দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে আবারও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, চলতি বছর মে মাস শেষে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কম। একই সঙ্গে এটি আগের মাসের তুলনায় প্রায় সাড়ে ৩ শতাংশ কম। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে চাপ এখনও পুরোপুরি কাটেনি। খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর
রিজার্ভ স্থিতি কমে আসার অন্যতম কারণ হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক বাজার থেকে নিয়মিত ডলার কেনা, আমদানি ঋণপত্র খোলা ও নিষ্পত্তিতে গতি, বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধে চাপ এবং নতুন ঋণ সুবিধা কমে যাওয়া।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গণনার ক্ষেত্রে নস্ট্রো হিসাবের ডেবিট ব্যালান্স এবং অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের (ওবিইউ) বিনিয়োগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মে মাস শেষে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ধারণকৃত বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪.৪৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯.৭০ শতাংশ কম। একই সঙ্গে মাসিক ভিত্তিতেও রিজার্ভে নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। এপ্রিল মাসে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর হাতে বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ ছিল ৪.৬৬ বিলিয়ন ডলার। এক মাসের ব্যবধানে মে মাসে তা ৩.৫৮ শতাংশ কমে বর্তমান অবস্থানে এসেছে।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ দেখে সামগ্রিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না। কারণ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নেট ওপেন পজিশন (এনওপি) গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সার্বিক রিজার্ভ স্থিতি কমলেও এনওপি স্বাভাবিক অবস্থায় রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্সে উচ্চ প্রবৃদ্ধির কারণে অনেক ব্যাংকের এনওপি নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করার ঘটনা ঘটে। ফলে ডলারের দাম ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনেছে। তিনি আরও বলেন, সামনের মাসগুলোতে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার পাশাপাশি রপ্তানি আয় শক্তিশালী হলে ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ডলার বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বৈদেশিক লেনদেনে ভারসাম্য সৃষ্টি করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে উল্লেখযোগ্য ওঠানামা হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছর শেষে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা ধারণকৃত ডলারের পরিমাণ ছিল ৫.৫৩ বিলিয়ন ডলার। পরবর্তী অর্থবছরে পরিস্থিতির উন্নতি হয় এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬.১০ বিলিয়ন ডলার। তবে এই ইতিবাচক ধারা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে রিজার্ভ আবার কমতে শুরু করে। ওই অর্থবছর শেষে অর্থাৎ ২০২৫ সালের জুনে ব্যাংকগুলোর ধারণকৃত বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ কমে ৪.২৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।
চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেও নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। মাসভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বরে রিজার্ভ কিছুটা বাড়লেও পরে তা ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে এসে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ নেমে দাঁড়ায় প্রায় ৩.৮০ বিলিয়ন ডলার, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম নিম্ন অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর বিভিন্ন পণ্যের আমদানি ঋণপত্র খোলা ও নিষ্পত্তির পরিমাণ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, গত এপ্রিল মাসে বিভিন্ন পণ্যের ৬৭৯ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়। একই মাসে বিভিন্ন পণ্যের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ৬৫১ কোটি ডলারের। আগের মাস মার্চে বিভিন্ন পণ্যের এলসি খোলা ও নিষ্পত্তির পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৫৭৭ কোটি ডলার ও ৪৬৬ কোটি ডলার।
এদিকে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে বাজার থেকে নিয়মিত ডলার কিনছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি জুন মাসের প্রথম চার দিনে বাজার থেকে প্রায় ১০১ মিলিয়ন ডলার কেনা হয়েছে। আগের মাস মেতে প্রায় ৫৬৫ মিলিয়ন ডলার কেনা হয়। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের ১ জুন থেকে গত ৪ জুলাই পর্যন্ত কেনা হয়েছে ৬ হাজার ৪১৬ মিলিয়ন ডলার।
Reporter Name 
























