اكفك اخره ــ

‘হে আদম সন্তান, দিনের শুরুতে তুমি আমার জন্য দুই রাকাত সালাত আদায় কর, আমি তোমার জন্য দিনের শেষ ভাগ পর্যন্ত সাহায্যকারী হয়ে থাকব।’ (আবু দাউদ, আহমদ, দারেমী)
এ কারণেই রাসূল আকরাম (সা.) উল্লিখিত দোয়ায় বলেছেন, ‘হে আল্লাহ নেক আমলের মাধ্যমে আমাকে দিনের সূচনা করার তাওফিক দান করুন, যাতে সারাদিন আপনার নুসরত ও নিরাপত্তার মধ্যে থাকতে পরি।’

দিনের শুরুতে আল্লাহর প্রতি নিবিষ্ট হও:
এই দোয়ার মাধ্যমে রাসূল আকরাম (সা.) উম্মতকে দিনের প্রথম অংশ থেকে আল্লাহ তায়ালার প্রতি নিবিষ্ট হতে উৎসাহিত করেছেন, কেননা ফজর নামাজ তো অবশ্য পড়বে, তারপরও কয়েক রাকাত এশরাকও আদায় করে নাও। কিছুক্ষণ কোরআন শরিফ তেলাওয়াত কর, কিছুক্ষন জিকির আজকার কর, তাসবিহ-তাহলিল পড়, দোয়া-মুনাজাত কর, আল্লাহ তায়ালার জিকির যে কোনো সময়ই ফজিলতপূর্ণ, তবে সকালের জিকিরের রয়েছে আল্লাহর দরবারে বিশেষ মর্যাদা।

সকালবেলা নতুন জীবন লাভ:
ডা. আবদুল হাই (রহ.) বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা সকালের সময়টাকে এমন করে বানিয়েছেন যে, এই সময় পৃথিবীর সকল বস্তুর মাঝে নতুন প্রাণ সঞ্চার হয়, ঘুমিয়ে থাকা লোকজন জেগে উঠে, ফুলের কলি পাপড়ি মেলে, পাখিরা জেগে উঠে তাসবিহ জপে, আল্লাহর জিকির করে। এটি নতুন জীবন সঞ্চারের সময়, নতুন জীবন দানের এই শুভ সময়ে যদি আল্লাহ তায়ালার জিকিরে নিমগ্ন থাকা যায়, তা হলে তোমদের অন্তরে আল্লাহর প্রতি নিবিষ্টতার নুর সৃষ্টি হবে, এই নুর অন্য সময়ে জিকির করলে হাসিল হবে না কখনোই। একটা সময় এমন ছিল যখন ফজরের ওয়াক্তে কোনো মুসলিম প্রধান এলাকা দিয়ে হেঁটে গেলে ঘর থেকে কোরআন শরিফ তেলাওয়আতের সুরেলা আওয়াজ ভেসে আসত। এক সময় যখন সকালবেলা আমাদের পাশে সবার ঘরে কোরআন তেলাওয়াতের আওয়াজ উচ্চরিত হত, যার ফলে তখন সকলের মাঝে অনুভূত হত এক অপার্থিক সৌহার্দ্য কিন্তু আফসোস মুসলামানদের ঘর থেকে এখন কোরআন তেলাওয়াতের পরিবর্তে ভেসে আসে গান-বাদ্যের ঝংকার, অশিক্ষিত হোক শিক্ষিত কিংবা সাধারণ মুসলমান সকলের।

সকালবেলা আমাদের অবস্থা:
উর্দু কবি মজিদ লাহোরি দৈনিক জঙ্গে ব্যঙ্গাত্বক কবিতা লিখতেন। তিনি সমসাময়িক প্রেক্ষাপট কবিতায় ফুটিয়ে তুলতেন। তিনি লিখেছেন, আগের দিনের লোকেরা জাগত খুব সকালে, সবাই জেগে মগ্ন হত কোরআন পঠনে আজকালের ছেলেরা নয়টা বাজে ওঠে, এভাবে তাদের দিনের শুরুটাই হয় গান আর গুনাহর মধ্য দিয়ে, কিংবা অনর্থক কাজের মাধ্যমে। আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে সম্পর্কহীন থাকলে সারা দিনের কাজকর্মে নুর আসবে কোথায় থেকে? আল্লাহ তায়ালা সকাল বেলাকে বানিয়েছেন অত্যন্ত বরকতপূর্ণ ও জ্যোতির্ময়। এই সময়টা যদি কেউ আল্লাহর জিকির তেলাওয়াত ও তাসবিহের মধ্য দিয়ে কাটিয়ে দিতে পারে তা হলে ইনশাআল্লাহ সকল কাজেই তার নুর হাসিল হবে।

সকালবেলায় রয়েছে বরকত:
এক হাদিসে নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন,

بارك الله لامتى في بكورهم

আল্লাহ তায়ালা আমার উম্মতের জন্য সকালবেলায় বরকত নিহিত রেখেছেন। হাদিসটি শধু জিকির ও ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না, রাসূল করিম (সা.) একজন ব্যবসায়ী সাহাবিকে সম্বোধন করে হাদিসটি বলেছিলেন। তিনি সেই সাহাবিকে এও বলেছিলেন যে, তুমি সকালে সকালে ব্যবসার উদ্দেশে বেরিয়ে যাবে, পরবর্তী সময়ে সেই সাহাবি বলেছিলেন, হজরত রাসূল (সা.) এর এই নির্দেশনা শোনার পর থেকে আমি এর ওপর আমল শুরু করলাম, এবং বেশ সকালেই ব্যবসা আরম্ভ করতে লাগলাম, এর ফলে আল্লাহ তায়ালা আমাকে এত অর্থ বিত্ত দিলেন, লোকজন আমাকে নিয়ে ঈর্ষা করতে থাকল।

ব্যবসায় মন্দা কেন হবে না:
আমাদের দেশে এখন সবকিছু উল্টো চলছে, দিনের এগারোটা পর্যন্ত বাজার মার্কেট বন্ধ থাকে, এগারোটার পর বেচা-বিক্রি কিছু শুরু হয়, এগারোটা মানে দুপুর, দিনের এক প্রহর অর্থহীন কাজ, ঘুম আর গাফলতের মাঝেই কেটে যায়, গুনাহ ও গর্হীত কাজেই আধা বেলা চলে যায়, এর পরও সবার মুখে একই কথা শোনা যায় যে, ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে, ঠিক মতো কিছুই চলছে না কিন্তু কেউ একথা ভাবছে না যে, যেই মহান সত্তার কুদরতি কবজায় ব্যবসার উত্থান-পতন, আমরা তার সঙ্গে সুসম্পর্ক কতটুকু সম্পর্ক স্থাপন করতে পেরেছি, অথচ ব্যবসার উন্নতি লাভের সহজ পদ্ধতি লো, যার কবজায় দুনিয়ার সকল কিছুর নিয়ন্ত্রন তার সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি কর, তার অনুসরণ কর, তার দেয়া বরকত গ্রহণ কর, প্রতিনিয়ত তার সঙ্গে সম্পর্ক বিনষ্ট করছ, আর বলে বেড়াচ্ছ যে, ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে, ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে।

এই হলো সাফল্যের চাবিকাঠি:
এ কারণেই রাসূলে মাকবুল (সা.) এই প্রার্থনা করেছেন যে, আয় আল্লাহ আমার জন্য দিনের শুরু ভাগকে মঙ্গলজনক বানিয়ে দিন, অর্থাৎ আমাকে নেক আমল করার তাওফিক দান করুন।
নবী করিম (সা.) উল্লিখিত শব্দমালার মাধ্যমে দোয়া করেছেন আর উম্মতকে এই শিক্ষা ও দিয়েছেন যে, আয় উম্মাতি যদি সাফল্য চাও, কল্যান তালাশ কর, তবে দিনের প্রথম অংশকে সুন্দর বানাও।

দিনের মধ্য ও শেষ ভাগের দোয়া:
আলোচ্য দোয়ার পরবর্তী অংশে রাসূল (সা.) বলেছেন, হে অল্লাহ পাক দিনের মধ্য ভাগকে আমার জন্য মঙ্গলময় করুন, অর্থাৎ আমার জন্য মঙ্গল জনক হয়, দিনের মধ্যভাগে আমাকে এমন কাজ করার তাওফিক দিন। হে আল্লাহ দিনের শেষ ভাগকে আমার জন্য সাফল্যমণ্ডিত করুন, অর্থাৎ দিনের সকল চেষ্টা মেহনতের পর সন্ধাবেলায়, যখন ঘরে প্রবেশ করব, তখন যেন আমি পরিপূর্ণ সাফল্যমণ্ডিত হয়ে প্রশান্ত চিত্তে ঘরে ফিরতে পারি, এবং দিন শেষে যেন বলতে পারি আজকের দিনের প্রতিটি মুহূর্ত আমি যথাস্থানে ব্যয় করেছি এবং সঠিক ফল লাভ করেছি, আল্লাহ আল্লাহ করে যদি এই দোয়া কবুল হয়ে যায়, তা হলে সবকিছু সহজেই হাসিল হয়ে যাবে, আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে এই দোয়া করার তাওফিক দান করুন এবং এই দোয়া কবুল করুন, আমিন।

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর