ঢাকা ০২:৫৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হেমন্তের আগমনে গ্রামজুড়ে ধান কাটার নগরে নবান্ন উৎসব

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:১১:৫৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৭
  • ৩০৭ বার

হাওর বার্তা ডেস্কঃ হেমন্তের আগমনে গ্রামজুড়ে ধান কাটার ধুম পড়েছে। প্রকৃতিতে বইছে শীতের বার্তা। ঢেঁকিতে চলছে গ্রাম্য বধূর ধান ভানা। সেই ধানের প্রথম অন্ন দিয়েই তো নবান্ন। সঙ্গে পিঠা-পুলির মৌ-মৌ গন্ধে পুরো গ্রাম যেন সুখের আধার। কিন্তু কংক্রিটময় নগরজীবনে নবান্নের সেই উৎসবমুখরতা কই ? তাই তো আবহমান বাংলার কৃষিজ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ নবান্ন উৎসবকে নগরবাসীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় জাতীয় নবান্নোৎসব উদযাপন পর্ষদ আয়োজন করে ১৯তম নবান্ন উৎসব। ‘এসো মিলি সবে নবান্নের উৎসবে’ স্লোগানে বুধবার দিনব্যাপী উদযাপিত হয় এ বর্ণিল উৎসব।
ভোর ৭টায় গাজী আবদুল হাকিমের বাঁশিতে লোকজ গানের সুরের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এবারের উৎসব। উৎসবের উদ্বোধন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মোঃ আখতারুজ্জামান বলেন, এ নবান্ন উৎসব একটি উদার, সার্বজনীন ও অসাম্প্রদায়িক উৎসব। গ্রামীণ সম্প্রদায়ের এ উৎসব গণমানুষের উৎসব, খেটে খাওয়া মানুষের উৎসব।
তিনি বলেন, আশ্বিন মাসকে আমাদের এলাকায় বলা হতো দারুণ আশ্বিন। এ মাসে অভাব-অনটন লেগেই থাকত। গুটিকয়েক ধনাঢ্য পরিবার ছাড়া আর কারও ঘরে ধানই থাকত না। পরে আসত অগ্রহায়ণ। সবার ঘরে সোনালি আমন ধান। পরিশেষে তিনি বলেন, গণমুখী, মানবতাবাদী মানুষ হতে গেলে ও একটি উদার-নৈতিক সমাজ গড়তে হলে প্রতিটি মানুষের নবান্ন উৎসবে শামিল হওয়া প্রয়োজন।
উদ্বোধনের পর আয়োজন করা হয় ‘নবান্ন কথন’ আলোচনা পর্ব। এতে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, হাজার বছরের চিরায়ত এ উৎসবটি নগরায়নের প্রভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে। নাগরিক তরুণরা আমাদের এ সার্বজনীন উৎসবের সঙ্গে পরিচিত নয়। তাদের শেকড়ে ফেরাতে হলে আমাদের এ গ্রামীণ উপাদানগুলো নগরে আরও বেশি করে তুলে ধরতে হবে।
এ উৎসবকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির আহ্বান জানিয়ে দিনটিকে সরকারি ছুটি ঘোষণার দাবি জানান নবান্ন উৎসবের আহ্বায়ক শাহরিয়ার সালাম। তিনি বলেন, বাংলা তারিখকে কেন্দ্র করে এ উৎসব রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উদযাপন করা গেলে কৃষি ও কৃষকের পাশাপাশি বাংলার অর্থনীতি আরও উপকৃত হবে।
জাতীয় নবান্নোৎসব উদযাপন পর্ষদের সভাপতি লায়লা হাসান বলেন, শেকড়ের উৎসবে আমরা লোকজ সংস্কৃতি উপস্থাপনের পাশাপাশি এ অস্থির সময়ে বাঙালিকে আমরা সম্প্রীতির বন্ধনে বাঁধতে চাই।
আলোচনা পর্ব শেষে শুরু হয় উৎসবের সাংস্কৃতিক পর্ব। সাংস্কৃতিক পর্বে লোকগানের সঙ্গে নৃত্যের পাশাপাশি অগ্রহায়ণে বাংলার প্রধান ফসল ধান কাটা নিয়ে ছিল বিভিন্ন গান। পটগান, ধামাইয়া গানসহ বিভিন্ন ধরনের লোকগানের সঙ্গে শিল্পীরা গেয়ে শোনান দেশের গান ও লালনগীতি আর রবীন্দ্র সংগীত। শেষে গারোদের নবান্ন উৎসব ‘ওয়ানগালা’র ঐতিহ্য পরিবেশন করে আচিকের শিল্পীরা।
পরে চারুকলা অনুষদ থেকে বিভিন্ন লোকজ অনুষঙ্গ নিয়ে শোভাযাত্রা বের করে নবান্নোৎসব উদযাপন পর্ষদ। শোভাযাত্রা টিএসসি মোড় ঘুরে আবার চারুকলায় এসে শেষ হয়। শোভাযাত্রা শেষে চারুকলার বকুলতলায় চিত্রশিল্পীদের অংশগ্রহণের শুরু হয় নবান্নের আর্ট ক্যাম্প। এতে অংশ নেন অধ্যাপক সমরজিৎ রায় চৌধুরী, আবদুস শাকুর শাহ, আবুল মান্নান, রেজাউন নবী, কামাল পাশা চৌধুরী, জাহিদ মোস্তফা, অশোক কর্মকার, নাসিমা তুহিনী, হিরন্ময় দাশ, রাশেদুল হুদাসহ ২২ জন চিত্রশিল্পী।
এদিকে, চারুকলায় সকালের পর্ব শেষে বিকালেও ছিল নবান্নোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। তাছাড়া জাতীয় নবান্নোৎসব উদযাপন পর্ষদের উদ্যোগে ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরেও ছিল নবান্নোৎসবের আয়োজন। নানা আয়োজনে রবীন্দ্র সরোবরের মুক্তমঞ্চে দিনব্যাপী ছিল নবান্ন উৎসব।
শিল্পকলায় নবান্নোৎসব : নবান্ন উৎসব উপলক্ষে বিকালে রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির নন্দনমঞ্চে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে শিল্পকলা একাডেমি। অনুষ্ঠানে সমবেত নৃত্য পর্বে দীপা খন্দকার, অনিক বোস, ফারহানা চৌধুরী বেবী ও এমআর ওয়াসেকের পরিচালনায় সমবেত নৃত্য পরিবেশন করে শিল্পকলা একাডেমির নৃত্য দল। একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন শিল্পী খায়রুল আনাম শাকিল, ফকির শাহাবুদ্দীন, অনিমা মুক্তি গোমেজ, অনুপমা মুক্তি এবং সমীর বাউল।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

হেমন্তের আগমনে গ্রামজুড়ে ধান কাটার নগরে নবান্ন উৎসব

আপডেট টাইম : ১১:১১:৫৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৭

হাওর বার্তা ডেস্কঃ হেমন্তের আগমনে গ্রামজুড়ে ধান কাটার ধুম পড়েছে। প্রকৃতিতে বইছে শীতের বার্তা। ঢেঁকিতে চলছে গ্রাম্য বধূর ধান ভানা। সেই ধানের প্রথম অন্ন দিয়েই তো নবান্ন। সঙ্গে পিঠা-পুলির মৌ-মৌ গন্ধে পুরো গ্রাম যেন সুখের আধার। কিন্তু কংক্রিটময় নগরজীবনে নবান্নের সেই উৎসবমুখরতা কই ? তাই তো আবহমান বাংলার কৃষিজ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ নবান্ন উৎসবকে নগরবাসীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় জাতীয় নবান্নোৎসব উদযাপন পর্ষদ আয়োজন করে ১৯তম নবান্ন উৎসব। ‘এসো মিলি সবে নবান্নের উৎসবে’ স্লোগানে বুধবার দিনব্যাপী উদযাপিত হয় এ বর্ণিল উৎসব।
ভোর ৭টায় গাজী আবদুল হাকিমের বাঁশিতে লোকজ গানের সুরের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এবারের উৎসব। উৎসবের উদ্বোধন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মোঃ আখতারুজ্জামান বলেন, এ নবান্ন উৎসব একটি উদার, সার্বজনীন ও অসাম্প্রদায়িক উৎসব। গ্রামীণ সম্প্রদায়ের এ উৎসব গণমানুষের উৎসব, খেটে খাওয়া মানুষের উৎসব।
তিনি বলেন, আশ্বিন মাসকে আমাদের এলাকায় বলা হতো দারুণ আশ্বিন। এ মাসে অভাব-অনটন লেগেই থাকত। গুটিকয়েক ধনাঢ্য পরিবার ছাড়া আর কারও ঘরে ধানই থাকত না। পরে আসত অগ্রহায়ণ। সবার ঘরে সোনালি আমন ধান। পরিশেষে তিনি বলেন, গণমুখী, মানবতাবাদী মানুষ হতে গেলে ও একটি উদার-নৈতিক সমাজ গড়তে হলে প্রতিটি মানুষের নবান্ন উৎসবে শামিল হওয়া প্রয়োজন।
উদ্বোধনের পর আয়োজন করা হয় ‘নবান্ন কথন’ আলোচনা পর্ব। এতে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, হাজার বছরের চিরায়ত এ উৎসবটি নগরায়নের প্রভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে। নাগরিক তরুণরা আমাদের এ সার্বজনীন উৎসবের সঙ্গে পরিচিত নয়। তাদের শেকড়ে ফেরাতে হলে আমাদের এ গ্রামীণ উপাদানগুলো নগরে আরও বেশি করে তুলে ধরতে হবে।
এ উৎসবকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির আহ্বান জানিয়ে দিনটিকে সরকারি ছুটি ঘোষণার দাবি জানান নবান্ন উৎসবের আহ্বায়ক শাহরিয়ার সালাম। তিনি বলেন, বাংলা তারিখকে কেন্দ্র করে এ উৎসব রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উদযাপন করা গেলে কৃষি ও কৃষকের পাশাপাশি বাংলার অর্থনীতি আরও উপকৃত হবে।
জাতীয় নবান্নোৎসব উদযাপন পর্ষদের সভাপতি লায়লা হাসান বলেন, শেকড়ের উৎসবে আমরা লোকজ সংস্কৃতি উপস্থাপনের পাশাপাশি এ অস্থির সময়ে বাঙালিকে আমরা সম্প্রীতির বন্ধনে বাঁধতে চাই।
আলোচনা পর্ব শেষে শুরু হয় উৎসবের সাংস্কৃতিক পর্ব। সাংস্কৃতিক পর্বে লোকগানের সঙ্গে নৃত্যের পাশাপাশি অগ্রহায়ণে বাংলার প্রধান ফসল ধান কাটা নিয়ে ছিল বিভিন্ন গান। পটগান, ধামাইয়া গানসহ বিভিন্ন ধরনের লোকগানের সঙ্গে শিল্পীরা গেয়ে শোনান দেশের গান ও লালনগীতি আর রবীন্দ্র সংগীত। শেষে গারোদের নবান্ন উৎসব ‘ওয়ানগালা’র ঐতিহ্য পরিবেশন করে আচিকের শিল্পীরা।
পরে চারুকলা অনুষদ থেকে বিভিন্ন লোকজ অনুষঙ্গ নিয়ে শোভাযাত্রা বের করে নবান্নোৎসব উদযাপন পর্ষদ। শোভাযাত্রা টিএসসি মোড় ঘুরে আবার চারুকলায় এসে শেষ হয়। শোভাযাত্রা শেষে চারুকলার বকুলতলায় চিত্রশিল্পীদের অংশগ্রহণের শুরু হয় নবান্নের আর্ট ক্যাম্প। এতে অংশ নেন অধ্যাপক সমরজিৎ রায় চৌধুরী, আবদুস শাকুর শাহ, আবুল মান্নান, রেজাউন নবী, কামাল পাশা চৌধুরী, জাহিদ মোস্তফা, অশোক কর্মকার, নাসিমা তুহিনী, হিরন্ময় দাশ, রাশেদুল হুদাসহ ২২ জন চিত্রশিল্পী।
এদিকে, চারুকলায় সকালের পর্ব শেষে বিকালেও ছিল নবান্নোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। তাছাড়া জাতীয় নবান্নোৎসব উদযাপন পর্ষদের উদ্যোগে ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরেও ছিল নবান্নোৎসবের আয়োজন। নানা আয়োজনে রবীন্দ্র সরোবরের মুক্তমঞ্চে দিনব্যাপী ছিল নবান্ন উৎসব।
শিল্পকলায় নবান্নোৎসব : নবান্ন উৎসব উপলক্ষে বিকালে রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির নন্দনমঞ্চে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে শিল্পকলা একাডেমি। অনুষ্ঠানে সমবেত নৃত্য পর্বে দীপা খন্দকার, অনিক বোস, ফারহানা চৌধুরী বেবী ও এমআর ওয়াসেকের পরিচালনায় সমবেত নৃত্য পরিবেশন করে শিল্পকলা একাডেমির নৃত্য দল। একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন শিল্পী খায়রুল আনাম শাকিল, ফকির শাহাবুদ্দীন, অনিমা মুক্তি গোমেজ, অনুপমা মুক্তি এবং সমীর বাউল।