ঢাকা ০৬:৫৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশের বৃহত্তম ভাসমান সেতু নির্মিত হয়েছে

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৩:৩২:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জানুয়ারী ২০১৮
  • ৫৬৫ বার

হাওর বার্তা ডেস্কঃ যশোরের মণিরামপুর উপজেলার ঝাঁপা বাঁওড়ের ওপর নির্মিত হয়েছে দেশের বৃহত্তম ভাসমান সেতু। সম্পূর্ণ ব্যক্তি উদ্যোগে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সেতুটি বাঁওড়ের দু’পাড়ের পাঁচ লাখ মানুষকে যুক্ত করেছে সম্প্রীতির বাঁধনে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এতদিন পারাপারের জন্য নৌকাই ছিল যাদের একমাত্র মাধ্যম। ভাসমান এই সেতুটি তাদের সামনে খুলে দিয়েছে স্বপ্নের দ্বার।

স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের আনন্দের সীমা নেই। হাজারো কৃষক এই সেতুকে ঘিরে বুনতে শুরু করেছেন স্বপ্নের জাল। ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার আশায় কৃষকের আনন্দের সীমা নেই। ইচ্ছামতো এই ব্রিজ পার হয়ে তারা রাজগঞ্জ বাজারে আসতে পারবেন। বেচতে পারবেন তাদের উৎপাদিত ফসল। একইভাবে ব্যবসা বাণিজ্য সম্প্রসারণে এই ভাসমান সেতুটি ঝাঁপা বাঁওড়ের দু’পাড়ের লাখ লাখ মানুষের মাঝে এক নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে।

যশোর সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে রাজগঞ্জ বাজার। মণিরামপুর উপজেলার পশ্চিমাংশের এই বাজারটি একটি বৃহত্তম বাণিজ্য কেন্দ্র। এই বাজারের পশ্চিম পার্শ্বে অবস্থিত ঝাঁপা বাঁওড়। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বাঁওড়টি ঘিরে গড়ে উঠেছে ঝাঁপা ইউনিয়ন পরিষদ। প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের বসবাস এই ইউনিয়নে। এই ইউনিয়নের পূর্ব প্রান্তে ঝাঁপা বাঁওড়ের পাড় ঘিরে বসবাস করেন প্রায় ১ লাখ মানুষ।

এই বিশাল জনগোষ্ঠীর অধিকাংশের জীবন জীবিকা নির্ভর করে ঝাঁপা বাঁওড়ের ওপর। বিশেষ করে কয়েক হাজার জেলে পরিবারের জীবন জীবিকা আবর্তিত হয় ঝাঁপা বাঁওড়কে কেন্দ্র করে। আর বিশাল এই বাঁওড়ের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত রাজগঞ্জ সরকারি প্রাইমারি স্কুল, রাজগঞ্জ হাই স্কুল, রাজগঞ্জ দাখিল মাদরাসা থেকে শুরু করে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতকারী শিক্ষার্থীদের চলাচলের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে নৌকা।

বাঁওড়ের পশ্চিম প্রান্তের মানুষকে রাজগঞ্জসহ জেলা বা উপজেলা সদরে চলাচলের মাধ্যমও হচ্ছে নৌকা। বর্ষা বাদলার দিনে নিদারুণ কষ্ট ভোগ করতে হয় চলাচলকারীদের। বিভিন্ন সময় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা প্রতিশ্রুতি দিলেও স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও ঝাঁপা বাঁওড়ের ওপর একটি পুল বা সেতু নির্মিত হয়নি। শেষ পর্যন্ত লাখো মানুষের এই দুঃখ দূর করতে এগিয়ে এসেছেন এলাকার একদল উদ্যোমী যুবক।

তাদের নিজস্বভাবে সংগৃহীত প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে দীর্ঘ ছয় মাস পরিশ্রম করে তারা এই বিশাল ঝাঁপা বাঁওড়ের  ওপর নির্মাণ করেছেন একটি নান্দনিক ভাসমান সেতু। স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত প্লাস্টিকের ব্যারেল, লোহার বার, নাটবোল্ড, স্টিলের প্লেন শিট আর বাঁশ ব্যবহার করে প্রায় ১ হাজার মিটার দীর্ঘ একটি ভাসমান সেতু নির্মাণ করে এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দুঃখ দুর্দশা দূর করার উদ্যোগ নিয়েছেন।

আর এই সেতুটি এখন এই এলাকার মানুষের কাছে টক অব দ্যা ভিলেজ শুধু নয় গোটা এলাকায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। অন লাইন মিডিয়া আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে ভাসমান এই সেতুর খবর পৌঁছে গেছে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশ বিভূঁইয়ে।

ইতিমধ্যে এলাকার যুবকদের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাতে ঘটনাস্থলে গেছেন যশোরের জেলা প্রশাসক আশরাফ উদ্দিন। তিনি নিজে ঘুরে দেখেছেন সেতুর কাজকর্ম। পরে তিনি এলাকার জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সেতুটি উদ্বোধন করে জনচলাচলের জন্য উন্মুক্ত করেন। বর্তমানে গড়ে প্রতিদিন এই সেতুর ওপর দিয়ে পাঁচ গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ চলাচল করছে। এছাড়া নান্দনিক এই ভাসমান সেতুটি দেখতে দূরদূরান্ত থেকে আসছেন আরো কয়েক হাজার মানুষ।

গত মঙ্গলবার বিকালে বাঁওড়ের তীরে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান শামছুল হক মন্টুর সভাপতিত্বে ভাসমান সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহাম্মদ ওবায়দুর রহমান, ভুমি কমিশনার হুসাইন মোহাম্মদ আল মুজাহিদ, জেলা সহকারী তথ্য অফিসার জাহারুল ইসলাম, আওয়ামী লীগ নেতা কামরুল হাসান বারী, ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল হামিদ সরদার, আব্দুস সাত্তার ও আসাদুজ্জামান প্রমুখ। বক্তারা বলেন, মণিরামপুর উপজেলার অভিশপ্ত গ্রামের নাম ঝাঁপা।

এ গ্রাম থেকে একটুকু বাইরে পা রাখতেই হতে হয় নৌকা পারাপার। আর এই পারাপারের সময় নানাবিধ সমস্যা ও দুর্ভোগের শিকার হন স্কুলগামী ছাত্র-ছাত্রী, চিকিৎসা নিতে যাওয়া দুস্থ রোগী ও প্রসব যন্ত্রণায় কাতর মা, হাট বাজারে আসা যাওয়া সাধারণ জনগণসহ সবাই। এ ছাড়া বাঁওড়ে নৌকা ডুবির ঘটনায় জান-মালসহ আর্থিক ক্ষতি সাধন হয়ে আসছে হর হামেশা। এ সব সমস্যা ও দুর্ভোগ থেকে রক্ষা পেতে ও ক্ষতি সাধন থেকে মুক্তি পেতে মুক্তির পথ খুঁজতে থাকে ঝাঁপা গ্রাম উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের সদস্যরা।

তাই ফাউন্ডেশনের সভাপতি মেহেদী হাসান টুটুল ও ভাসমান এ সেতু নির্মাণের প্রধান উদ্যোক্তা মাস্টার আসাদুজ্জামান ২০১৭ সালের ১লা জানুয়ারি ফাউন্ডেশনের এক জরুরি সভার আহ্বান করেন। সেই সভায় স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে ঝাঁপা বাঁওড়ের ওপর একটি  ভাসমান সেতু তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। এরপর একে একে সাড়াও মেলে আশাতীত।

সংগঠনের ৬০ জন সদস্যের অর্থায়নে শুরু করা হয় ১ হাজার মিটার দৈর্ঘ্যের ভাসমান সেতু নির্মাণের কাজ। সংগঠনের বাইরেও অনেক কৃষক, শ্রমিক সামিল হন তাদের সঙ্গে। ৯ ফুট প্রস্থের সেতু নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে ৮৮৯টি বড় আকারের প্লাস্টিকের ব্যারেল। যা সংযুক্ত রাখার জন্য লোহার শিট ব্যবহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যারেলের ওপর দিয়ে চলাচলের জন্য দেয়া হয় ১ হাজার মিটার দৈর্ঘ্যের লোহার পাত।

প্রায় অর্ধ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে বৃহত্তর ভাসমান এ সেতুটি। তবে, বর্ষা  মৌসুমের আগেই ভাসমান সেতুটির দু’পাশে আরসিসি ব্রিজ নির্মাণ করা হবে এবং রাতের আঁধার ঠেকাতে সেতুর এ পাশ থেকে ও পাশ পর্যন্ত বৈদ্যুতিক ও জেনারেটরের আলো থাকবে বলে উদ্যোক্তা মাস্টার আসাদুজ্জামান জানান। এতে আরো প্রায় অর্ধ কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে তিনি দাবি করেন।

এদিকে ঝাঁপা গ্রাম উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের পরিকল্পনা ও সেতুর নকশা মাফিক ৫ই আগস্ট থেকে ভাসমান সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করেন রাজগঞ্জের রশিদ ওয়ার্কসপের ইঞ্জিনিয়ার রবিউল ইসলাম। দীর্ঘ প্রায় ছয় মাস অক্লান্ত পরিশ্রমের পর গতকাল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে সাধারণ মানুষ ও যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয় ভাসমান সেতুটি। গতকাল থেকে ভাসমান সেতু দিয়ে সরাসরি পার হয়ে মণিরামপুরের পশ্চিমাঞ্চলের লাখ লাখ জনগণ স্বল্প সময়ে উপজেলা সদরে যেতে পারছে। মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স, প্রাইভেটকারসহ ছোটখাট সব যানবাহন চলাচল করতে পারছে সেতু দিয়ে।

এদিকে বাঁওড়ে ভাসমান সেতু চালু হওয়াতে এ অঞ্চলের সচেতন মহল ধারণা করছে, শুধু ঝাঁপা গ্রামবাসীর স্বস্তি নয়, ফিরে আসছে সর্বত্রই স্বস্তি। গড়ে উঠেছে একটি নতুন অধ্যায়, নতুন জীবন। অপরদিকে ঝাঁপা গ্রামের অর্ধশতাধিক যুবকের নিজস্ব অর্থায়নে বাঁওড়ের ওপর বিশাল দৈর্ঘ্যের একটি লোহার তৈরি ভাসমান সেতু তৈরি করার সংবাদ শুনে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মানুষ সেতুটি দেখার জন্য রাজগঞ্জ বাজারের খেয়াঘাট সংলগ্ন স্থানে ও ঝাঁপার অনাথের ঘাটে জমায়েত হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে কাক ডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সেতু সংলগ্ন স্থানের দু’পাড়ে যেন চলছে মিলন মেলা।

সেতুটি উদ্বোধন করা ও লোকজন সেতুর ওপর দিয়ে চলাচল করতে পারায় সবার মনে যেন আনন্দের বন্যা বয়ে চলেছে। এদিকে বাঁওড়ের ওপর ভাসমান সেতু তৈরিতে ঝাঁপা গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক মমিনুর রহমান বলেন, শুধু ঝাঁপা গ্রামবাসীর দুঃখ নয় মণিরামপুরবাসীসহ সবাই নৌকা পারাপার থেকে মুক্তি পাওয়ায় স্বস্তি ফিরে পাবে। গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তিত্ব আলহাজ আব্দুস সাত্তার বলেন, পিতা-মাতা, দাদা-দাদির সেই চরম ভোগান্তি নৌকা পারাপার আর নয়, এখন সরাসরি ভাসমান সেতুর ওপর দিয়ে হেঁটে রাজগঞ্জে যেতে পারবো।

ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা সেবা, যে কোনো কাজে আর ভোগান্তি নয়, সব ক্ষেত্রে গ্রামবাসীসহ এলাকার জনগণ চরমভাবে উপকৃত হবে। রাজগঞ্জ বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও বাজার কমিটির সভাপতি চাকলাদার আবুল বাসার বলেন, নৌকা পারাপারের কারণে রাজগঞ্জ বাজারের সঙ্গে ঝাঁপা গ্রামবাসীর একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।

ওই গ্রামের অনেক ব্যবসায়ীকে এ বাজারে ব্যবসা করতে এসে নৌকা পারাপারের কারণে রাত ৯টার মধ্যে দোকান বন্ধ করে বাড়িতে চলে যেতে হতো। সেতু তৈরি হওয়ায় ওই ব্যবসায়ীদের আর সকাল সকাল দোকান বন্ধ করে চলে যেতে হবে না।

ফলে শুধু ঝাঁপা গ্রামবাসী নয়, নৌকা পারাপার হয়ে যে সব অঞ্চলের লোক বিভিন্ন হাট বাজারে যেতে তাদের আর সকাল সকাল বাড়িতে ফিরতে হবে না। ফলে ভাসমান সেতুটি ব্যবসা ক্ষেত্রে উন্নতির জন্য বিশাল ভূমিকা রাখবে। এ বিষয়ে চালুয়াহাটী চেয়ারম্যান আব্দুল হামিদ সরদার বলেন, এই ভাসমান সেতুর ফলে এক দীর্ঘ অভিশাপ থেকে মুক্তি মিলল এই অঞ্চলের লাখো মানুষের।

এই সেতু নির্মাণের ফলে ঝাঁপা বাঁওড়ের দু’পাড়ের লোকের মধ্যে বন্ধুত্ব ও যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে। ঝাঁপা ইউপি চেয়ারম্যান সামছুল হক মন্টু বলেন, সেতুটি চালু হওয়াতে মণিরামপুর সদরসহ সব বাজারের সঙ্গে এলাকার সাধারণ জনগণের সরাসরি যোযোগের সুবিধা হলো।

আমার ইউনিয়নের একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ ও ব্যবসা বাণিজ্যসহ সব ক্ষেত্রে উন্নতির প্রসার ঘটাতে ভাসমান সেতুটি মুখ্য ভূমিকা হিসেবে কাজ করবে বলে আমি মনে করছি। রাজগঞ্জ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের অফিসার ইনচার্জ আকরাম হোসেন বলেন, সেতু তৈরিতে অল্প সময়ের মধ্যে একে অপরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা গেলে আইনশৃঙ্খলার উন্নতি হবে। এলাকার মানুষের ভাগ্যের উন্নতি এখন সময়ের দাবি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

দেশের বৃহত্তম ভাসমান সেতু নির্মিত হয়েছে

আপডেট টাইম : ০৩:৩২:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জানুয়ারী ২০১৮

হাওর বার্তা ডেস্কঃ যশোরের মণিরামপুর উপজেলার ঝাঁপা বাঁওড়ের ওপর নির্মিত হয়েছে দেশের বৃহত্তম ভাসমান সেতু। সম্পূর্ণ ব্যক্তি উদ্যোগে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সেতুটি বাঁওড়ের দু’পাড়ের পাঁচ লাখ মানুষকে যুক্ত করেছে সম্প্রীতির বাঁধনে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এতদিন পারাপারের জন্য নৌকাই ছিল যাদের একমাত্র মাধ্যম। ভাসমান এই সেতুটি তাদের সামনে খুলে দিয়েছে স্বপ্নের দ্বার।

স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের আনন্দের সীমা নেই। হাজারো কৃষক এই সেতুকে ঘিরে বুনতে শুরু করেছেন স্বপ্নের জাল। ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার আশায় কৃষকের আনন্দের সীমা নেই। ইচ্ছামতো এই ব্রিজ পার হয়ে তারা রাজগঞ্জ বাজারে আসতে পারবেন। বেচতে পারবেন তাদের উৎপাদিত ফসল। একইভাবে ব্যবসা বাণিজ্য সম্প্রসারণে এই ভাসমান সেতুটি ঝাঁপা বাঁওড়ের দু’পাড়ের লাখ লাখ মানুষের মাঝে এক নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে।

যশোর সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে রাজগঞ্জ বাজার। মণিরামপুর উপজেলার পশ্চিমাংশের এই বাজারটি একটি বৃহত্তম বাণিজ্য কেন্দ্র। এই বাজারের পশ্চিম পার্শ্বে অবস্থিত ঝাঁপা বাঁওড়। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বাঁওড়টি ঘিরে গড়ে উঠেছে ঝাঁপা ইউনিয়ন পরিষদ। প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের বসবাস এই ইউনিয়নে। এই ইউনিয়নের পূর্ব প্রান্তে ঝাঁপা বাঁওড়ের পাড় ঘিরে বসবাস করেন প্রায় ১ লাখ মানুষ।

এই বিশাল জনগোষ্ঠীর অধিকাংশের জীবন জীবিকা নির্ভর করে ঝাঁপা বাঁওড়ের ওপর। বিশেষ করে কয়েক হাজার জেলে পরিবারের জীবন জীবিকা আবর্তিত হয় ঝাঁপা বাঁওড়কে কেন্দ্র করে। আর বিশাল এই বাঁওড়ের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত রাজগঞ্জ সরকারি প্রাইমারি স্কুল, রাজগঞ্জ হাই স্কুল, রাজগঞ্জ দাখিল মাদরাসা থেকে শুরু করে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতকারী শিক্ষার্থীদের চলাচলের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে নৌকা।

বাঁওড়ের পশ্চিম প্রান্তের মানুষকে রাজগঞ্জসহ জেলা বা উপজেলা সদরে চলাচলের মাধ্যমও হচ্ছে নৌকা। বর্ষা বাদলার দিনে নিদারুণ কষ্ট ভোগ করতে হয় চলাচলকারীদের। বিভিন্ন সময় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা প্রতিশ্রুতি দিলেও স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও ঝাঁপা বাঁওড়ের ওপর একটি পুল বা সেতু নির্মিত হয়নি। শেষ পর্যন্ত লাখো মানুষের এই দুঃখ দূর করতে এগিয়ে এসেছেন এলাকার একদল উদ্যোমী যুবক।

তাদের নিজস্বভাবে সংগৃহীত প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে দীর্ঘ ছয় মাস পরিশ্রম করে তারা এই বিশাল ঝাঁপা বাঁওড়ের  ওপর নির্মাণ করেছেন একটি নান্দনিক ভাসমান সেতু। স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত প্লাস্টিকের ব্যারেল, লোহার বার, নাটবোল্ড, স্টিলের প্লেন শিট আর বাঁশ ব্যবহার করে প্রায় ১ হাজার মিটার দীর্ঘ একটি ভাসমান সেতু নির্মাণ করে এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দুঃখ দুর্দশা দূর করার উদ্যোগ নিয়েছেন।

আর এই সেতুটি এখন এই এলাকার মানুষের কাছে টক অব দ্যা ভিলেজ শুধু নয় গোটা এলাকায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। অন লাইন মিডিয়া আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে ভাসমান এই সেতুর খবর পৌঁছে গেছে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশ বিভূঁইয়ে।

ইতিমধ্যে এলাকার যুবকদের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাতে ঘটনাস্থলে গেছেন যশোরের জেলা প্রশাসক আশরাফ উদ্দিন। তিনি নিজে ঘুরে দেখেছেন সেতুর কাজকর্ম। পরে তিনি এলাকার জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সেতুটি উদ্বোধন করে জনচলাচলের জন্য উন্মুক্ত করেন। বর্তমানে গড়ে প্রতিদিন এই সেতুর ওপর দিয়ে পাঁচ গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ চলাচল করছে। এছাড়া নান্দনিক এই ভাসমান সেতুটি দেখতে দূরদূরান্ত থেকে আসছেন আরো কয়েক হাজার মানুষ।

গত মঙ্গলবার বিকালে বাঁওড়ের তীরে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান শামছুল হক মন্টুর সভাপতিত্বে ভাসমান সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহাম্মদ ওবায়দুর রহমান, ভুমি কমিশনার হুসাইন মোহাম্মদ আল মুজাহিদ, জেলা সহকারী তথ্য অফিসার জাহারুল ইসলাম, আওয়ামী লীগ নেতা কামরুল হাসান বারী, ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল হামিদ সরদার, আব্দুস সাত্তার ও আসাদুজ্জামান প্রমুখ। বক্তারা বলেন, মণিরামপুর উপজেলার অভিশপ্ত গ্রামের নাম ঝাঁপা।

এ গ্রাম থেকে একটুকু বাইরে পা রাখতেই হতে হয় নৌকা পারাপার। আর এই পারাপারের সময় নানাবিধ সমস্যা ও দুর্ভোগের শিকার হন স্কুলগামী ছাত্র-ছাত্রী, চিকিৎসা নিতে যাওয়া দুস্থ রোগী ও প্রসব যন্ত্রণায় কাতর মা, হাট বাজারে আসা যাওয়া সাধারণ জনগণসহ সবাই। এ ছাড়া বাঁওড়ে নৌকা ডুবির ঘটনায় জান-মালসহ আর্থিক ক্ষতি সাধন হয়ে আসছে হর হামেশা। এ সব সমস্যা ও দুর্ভোগ থেকে রক্ষা পেতে ও ক্ষতি সাধন থেকে মুক্তি পেতে মুক্তির পথ খুঁজতে থাকে ঝাঁপা গ্রাম উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের সদস্যরা।

তাই ফাউন্ডেশনের সভাপতি মেহেদী হাসান টুটুল ও ভাসমান এ সেতু নির্মাণের প্রধান উদ্যোক্তা মাস্টার আসাদুজ্জামান ২০১৭ সালের ১লা জানুয়ারি ফাউন্ডেশনের এক জরুরি সভার আহ্বান করেন। সেই সভায় স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে ঝাঁপা বাঁওড়ের ওপর একটি  ভাসমান সেতু তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। এরপর একে একে সাড়াও মেলে আশাতীত।

সংগঠনের ৬০ জন সদস্যের অর্থায়নে শুরু করা হয় ১ হাজার মিটার দৈর্ঘ্যের ভাসমান সেতু নির্মাণের কাজ। সংগঠনের বাইরেও অনেক কৃষক, শ্রমিক সামিল হন তাদের সঙ্গে। ৯ ফুট প্রস্থের সেতু নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে ৮৮৯টি বড় আকারের প্লাস্টিকের ব্যারেল। যা সংযুক্ত রাখার জন্য লোহার শিট ব্যবহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যারেলের ওপর দিয়ে চলাচলের জন্য দেয়া হয় ১ হাজার মিটার দৈর্ঘ্যের লোহার পাত।

প্রায় অর্ধ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে বৃহত্তর ভাসমান এ সেতুটি। তবে, বর্ষা  মৌসুমের আগেই ভাসমান সেতুটির দু’পাশে আরসিসি ব্রিজ নির্মাণ করা হবে এবং রাতের আঁধার ঠেকাতে সেতুর এ পাশ থেকে ও পাশ পর্যন্ত বৈদ্যুতিক ও জেনারেটরের আলো থাকবে বলে উদ্যোক্তা মাস্টার আসাদুজ্জামান জানান। এতে আরো প্রায় অর্ধ কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে তিনি দাবি করেন।

এদিকে ঝাঁপা গ্রাম উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের পরিকল্পনা ও সেতুর নকশা মাফিক ৫ই আগস্ট থেকে ভাসমান সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করেন রাজগঞ্জের রশিদ ওয়ার্কসপের ইঞ্জিনিয়ার রবিউল ইসলাম। দীর্ঘ প্রায় ছয় মাস অক্লান্ত পরিশ্রমের পর গতকাল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে সাধারণ মানুষ ও যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয় ভাসমান সেতুটি। গতকাল থেকে ভাসমান সেতু দিয়ে সরাসরি পার হয়ে মণিরামপুরের পশ্চিমাঞ্চলের লাখ লাখ জনগণ স্বল্প সময়ে উপজেলা সদরে যেতে পারছে। মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স, প্রাইভেটকারসহ ছোটখাট সব যানবাহন চলাচল করতে পারছে সেতু দিয়ে।

এদিকে বাঁওড়ে ভাসমান সেতু চালু হওয়াতে এ অঞ্চলের সচেতন মহল ধারণা করছে, শুধু ঝাঁপা গ্রামবাসীর স্বস্তি নয়, ফিরে আসছে সর্বত্রই স্বস্তি। গড়ে উঠেছে একটি নতুন অধ্যায়, নতুন জীবন। অপরদিকে ঝাঁপা গ্রামের অর্ধশতাধিক যুবকের নিজস্ব অর্থায়নে বাঁওড়ের ওপর বিশাল দৈর্ঘ্যের একটি লোহার তৈরি ভাসমান সেতু তৈরি করার সংবাদ শুনে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মানুষ সেতুটি দেখার জন্য রাজগঞ্জ বাজারের খেয়াঘাট সংলগ্ন স্থানে ও ঝাঁপার অনাথের ঘাটে জমায়েত হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে কাক ডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সেতু সংলগ্ন স্থানের দু’পাড়ে যেন চলছে মিলন মেলা।

সেতুটি উদ্বোধন করা ও লোকজন সেতুর ওপর দিয়ে চলাচল করতে পারায় সবার মনে যেন আনন্দের বন্যা বয়ে চলেছে। এদিকে বাঁওড়ের ওপর ভাসমান সেতু তৈরিতে ঝাঁপা গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক মমিনুর রহমান বলেন, শুধু ঝাঁপা গ্রামবাসীর দুঃখ নয় মণিরামপুরবাসীসহ সবাই নৌকা পারাপার থেকে মুক্তি পাওয়ায় স্বস্তি ফিরে পাবে। গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তিত্ব আলহাজ আব্দুস সাত্তার বলেন, পিতা-মাতা, দাদা-দাদির সেই চরম ভোগান্তি নৌকা পারাপার আর নয়, এখন সরাসরি ভাসমান সেতুর ওপর দিয়ে হেঁটে রাজগঞ্জে যেতে পারবো।

ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা সেবা, যে কোনো কাজে আর ভোগান্তি নয়, সব ক্ষেত্রে গ্রামবাসীসহ এলাকার জনগণ চরমভাবে উপকৃত হবে। রাজগঞ্জ বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও বাজার কমিটির সভাপতি চাকলাদার আবুল বাসার বলেন, নৌকা পারাপারের কারণে রাজগঞ্জ বাজারের সঙ্গে ঝাঁপা গ্রামবাসীর একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।

ওই গ্রামের অনেক ব্যবসায়ীকে এ বাজারে ব্যবসা করতে এসে নৌকা পারাপারের কারণে রাত ৯টার মধ্যে দোকান বন্ধ করে বাড়িতে চলে যেতে হতো। সেতু তৈরি হওয়ায় ওই ব্যবসায়ীদের আর সকাল সকাল দোকান বন্ধ করে চলে যেতে হবে না।

ফলে শুধু ঝাঁপা গ্রামবাসী নয়, নৌকা পারাপার হয়ে যে সব অঞ্চলের লোক বিভিন্ন হাট বাজারে যেতে তাদের আর সকাল সকাল বাড়িতে ফিরতে হবে না। ফলে ভাসমান সেতুটি ব্যবসা ক্ষেত্রে উন্নতির জন্য বিশাল ভূমিকা রাখবে। এ বিষয়ে চালুয়াহাটী চেয়ারম্যান আব্দুল হামিদ সরদার বলেন, এই ভাসমান সেতুর ফলে এক দীর্ঘ অভিশাপ থেকে মুক্তি মিলল এই অঞ্চলের লাখো মানুষের।

এই সেতু নির্মাণের ফলে ঝাঁপা বাঁওড়ের দু’পাড়ের লোকের মধ্যে বন্ধুত্ব ও যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে। ঝাঁপা ইউপি চেয়ারম্যান সামছুল হক মন্টু বলেন, সেতুটি চালু হওয়াতে মণিরামপুর সদরসহ সব বাজারের সঙ্গে এলাকার সাধারণ জনগণের সরাসরি যোযোগের সুবিধা হলো।

আমার ইউনিয়নের একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ ও ব্যবসা বাণিজ্যসহ সব ক্ষেত্রে উন্নতির প্রসার ঘটাতে ভাসমান সেতুটি মুখ্য ভূমিকা হিসেবে কাজ করবে বলে আমি মনে করছি। রাজগঞ্জ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের অফিসার ইনচার্জ আকরাম হোসেন বলেন, সেতু তৈরিতে অল্প সময়ের মধ্যে একে অপরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা গেলে আইনশৃঙ্খলার উন্নতি হবে। এলাকার মানুষের ভাগ্যের উন্নতি এখন সময়ের দাবি।