আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে নতুন একটি রাজনৈতিক জোট আত্মপ্রকাশ করেছে। ৫৮ টি দল নিয়ে ইউনাইটেড ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স (ইউএনএ) বা সম্মিলিত জাতীয় জোট গঠন করেন। রোববার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘সম্মিলিত জাতীয় জোট’ -্এর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ।
জোট ঘোষণাকালে জোটের নেতৃবৃন্দ এবং সমগ্র দেশবাসীর উদ্দেশ্যে দেওয়া হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের দেওয়া বক্তব্যটি পূর্বপশ্চিমের পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হল:
আস্সালামু আলাইকুম,
আজ আমরা জাতীয় এবং রাজনৈতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি। দেশে গণতান্ত্রিক এবং সাংবিধানিক ধারা অব্যাহত রাখতে সুষ্ঠু-সুন্দর- সু-শৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চা অপরিহার্য। আমরা যারা এই রাজনৈতিক চর্চা করে দেশে শান্তি-স্থিতিশীলতা বজায় রেখে গণতন্ত্রের বিকাশ এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রাখার মাধ্যমে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির রাজনীতি প্রবর্তন করতে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি- তেমন কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে আজ একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক জোট গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে যাচ্ছি।
আজ আমরা এখানে যারা আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি- রাজনৈতিক নীতি ও আদর্শের দিক থেকে- আমরা সবাই স্বাধীনতার চেতনা, ইসলামি মূল্যবোধ তথা সকল ধর্মের প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ আদর্শের অনুসারি এবং ধারক ও বাহক। আমাদের অঙ্গীকার আছে- এই জোটে কোনো স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির জায়গা হবেনা।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
বর্তমানে সংসদীয় গণতান্ত্রিক বিশ্বে জোটগত রাজনৈতিক প্রবণতা বিরাজ করছে। আমাদের দেশেও এই ধারা অব্যাহত আছে। আমরাও এই প্রবণতার বাইরে নই। জোটের রাজনীতির মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে সৌহার্দ স্থাপনের সুযোগ থাকে। যা সংঘাতের রাজনীতির বিপরীতে সম্প্রীতির রাজনীতি প্রবর্তন করতে পারে।
আমি একটি রাজনৈতিক জোট গঠনের ঘোষণা দেয়ার পর- অনেক রাজনৈতিক দল আমার আহ্বানে সাড়া দিয়ে জাতীয় পার্টির সাথে জোট গঠনের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তাদের সমন্বয় করার জন্য আমি পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং আমার প্রেস ও রাজনৈতিক সচিব সুনীল শুভ রায়কে দায়িত্ব দিয়েছি।
জোট গঠনের জন্য আমরা দুইভাবে জোটের শরীক নির্বাচনের নীতি গ্রহণ করেছি। যেসকল দল নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত আছে- সেই দল সরাসরি জোটের শরীক হিসেবে থাকবে এবং যেসকল দল নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে কিংবা নিবন্ধিত হবার অপেক্ষায় আছে, তাদের সমন্বয়ে মোর্চা বা জোট গঠন করে সেই জোটকে আমরা শরীক হিসেবে বৃহত্তর জোটে অন্তর্ভূক্ত করেছি।
প্রথম পর্যায়ে ২টি নিবন্ধিত দল এবং ২টি জোট এই ৪ শরীক নিয়ে আমরা বৃহত্তর একটি জোট গঠনের ঘোষণা করছি। এছাড়া আরো ২টি নিবন্ধিত দলের সাথে আমাদের কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। তারাও আমাদের জোটে অন্তর্ভূক্ত হবার জন্য প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। তাদের দলীয় ফোরামে আলোচনা করে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানালে- সুবিধামতো সময়ে তারা এই জোটে অন্তর্ভূক্ত হবে- আশা করছি। এছাড়াও আমাদের নীতি ও আদর্শের সাথে যারা ঐক্যমত পোষণ করবে- তাদের জন্যেও আমাদের জোটের দরজা খোলা থাকবে। দেশ-জাতি-গণতন্ত্র এবং সংবিধানের স্বার্থে বৃহত্তর ঐক্যের এখন আর কোনো বিকল্প নাই। সেকারণে আজ আমরা এই জোট গঠনের ঘোষণা করতে যাচ্ছি।
এবার আমি আমাদের জোটের নীতিমালা ও ঘোষণাপত্র পাঠ করছি:
জোট গঠনের নীতিমালা ও ঘোষণাপত্র:
ভূমিকা: মহান আল্লাহপাকের উপর সর্বোচ্চ বিশ্বাস, আস্থা ও ভরসা রেখে আমরা নিজ নিজ দল ও জোটের পক্ষে নিম্ন স্বাক্ষরকারীগণ দেশ ও জাতির স্বার্থে জাতীয় পর্যায়ে একটি জোট গঠনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করছি। আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হবে- জোটগতভাবে জাতীয় নির্বাচনসহ সকল পর্যায়ের নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং জোটগতভাবে সরকার গঠন করে দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, সমাজে ন্যায় বিচার ও সু-শাসন নিশ্চিত করা এবং উন্নয়নের ধারা প্রবর্তন করে সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
নিম্নে বর্ণিত নীতিমালার ভিত্তিতে আমরা এই জোট গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছি।
নীতিমালা
এক. জোটের নাম হবে: সম্মিলিত জাতীয় জোট।
ইউনাইটেড ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স সংক্ষেপে: ইউএনএ
সম্মিলিত জোটের চেয়ারম্যান: আমি, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ
এরশাদ
সম্মিলিত জোটের শরীক: জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, জাতীয় ইসলামি মহাজোট এবং
বাংলাদেশ জাতীয় জোট (বিএনএ)
দুই. সম্মিলিত জোটের মৌলিক আদর্শ- ক. ইসলামী মূল্যবোধ তথা সকল ধর্মীয় মূল্যবোধের
প্রতি সমান মর্যাদা প্রদর্শন,
খ. স্বাধীনতার চেতনা এবং
গ. বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনবোধ
নিশ্চিত করা।
এই জোট বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব সমুন্নত রেখে মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক মুক্তি, ইসলামী মূল্যবোধ তথা অন্যান্য ধর্ম বিশ্বাসীদের প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি, আইনের শাসন এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করে একটি আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে তোলাই হবে এই জোটের লক্ষ্য। আমরা নিজ নিজ ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলবো। কেউ কারো ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত করবোনা কিংবা কাউকে তা করতে দেয়া হবেনা।
তিন. সম্মিলিত জাতীয় জোটের অন্তর্ভূক্ত সকল দল ও শরীক জোট সমান মর্যাদা নিয়ে অবস্থান করবে। শরীক দল বা
শরীক জোটের চেয়ারম্যানগণ এই জোটের শীর্ষনেতা হিসেবে সম্মানিত হবেন। জোটের চেয়ারম্যান শরীক দল
ও শরীক জোটের শীর্ষ নেতাদের পরামর্শ গ্রহণ করে জোটগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।
প্রথম পর্যায়ে জোট গঠনের পর অন্য কোনো দল এই জোটে অন্তর্ভূক্ত হবার আগ্রহ প্রকাশ করলে, সেক্ষেত্রে জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। সম্মিলিত জোটের অন্তর্ভূক্ত শরীক জোটের সদস্যদলের প্রধানগণ স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য থাকবেন। সম্মিলিত জোটের চেয়ারম্যান সভা ডেকে জোটের গৃহিত সিন্ধান্তসমূহ স্টিয়ারিং কমিটিতে অবহিত করবেন।
সম্মিলিত জোটের একটি লিয়াজোঁ কমিটি থাকবে।
চার. এই জোটের শরীক দল ও শরীক জোটের মহাসচিববৃন্দ/প্রতিনিধিবৃন্দ নিজ নিজ দল বা জোটের মুখপাত্র হিসেবে
দায়িত্ব পালন করবেন। জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার জোটের প্রধান মুখপাত্র
হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
পাঁচ. জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী মনোনীত করার ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনার চেয়ে প্রার্থীর যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেয়া হবে।
তবে শরীক দল বা শরীক জোটের প্রার্থীতা নিশ্চিত করা হবে। জাতীয় নির্বাচনে জোটের যৌথ ইশতেহার প্রণয়ন
করা হবে। শরীক দল বা শরীক জোটের নিজস্ব ইশতেহারও থাকতে পারে। তবে তা সম্মিলিত জোটের
ইশতেহারের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারবেনা।
ছয়. এই জোটের অন্তর্ভূক্ত সকল রাজনৈতিক দল তাদের নিজ নিজ দলের মত ও আদর্শ নিয়ে তাদের দলীয় কর্মকান্ড
চালাতে পারবে। তবে জোটগতভাবে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে তা পালন করতে সবাই বাধ্য থাকবে। জোটের
অন্তর্ভূক্ত দলের ক্ষেত্রে যেকোনো নির্বাচনে নিবন্ধিত দলের প্রতীক ব্যবহারের বিষয়টি উন্মুক্ত থাকবে।
সাত. এই জোট নির্বাচনী ফলাফল মেনে নেবে। ফল যা-ই হোক না কেনো জোট বহাল থাকবে। জোটের দীর্ঘস্থায়ীত্বের জন্য রাজনৈতিক বিপদে-আপদে, সুদিনে-দুর্দিনে শরীকরা একে-অপরের পাশে থাকবে। আমাদের অঙ্গীকার থাকবে নীতিমালা লঙ্ঘন ব্যাতিত কোনোভাবে স্বার্থের বশবর্তী হয়ে কেউ জোট ছেড়ে যাবোনা।
আমরা যারা জোটের ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছি তারা হলেন:
আমি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, চেয়ারম্যান জাতীয় পার্টি, আল্লামা এম.এ. মান্নান, চেয়ারম্যান-বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, আলহাজ্ব আবু নাছের ওয়াহেদ ফারুক, চেয়ারম্যান- জাতীয় ইসলামি মহাজোট এবং সেকেন্দার আলী মনি, চেয়ারম্যান- বাংলাদেশ জাতীয় জোট (বিএনএ)
পরবর্তীতে আর কোনো দল বা জোট সম্মিলিত জাতীয় জোটের নীতিমালা অনুসারে অন্তর্ভূক্ত করা হলে একইভাবে আমরা সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে দেশবাসীকে অবহিত করবো। আজকের এই সম্মেলনে আপনাদের উপস্থিতির জন্য সবাইকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। খোদা হাফেজ।
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ
চেয়ারম্যান-জাতীয় পার্টি
Reporter Name 
























