,

প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাবলম্বী হচ্ছেন হাজারো কৃষক

খাদ্যে স্বয়ংস্পূর্ণতা নিশ্চিত করতে কৃষক মাঠ স্কুল থেকে বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে কৃষি প্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাবলম্বী হচ্ছেন রাজশাহী জেলার হাজারো কৃষক।

প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা ফসলের উৎপাদন বাড়াচ্ছেন, কোন ফসলে কোন প্রাকৃতিক বালাইনাশক প্রয়োগ করা যায়, ঘর-গৃহস্থালি কীভাবে বিজ্ঞানসম্মতভাবে পরিচালনা করা যায় তা শিখছেন বাস্তবসম্মতভাবে। প্রধানত কৃষকদের কৃষি উপকরণ ও প্রযুক্তি সম্পর্কে হাতে কলমে শেখানোর এক বাস্তবভিত্তিক স্কুলের নাম ‘কৃষক মাঠ স্কুৃল’। আর এ কাজে সহযোগিতা করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষিবিদরা।

কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, একজন উপজেলা কৃষিবিদের অধীনে হাজারো কৃষক রয়েছেন। তাদের একজনের পক্ষে এতো সংখ্যক কৃষককে কৃষি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া সম্ভব না।

বিশেষ করে নিত্য নতুন কৃষিবীজ ও প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া বেশ কঠিন। কিন্তু কৃষক মাঠ স্কুলের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নিয়ে খুব সহজে কৃষি উপকরণ ও প্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা সম্ভব।

এ ছাড়া কৃষক মাঠ স্কুল থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কৃষকরা কৃষক ক্লাব গঠন করতে পারবেন। কৃষক ক্লাবে কৃষি উপকরণ ক্রয় করতে সহযোগিতা করবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। কৃষক ক্লাবের অন্তর্ভুক্ত সদস্যদের নিয়ে বছরে একবার কৃষক মাঠ দিবস অনুষ্ঠিত হবে।

এসব সুবিধার কথা বিবেচনা করে বিদেশি কোম্পানি ড্যানি ডের অর্থায়নে কৃষক মাঠ স্কুল চালু করা হয়েছে। রাজশাহীতে এ ধরনের স্কুল প্রথম চালু করা হয় ৯০ এর দশকে। এ মাঠ স্কুলে প্রথমে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হত। পরে একে বর্ধিত করে নাম দেওয়া হয় সমন্বিত শস্য ব্যবস্থাপনা (আইসিএম)।

এখন এ প্রকল্পের নাম ‘সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনা কম্পোনেন্ট’ (আইএফএমসি)। আইপিএম প্রকল্পের অধীনে প্রথমে শুধু বালাই ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হত। কোন ফসলে কোন ধরনের পোকামাকড় আক্রমণ করলে তা কীভাবে প্রাকৃতিক উপায়ে নির্মূল করা যায় সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হত।

পরে যুগের প্রয়োজনে কৃষিপণ্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আইসিএম বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়। আইসিএম প্রশিক্ষণে একটা শস্য রোপণ করার পর থেকে শস্য কেটে ঘরে উঠানো পর্যন্ত যা যা করা লাগবে সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় আইসিএম প্রকল্পে।

আর আইএফএমসি প্রকল্পে সবধরনের ফসল থেকে শুরু করে ঘর গৃহস্থালি খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। আইএফএমসি প্রশিক্ষণের মেয়াদ ১ বছর।

বর্তমানে রাজশাহীতে আইএফএমসি মাঠস্কুল রয়েছে ৫৪টি। এর মধ্যে দুর্গাপুরে ১০টি, পবা, তানোর, গোদাগাড়ী, পুঠিয়া, বাঘা, চারঘাট ও বাগমারায় ছয়টি করে এবং মোহনপুরে দুটি মাঠ স্কুল রয়েছে।

প্রতিটি স্কুলে পাঠ নিচ্ছেন ৫০ জন কৃষক। এ স্কুলে একই পরিবার থেকে একজন পুরুষ ও একজন নারী সদস্য হতে পারবেন। বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রীদেরই প্রাধান্য দেওয়া হয়ে থাকে। যাতে নারী ও পুরুষ উভয়ে প্রশিক্ষিত হয়ে ঘরে বাইরে যাবতীয় কৃষি কর্মকাণ্ডে লাভবান হতে পারেন।

কৃষক মাঠ স্কুল থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ঝালুকা ইউনিয়নের গৌড়ীহার গ্রামের জাহিদুল ইসলাম বলেন, কৃষক মাঠ স্কুল থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেক উপকৃত হয়েছি। আগে জমিতে সনাতন পদ্ধিতে চাষাবাদ করতাম। প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর থেকে জমিতে আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি প্রয়োগ করছি। এতে তিনি বেশ লাভবান হচ্ছেন বলেন জানান।

নারী কৃষক হামেদা বেগম জানান, এরই মধ্যে তিনি আধুনিক পদ্ধতিতে হাস-মুরগি, গাভী ও ছাগল পালন শুরু করেছেন। এতে তার আয় বেড়েছে। পরিবারের জন্য আর্থিকভাবে উপার্জন করতে পারছি বলে নিজেকে স্বাবলম্বী বলে মনে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হযরত আলী বলেন, প্রতিটি স্কুলে একজন কৃষিবিদের মাধ্যমে কৃষি সম্পকে অর্থাৎ কৃষি বীজ থেকে শুরু করে কৃষি উপকরণ সম্পর্কে কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।

এ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কৃষকরা কৃষি সম্পর্কে হাতেকলমে জ্ঞান অর্জন করেন। এ ছাড়া এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে কৃষকরা কৃষক ক্লাব গঠন করতে পারেন, যাতে আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

কৃষক ক্লাবের মাধ্যমে কৃষকরা সংগঠিত হবার সুযোগ পাবেন। অন্য সব শ্রমজীবীদের শ্রমিক সংগঠন আছে, ট্রেড ইউনিয়ন আছে কিন্তু কৃষকদের সে সংগঠন নেই। ক্লাবের মাধ্যমে কৃষকরা তাদের অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করতে পারবেন।

এ ছাড়া আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে কৃষি উপকরণ ক্রয় করে তারা তাদের চাহিদা মেটাতে পারবে বলে জানান তিনি।

 

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর