ঢাকা ০৭:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জলাবদ্ধতার কারণে দূষিত হচ্ছে ওয়াসার পানি

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৫:৩৫:৪৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ জুলাই ২০১৭
  • ৪৫৮ বার

হাওর বার্তা ডেস্কঃ  ঢাকায় বৃষ্টি নামলেই এখন অনিবার্যভাবে জলাবদ্ধতা৷ আর এই জলাবদ্ধতার কারণে বাড়ির ভূগর্ভস্থ পানির ট্যাংকিতে ঢুকে পড়ছে দূষিত এবং ময়লা পানি, যা নগরবাসীর স্বাস্থ্যে আরেক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে৷

বনশ্রী এলাকায় সপরিবারে বসবাস করেন নাহিদা আক্তার৷ ওয়াসার পানিই তাঁর একমাত্র ভরসা৷ খাবার পনি তো বটেই, রান্না-বান্না থেকে বাসন-কোসন ধোয়া সবই হয় ওয়াসার পানি দিয়ে৷ কিন্তু বর্ষা শুরু হওয়ার পর থেকে তিনি পানি নিয়ে সংকটে আছেন৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি জানান, ‘‘বৃষ্টিতে পানি জমলেই ওয়াসার পানিতে ময়লা আসে৷ আসে বিভিন্নরকম পোকাও৷ পানি আর খাবার উপযুক্ত থাকে না৷ এমনকি পানি থেকে উৎকট গন্ধও আসে ।  তাঁর কথায়, ‘‘জলাবদ্ধতার কারণে বাসার নীচতলা পানিতে ডুবে যায়৷ এ কারণে ভূগর্ভস্থ পানির ট্যাংকিও যায় ডুবে৷ আমার মনে হয়, তখনই পানিতে আবর্জনা ঢুকে পড়ে৷”

একই অভিজ্ঞতা মিরপুরের জেসমিন লিপির৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘যখন জলাবদ্ধতা হয় তখন ওয়াসার পানির রং হয়ে যায় কালো৷ পানির মধ্যে নানা ধরনের ময়লা দেখা যায়৷ দেখা যায় অনেক ধরনের পোকা৷ এছাড়া দুর্গন্ধ তো আছেই৷”

তিনিও জানান, ‘‘বৃষ্টিতে পানি জমলে বাসার ভূগর্ভস্থ পানির ট্যাংকিও ডুবে যায়৷ তখন ময়লা পানিতে ট্যাংকি ভরে যায়৷” তিনি বলেন, ‘‘আমরা খাবার পানি তখন বাইরে থেকে কিনে খাই৷ কিন্তু রান্না-বান্না, ধোয়া-মোছাসহ গৃহস্থালীর কাজের জন্য এত পানি তো আর বাইরে থেকে চড়া দামে কেনা যায় না৷ তাই বাধ্য হয়েই ময়লা পানি ছেকে ফুটিয়ে ব্যবহার করি ৷

ঢাকার প্রায় সব একারই একই চিত্র, বিশেষ করে যেসব এলকার বাড়িতে জলবদ্ধতায় পানি ঢোকে এবং ভূগর্ভস্থ পানির ট্যাংকি রাস্তার লেভেলের চেয়ে নীচুতে ৷

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকার মিরপুর রামপুরা, বনশ্রী মগবাজার, যাত্রাবাড়ী, ওয়ারী, গোলাপবাগ, গোপীবাগ, গেন্ডারিয়া মানিকনগর, মতিঝিল ফকিরাপুল, শাজাহানপুর, মতিঝিল সোনালী ব্যাংক স্টাফ কোয়াটার, বাংলাদেশ ব্যাংক স্টাফ কোয়াটার, গোড়ান, সবুজবাগ, মুগদা, বাসাবো কমলাপুরসহ পশ্চিম কারওয়ান বাজারের গার্ডেন রোড, পুরান ঢাকার শশী মোহন বসাক লেন, বনগ্রাম, মৈশুন্ডি, সুত্রাপুর, ধোলাইখাল, অভয়দাস লেন, স্বামীবাগ প্রভৃতি এলাকায় ওয়াসার পানিতে দুর্গন্ধ ও ময়লা পাওয়া যাচ্ছে৷

স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ মোবাশ্বির হোসেন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এখন ওয়াসার পাইপগুলো আধুনিক এবং কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত৷ পাইপের মধ্য দিয়ে উচ্চচাপে পানি যায়৷ ফলে বাইরে থেকে লিক করে পানি ঢোকার সম্ভাবনা খুবই কম৷ কোথাও পনির চাপ কম হলে তা কম্পিউটারে ডিটেকটেড হয়৷ আমার মনে হয় পানির ভূগর্ভস্থ রিজার্ভার পানিতে ডুবে ময়লা পানি প্রবেশ করে৷

ঢাকার শহরের বিশেষ করে পুরনো ঢাকার বাড়ি-ঘরের পানির রিজার্ভার জলাবদ্ধতা হলেই পানির নীচে চলে যায়৷ এর ফলে ময়লা পানি ঢোকে৷ ঢাকার সড়কগুলো অবৈজ্ঞানিকভাবে সংস্কার করায় রাস্তা উঁচু হয়ে গেছে বাড়ি-ঘরের তুলনায়৷ ফলে বৃষ্টি নামলেই পানিবাড়িতে ঢুকে যায় ৷

ওয়াসা শতকরা ১৩ ভাগ পানি নদী থেকে সংগ্রহ করে, বাকিটা ভূগর্ভস্থ পানি৷ বিশ্লেষকরা বলছেন, বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা থেকে যে প্রক্রিয়ায় পানি সংগ্রহ করা হয় তাতে পানি বিশুদ্ধ হয় না৷ এছাড়া পানি বিশুদ্ধ করতে অনেক সময় ওয়াসা অতিমাত্রায় কেমিক্যাল ব্যবহার করে, যার কারণে পানি দুর্গন্ধ হয়৷

ঢাকার দেড় কোটি মানুষের জন্য প্রতিদিন ২৩০ কোটি লিটার পানির চাহিদা রয়েছে৷ ওদিকে ওয়াসার উৎপাদন ক্ষমতা ২১০ কোটি লিটারের মতো৷ রাজধানীর বাসিন্দারা প্রধানত ওয়াসার পানির ওপরই নির্ভরশীল৷ কিন্তু যে পানি তারা পান, তাও সব সময় ব্যবহার উপযোগী থাকে না৷

ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী কামরুল হাসান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে ওয়াসা ডিস্ট্রিক্ট মিটার্ড এরিয়া(ডিএমএ) প্রজেক্ট চালু করেছে৷ তবে এই প্রজেক্টের আওয়তায় সব গ্রাহককে এখনো আনা যায়নি৷ যেসব এলাকা ডিএমএ-র আওতায় এসেছে, সেসব এলকায় পানির মিটারগুলো ওয়াটার টাইট৷ পানিতে ডুবে গেলেও সাধারণভাবে পাইপে বাইরের পানি ঢোকার কথা না৷ তবে পানির রিজার্ভারে সমস্যা থাকলে আলাদা কথা ৷

তিনি আরো বলেন, ‘‘কোনো এলাকার পাইপে লিকেজ থাকলেও আলাদা কথা৷ কিন্তু আমাদের পাইপ ওয়াটার টাইট, লিকেজ থাকলে আমরা তা জানতে পারি৷”

মোবাশ্বির হোসেনের কথায়, ‘‘এই ময়লা পানি পান করে ডায়ারিয়া, আমাশয়সহ নানা ধরনের রোগ হতে পারে৷ হয় নানা ধরনের চর্মরোগও৷ তাই বিকল্প হিসেবে আমাদের রেইন ওয়াটার হারভেস্টে যাওয়া উচিত ৷ ডিডব্লিউ

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

জলাবদ্ধতার কারণে দূষিত হচ্ছে ওয়াসার পানি

আপডেট টাইম : ০৫:৩৫:৪৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ জুলাই ২০১৭

হাওর বার্তা ডেস্কঃ  ঢাকায় বৃষ্টি নামলেই এখন অনিবার্যভাবে জলাবদ্ধতা৷ আর এই জলাবদ্ধতার কারণে বাড়ির ভূগর্ভস্থ পানির ট্যাংকিতে ঢুকে পড়ছে দূষিত এবং ময়লা পানি, যা নগরবাসীর স্বাস্থ্যে আরেক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে৷

বনশ্রী এলাকায় সপরিবারে বসবাস করেন নাহিদা আক্তার৷ ওয়াসার পানিই তাঁর একমাত্র ভরসা৷ খাবার পনি তো বটেই, রান্না-বান্না থেকে বাসন-কোসন ধোয়া সবই হয় ওয়াসার পানি দিয়ে৷ কিন্তু বর্ষা শুরু হওয়ার পর থেকে তিনি পানি নিয়ে সংকটে আছেন৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি জানান, ‘‘বৃষ্টিতে পানি জমলেই ওয়াসার পানিতে ময়লা আসে৷ আসে বিভিন্নরকম পোকাও৷ পানি আর খাবার উপযুক্ত থাকে না৷ এমনকি পানি থেকে উৎকট গন্ধও আসে ।  তাঁর কথায়, ‘‘জলাবদ্ধতার কারণে বাসার নীচতলা পানিতে ডুবে যায়৷ এ কারণে ভূগর্ভস্থ পানির ট্যাংকিও যায় ডুবে৷ আমার মনে হয়, তখনই পানিতে আবর্জনা ঢুকে পড়ে৷”

একই অভিজ্ঞতা মিরপুরের জেসমিন লিপির৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘যখন জলাবদ্ধতা হয় তখন ওয়াসার পানির রং হয়ে যায় কালো৷ পানির মধ্যে নানা ধরনের ময়লা দেখা যায়৷ দেখা যায় অনেক ধরনের পোকা৷ এছাড়া দুর্গন্ধ তো আছেই৷”

তিনিও জানান, ‘‘বৃষ্টিতে পানি জমলে বাসার ভূগর্ভস্থ পানির ট্যাংকিও ডুবে যায়৷ তখন ময়লা পানিতে ট্যাংকি ভরে যায়৷” তিনি বলেন, ‘‘আমরা খাবার পানি তখন বাইরে থেকে কিনে খাই৷ কিন্তু রান্না-বান্না, ধোয়া-মোছাসহ গৃহস্থালীর কাজের জন্য এত পানি তো আর বাইরে থেকে চড়া দামে কেনা যায় না৷ তাই বাধ্য হয়েই ময়লা পানি ছেকে ফুটিয়ে ব্যবহার করি ৷

ঢাকার প্রায় সব একারই একই চিত্র, বিশেষ করে যেসব এলকার বাড়িতে জলবদ্ধতায় পানি ঢোকে এবং ভূগর্ভস্থ পানির ট্যাংকি রাস্তার লেভেলের চেয়ে নীচুতে ৷

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকার মিরপুর রামপুরা, বনশ্রী মগবাজার, যাত্রাবাড়ী, ওয়ারী, গোলাপবাগ, গোপীবাগ, গেন্ডারিয়া মানিকনগর, মতিঝিল ফকিরাপুল, শাজাহানপুর, মতিঝিল সোনালী ব্যাংক স্টাফ কোয়াটার, বাংলাদেশ ব্যাংক স্টাফ কোয়াটার, গোড়ান, সবুজবাগ, মুগদা, বাসাবো কমলাপুরসহ পশ্চিম কারওয়ান বাজারের গার্ডেন রোড, পুরান ঢাকার শশী মোহন বসাক লেন, বনগ্রাম, মৈশুন্ডি, সুত্রাপুর, ধোলাইখাল, অভয়দাস লেন, স্বামীবাগ প্রভৃতি এলাকায় ওয়াসার পানিতে দুর্গন্ধ ও ময়লা পাওয়া যাচ্ছে৷

স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ মোবাশ্বির হোসেন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এখন ওয়াসার পাইপগুলো আধুনিক এবং কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত৷ পাইপের মধ্য দিয়ে উচ্চচাপে পানি যায়৷ ফলে বাইরে থেকে লিক করে পানি ঢোকার সম্ভাবনা খুবই কম৷ কোথাও পনির চাপ কম হলে তা কম্পিউটারে ডিটেকটেড হয়৷ আমার মনে হয় পানির ভূগর্ভস্থ রিজার্ভার পানিতে ডুবে ময়লা পানি প্রবেশ করে৷

ঢাকার শহরের বিশেষ করে পুরনো ঢাকার বাড়ি-ঘরের পানির রিজার্ভার জলাবদ্ধতা হলেই পানির নীচে চলে যায়৷ এর ফলে ময়লা পানি ঢোকে৷ ঢাকার সড়কগুলো অবৈজ্ঞানিকভাবে সংস্কার করায় রাস্তা উঁচু হয়ে গেছে বাড়ি-ঘরের তুলনায়৷ ফলে বৃষ্টি নামলেই পানিবাড়িতে ঢুকে যায় ৷

ওয়াসা শতকরা ১৩ ভাগ পানি নদী থেকে সংগ্রহ করে, বাকিটা ভূগর্ভস্থ পানি৷ বিশ্লেষকরা বলছেন, বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা থেকে যে প্রক্রিয়ায় পানি সংগ্রহ করা হয় তাতে পানি বিশুদ্ধ হয় না৷ এছাড়া পানি বিশুদ্ধ করতে অনেক সময় ওয়াসা অতিমাত্রায় কেমিক্যাল ব্যবহার করে, যার কারণে পানি দুর্গন্ধ হয়৷

ঢাকার দেড় কোটি মানুষের জন্য প্রতিদিন ২৩০ কোটি লিটার পানির চাহিদা রয়েছে৷ ওদিকে ওয়াসার উৎপাদন ক্ষমতা ২১০ কোটি লিটারের মতো৷ রাজধানীর বাসিন্দারা প্রধানত ওয়াসার পানির ওপরই নির্ভরশীল৷ কিন্তু যে পানি তারা পান, তাও সব সময় ব্যবহার উপযোগী থাকে না৷

ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী কামরুল হাসান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে ওয়াসা ডিস্ট্রিক্ট মিটার্ড এরিয়া(ডিএমএ) প্রজেক্ট চালু করেছে৷ তবে এই প্রজেক্টের আওয়তায় সব গ্রাহককে এখনো আনা যায়নি৷ যেসব এলাকা ডিএমএ-র আওতায় এসেছে, সেসব এলকায় পানির মিটারগুলো ওয়াটার টাইট৷ পানিতে ডুবে গেলেও সাধারণভাবে পাইপে বাইরের পানি ঢোকার কথা না৷ তবে পানির রিজার্ভারে সমস্যা থাকলে আলাদা কথা ৷

তিনি আরো বলেন, ‘‘কোনো এলাকার পাইপে লিকেজ থাকলেও আলাদা কথা৷ কিন্তু আমাদের পাইপ ওয়াটার টাইট, লিকেজ থাকলে আমরা তা জানতে পারি৷”

মোবাশ্বির হোসেনের কথায়, ‘‘এই ময়লা পানি পান করে ডায়ারিয়া, আমাশয়সহ নানা ধরনের রোগ হতে পারে৷ হয় নানা ধরনের চর্মরোগও৷ তাই বিকল্প হিসেবে আমাদের রেইন ওয়াটার হারভেস্টে যাওয়া উচিত ৷ ডিডব্লিউ