হাওর বার্তা ডেস্কঃ ২০ ডিসেম্বর বেলা ২টা। উখিয়া টিএনটি এলাকায় যানবাহন তল্লাশিকালে সেনাবাহিনী সদস্যরা আটক করেন এক রোহিঙ্গা কিশোরী ও কক্সবাজার শহরের একটি আবাসিক হোটেলের এক কর্মচারীকে। তল্লাশির একপর্যায়ে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী একজন অপরজনকে না চেনার ভান করেন। উভয়ে বাংলাদেশি পরিচয় দেন। কিন্তু সেনা সদস্যদের জেরার মুখে বেরিয়ে আসে প্রকৃত সত্য।
উক্ত হোটেল কর্মচারী কক্সবাজার শহরের বাহারছড়া এলাকার মো. আনোয়ার (৪০) ওই রোহিঙ্গা কিশোরীকে হোটেলে অনৈতিক কাজ করতে নিয়ে যাচ্ছিলেন। পরে তাদের উখিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. নিকারুজ্জামান চৌধুরীর ভ্রাম্যমাণ আদালতে হাজির করা হলে উক্ত রোহিঙ্গা কিশোরীকে অভিভাবকের জিম্মায় ও পাচারকারী হোটেল কর্মচারীকে ১৫ দিনের জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।
১৮ ডিসেম্বর দুপুর ১টার দিকে উখিয়ার একই এলাকায় সেনা তল্লাশি চৌকির সদস্যরা যাত্রীবাহী যানবাহন তল্লাশি চালিয়ে কুতুপালংয়ে পারভীন (১৩) নামের এক রোহিঙ্গা কিশোরীকে পাচারের জন্য নিয়ে যাওয়ার সময় আটক করেন। এ সময় পাচারকাজে জড়িত থাকার অভিযোগে সঙ্গীয় হাসিনা বেগমকে (৩৫) আটক করা হয়। হাসিনাকে পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দিয়ে জেলে প্রেরণ করা হয়। প্রশাসনের সূত্র মতে উক্ত পুরনো রোহিঙ্গা হাসিনা সংঘবদ্ধ নারী ও শিশু পাচারকারী চক্রের সদস্য। ইতিপূর্বে তিনি এ ধরনের বেশ কয়েক রোহিঙ্গা নারী-শিশু পাচারের সঙ্গে জড়িত।
১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় অটোরিকশাযোগে বালুখালী-১ রোহিঙ্গা শিবির থেকে পাচার করে নিয়ে যাওয়ার সময় উখিয়া সেনা তল্লাশি চৌকিতে সেনা সদস্যরা খালেদা বেগম (১৭) নামের এক রোহিঙ্গা কিশোরীকে উদ্ধার করেন। এ কিশোরীকে পাচার কাজে জড়িত থাকায় একই গাড়ি থেকে সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি এলাকার মুফতি রফিকুল ইসলাম (৩৫) ও খুলনা জেলার পাইকগাছার বেতবুনিয়া এলাকার মৌলানা মো. হারুনুর রশিদকে (৩৭) আটক করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে রোহিঙ্গা কিশোরীকে অভিভাবকের জিম্মায় এবং উক্ত দুই হুজুরকে সাত মাস করে কারাদণ্ড দিয়ে জেলে পাঠানো হয়েছে।
৩০ নভেম্বর জয়পুরহাটের পাঁচ বিবি সীমান্ত থেকে ভারতে পাচারকালে বিজিবি সদস্যরা আয়েশা খাতুনকে (৩০) আটক করেন। তিনি কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের আশ্রয়গ্রহণকারী সদ্য আসা রোহিঙ্গা। একই দিন ঢাকার ডেমরায় একটি বাসা থেকে সেতারা বেগম (১৫), জাহেদা বেগম (১৬), ও তার মেয়ে শফিকাকে (৬) পুলিশ আটক করে। তাদের মালয়েশিয়া পাচারের উদ্দেশ্যে উখিয়া বালুখালী ও জামতলী আশ্রয় শিবির থেকে পাচারকারীচক্র নিয়ে গিয়েছিল। এ সময় দুই দালালকে আটক করা হয়। উদ্ধার রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের উখিয়া আশ্রয় শিবিরে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
গত সপ্তাহে কক্সবাজার জনশক্তি ও অভিবাসন অফিস থেকে বাংলাদেশি পাসপোর্টসহ নতুন আসা দুই রোহিঙ্গা তরুণী সেতারা বেগম ও নাজিবা বেগমকে আটক করা হয়। তাদের পাসপোর্ট দুটি জব্দ করে বাতিল করা হয়। তারা যে শুধু বাংলাদেশি পাসপোর্ট তৈরি করেছিলেন তা নয় এর মধ্যে সৌদি আরবের ভিসাসহ সব কাগজপত্র প্রস্তুত করে ফেলেন। পরে তাদের উখিয়ার আশ্রয় শিবিরে প্রেরণ করা হয়।
এভাবে গত চার মাসে দেশের প্রায় সব এলাকা থেকে কয়েকশ’ নারী ও শিশু উদ্ধার করা হয়। আটক করা হয় কয়েক হাজার রোহিঙ্গা নারী-পুরুষকে। এত তল্লাশি চৌকি, কড়াকড়ির পরও প্রতিদিন নানা কৌশলে পাচারকারীদের সহায়তায় অসংখ্য রোহিঙ্গা নারী, শিশু ও পুরুষ পাচার হয়ে যাচ্ছে।
উখিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চিকিৎসক জানান, আগস্টের পর থেকে আগমন অব্যাহত থাকা লাখ লাখ রোহিঙ্গার কারণে ইতোমধ্যে উখিয়া-টেকনাফ, কক্সবাজার তো বটেই পুরো দেশের মানুষ কঠিন স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। কারণ রোহিঙ্গাদের মাঝে এইচআইভি/এইডস, ডিপথেরিয়া, হাম, যক্ষ্মা, গনোরিয়া, সিফিলিসসহ নানা রকম চর্মরোগের প্রকোপ বিরাজমান। এগুলোসহ আরো কিছু রোগ রয়েছে যেগুলো সংক্রামক ও ছোঁয়াচে। তাছাড়া কক্সবাজার পর্যটন এলাকা হিসেবে দেশি/বিদেশি প্রচুর লোকজনের সমাগম ঘটে থাকে।
যেভাবে নিম্ন, মাঝারিসহ প্রায় সব ধরনের হোটেল মোটেল, গেস্ট হাউসে রোহিঙ্গা নারীদের অবাধ যৌনাচার চলছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে তা খুবই উদ্বেগজনক। কারণ এসব ছোঁয়াচে রোগ ব্যাধির পাশাপাশি রোহিঙ্গা নারীদের মাঝে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মরণ ব্যাধি এইডস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। অশনাক্ত কি পরিমানের রোগী রয়েছে তা বলা কঠিন। তাই যে কোনো মূল্যে রোহিঙ্গাদের নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে যাতায়াত, অবস্থান আরো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আনা সম্ভব না হলে সারাদেশের মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি ক্রমাম্বয়ে অবনতির দিকে ধাবিত হবে বলে তারা জানান।
উখিয়া উপজেলা মাসিক আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় কমিটির সভায় গত বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সভার সভাপতি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. নিকারুজ্জামান চৌধুরী জানান, প্রতিদিন বিভিন্ন তল্লাশি চৌকিতে অনেক রোহিঙ্গাকে আটক করে ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। সংঘবদ্ধ চক্র নানা কৌশলে রোহিঙ্গাদের পাচার করে যাচ্ছে। অনেক রোহিঙ্গা নানাভাবে চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্র দেখিয়ে, জাল পরিচয়পত্র ও অন্যান্য ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে পাচার হচ্ছে।
সভায় উপস্থিত সদস্যরা জানান, অনেক এনজিও কর্মীও রোহিঙ্গা পাচারের সঙ্গে জড়িত। তাছাড়া রোহিঙ্গারা নির্দিষ্ট কোনো ঘেরের মধ্যে না থাকায় পাহাড়, জঙ্গল বেয়ে পায়ে হেঁটে ভিন্ন কৌশলে ইচ্ছাকৃতভাবে পাচারের শিকার হচ্ছে।
কিছু কিছু এনজিও, আইএনজিওর বিলাসবহুল গাড়িতে কালো গ্লাসে ঢাকা থাকায় ও সংঘবদ্ধ পাচারকারীদের নানা কৌশল, রোহিঙ্গা সর্দার বা মাঝিদের মধ্যস্থতায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাচার অব্যাহত থাকায় সভায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এনজিওগুলোর গাড়িতে কালো গ্লাস ব্যবহারে বিধি নিষেধ আরোপসহ তল্লাশির আওতায় আনা ও রোহিঙ্গা মাঝিদের মধ্যে ঘন ঘন রদবদলের সুপারিশ করা হয়।
Reporter Name 
























